প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন

জোনাকী অনলাইন লাইব্রেরীতে আপনাকে স্বাগতম | জোনাকী যদি আপনার ভালো লাগে তবে আপনার বন্ধুদের সাথে লিংকটি শেয়ার করার অনুরোধ জানাচ্ছি | এছাড়াও যারা ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করতে আগ্রহী তারা jaherrahman@gmail.com এ মেইল করার অনুরোধ করা হচ্ছে | আপনার অংশগ্রহণে সমৃদ্ধ হোক আপনার প্রিয় অনলাইন লাইব্রেরী। আমাদের সকল লেখক, পাঠক- শুভানুধ্যায়ীদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা- অভিনন্দন।

লৌকিকতা; ইবাদতের জন্য এক মহাবিপদ | ইমরান বিন বোরহান

জোনাকীতে প্রকাশ করেছেনঃ জহির রহমান | 0 comments


ভূমিকা :
ইসলামে কোনো আমলের বাহ্যিক সৌন্দর্য বা পরিমাণের চেয়ে তার অন্তর্নিহিত নিয়ত ও ইখলাছ অধিক গুরুত্বপূর্ণ। ইখলাছ ইবাদতের রূহ বা প্রাণসত্তা। 
শায়খ আব্দুর রহমান বিন নাছির আস-সা‘দী (রহঃ) বলেন,

اِعْلَمْ أَنَّ الْإِخْلَاصَ لِلَّهِ أَسَاسُ الدِّينِ وَرُوحُ التَّوْحِيدِ وَالْعِبَادَةِ

‘জেনে রাখুন! আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠতা (ইখলাছ) হল দ্বীনের ভিত্তি, তাওহীদের প্রাণ এবং ইবাদতের আত্মা’।(আল-কাওলুস সাদীদ শারহু কিতাবিত তাওদীদ, পৃ. ২১৯)
ইখলাছ হল, বান্দার সকল ইবাদত ও সৎকর্মে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টিকে লক্ষ্য নির্ধারণ করা, আর এর বিপরীত হল রিয়া বা লৌকিকতা, যা মানুষের প্রশংসা, সম্মান বা মর্যাদা লাভের উদ্দেশ্যে আমল করা। রিয়া এমন এক অন্তরব্যাধি, যা নিঃশব্দে মানুষের নেক আমলকে গ্রাস করে এবং আল্লাহর নিকট তার মর্যাদাকে নষ্ট করে দেয়। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর উম্মতকে রিয়া সম্পর্কে বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন এবং একে ‘শিরকে আছগার’বা ছোট শিরক হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন।
মানুষের আত্মশুদ্ধি, আমলের বিশুদ্ধতা এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য রিয়ার বিধিবিধান সম্পর্কে জ্ঞান লাভ অত্যন্ত যরূরী। কারণ যে ব্যক্তি রিয়ার ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারে, সে নিজের নিয়তকে পরিশুদ্ধ করতে সচেষ্ট হয় এবং আমলকে আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ করার প্রয়াস পায়। তাই ইসলামী জীবনব্যবস্থায় রিয়ার বিধিবিধান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

    ইসলামে রিয়া(লৌকিকতা)’র বিধান:
ইসলামে রিয়া সুস্পষ্টভাবে হারাম, এ ব্যাপারে কোন মতভেদ নেই।
•    ইমাম নববী (রহঃ) ‘রিয়াযুছ ছালেহীন’গ্রন্থে রিয়া হারাম হওয়ার দলীল হিসাবে তিনটি আয়াত (বাইয়িনাহ ৫; বাক্বারাহ ২৬৪; নিসা ১৪২) এবং ৫টি হাদীছ নিয়ে এসে তিনি এটিকে শিরক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। (রিয়াযুছ ছালেহীন হা/১৬১৬-১৬২০)
•    ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, فَالرِّيَاءُ كُلُّهُ شِرْكٌ ‘রিয়া সম্পূর্ণটাই শিরক’। তবে তা শিরকে আছগার বা ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত। (আল-জাওয়াবুল কাফী, পৃ. ১৩৩ )

•    ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) শিরকে আছগারের উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেছেন,
وَأَمَّا الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ فَكَيَسِيرِ الرِّيَاءِ.
‘পক্ষান্তরে ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত হল অল্প পরিমাণ রিয়া বা লৌকিকতা’। (মাদারিজুস সালিকীন ১/২৮১) ।
কখনো কখনো এটি শিরকে আকবার বা বড় শিরকে পরিণত হতে পারে।
•    শায়খ মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল-উছায়মীন (রহঃ) বলেন,
وَالرِّيَاءُ يَسِيرُهُ مِنَ الشِّرْكِ الْأَصْغَرِ، وَكَثِيرُهُ مِنَ الشِّرْكِ الْأَكْبَرِ.
‘অল্প পরিমাণ রিয়া ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত আর বেশী পরিমাণ বড় শিরকের অন্তর্ভুক্ত’। (শারহু রিয়াযিছ ছালেহীন (রিয়াদ : দারুল ওয়াতান, ২য় সংস্করণ, ১৪২৭হি.), ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃ. ৩৩৮) ।
উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে আমরা এ কথা বুজতে পারি যে, রিয়া বা লৌকিকতা যে কোন ইবাদাতের জন্য মহাবিপদ, যে ইবাদতের মাধ্যমে রিয়া করা হচ্ছে তার মর্যাদার তারতম্য অনুযায়ী এর গুনাহ ও অপরাধের মাত্রাও ভিন্ন ভিন্ন হয়। সুতরাং যে ইবাদত যত বেশী মর্যাদাপূর্ণ, তা নিয়ে রিয়া করা তত বেশী গুনাহের কারণ।
    ইবাদতের সাথে রিয়া মিশ্রিত হওয়ার তিনটি অবস্থা:
ইবাদতের সাথে রিয়া মিশ্রিত হলে তার তিনটি অবস্থা রয়েছে।
•    প্রথম অবস্থা : মূল ইবাদতে রিয়া চলে আসা। অর্থাৎ ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য যদি হয় মানুষকে দেখানো ও তাদের প্রশংসা লাভ। যেমন: কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নয়; বরং মানুষকে দেখানোর জন্য নামাজ আদায় করে। মূলত মুনাফিকদের ছালাতের অবস্থা এরকম হয়।
মহান আল্লাহ বলেন,
وَإِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلَاةِ قَامُوا كُسَالَى يُرَاءُونَ النَّاسَ وَلَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلًا.
‘যখন তারা নামাজে দাঁড়ায়, তখন অলসভাবে দাঁড়ায়। তারা লোকদের দেখায় এবং আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে’ (নিসা ৪/১৪২) ।
•    ইবনু রজব হাম্বলী (রহঃ) এ ধরনের রিয়াকে رِيَاءٌ مَحْضٌ বা খাঁটি রিয়া হিসাবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, ‘এই খাঁটি রিয়া সাধারণত কোন মুমিনের পক্ষ থেকে নামাজ ও সিয়ামের মতো ফরয ইবাদতে প্রকাশ পায় না। কখনো কখনো এটি ওয়াজিব সাদাক্বা বা হজ্জ এবং এ জাতীয় প্রকাশ্য আমলের ক্ষেত্রে প্রকাশিত হতে পারে। অথবা এমন আমলের ক্ষেত্রে প্রকাশিত হতে পারে যার কল্যাণ অন্যদের কাছে পৌঁছে। কারণ এ ধরনের আমলে ইখলাছ বা একনিষ্ঠতা বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন ও দুরূহ’। (জামেউল উলূম ওয়াল হিকাম, তাহকীক্ব : শু‘আইব আরনাউত্ব ও ইবরাহীম বাজিস (রিয়াদ : দারাতুল মালিক আব্দুল আযীয, ৯ম মুদ্রণ, ২০০২ খ্রি.), ১ম খন্ড, পৃ. ৭৯, ১ম হাদীছের ব্যাখ্যা দ্র.) ।
•    আল-হারিছ আল-মুহাসিবী একে ( الرِّيَاءُ الأَعْظَمُ وَالأَشَدُّ ) বা বড় ও গুরুতর রিয়া হিসাবে আখ্যায়িত করে বলেছেন,
وَإِنَّمَا الْوَجْهُ الَّذِي هُوَ أَشَدُّ الرِّيَاءِ وَأَعْظَمُهُ: إِرَادَةُ الْعَبْدِ الْعِبَادَ بِطَاعَةِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، لَا يُرِيدُ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ بِذَلِكَ.
‘রিয়ার সবচেয়ে ভয়াবহ ও গুরুতর রূপ হল, বান্দা মহান আল্লাহর আনুগত্যমূলক কাজের মাধ্যমে মানুষের সন্তুষ্টি ও প্রশংসা কামনা করে। কিন্তু এর দ্বারা সে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে না’। (আর-রিয়া (দামেশক : দারু কালিমাত, ১৪৪৬ হি./২০২৫ খ্রি.), পৃ. ২১) ।
•    শায়খ বিন বায (রহঃ) এ ধরনের রিয়াকে ( رِيَاءٌ أَكْبَرُ ) বা ‘বড় রিয়া’ হিসাবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, وَهُوَ رِيَاءُ الْمُنَافِقِينَ، وَأَهْلُهُ فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ  ‘এটি মুনাফিকদের রিয়া। এ ধরনের রিয়াকারীরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে’। (শায়খ বিন বায, শারহু রিয়াযিছ ছালেহীন (বৈরুত : দারু কুরতুবাহ, ১ম প্রকাশ, ১৪৪০ হি. ২০১৯ খ্রি.), ৪র্থ খন্ড, পৃ. ৩৬৮) ।

    এ ধরনের রিয়া মিশ্রিত আমলের বিধান:
•    ইবনু রজব হাম্বলী (রহঃ) বলেন,
وَهَذَا الْعَمَلُ لَا يَشُكُّ مُسْلِمٌ أَنَّهُ حَابِطٌ، وَأَنَّ صَاحِبَهُ يَسْتَحِقُّ الْمَقْتَ مِنَ اللَّهِ وَالْعُقُوبَةَ.
‘এ ধরনের আমল যে বিনষ্টকারী ও সম্পূর্ণরূপে বাতিল-এ বিষয়ে কোন মুসলিমেরই সন্দেহ নেই। এমন আমলকারীর উপর আল্লাহর ক্রোধ, অসন্তোষ ও শাস্তি উপযুক্ত হয়ে যায়’। (জামেউল উলূম ওয়াল হিকাম ১/৭৯) ।
•    ইবনু কুদামা মাকদেসী বলেন,
أَمَّا الْعَمَلُ الَّذِي لَا يُرِيدُ بِهِ إِلَّا الرِّيَاءَ فَهُوَ عَلَى صَاحِبِهِ لَا لَهُ، وَهُوَ سَبَبٌ لِلْعِقَابِ، كَمَا أَنَّ الْعَمَلَ الْخَالِصَ لِوَجْهِ اللَّهِ تَعَالَى سَبَبٌ لِلثَّوَابِ. وَلَا إِشْكَالَ فِي هَذَيْنِ الْقِسْمَيْنِ.
‘আর যে আমলের উদ্দেশ্যই শুধু লোক দেখানো, তা আমলকারীর পক্ষে নয়; বরং তার বিরুদ্ধেই যায়। এটি শাস্তির কারণ। যেমন একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে সম্পাদিত আমল ছওয়াবের কারণ। এই দুই প্রকার আমলের ব্যাপারে কোনো সংশয় নেই’। (মুখতাছার মিনহাজুল কাছেদীন, পৃ. ৩৬৭) ।
•    শায়খ উছায়মীন (রহঃ) বলেন, فَهَذَا شِرْكٌ، وَالْعِبَادَةُ بَاطِلَةٌ. ‘এটি শিরক আর ইবাদত বাতিল’। (আল-কাওলুল মুফীদ আলা কিতাবিত তাওহীদ, পৃ. ৪৪৯) ।

•    দ্বিতীয় অবস্থা :
ইবাদতের মাঝখানে রিয়া এতে শরীক হয়ে যাওয়া অর্থাৎ শুরুতে ইবাদত আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ ছিল, পরে ইবাদতের মাঝে রিয়া এসে পড়ল।
এক্ষেত্রে যদি ইবাদতের প্রথম অংশ শেষ অংশের উপর নির্ভরশীল না হয়, তাহলে প্রথম অংশ ছহীহ (শুদ্ধ) হবে এবং শেষ অংশ বাতিল হবে। যেমন, একজন ব্যক্তি একশত টাকা দান করার ইচ্ছা পোষণ করল। সে পঞ্চাশ টাকা খাঁটি ইখলাছের সাথে দান করল। আর বাকী পঞ্চাশ টাকা দান করল লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে। এক্ষণে প্রথম পঞ্চাশ টাকা দানের ছওয়াব সে পাবে। আর দ্বিতীয় পঞ্চাশ টাকা দানের ছওয়াব বাতিল বলে গণ্য হবে।
যদি ইবাদতের শেষ অংশ প্রথম অংশের উপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে তার দু’টি অবস্থা রয়েছে-
এক. যদি ব্যক্তি সাথে সাথে রিয়াকে প্রতিহত করে এবং তার দিকে ঝুঁকে না পড়ে; বরং তাকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং তা অপছন্দ করে, তাহলে এতে তার কোন ক্ষতি হবে না। কারণ নবী (ছাঃ) বলেছেন,
إِنَّ اللهَ تَجَاوَزَ لِأُمَّتِي عَمَّا وَسْوَسَتْ أَوْ حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا مَا لَمْ تَعْمَلْ بِهِ أَوْ تَكَلَّمْ.
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা আমার উম্মতের অন্তরে উদিত কুমন্ত্রণা ও চিন্তাগুলো ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না তারা তা কাজে পরিণত করে অথবা মুখে প্রকাশ করে’। (বুখারী হা/৬৬৬৪; মুসলিম হা/১২৭) ।
দুই.  যদি সে এই রিয়ার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যায় এবং তা প্রতিহত না করে, তাহলে তার পুরো ইবাদত বাতিল হয়ে যাবে। কারণ ইবাদতের শেষ অংশ প্রথম অংশের সাথে সম্পর্কযুক্ত ও তার উপর ভিত্তিশীল।
উদাহরণ : একজন ইখলাছের সাথে দুই রাক‘আত ছালাত শুরু করল। দ্বিতীয় রাক‘আতে কারো দৃষ্টি তার উপর পড়েছে অনুভব করে তার মনে রিয়ার উদ্রেক হল, আর সে এতে সন্তুষ্ট হয়ে গেল ও তার প্রতি ঝুঁকে পড়ল। ফলে তার পুরো ছালাত বাতিল হয়ে যাবে। কারণ এর এক অংশ অন্য অংশের সাথে সম্পর্কযুক্ত।
•    তৃতীয় অবস্থা : ইবাদত শেষ হওয়ার পর রিয়ার কিছু অনুভূতি আসা। ইবাদত শেষ হওয়ার পর যদি রিয়ার কিছু অনুভূতি আসে তাহলে তা ইবাদতের কোন ক্ষতি করবে না। তবে যদি এর মধ্যে অন্যের প্রতি যুলুম থাকে- যেমন দান করার পর খোঁটা দেওয়া বা কষ্ট দেওয়া- তাহলে এই অন্যায়ের গুনাহ ছাদাক্বার ছাওয়াবের মোকাবিলায় দাঁড়াবে এবং তা বাতিল করে দিবে।
মহান আল্লাহ বলেন,
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُبْطِلُوا صَدَقَاتِكُمْ بِالْمَنِّ وَالْأَذَى كَالَّذِي يُنْفِقُ مَالَهُ رِئَاءَ النَّاسِ وَلَا يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَمَثَلُهُ كَمَثَلِ صَفْوَانٍ عَلَيْهِ تُرَابٌ فَأَصَابَهُ وَابِلٌ فَتَرَكَهُ صَلْدًا لَا يَقْدِرُونَ عَلَى شَيْءٍ مِمَّا كَسَبُوا وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ.
‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা খোটা দিয়ে ও কষ্ট দিয়ে তোমাদের দানগুলিকে বিনষ্ট করোনা। সেই ব্যক্তির মত, যে তার ধন-সম্পদ ব্যয় করে লোক দেখানোর জন্য এবং সে আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাস করেনা। ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্ত একটি মসৃণ প্রস্তরখন্ডের মত, যার উপরে কিছু মাটি ছিল। অতঃপর সেখানে প্রবল বৃষ্টিপাত হ’ল ও তাকে ধুয়ে ছাফ করে রেখে গেল। এভাবে তারা যা উপার্জন করে, তা থেকে কোনই সুফল তারা পায় না। বস্ত্ততঃ আল্লাহ অবিশ্বাসী সম্প্রদায়কে সুপথ প্রদর্শন করেন না’ (বাক্বারাহ ২/২৬৪)। [জামেউল উলূম ওয়াল হিকাম ১/৭৯-৮৩; আল-কাত্তলুস সাদীদ শারহু কিতাবিত তাওহীদ, পৃ. ২১৯-২২০; আল-কাত্তলুল মুফীদ, পৃ ৪৪৯-৪৫০]
    যা কিছু রিয়া নয়:
ইবাদত শেষ হওয়ারপর মানুষ তার সে ইবাদতের কথা জেনে গেছে দেখে যদি সে আনন্দিত হয়, তাহলে তা রিয়া নয়। কারণ এই অনুভূতি ইবাদত শেষ হওয়ার পরে এসেছে।
    হাফেয ইবনু কাছীর (রহঃ) সূরা মাঊনের ৬নং আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন,
أَنَّ مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لِلَّهِ فَاطَّلَعَ عَلَيْهِ النَّاسُ فَأَعْجَبَهُ ذَلِكَ، أَنَّ هَذَا لَا يُعَدُّ رِيَاءً.
‘কোন মানুষ যদি আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোন আমল করে, অতঃপর মানুষ তা জেনে ফেলে এবং এতে সে আনন্দিত হয়, তবে এটিকে রিয়া হিসাবে গণ্য করা হবে না’। (তাফসীর ইবনে কাছীর ৮/৪৬৫)
    ইবনু কুদামা মাকদেসী বলেন,
فَإِنْ وَرَدَ عَلَيْهِ بَعْدَ الْفَرَاغِ سُرُورٌ بِالظُّهُورِ مِنْ غَيْرِ إِظْهَارٍ مِنْهُ، فَهَذَا لَا يُحْبِطُ الْعَمَلَ، لِأَنَّهُ قَدْ تَمَّ عَلَى نَعْتِ الْإِخْلَاصِ، فَلَا يَنْعَطِفُ مَا طَرَأَ عَلَيْهِ بَعْدَهُ، لَا سِيَّمَا إِذَا لَمْ يَتَكَلَّفْ هُوَ إِظْهَارَهُ وَالتَّحَدُّثَ بِهِ.
‘যদি ইবাদত শেষ হওয়ার পর মানুষের কাছে প্রকাশ পাওয়ার কারণে তার মনে আনন্দাভূতি সৃষ্টি হয়- যা সে নিজে প্রকাশ বা প্রচার করেনি- তাহলে তা আমলকে বাতিল করে না। কারণ আমলটি তো ইখলাছের সাথেই সম্পাদিত হয়েছে। সুতরাং পরে উদ্ভূত বিষয় তার উপর প্রভাব ফেলবে না; বিশেষত যখন সে নিজে তা প্রকাশ বা প্রচারের চেষ্টা করেনি’। (মুখতাছার মিনহাজুল কাছেদীন, পৃ. ২২১)
    অনুরূপভাবে কোনো ব্যক্তির নিজে সৎকর্ম করতে পেরে অন্তরে আনন্দ অনুভব করাও রিয়া নয়; বরং এটি তার ঈমানের বহিঃপ্রকাশ। নবী (ছাঃ) বলেছেন,
مَنْ سَرَّتْهُ حَسَنَتُهُ وَسَاءَتْهُ سَيِّئَتُهُ فَذَلِكَ الْمُؤْمِنُ .
‘যার নেক কাজ তাকে আনন্দিত করে এবং গুনাহ তাকে কষ্ট দেয়, সেই মুমিন’। (মুসনাদ আহমাদ হা/২২২২০; তিরমিযী হা/২১৬৫) ।
এ ব্যাপারে নবী (সাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ( تِلْكَ عَاجِلُ بُشْرَى الْمُؤْمِنِ ) ‘এটাই হলো মুমিনের জন্য দুনিয়াতেই প্রাপ্ত অগ্রিম সুসংবাদ’। (মুসলিম হা/২৬৪২) ।

    লৌকিকতার ভয়ে আমল পরিত্যাগের বিধান :
কিছু মানুষ সৎকর্মে অভ্যস্ত থাকে। কিন্তু কখনো তার মনে রিয়ার আশংকা জাগে। ফলে সে এই আশংকার ভয়ে ইবাদত বা নেক আমল ছেড়ে দেয়। অথবা কোন মানুষ দেখছে এই কারণেই সে সৎকাজ পরিত্যাগ করে। অথচ এ ধরনের চিন্তা ভুল।
•    ফুযাইল বিন ইয়ায বলেন,
تَرْكُ الْعَمَلِ مِنْ أَجْلِ النَّاسِ رِيَاءٌ، وَالْعَمَلُ مِنْ أَجْلِ النَّاسِ شِرْكٌ، وَالْإِخْلَاصُ أَنْ يُعَافِيَكَ اللَّهُ مِنْهُمَا.
‘মানুষের কথা ভেবে আমল ত্যাগ করা রিয়া আর মানুষের জন্য আমল করা শিরক। পক্ষান্তরে প্রকৃত ইখলাছ হল, আল্লাহ তোমাকে এ উভয় ব্যাধি থেকে হেফাযত করুন’। (শু‘আবুল ঈমান হা/৬৮৭৯; মু‘জামুত তাওহীদ ২/২৭৯) ।
তবে কেউ যদি কিছু নফল ইবাদত কিছু মানুষের সামনে এ কারণে ছেড়ে দেয় যে, তারা তার এমন প্রশংসা করবে যা তার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, অথবা সে নিজের ব্যাপারে ফিতনার আশংকা করে- তাহলে সেটিও রিয়ার অন্তর্ভুক্ত নয়। কিন্তু ওয়াজিব আমল কোন শারঈ ওযর ছাড়া ত্যাগ করার অনুমতি নেই’। (ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা ১/৭৬৮-৬৯, ফাতাওয়া নং ৩৪১৯) ।

    রিয়ায় নিপতিত হওয়ার আশংকায় আমল পরিত্যাগ শয়তানী চক্রান্ত ও ফাঁদ:
•    ইমাম ইবনু হাযম আন্দালুসী বলেন,
لِإِبْلِيسَ فِي ذَمِّ الرِّيَاءِ حِبَالَةٌ، وَذَلِكَ أَنَّهُ رُبَّ مُمْتَنِعٍ مِنْ فِعْلِ خَيْرٍ مَخَافَةَ أَنْ يُظَنَّ بِهِ الرِّيَاءُ، فَإِذَا أَطْرَقَكَ مِنْهُ هَذَا فَامْضِ عَلَى فِعْلِكَ، فَهُوَ شَدِيدُ الْأَلَمِ عَلَيْهِ.
‘রিয়ার নিন্দার মধ্যেও ইবলীসের একটি ফাঁদ রয়েছে। তা হল, অনেক মানুষ রিয়াকার আখ্যায়িত হওয়ার ভয়ে ভাল কাজ ছেড়ে দেয়। সুতরাং তোমার মনেও যদি শয়তানের পক্ষ থেকে এ ধরনের কুমন্ত্রণা আসে, তবে তুমি তোমার সৎকর্ম চালিয়ে যাও। কারণ এটি ইবলীসের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক’। (আল-আখলাক ওয়াস সিয়ার, তাহকীক্ব : ইফা রিয়ায (বৈরূত : দারু ইবনি হাযম, ২য় সংস্করণ, ২০০৭ খ্রি.), পৃ. ৮০)
    রিয়ার আশংকায় আমল পরিত্যাগের ইমামদের বক্তব্য:
ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন,
وَمَنْ نَهَى عَنْ أَمْرٍ مَشْرُوعٍ بِمُجَرَّدِ زَعْمِهِ أَنَّ ذَلِكَ رِيَاءٌ، فَنَهْيُهُ مَرْدُودٌ عَلَيْهِ مِنْ وُجُوهٍ.
‘যে ব্যক্তি কেবল এই ধারণায় কোন শরী‘আতসম্মত কাজ থেকে নিষেধ করে যে, তা রিয়া- তার এ নিষেধাজ্ঞা কয়েকটি দিক থেকে প্রত্যাখ্যাত’।
১. রিয়ার আশংকায় শরী‘আতসম্মত আমলগুলো থেকে নিষেধ করা হয় না; বরং সেগুলো সম্পাদন করতে এবং তাতে ইখলাছ বজায় রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়। কারণ শরী‘আতসম্মত কাজ প্রকাশ না করার ক্ষতি, তা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে প্রকাশ করার ক্ষতির চেয়েও বড়। যেমন ঈমান ও নামাজ প্রকাশ না করার ক্ষতি, তা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে প্রকাশ করার ক্ষতির চেয়ে অধিক ভয়াবহ। কারণ নিষেধাজ্ঞা তো তখনই প্রযোজ্য হয়, যখন ঐ কাজটি মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে প্রকাশ করার মধ্যে ক্ষতি থাকে।
২. নিষেধ ঐ বিষয়ের উপর প্রযোজ্য হয়, শরী‘আত যেটিকে অপছন্দ করেছে। আর রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, (
إِنِّي لَمْ أُؤْمَرْ أَنْ أَنْقُبَ عَنْ قُلُوبِ النَّاسِ ) ‘নিশ্চয়ই আমি মানুষের বুক চিরে দেখতে আদিষ্ট হইনি’। (বুখারী হা/৪৩৫১; মুসলিম হা/১০৬৪) ।
৩. এ ধরনের ধারণাকে বৈধ মনে করলে এর পরিণতি হবে- শিরক ও ফাসাদ সৃষ্টিকারী লোকেরা যখনই কোন দ্বীনদার ও সৎ মানুষকে কোন শরী‘আতসম্মত ও সুন্নাহসম্মত কাজ প্রকাশ্যে করতে দেখবে, তখনই বলবে, সে রিয়া করছে। ফলে সত্যবাদী ও মুখলিছ ব্যক্তিরা মানুষের নিন্দা ও কটূক্তির ভয়ে শরী‘আতসম্মত কাজ প্রকাশ করা ছেড়ে দিবে। এতে কল্যাণমূলক কাজ স্থবির হয়ে পড়বে আর শিরকপন্থীরা শক্তিশালী হয়ে উঠবে। তারা প্রকাশ্যে মন্দ কাজ করবে অথচ কেউ তাদের বাধা দেবে না। এটি বড় ধরনের অনিষ্টের শামিল।
৪. এ ধরনের আচরণ মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্যের অন্তর্ভুক্ত। তারা শরী‘আতসম্মত আমল প্রকাশকারীদের দোষারোপ করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
الَّذِينَ يَلْمِزُونَ الْمُطَّوِّعِينَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ فِي الصَّدَقَاتِ وَالَّذِينَ لَا يَجِدُونَ إِلَّا جُهْدَهُمْ فَيَسْخَرُونَ مِنْهُمْ سَخِرَ اللَّهُ مِنْهُمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ.
‘যারা স্বেচ্ছায় ছাদাকা দানকারী মুমিনদের প্রতি বিদ্রুপ করে এবং যাদের স্বীয় পরিশ্রমলব্ধ বস্ত্ত ছাড়া কিছুই নেই তাদেরকে ঠাট্টা করে, আল্লাহ তাদেরকে লাঞ্ছিত করেন এবং তাদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি’ (তওবা ৯/৭৯)। (মাজমূউল ফাতাওয়া ২৩/১৭৪) ।
    আবু মাসউদ আনছারী (রাঃ) বলেন,
لَمَّا أُمِرْنَا بِالصَّدَقَةِ كُنَّا نَتَحَامَلُ فَجَاءَ أَبُوْ عَقِيْلٍ بِنِصْفِ صَاعٍ وَجَاءَ إِنْسَانٌ بِأَكْثَرَ مِنْهُ فَقَالَ الْمُنَافِقُوْنَ إِنَّ اللهَ لَغَنِيٌّ عَنْ صَدَقَةِ هَذَا وَمَا فَعَلَ هَذَا الآخَرُ إِلَّا رِئَاءً فَنَزَلَتْ (الَّذِيْنَ يَلْمِزُوْنَ الْمُطَّوِّعِيْنَ مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ فِي الصَّدَقَاتِ وَالَّذِيْنَ لَا يَجِدُوْنَ إِلَّا جُهْدَهُمْ) الآيَةَ.
‘(তাবুক যুদ্ধের দিন) যখন আমাদের ছাদাকা করার নির্দেশ দেওয়া হল, তখন আমরা কষ্ট করে (উপার্জন করে) ছাদাকা দিতাম। এমন সময় আবু আকীল অর্ধ ছা পরিমাণ দান নিয়ে এলেন। আরেকজন ব্যক্তি তার চেয়ে বেশী দান নিয়ে এলেন। তখন মুনাফিকরা বলল, আল্লাহ তো এ ব্যক্তির এই সামান্য ছাদাকার মুখাপেক্ষী নন। আর অন্য ব্যক্তি সম্পর্কে বলল, ‘সে তো শুধু লোক দেখানোর জন্যই তা করেছে’। তখন উক্ত আয়াতটি (তওবা ৯/৭৯) নাযিল হল। [বুখারী হা/৪৬৬৮] ।
    ইমাম নববী (রহঃ) রিয়ার আশংকায় আমল পরিত্যাগের ভয়াবহতা সম্পর্কে বলেন,
ثمَّ لَا يَنْبَغِي أَنْ يُتْرَكَ الذِّكْرُ بِاللِّسَانِ مَعَ الْقَلْبِ خَوْفًا مِنْ أَنْ يُظَنَّ بِهِ الرِّيَاءُ، بَلْ يَذْكُرُ بِهِمَا جَمِيعًا وَيَقْصِدُ بِهِ وَجْهَ اللَّهِ تَعَالَى وَلَوْ فَتَحَ الْإِنْسَانُ عَلَى نَفْسِهِ بَابَ مُلَاحَظَةِ النَّاسِ، وَالِاحْتِرَازِ مِنْ تَطَرُّقِ ظُنُونِهِمُ الْبَاطِلَةِ، لَانْسَدَّ عَلَيْهِ أَكْثَرُ أَبْوَابِ الْخَيْرِ، وَضَيَّعَ عَلَى نَفْسِهِ شَيْئًا عَظِيمًا مِنْ مُهِمَّاتِ الدِّينِ، وَلَيْسَ هَذَا طَرِيقَ الْعَارِفِينَ.
‘রিয়াকার মনে করার আশংকায় অন্তরসহ জিহবার যিকির ত্যাগ করা উচিত নয়; বরং উভয়ভাবেই যিকির করবে এবং এর দ্বারা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টিই উদ্দেশ্য রাখবে। মানুষ যদি সবসময় লোকদের দৃষ্টি ও তাদের ভ্রান্ত ধারণার ভয় করতে থাকে এবং তা থেকে বাঁচতে সচেষ্ট হয়, তবে তার জন্য কল্যাণের অধিকাংশ দরজাই বন্ধ হয়ে যাবে। সে দ্বীনের বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবে। আর এটি আল্লাহওয়ালাদের পথ নয়’।  [আল-আযকার (জেদ্দা : দারুল মিনহাজ, ৪র্থ সংস্করণ, ১৪৩৩হি./২০১২খ্রি.), পৃ. ৩৭-৩৮] ।
    যেসব বিষয় রিয়া-র অন্তর্ভুক্ত নয় :
কিছু বিষয় রয়েছে যেগুলোকে মানুষ রিয়া মনে করে অথচ সেগুলো রিয়ার অন্তর্ভুক্ত নয়। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোকপাত করা হল-
১. বান্দার সংকর্মের প্রশংসা করা : কোন মানুষ যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোন সৎকর্ম সম্পাদন করে অতঃপর মানুষ তা জেনে যায়। অথচ সে নিজে সেটি প্রকাশ বা প্রচার করতে চায়নি। এতে আমলকারীর মনে আনন্দানুভূতির উদ্রেক হলে এবং মানুষ তার আমলের প্রশংসা করলে সেটি রিয়া হিসাবে গণ্য হবে না। বরং এক্ষেত্রে মানুষের প্রশংসা লাভ তার প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও তার জন্য আগাম সুসংবাদ বলে বিবেচিত হবে। (তাফসীর ইবনে কাছীর ৮/৪৬৫, মাঊন ৬ আয়াতের তাফসীর দ্র.; মুখতাছার মিনহাজুল কাছেদীন, পৃ. ২২১)
মহান আল্লাহ বলেন, قُلْ بِفَضْلِ اللهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَلِكَ فَلْيَفْرَحُوا هُوَ خَيْرٌ مِمَّا يَجْمَعُونَ. ‘বল, আল্লাহর এই দান ও তার অনুগ্রহের কারণে তাদের আনন্দিত হওয়া উচিত। এটি সবকিছু থেকে উত্তম যা তারা সঞ্চয় করে’ (ইউনুস ১০/৫৮)।
আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করা হল, ঐ ব্যক্তির ব্যাপারে আপনার মতামত কী যে সৎকর্ম করে এবং এজন্য মানুষ তার প্রশংসা করে? অন্য বর্ণনায় রয়েছে, এজন্য মানুষ তাকে ভালোবাসে। তিনি বললেন, تِلْكَ عَاجِلُ بُشْرَى الْمُؤْمِنِ. ‘এটি মুমিনের জন্য নগদ সুসংবাদ’। (মুসলিম হা/২৬৪২; ইবনু মাজাহ হা/৩৪২৩)।
ইমাম নববী (রহ.) বলেন, ‘আলেমগণ বলেছেন, এর অর্থ হ’ল মানুষের পক্ষ থেকে কোন নেককার বান্দার প্রশংসা হওয়া তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অগ্রিম সুসংবাদ। এটি এ কথার প্রমাণ যে, আল্লাহ তা‘আলা তার প্রতি সন্তুষ্ট এবং তিনি তাকে ভালবাসেন। ফলে আল্লাহ তাকে মানুষের কাছে প্রিয় করে তোলেন, অতঃপর পৃথিবীতে তার গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি করে দেন। এসবই তখন হবে, যখন মানুষ তার প্রশংসা করবে তার পক্ষ থেকে প্রশংসা পাওয়ার কোন চেষ্টা বা আকাঙ্ক্ষা ছাড়াই। কিন্তু যদি সে মানুষের প্রশংসা কামনা করে, তবে তা হবে নিন্দনীয়’। (আল-মিনহাজ শারহু ছহীহ মুসলিম হা/২৬৪২-এর ব্যাখ্যা দ্র.) ।
এভাবেই মুখলিছ ব্যক্তি সুনাম-সুখ্যাতি ও প্রশংসা অপছন্দ করে এবং তা থেকে পালায়, কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবীতে তার জন্য গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি করে দেন। এটি কেবল আল্লাহর অনুগ্রহেই সম্ভব হয়।
২. সুন্দর পোষাক-পরিচ্ছদ পরিধান : নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর পোষাক এবং জুতা-স্যান্ডেল পরিধান করা রিয়ার অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে এক্ষেত্রে অহংকার ও অপচয় থেকে বিরত থাকতে হবে।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
كُلُوا وَاشْرَبُوا وَتَصَدَّقُوا وَالْبَسُوا مَا لَمْ يُخَالِطْهُ إِسْرَافٌ أَوْ مَخِيلَةٌ.
‘তোমরা খাও, পান করো, দান-ছাদাকা করো এবং পোষাক পরিধান করো- যতক্ষণ না তাতে অপচয় ও অহংকারের ছোঁয়া থাকে’। (নাসাঈ হা/২৫৫৯; ইবনু মাজাহ হা/৩৬০৫, হাদীছ হাসান) ।
অন্য হাদীছে এসেছে, إِنَّ اللهَ يُحِبَّ أَنْ يُرَى أَثَرُ نِعْمَتِهِ عَلَى عَبْدِهِ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা তার বান্দার উপর তার নে‘মতের সৌন্দর্য ও প্রভাব দেখতে পছন্দ করেন’। (তিরমিযী হা/২৮১৯, হাসান ছহীহ) ।
৩. ইসলামের নিদর্শনসমূহ প্রকাশ করা : স্বতঃসিদ্ধ মূলনীতি হল,
مَبْنَى الشَّعَائِرِ عَلَى الْإِشْهَارِ وَالْإِظْهَارِ دُونَ الْإِخْفَاءِ.
‘ইসলামের প্রতীক ও নিদর্শনসমূহের ভিত্তি হল সেগুলোকে প্রকাশ ও প্রচার করা; গোপন রাখা নয়’। এজন্য ইসলামে এমন কিছু ইবাদত রয়েছে, যেগুলো গোপন করা সম্ভব নয়। যেমন: হজ্জ, ওমরা, জুম‘আ, জামা‘আত, জিহাদ ইত্যাদি। এগুলো প্রকাশ করার মাধ্যমে বান্দা রিয়াকারী হিসাবে গণ্য হয় না। কেননা ফরয আমলগুলোর দাবী হল, সেগুলো ঘোষণা দেওয়া ও প্রচার করা। এসকল আমল দ্বীনের প্রতীক ও ইসলামের নিদর্শন। উপরন্তু এ আমলগুলো পরিত্যাগকারী নিন্দা, তিরস্কার ও ঘৃণার যোগ্য। তাই কুধারণা দূর করার জন্য এগুলো প্রকাশ করা জরূরী। (সালীম আল-হেলালী, আর-রিয়া, পৃ. ৫৮) ।
৪. পাপ গোপন রাখা : পাপ গোপন রাখা এবং সে সম্পর্কে কাউকে কিছু না বলা রিয়া নয়। বরং ইসলামে নিজেদের ও অন্যদের দোষ গোপন রাখার নির্দেশনা রয়েছে। কিছু মানুষ মনে করে, অপরাধ প্রকাশ করা যরূরী, যাতে সে মুখলিছ বান্দা বলে গণ্য হতে পারে। এটি ভুল ধারণা ও শয়তানী ধোঁকা ছাড়া কিছুই নয়। কেননা পাপের কথা বলে বেড়ানো মুমিনদের মাঝে অশ্লীলতা ছড়িয়ে দেওয়ার অন্তর্ভুক্ত। (মুখতাছার মিনহাজুল কাছেদীন, পৃ. ২২৪; মুহাম্মাদ ছালেহ আল-মুনাজ্জিদ, আ‘মালুল কুলূব, পৃ. ৪৭) ।
মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ.
‘নিশ্চয়ই যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য রয়েছে ইহকালে ও পরকালে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। বস্ত্ততঃ আল্লাহ জানেন কিন্তু তোমরা জানো না’ (নূর ২৪/১৯)।
৫. সৎকর্মশীল বান্দাদের সংস্পর্শে ইবাদতের স্পৃহা বৃদ্ধি : কেউ কেউ কখনো কোন উদ্যমী ইবাদতকারীকে দেখে এবং সৎকর্মপরায়ণ ও মুখলিছ ব্যক্তিদের সংস্পর্শে এসে সৎকর্ম ও ইবাদতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। এটা রিয়া বা লৌকিকতা নয়। এগুলো আমলকারীর সংকল্পকে দৃঢ় করে এবং তার অন্তরে কর্মস্পৃহা ও প্রফুল্লতা সৃষ্টি করে। ইবনু কুদামা মাকদেসী (রহঃ) এর উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘কখনো একজন ব্যক্তি তাহাজ্জুদগুযারদের সাথে রাত যাপন করে। তারা রাতের অধিকাংশ সময় জুড়ে তাহাজ্জুদ ছালাতে নিমগ্ন থাকে। অথচ তার নিজের অভ্যাস হল অল্প সময় ক্বিয়াম করা। কিন্তু তাদের সঙ্গ পেয়ে সেও অধিক সময় ইবাদতে মশগুল হয়ে যায়। অথবা তারা ছিয়াম পালন করে। তাই সেও ছিয়াম রাখে। তাদের সঙ্গ না পেলে হয়তো তার মাঝে এধরনের উদ্যম সৃষ্টি হতো না। এ অবস্থাকে কেউ কেউ রিয়া মনে করতে পারে। অথচ এটা মোটেও রিয়া নয়’। (মুখতাছার মিনহাজুল কাছেদীন, পৃ. ২২৫) ।
    উপসংহার : রিয়া এমন একটি মারাত্মক আত্মিক ব্যাধি, যা মানুষের আমলের প্রাণশক্তি তথা ইখলাছকে ধ্বংস করে দেয় এবং আখিরাতের সফলতাকে বিপন্ন করে। বাহ্যিকভাবে নেক আমল যতই সুন্দর ও প্রশংসনীয় হোক না কেন, যদি তার অন্তরে আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে মানুষের সন্তুষ্টি বা প্রশংসা লাভের আকাঙ্ক্ষা থাকে, তবে সেই আমল আল্লাহর নিকট মূল্যহীন। এ কারণে সালাফে ছালেহীন রিয়াকে অত্যন্ত ভয় করতেন এবং সর্বদা নিজেদের নিয়ত পরিশুদ্ধ রাখার চেষ্টা করতেন।


ফিকহী মূলনীতির আলোকে ইসলামে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা | ইমরান বিন বোরহান

জোনাকীতে প্রকাশ করেছেনঃ জহির রহমান | 0 comments



ভূমিকা

খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা শিক্ষা মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্তর্ভুক্ত মানব শরীরের বিকাশ, ক্ষয়রোধ পুষ্টি চাহিদা মেটানোর অত্যাবশকীয় উপাদান খাদ্য পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে ইসলাম মানব জীবনের প্রতিটি দিকের জন্য প্রয়োজনীয় সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে কুরআন হাদীসে মানুষের খাদ্য গ্রহনের ক্ষেত্রে পরিমিত, স্বাস্থ্যকর, রুচিসম্মত হালাল পবিত্রতার উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, যা ইসলামের সামগ্রিক জীবনবিধানের একটি অপরিহার্য অংশ বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা আধুনিকায়নের ফলে খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ বিপণন ব্যবস্থায় নানা চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে, ফলে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ এখন সামাজিক জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনায় কিছু আইন ও নিয়মনীতি রয়েছে যা খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থার উপর গুরুত্ব দেয়এর সাথে যদি ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে ফিকহী মূলনীতির আলোকে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব অনুধাবন করা হয়, তাহলে তা ব্যক্তি ও সমাজের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি ন্যায়বিচার, বিশ্বাসযোগ্যতা ও নৈতিকতার মতো ইসলামি মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে ইনশা-আল্লাহ!।

  

ফিকহী মূলনীতির আলোকে নিরাপদ খাদ্য:

যুগে যুগে ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞরা কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বিভিন্ন ফিকহী মূলনীতি গ্রহণ করেছেন এবং সেগুলোর আলোকে বিভিন্ন বিষয়ের সমাধান দিয়েছেন। নিম্নে তা নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থার নিরিখে বিশ্লেষণ করা হলো

·         মূলনীতি এক : أصْلُ الشَّيءِ الإباحَة : (কোন বিষয়ের মূল অবস্থা হলো অনুমোদিত বা বৈধ)

ইসলামে কোন জিনিস হারাম করতে দলিলের প্রয়োজন পড়ে, কিন্তু হালাল হওয়ার জন্য কোন দলিল প্রয়োজন পড়ে না। কারণ প্রত্যেক জিনিসের মূল অবস্থাই হলো বৈধ। যদি কেউ কোন বস্তু হারাম করতে চায় সে ক্ষেত্রে তার হারাম হওয়ার পক্ষে দলিল উপস্থাপন করতে হবে।

যেমন আল্লাহ তায়া'লা কুরআনুল কারিমে বলেন,

هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُم مَّا فِي الْأَرْضِ جَمِيعً

জমিনে যা কিছু রয়েছে সবকিছু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। ( সুরা আল-বাকারাহ, ২৯)

 

আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُحَرِّمُوا طَيِّبَاتِ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا ۚ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ

হে ঈমানদারগণ! তোমরা সেই পবিত্র বস্তুসমূহকে হারাম করো না, যা আল্লাহ তোমাদের জন্য হালাল করেছেন এবং সীমালঙ্ঘন কোরো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না। ( সুরা মায়েদা, ৮৭)

উক্ত আয়াতসমূহে বলা হয়েছে আল্লাহ তায়া'লা জমিনে যা কিছু সৃষ্টি করেছেন সবকিছু আমাদের জন্য। এই আয়াতের আলোকে আমাদের জন্য সকল বস্তু ব্যবহারযোগ্য ও সকল খাবার গ্রহণযোগ্য, যদি এর বিপক্ষে কোন দলিল না থাকে। যদি কোন বস্তু বা খাদ্য হারাম করা হয় তাহলে সেটা আমাদের জন্য নয়। হাদিস শরীফে এসেছে রাসূল বলেছেন,

كَانَ أَهْلُ الْجَاهِلِيَّةِ يَأْكُلُونَ أَشْيَاءَ، وَيَتْرُكُونَ أَشْيَاءَ تَقَذُّرًا، فَبَعَثَ اللهُ تَعَالَى نَبِيَّهُ، وَأَنْزَلَ كِتَابَهُ، وَأَحَلَّ حَلَالَهُ، وَحَرَّمَ حَرَامَهُ، فَمَا أَحَلَّ فَهُوَ حَلَالٌ، وَمَا حَرَّمَ فَهُوَ حَرَامٌ، وَمَا سَكَتَ عَنْهُ فَهُوَ عَفْوٌ

জাহেলী যুগের লোকেরা কিছু জিনিস খেত এবং কিছু জিনিস ঘৃণাবশত পরিত্যাগ করত। এরপর আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে প্রেরণ করলেন এবং তাঁর কিতাব নাযিল করলেন। তিনি যা হালাল করেছেন, তা হালাল, এবং যা হারাম করেছেন, তা হারাম। আর যার ব্যাপারে তিনি নীরব থেকেছেন, তা ক্ষমার যোগ্য (অনুমোদিত) (আবু দাউদ- ৩৮০০)

উক্ত মূলনীতির আলোকে সকল খাবার বৈধ, যদি স্পষ্টভাবে কুরআন এবং হাদিসে কোন খাবারের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আসে তাহলে তা অবৈধ। যেমনটা আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারিমে বলেন,

حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنْزِيْرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللهِ بِهِ وَالْمُنْخَنِقَةُ وَالْمَوْقُوْذَةُ وَالْمُتَرَدِّيَةُ وَالنَّطِيْحَةُ وَمَا أَكَلَ السَّبُعُ إِلَّا مَا ذَكَّيْتُمْ وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ وَأَنْ تَسْتَقْسِمُوْا بِالْأَزْلَامِ ذٰلِكُمْ فِسْقٌ.

তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত জন্তু, রক্ত, শূকরের গোস্ত, আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে যবেহ করা পশু, গলা চিপে মারা যাওয়া জন্তু, প্রহারে মারা যাওয়া জন্তু, উপর থেকে পড়ে মারা যাওয়া জন্তু, অন্য প্রাণীর শিং এর আঘাতে মারা যাওয়া জন্তু এবং হিংস্র পশুতে খাওয়া জন্তু; তবে যা তোমরা যবেহ করতে পেরেছ তা ছাড়া, আর যা মূর্তি পূজার বেদীর উপর বলী দেয়া হয় তা এবং জুয়ার তীর দিয়ে ভাগ্য নির্ণয় করা, এসব পাপ কাজ। (সুরা মায়েদা- ৩)

যেহেতু আল্লাহ তায়ালা এ সকল খাবার হারাম করেছেন তাই এগুলো খাওয়া যাবে না, বিক্রিও করা যাবে না। মাছ ও মাছজাত পণ্য (পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০২০ এর ধারা ৪-৫ অনুসারে মাছ ও মাছজাত পণ্যের উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণে মান নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি পরিদর্শনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রকৃতিগতভাবে মাছ হালাল, পবিত্র, স্বাস্থ্যসম্মত; যদি না তাতে কোনো ভেজাল মিশ্রণ না হয়। তাই প্রকৃতিগতভাবে হালাল ও পবিত্র এ পণ্যের পবিত্রতা যেন রক্ষিত হয়, সে লক্ষ্যে এ আইন প্রণীত হয়েছে।

বাংলাদেশে হোটেল ও রেস্টুরেন্ট আইন ২০১৪ এর ধারা ১০ অনুসারে হোটেল ও রেস্টুরেন্টে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে খাদ্য প্রস্তুত, সংরক্ষণ ও পরিবেশন করতে হবে। খাদ্য প্রস্তুত ও পরিবেশনের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা ইসলামের তাহারাত নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্য আইন ২০১০ এর ধারা ৪-৫ অনুসারে মাছ ও প্রাণী খাদ্যের মান নির্ধারণ এবং পরীক্ষা নিরীক্ষা করে নিশ্চিত করতে হবে যে খাদ্য স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ। মাছ স্বভাবতই হালাল, হালাল প্রাণীর মাংসও স্বভাবতই হালাল, তাই এগুলো উৎপাদনে যেন কোনো ক্ষতিকর উপাদানের প্রয়োগ।

না হয়, তা নিশ্চিত করা ইসলামের নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি কুরআনের হালাল ও তায়্যিব নীতির সাথে সামঞ্জস্য। মহান আল্লাহ বলেন,

يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا

হে মানবজাতি! পৃথিবীর হালাল ও পবিত্র বস্তু ভক্ষণ কর। ( সুরা বাকারাহ, ১৬৮)

আইনের এই ধারা খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, যা ইসলামের তায়্যিব (স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ খাদ্য) নীতির বাস্তব প্রয়োগ।

বাংলাদেশ সরকার গৃহীত নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩-এর ধারা ৩০-৩২ দ্বারা খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে মান ও স্বাস্থ্যবিধি রক্ষার্থে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো খাদ্য উৎপাদন ও সংরক্ষণে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা। এটি ইসলামের পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ বলেছেন:

الطُّهُورُ شَطْرُ الْإِيمَانِ - পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক। ( সহীহ মুসলিম, ই.ফা. ২য় খন্ড, ৪২৫)

 

সর্বোপরি, খাদ্য উৎপাদনের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা ইসলামের তাহারাত নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

·         মূলনীতি দুই : الضَّرُورَةُ تُبِيحُ الْمَحْظُورَاتِ (প্রয়োজন নিষিদ্ধ বিষয়কে বৈধ করে)

এই মূলনীতি ফিকহের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান। এটি দেখায় যে ইসলাম কষ্ট ও কঠোরতার ধর্ম নয়; বরং প্রয়োজনে নিষিদ্ধ বিষয়কেও সীমিত পরিসরে বৈধতা দেয়। তবে শর্ত হলো, তা শুধু চরম প্রয়োজনের জন্য হতে হবে এবং প্রয়োজন শেষ হলে স্বাভাবিক বিধান পুনরায় কার্যকর হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَمَا لَكُمْ أَلَّا تَأْكُلُوا مِمَّا ذُكِرَ اسْمُ اللَّهِ عَلَيْهِ وَقَدْ فَصَّلَ لَكُم مَّا حَرَّمَ عَلَيْكُمْ إِلَّا مَا اضْطُرِرْتُمْ إِلَيْهِ

আর তোমাদের কি হয়েছে যে, যাতে আল্লাহর নাম নেয়া হয়েছে তোমরা তা থেকে খাবে না? যা তোমাদের জন্য তিনি হারাম করেছেন তা তিনি বিশদভাবেই তোমাদের কাছে বিবৃত করেছেন, তবে তোমরা নিরুপায় হলে তা স্বতন্ত্র। (সুরা আনআম, ১১৯)

 

 

 

 

إِنَّمَا حَرَّمَ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمَ وَلَحْمَ الْخِنْزِيرِ وَمَا أُهِلَّ بِهِ لِغَيْرِ اللَّهِ فَمَنِ اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغٍ وَلَا عَادٍ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

তিনি আল্লাহ তো কেবল তোমাদের উপর হারাম করেছেন মৃত জন্তু, রক্ত, শুকরের গোশত এবং যার উপর আল্লাহর নাম ছাড়া অন্যের নাম উচ্চারিত হয়েছে, কিন্তু যে নিরুপায় অথচ নাফরমান এবং সীমালঙ্ঘনকারী নয় তার কোনো পাপ হবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। ( সুরা বাকারাহ, ১৭৩)

فَمَنِ اضْطُرَّ فِي مَخْمَصَةٍ غَيْرَ مُتَجَانِفٍ لِّإِثْمٍ فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

অতঃপর কেউ পাপের দিকে না ঝুঁকে ক্ষুধার তাড়নায় বাধ্য হলে তবে নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

(সুরা মায়েদা, ৩)

এই আয়াতগুলোতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, যদি কেউ চরম প্রয়োজনের মুখোমুখি হয় (যেমন অনাহারে মৃত্যুর শঙ্কা থাকে), তাহলে সাধারণত নিষিদ্ধ বস্তু খাওয়ার অনুমতি রয়েছে। রাসূল বলেছেন,

إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِأُمَّتِي عَنِ الْخَطَاءِ وَالنِّسْيَانِ وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ

নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের জন্য ভুল, বিস্মৃতি এবং যে বিষয়ে তাদের বাধ্য করা হয়েছে, তা ক্ষমা করে দিয়েছেন। ( ইবনু মাজাহ, ২০৪৫)

এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, কেউ যদি চরম প্রয়োজনের কারণে নিষিদ্ধ কোনো কাজে বাধ্য হয়, তবে তা ক্ষমাযোগ্য।

এ মূলনীতি অনুসারে হারাম খাদ্যও গ্রহণ করা যাবে যদি তা গ্রহণ করা ছাড়া অন্য কোন উপায় না থাকে। যেমন ঔষধের ক্ষেত্রে আমরা অনেক নেশা জাতীয় দ্রব্য মেশানোর কথা জানি তবুও আমাদের সুস্থতার জন্য আমাদের তা গ্রহণ করতে হয়। এছাড়াও কোন ব্যক্তি যদি এমন জায়গায় অবস্থান করেন যেখানে হালাল খাদ্য পাওয়া যায় না বা হালাল খাদ্য কিনার সামর্থ্য নেই সেক্ষেত্রেও প্রয়োজন অনুপাতে ক্ষুধা নিবারণের জন্য হারাম খাদ্য গ্রহণ করতে পারবে। ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৫ এর ধারা ৪ অনুসারে সরকারি অনুমতি বা লাইসেন্স ছাড়া ফরমালিন উৎপাদন, আমদানি বা সংরক্ষণ করা অপরাধ। এই ধারা ক্ষতিকর রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার প্রতিরোধ করে সমাজের কল্যাণ নিশ্চিত করে। ফরমালিন প্রকৃত অর্থে খাদ্যদ্রব্য বিবেচনায় ক্ষতিকর হলেও ঔষধসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এটির ব্যবহার মানবদেহের জন্য উপকারী। তাই এ আইনে এর নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিশ্চিত করনে লাইসেন্স ব্যতীত উৎপাদন, আমদানি ও সংরক্ষণ নিষিদ্ধ করেছে। এটি ফিকহী মূলনীতি প্রয়োজনে হারাম তথা নিষিদ্ধ বস্তুও হালাল বিবেচনা রীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এছাড়াও ইসলামে সমাজের ক্ষতিকর কাজ প্রতিরোধের জন্য রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বৈধ হওয়ার রীতিও এখানে প্রয়োগযোগ্য।

 

কুরআনে ইরশাদ করা হয়েছে:

وَلَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ بَعْدَ إِصْلَاحِهَا - পৃথিবীতে সংশোধনের পর আবার অশান্তি সৃষ্টি করো না।

( সুরা আ’রাফ, ৫৬)

·         মূলনীতি তিন : لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ (নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ো না, অপরকেও ক্ষতিগ্রস্ত করো না)

এটি একটি হাদিস তবে ফকিহগণ এটাকে ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা হিসাবে গ্রহণ করেছেন, যা মুসলিম সমাজে ন্যায়বিচার ও ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করার জন্য ব্যবহৃত হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَلَا تَقْتُلُوا أَنفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا

তোমরা নিজেদের হত্যা করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়ালু। (সুরা নিসা, ২৯)

وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ

নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না। ( সুরা বাকারাহ, ১৯৫)

إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ

নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার ও সদাচার করার নির্দেশ দেন। ( সুরা আন-নাহল, ৯০)

হাদিস শরীফে এসেছে রাসূল বলেছেন,

لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ - নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ো না, এবং অন্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করো না। ( মুয়াত্তা মালেক, ২/৭৪৫)

রাসুল সাঃ আরো বলেছেন,

مَنْ ضَارَّ ضَارَّ اللَّهُ بِهِ، وَمَنْ شَاقَّ شَاقَّ اللَّهُ عَلَيْهِ.

যে ব্যক্তি (অন্যের) ক্ষতি করবে, আল্লাহ তার ক্ষতি করবেন, এবং যে ব্যক্তি (অন্যের জন্য) কষ্ট সৃষ্টি করবে, আল্লাহ তাকে কষ্টে ফেলবেন। ( আবু দাউদ, ৩৬৩৫)

উল্লিখিত কুরআন ও হাদিসের আলোকে স্পষ্ট হয় যে, ইসলাম ক্ষতির নীতিকে নিরুৎসাহিত করে এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে ক্ষতি এড়ানোর নির্দেশ দেয়।  এটি ইসলামি আইনের একটি মৌলিক নীতি, যা মানুষের কল্যাণ ও ইনসাফ নিশ্চিত করে।

এই মূলনীতির আলোকে খাদ্য ভেজাল দেওয়া যাবে না, হারাম খাদ্য বিক্রি করা যাবে না, কাউকে ওজনে কম দেওয়া যাবে না, খাদ্যের ক্ষতিকর কোন দ্রব্য মেশানো যাবে না। একই সাথে ব্যক্তি নিজেও ভেজাল খাদ্য, হারাম খাদ্য, নেশা জাতীয় দ্রব্য, ক্ষতিকর কোন খাবার গ্রহণ করতে পারবে না।  বাংলাদেশে খাদ্যে বিষাক্ত বা ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার আইনত নিষিদ্ধ।

 এ বিষয়ে নিরাপদ খাদ্য অধ্যাদেশ ১৯৫৯ (সংশোধিত ২০০৫)-এর ধারা ৬ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক বা বিষাক্ত উপাদান খাদ্যদ্রব্যে ব্যবহার, মিশ্রণ, মজুদ বা বিক্রয় করতে পারবে না।  এই বিধানের আওতায় ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ফরমালিন, সোডিয়াম সাইক্লামেট, ডি.ডি.টি., পি.সি.বি. তেলসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক, কীটনাশক, রঞ্জক বা অন্যান্য বিষাক্ত সংযোজন খাদ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়াও নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩-এর ধারা ৩৪ অনুসারে কোনো ব্যক্তি বা তার পক্ষে নিয়োজিত কেউ যদি ছোঁয়াচে ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তি দ্বারা খাদ্যদ্রব্য বা খাদ্যোপকরণ তৈরি, পরিবেশন বা বিক্রয় করায়, তা নিষিদ্ধ। এর দ্বারা মূলত খাদ্যদ্রব্যের মাধ্যমে রোগ সংক্রমণ প্রতিরোধের বিধান করা হয়েছে।

এ আইনের ৩৫ অনুসারে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ সংরক্ষণ/প্রক্রিয়া অনুশীলনের মানদণ্ড ও শর্তের ব্যত্যয় ঘটিয়ে, এমন কোনো প্রক্রিয়ায় প্রস্তুতকৃত খাদ্যদ্রব্য বা খাদ্যোপকরণ উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ বা বিক্রয় করা নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।  এ আইনের ধারা ৩৬ অনুসারে কোনো ব্যক্তি বা তার পক্ষে নিয়োজিত কেউ মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যদ্রব্য বা খাদ্যোপকরণ আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, সরবরাহ বা বিক্রয় করতে পারবেন না। এছাড়াও এ আইনের ৪১, ৪২ এর দ্বারা খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক, বিষাক্ত বা ক্ষতিকর উপাদান মেশানো নিষিদ্ধ এবং অপরাধীদের শাস্তির বিধান রয়েছে।  কোনো ব্যক্তি নিজে বা তার পক্ষে নিয়োজিত অন্য কোনো ব্যক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রবিধান বা প্রচলিত অন্য আইনে নির্ধারিত মাত্রার অতিরিক্ত তেজস্ক্রিয়তাসম্পন্ন বা বিকিরণযুক্ত পদার্থ, কিংবা প্রাকৃতিকভাবে বা অন্য কোনোভাবে উপস্থিত ভারী ধাতু খাদ্যদ্রব্য বা খাদ্যোপকরণে ব্যবহার বা অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে না।  অতএব, নির্ধারিত নিরাপদ সীমার অতিরিক্ত তেজস্ক্রিয় উপাদান বা ভারী ধাতুসমন্বিত খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, বিপণন বা বিক্রয় করা উক্ত আইনের অধীনে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।  এ আইনের ধারা ৪৪ দ্বারা খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল মেশানোর উদ্দেশ্যে শিল্প-কারখানায় ব্যবহৃত তেল, বর্জ্য বা দূষণকারী দ্রব্য খাদ্য স্থাপনায় সংরক্ষণ করা আইনত নিষিদ্ধ।  এই ধারাগুলো ইসলামি আইনের ক্ষতি প্রতিরোধ নীতির বাস্তব প্রতিফলন।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এর ৪২ ধারা ভেজাল বা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর খাদ্য উৎপাদন বা বিক্রি করাকে অপরাধ ঘোষণা করা হয়েছে।  এ আইনের ৫৯ ধারায় ভোক্তার অভিযোগের ভিত্তিতে জরিমানা ও ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে। ইসলামে অন্যের অধিকার নষ্ট করলে ক্ষতিপূরণ বা প্রতিকার দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে।

রাসুলুল্লাহ বলেছেন:

مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لِأَخِيهِ فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ

কারও প্রতি অন্যায় করলে তার কাছ থেকে ক্ষমা বা প্রতিকার গ্রহণ কর। ( বুখারী, ৬৫৩৪)

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এর ধারা ৪৫ অনুসারে ওজনে বা পরিমাপে কম দেওয়া বা প্রতারণা করা অপরাধ।  ওজনে কম দেওয়া ইসলামে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এটি ইসলামি নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কুরআনে বলা হয়েছে:

وَيْلٌ لِّلْمُطَفِّفِينَ ۝ الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُوا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ ۝ وَإِذَا كَالُوهُمْ أَوْ وَّزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ

ধ্বংস যারা পরিমাপে কম দেয় তাদের জন্য। যারা লোকদের কাছ থেকে মেপে নেয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে। আর যখন তাদের মেপে দেয় অথবা ওজন করে দেয় তখন কম দেয়। ( সুরা মুত্বফফিফীন, ১-৩)

বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনায় দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর কয়েকটি ধারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই ধারাগুলো ইসলামের ন্যায়বিচার, প্রতারণা নিষিদ্ধকরণ এবং জনস্বার্থ রক্ষার নীতির সঙ্গে সুস্পষ্টভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। দণ্ডবিধির ধারা ২৭২ অনুসারে খাদ্য বা পানীয়তে এমন কিছু মেশানো যাতে তা মানুষের জন্য ক্ষতিকর বা অখাদ্য হয়ে যায়, তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ইসলামি শাস্তি আইন অনুসারে খাদ্যে ভেজাল মিশ্রণের জন্য শাস্তি দেওয়ার বিধান রয়েছে। এ সকল অপরাধের জন্য হুদুদ তথা নির্ধারিত শাস্তি না থাকলেও তাযীরী শাস্তির আওতায় বিচারক শাস্তি দিতে পারেন। ফলে বিচারক তাকে অন্যদেশে সাময়িক ও চিরস্থায়ী ভাবে বহিষ্কার করতে পারে। ইমাম মালেকের মতে অনৈতিক উপায় অবলম্বন করে অর্জিত মাল গরীব অনাথ ও জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করার ব্যবস্থা সংশোধন ও তওবা না করা পর্যন্ত তাকে ব্যবসা থেকে দূরে রাখতে হবে।

ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৫ এর ধারা ৫ অনুসারে লাইসেন্স ছাড়া ফরমালিন বিক্রি বা ব্যবহার করা যাবে না এবং নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ছাড়া এটি ব্যবহার নিষিদ্ধ। এ আইনের ধারা ১৫ অনুসারে ফরমালিনের অবৈধ ব্যবহার, বিক্রি বা সংরক্ষণের জন্য কারাদণ্ড ও জরিমানার ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন অধ্যাদেশ ১৯৮৫ এর ধারা ১৪ অনুসারে যেসব পণ্য নির্ধারিত মান পূরণ করবে সেগুলোকে BSTI মানচিহ্ন ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে। এ মানচিহ্ন ভোক্তাকে পণ্যের মান সম্পর্কে নিশ্চিত করে, যা ব্যবসায়িক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে। এ অধ্যাদেশের ধারা ১৬ অনুসারে অনুমতি ছাড়া BSTI মানচিহ্ন ব্যবহার করা বা জাল মানচিহ্ন ব্যবহার করা অপরাধ। এ আইনে ধারা ১৮ অনুসারে নির্ধারিত মান অনুসরণ না করে নিম্নমানের পণ্য উৎপাদন বা বিক্রয় করলে ২ বছরের কারাদণ্ড অথবা অনধিক ১ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। ইসলামে সমাজের ক্ষতিকর কাজ প্রতিরোধের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। মাছ ও মাছজাত পণ্য (পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০২০ এর ধারা ১০ অনুসারে মানহীন বা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর মাছ বা মাছজাত পণ্য উৎপাদন, বিক্রি বা রপ্তানি করা যাবে না।  এ আইনে ধারা ১৭ অনুসারে মান নিয়ন্ত্রণ বিধি লঙ্ঘন করলে জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।  বাংলাদেশে হোটেল ও রেস্টুরেন্ট আইন ২০১৪ এর ধারা ১২ অনুসারে হোটেল বা রেস্টুরেন্টে মানুষের জন্য ক্ষতিকর বা নিম্নমানের খাদ্য পরিবেশন করা যাবে না।  এ আইনের ধারা ২০ অনুসারে আইনের বিধান লঙ্ঘন করলে জরিমানা বা অন্যান্য শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।  মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্য আইন ২০১০ এর ধারা ১০ অনুসারে অবৈধ বা ক্ষতিকর উপাদান যুক্ত মাছ ও প্রাণী খাদ্য উৎপাদন, বিক্রয় বা সরবরাহ করা যাবে না।  এ আইনে ধারা ১৫ অনুসারে মান লঙ্ঘন, ভেজাল বা ক্ষতিকর খাদ্য সরবরাহ করলে জরিমানা বা কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।  নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩-এর ধারা ৪৩ দ্বারা ভোক্তাকে প্রতারণা করে নিম্নমানের বা ভেজাল খাদ্য বিক্রি করা অপরাধ হিসেবে গণ্য করা। ইসলামি নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ বলেছেন:

مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنَّا - যে প্রতারণা করে সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। (মুসলিম, ১০২)

খাদ্যে ভেজাল দেওয়া মূলত ভোক্তার সাথে প্রতারণা।  তাই এই ধারা ইসলামের ব্যবসায়িক নৈতিকতার সঙ্গে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।  নিম্নমানের, ক্ষতিকর বা ভেজাল খাদ্য মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকিপূর্ণ করে, ভেজাল খাদ্য পরিবেশন ভোক্তার সাথে প্রতারণা; যা ইসলামের ক্ষতি প্রতিরোধ নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।  ইসলামে এমন কাজ নিষিদ্ধ যা মানুষের ক্ষতির কারণ হয়।  ফরমালিনযুক্ত খাদ্য মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর; তাই এই ধারা ইসলামের ক্ষতি প্রতিরোধ নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইসলামে সমাজের ক্ষতিকর অপরাধ প্রতিরোধের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।

·         মূলনীতি চার : دَرْءُ الْمَفَاسِدِ مُقَدَّمٌ عَلَى جَلْبِ الْمَصَالِحِ (কল্যাণ সাধনের চেয়ে অকল্যাণ প্রতিরোধ প্রাধান্যপ্রাপ্ত)

ইসলামি আইন শাস্ত্রবিদ তথা ফকিহগণের নিকট এটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি।  এই মূলনীতিকে কুরআন এবং হাদিসের আলোকে উনারা ব্যাখ্যা করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ قُلْ فِيهِمَا إِثْمٌ كَبِيرٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَإِثْمُهُمَا أَكْبَرُ مِن نَّفْعِهِمَا

তারা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে।  আপনি বলুন, উভয়ের মধ্যে রয়েছে বড় পাপ এবং মানুষের জন্য কিছু উপকারও রয়েছে, তবে তাদের পাপ উপকারের চেয়ে বড়। ( সুরা বাকারাহ, ২১৯)

 

এই আয়াতে বলা হয়েছে যে মদ ও জুয়াতে কিছু উপকার থাকতে পারে, কিন্তু যেহেতু তাদের ক্ষতি উপকারের চেয়ে বেশি, তাই এগুলো হারাম করা হয়েছে।  এটি স্পষ্টভাবে দেখায় যে ক্ষতির প্রতিরোধ কল্যাণের চেয়ে অগ্রগণ্য।  

আয়েশা রা. হতে বর্ণিত রাসূল বলেছেন,

لَوْلَا أَنَّ قَوْمَكِ حَدِيثُ عَهْدٍ بِجَاهِلِيَّةٍ لَهَدَمْتُ الْكَعْبَةَ وَجَعَلْتُ لَهَا بَابَيْنِ

যদি না তোমার জাতি নতুন জাহেলিয়াত থেকে বের হয়ে আসতো, তাহলে আমি কাবা ঘর ভেঙে দিতাম এবং তার জন্য দুটি দরজা বানাতাম। (বুখারী, ১৫৮৬)

এখানে নবী কা'বাকে ইব্রাহিম (আ.)-এর প্রকৃত ভিত্তির উপর পুনর্নির্মাণ করার কল্যাণকর কাজ পরিত্যাগ করেছেন, কারণ এতে মানুষের মধ্যে ফিতনার (গোত্রীয় বিদ্বেষ ও বিভ্রান্তি) সম্ভাবনা ছিল।  এটি দেখায় যে সম্ভাব্য ক্ষতি প্রতিরোধ করা কল্যাণকর কাজের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

খাবারের ক্ষেত্রে এই মূলনীতির প্রয়োগ কয়েকভাবে করা যায়। যেমন:

১. ক্ষতিকর খাবার থেকে বেঁচে বাঁচা: যদি কোনো খাবার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয় (যেমন: দূষিত, বিষাক্ত, হারাম বা স্বাস্থ্যহানিকর), তবে তা পরিহার করা উচিত, যদিও তা স্বাদে বা পুষ্টিগুণে উপকারী হতে পারে।  কারণ, ক্ষতি থেকে বাঁচা উপকার পাওয়ার চেয়ে অগ্রাধিকারযোগ্য।

২. অ্যালার্জি বা অসহিষ্ণুতা:

যদি কোনো খাবার কারও শরীরের জন্য ক্ষতিকর হয় (যেমন: কোনো নির্দিষ্ট খাবারে অ্যালার্জি বা ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স), তবে তা খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত, যদিও তা পুষ্টিকর বা সুস্বাদু হয়।

৩. অপবিত্র বা সন্দেহযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা:

ইসলামি বিধানের আলোকে যদি কোনো খাবার হারামের সন্দেহে পড়ে, তবে তা বর্জন করা শ্রেয়, যদিও তা স্বাদে আকর্ষণীয় বা পুষ্টিগুণসম্পন্ন হয়।

৪. অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ না করা: অতিরিক্ত খাবার গ্রহণে স্থূলতা, হজমের সমস্যা বা অন্যান্য স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই উপকারিতা থাকলেও সংযত থাকা উত্তম, কারণ ক্ষতি প্রতিরোধই মূলনীতি অনুসারে অগ্রাধিকার পাবে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এর ধারা ৪৪ দ্বারা পণ্য বা সেবার বিষয়ে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন প্রচার করাকে শাস্তিমূলক অপরাধ ঘোষণা করা হয়েছে।  মিথ্যা বিজ্ঞাপন ভোক্তাকে প্রতারণা করার একটি উপায়, যা ইসলামি নৈতিকতার পরিপন্থী, ছাড়াও এটি ইসলামে ব্যবসায় সত্যবাদিতা নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

রাসূলুল্লাহ বলেছেন:

التَّاجِرُ الصَّدُوقُ الْأَمِينُ مَعَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ

সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে। (তিরমিজি, ১২০৯)

জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা-২০১৪ এর ৪.২.২ ধারায় উল্লেখ রয়েছে, “বিজ্ঞাপনে প্রতিযোগী পণ্যের তুলনা বা নিন্দা করে শ্রেষ্ঠত্ব দাবী করা যাবে না এবং এমন কোন বর্ণনা বা দাবী প্রচার করা যাবে না যাতে জনগণ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রতারিত হতে পারে।  মিথ্যা বিজ্ঞাপন দ্বারা ব্যবসায়ীর বিক্রি বেশি হলেও এর দ্বারা ক্রেতার প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় এটি নিষিদ্ধ।

ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা একটি সাধারণ রীতি, কিন্তু অসম প্রতিযোগিতা বা অসৎ প্রতিযোগিতা নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি তৈরি করে। বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে প্রতিযোগিতা আইন ২০১২ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ আইনের ধারা ১৫ অনুসারে ষড়যন্ত্রমূলক যোগসাজশ ৪৭, মনোপলি ৪৮, ওলিগোপলি ৪৯, জোটবদ্ধতা ও কর্তৃত্বময় অবস্থানের অপব্যবহার নিষিদ্ধ। ইসলামে এ সকল অসৎ ও অসম প্রতিযোগিতা নিষিদ্ধের বিষয়টি কল্যাণ সাধনের চেয়ে অকল্যাণ প্রতিরোধ প্রাধান্যপ্রাপ্ত হওয়ার মূলনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

·         মূলনীতি পাঁচ : বাজার তদারকিতে আল হিসবাহ নীতির প্রয়োগ:

বাংলাদেশ সরকার গৃহীত নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩-এর ধারা ৫ দ্বারা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে। এটি খাদ্য নিরাপত্তা তদারকি করার জন্য একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ গঠন। প্রতিযোগিতা আইনের ধারা ৫ এর মাধ্যমে সরকার প্রতিযোগিতা কমিশন গঠন করে। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার পরিবেশ তথা উৎপাদনকারী, বাজারজাতকারী, ক্রেতা ও বিক্রেতা সকলের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য আল-হিসবাহ ব্যবস্থাপনার আওতায় মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে মহানবী (সা.) বাজার পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) কখনো কখনো নিজেই বাজার পর্যবেক্ষণ করতেন।  খলীফা উমর রা. নিজেই বাজারে ঘুরে বেড়াতেন এবং এ ধরনের অসাধু ব্যবসায়িক তৎপরতা রোধে ভূমিকা রাখতেন উমর রা. চাবুক হাতে নিয়ে বাজারে প্রবেশ করতেন, ব্যবসায়ীদেরকে সব ধরনের প্রতারণা বর্জনের নির্দেশ দিতেন, সতর্ক করতেন এবং প্রতারণাকারী ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিকারীর বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করতেন। তিনি আবদুল্লাহ ইবনু ওতবাহকে বাজার ব্যবস্থাপনার জন্য নিয়োগ করেছিলেন।  উমর রা. হিসবাহ ব্যবস্থা জোরদার করার জন্য আল-হারিছ ইবনুল আস ও সুলায়মান ইবনু ইয়াসারকেও দায়িত্ব প্রদান করেছিলেন।  আলী রা.-ও হিসবাহ ব্যবস্থা প্রয়োগ করে অপরাধীদের শাস্তি দিতেন।  ইসলামি খিলাফতের সকল খলীফা এবং ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামি শাসনামলে নিয়মিত বাজার তদারকি করা হতো।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও প্রতিযোগিতা কমিশন গঠন ইসলামের হিসবা ব্যবস্থার আধুনিক রূপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ইসলামি দৃষ্টিকোণে বাজার ব্যবস্থা তদারকির জন্য রাষ্ট্র বাজার-প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করবে এবং বাজার ব্যবস্থাপনা তদারকির জন্য কর্মচারী নিয়োগ করবে।

এ সম্পর্কে হাদিসের বাণী,

عَنِ السَّائِبِ بْنِ يَزِيدَ ؛ أَنَّهُ قَالَ : كُنْتُ عَامِلاً مَعَ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُتْبَةَ بْنِ مَسْعُودٍ ،

 عَلَى سُوقِ الْمَدِينَةِ ، فِي زَمَانِ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ . فَكُنَّا نَأْخُذُ مِنَ النَّبَطِ الْعُشْرَ

হযরত সায়েব বিন ইয়ায়িদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত উমর রা.-এর খিলাফতকালে আবদুল্লাহ বিন উতবা বিন মাসূদের সাথে মদীনার বাজার কর্মচারী ছিলাম এবং আমরা নবতীদের কাছ থেকে আমদানি কর এক দশমাংশ আদায় করতাম। (মুয়াত্তা মালেক, ৯৭৭)

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন অর্ডিনেন্স ১৯৮৫ এর মাধ্যমে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI) প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ অধ্যাদেশের ধারা ৩ ও ৪ অনুসারে BSTI পণ্যের মান নির্ধারণ, পরীক্ষা এবং মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করবে। মান নির্ধারণের মাধ্যমে নিম্নমানের বা ভেজাল পণ্য বাজারে আসা প্রতিরোধ করা হয়, যা ইসলামের বাজার ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম আল হিসবাহ-এর অন্তর্ভুক্ত।

মাছ ও মাছজাত পণ্য (পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০২০ এর ধারা ৭ অনুসারে মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধন ও লাইসেন্স গ্রহণ করতে হবে। লাইসেন্স ও নিবন্ধন ব্যবস্থা বাজারে শৃঙ্খলা ও মান বজায় রাখতে সহায়ক। মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯ এর ধারা ৫ অনুসারে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে তাৎক্ষণিকভাবে অপরাধের বিচার করতে পারেন। এ আইনের ধারা ৬ অনুসারে মোবাইল কোর্ট বিভিন্ন বিশেষ আইনের অধীনে (যেমন নিরাপদ খাদ্য আইন, ভোক্তা অধিকার আইন ইত্যাদি) অভিযান পরিচালনা করতে পারে। এ আইনের ধারা ৭ অনুসারে অপরাধ প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে জরিমানা বা অন্যান্য শাস্তি প্রদান করা যায়। ইসলামে অপরাধ দমন ও সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে শাস্তির বিধান রয়েছে। এ আইনের ধারা ৯ এর ক্ষমতাবলে মোবাইল কোর্ট বাজার তদারকি ও জনস্বার্থ রক্ষায় অভিযান পরিচালনা করতে পারে। বাংলাদেশে হোটেল ও রেস্টুরেন্ট আইন ২০১৪ এর ধারা ৬ অনুসারে হোটেল বা রেস্টুরেন্ট পরিচালনার জন্য সরকারি লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক। মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্য আইন ২০১০ এর ধারা ৭ অনুসারে মাছ ও প্রাণী খাদ্য উৎপাদন ও বিক্রির জন্য লাইসেন্স ও অনুমোদন গ্রহণ বাধ্যতামূলক

লাইসেন্স ব্যবস্থা বাজারে শৃঙ্খলা ও মান বজায় রাখতে সহায়ক। ইসলামে সমাজের ক্ষতি প্রতিরোধ ও জনস্বার্থ রক্ষার জন্য রাষ্ট্রীয় তদারকি বৈধ। ইসলামি শাসনব্যবস্থায় বাজার তদারকির জন্য হিসবা ব্যবস্থা চালু ছিল। সর্বোপরি, মোবাইল কোর্ট ব্যবস্থা, ভোক্তা অধিকার, বিএসটিআই, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, প্রতিযোগিতা কমিশন ইত্যাদি ইসলামের হিসবা ব্যবস্থার আধুনিক প্রয়োগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ঐতিহাসিকভাবে ইসলামি রাষ্ট্রে বাজার তদারকি ব্যবস্থা (হিসবা) চালু ছিল। ইসলামে সমাজের ক্ষতিকর কাজ প্রতিরোধ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সে হিসেবে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গঠন ইসলামের আল হিসবাহ ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ

·         মূলনীতি ছয় : মাকাসিদুশ শরিয়াহ (مقاصد الشريعة)

ইসলামি শরীয়াহর প্রধান উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, জীবন রক্ষা ( حفظ النفس) ও সম্পদ রক্ষা (حفظ المال), যার সাথে স্বাস্থ্য রক্ষার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কারণ অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণ ভোক্তার জীবনের জন্য ঝুঁকি এবং অর্থ অপচয় ঘটায়। এছাড়াও মাকাসিদুশ শরিয়ার মূলনীতি মাসলেহে আল মুরসালা তথা সমাজের কল্যাণ নিশ্চিত করার নীতিটি নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনার সাথে সম্পর্কিত। খাদ্য নিরাপত্তা ও ভোক্তা সুরক্ষার বিদ্যমান আইন মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় সহায়ক, যা মাকাসিদুশ শরীয়াহর মৌলিক উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এর ৪১ দ্বারা পণ্যে অনিরাপদ বা মানহীন পণ্য বিক্রি করলে শাস্তির বিধান রয়েছে। এটি ইসলামি নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। অনিরাপদ খাদ্য মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর, সুতরাং মাকাসিদুশ শরিয়ার জীবন সুরক্ষা নীতির আওতায়ও খাদ্যে ভেজাল নিষিদ্ধ।

দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ২৭৩ ধারানুসারে মানুষের জন্য ক্ষতিকর খাদ্য বা পানীয় বিক্রি করা অপরাধ। এই ধারা জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি প্রতিরোধ করে, যা ইসলামের ক্ষতি প্রতিরোধ নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ধারা ২৭৪ অনুসারে ভেজাল ওষুধ প্রস্তুত করা বা মানুষের জন্য ক্ষতিকর ওষুধ তৈরি করা অপরাধ। দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ধারা ২৭৫ অনুসারে ভেজাল বা ক্ষতিকর ওষুধ বিক্রি করাও অপরাধ। ধারা ২৭৬ অনুসারে ওষুধ বা খাদ্যের প্রকৃতি বা গুণমান সম্পর্কে ভুল তথ্য দেওয়া অপরাধ। ইসলামে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

يَا عِبَادَ اللهِ تَدَاوَوْا - হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ কর। (তিরমিজি, ২০৩৮)

ভেজাল ওষুধ মানুষের জীবন বিপন্ন করে, যা ইসলামের জীবন রক্ষার নীতির পরিপন্থী। ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৫ এর ধারা ৬ অনুসারে ফরমালিন সংরক্ষণ, পরিবহন ও ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হবে। ইসলামে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা মাকাসিদুশ শরীয়াহ-এর অন্যতম উদ্দেশ্য। ফরমালিনের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সহায়ক। নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়াদি মাসালেহ (المصالح), সাদ্দু যারায়ে (سد الذرائع) ও মাকাসিদুস শরীয়াহ (مقاصد الشريعة) ইত্যাদি ফিকহী কায়দার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

 

ইমাম আল-গাযালী মাকাসিদুশ শরীয়ার ভিত্তিতে বিধান প্রণয়নে তিনটি শর্ত প্রদান করেছেন-

১. কল্যাণ অত্যাবশ্যক হওয়া, ২. কল্যাণের পরিধি সার্বজনীন হওয়া, ব্যক্তিবিশেষের কল্যাণ ধর্তব্য নয়, ৩. কল্যাণ বাস্তবসম্মত হওয়া, ধারণাপ্রসূত না হওয়া। ইমাম গাযালীর তিনটির শর্তের উপযোগিতা থাকায় খাদ্যে ভেজাল মিশ্রণ, ক্ষতিকর উপাদান, মেয়াদউত্তীর্ণ খাদ্য বিক্রি ইত্যাদি নিষিদ্ধ। মাকাসিদুশ শরীয়ার পাঁচটি বিষয়ের সম্পদের নিরাপত্তা রক্ষার্থেও খাদ্যে ভেজাল, ক্ষতিকর উপাদান মিশ্রণ নিষিদ্ধ।

 

ইসলামি দিকনির্দেশনার আলোকে বাংলাদেশের খাদ্যব্যবস্থা নিরাপদকরণে কতিপয় সুপারিশ:

বর্তমান বাংলাদেশে যেই পরিমাণ ভেজাল ও অনিরাপদ খাদ্যের ছড়াছড়ি তা থেকে উত্তরণ এবং ইসলামি দিকনির্দেশনা অনুসরণের মাধ্যমে বাংলাদেশের খাদ্যব্যবস্থা উন্নতিকরণ ও নিরাপদকরণে কতিপয় সুপারিশ পেশ করা হলো। যথা:

*   নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩, ভোক্তা অধিকার আইন ২০০৯ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট আইনসমূহের মধ্যে সমন্বিত প্রয়োগ নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত আইনগত কাঠামো গঠন করা।

*   বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও বিএসটিআই হালাল সার্টিফিকেট দিলেও এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সীমিত। তাই স্বতন্ত্র হালাল-তায়্যিব সার্টিফিকেশন কর্তৃপক্ষ নামে হালাল সার্টিফিকেশন বোর্ড গঠন করা।

*   নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অধীনে বিএসটিআই, ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন ও ইসলামি স্কলারদের সমন্বয়ে জেলা পর্যায়ে সমন্বিত টাস্কফোর্স গঠন করা

* হোটেল, রেস্টুরেন্ট, খাদ্য উৎপাদকদের লাইসেন্স নবায়নকে অডিট কার্যক্রমের সাথে যুক্ত করা।

নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনায় প্রতিবন্ধকতার ক্ষেত্রে সতর্কতা ও প্রশিক্ষণ, জরিমানা, লাইসেন্স স্থগিত, কারাদণ্ড ইত্যাদি শাস্তি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা।

*   মোবাইল কোর্ট অভিযান নিয়মিত করণ এবং অভিযানের সংখ্যা বাড়ানো।

*   খাদ্য ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও পরিদর্শকদের জন্য বাধ্যতামূলক খাদ্য নিরাপত্তা ট্রেনিং দেওয়া।

*   ইমাম, খতিব ও ইসলামি স্কলারদের মাধ্যমে খাদ্যে প্রতারণা হারামবিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি।

*   স্কুল কারিকুলামে খাদ্য নিরাপত্তা ও ইসলামি নৈতিকতা বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা।

 

লেখকঃ
হাফেজ মাওলানা ইমরান বিন বোরহান 
খতিব, রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স জামে মসজিদ, রায়পুর, লক্ষ্মীপুর।


নির্বাচিত বিষয়গুলো দেখুন

কবিতা ছোটগল্প গল্প নিবন্ধ ছড়া টিপস রম্য গল্প প্রেমের কবিতা ইসলামী সাহিত্য স্বাস্থ্য কথা কৌতুক কম্পিউটার টিপস জানা অজানা লাইফ স্ট্যাইল স্বাধীনতা স্থির চিত্র ইসলাম ফিচার শিশুতোষ গল্প কবি পরিচিতি প্রবন্ধ ইতিহাস চিত্র বিচিত্র প্রকৃতি বিজ্ঞান রম্য রচনা লিরিক ঐতিহ্য পাখি মুক্তিযুদ্ধ শরৎ শিশু সাহিত্য বর্ষা আলোচনা বিজ্ঞান ও কম্পিউটার বীরশ্রেষ্ঠ লেখক পরিচিতি স্বাস্থ টিপস উপন্যাস গাছপালা জীবনী ভিন্ন খবর হারানো ঐতিহ্য হাসতে নাকি জানেনা কেহ ছেলেবেলা ফল ফুল বিরহের কবিতা অনু গল্প প্রযুক্তি বিউটি টিপস ভ্রমণ মজার গণিত সংস্কৃতি সাক্ষাৎকার ঔষধ গবেষণা ডাউনলোড প্যারডী ফেসবুক মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য রম্য কবিতা সাধারণ জ্ঞান সাহিত্যিক পরিচিতি সায়েন্স ফিকশান স্বাধীনতার কবিতা স্বাধীনতার গল্প কৃষি তথ্য চতুর্দশপদী প্রেমের গল্প মোবাইল ফোন রুপকথার গল্প কাব্য ক্যারিয়ার গৌরব জীবনের গল্প ফটোসপ সবুজ সভ্যতা
অতনু বর্মণ অদ্বৈত মারুত অধ্যাপক গোলাম আযম অনন্ত জামান অনিন্দ্য বড়ুয়া অনুপ সাহা অনুপম দেব কানুনজ্ঞ অমিয় চক্রবর্তী অরুদ্ধ সকাল অর্ক অয়ন খান আ.শ.ম. বাবর আলী আইউব সৈয়দ আচার্য্য জগদীশচন্দ্র বসু আজমান আন্দালিব আতাউর রহমান কাবুল আতাউস সামাদ আতোয়ার রহমান আত্মভোলা (ছন্দ্রনাম) আদনান মুকিত আনিসা ফজলে লিসি আনিসুর রহমান আনিসুল হক আনোয়ারুল হক আন্জুমান আরা রিমা আবদুল ওহাব আজাদ আবদুল কুদ্দুস রানা আবদুল গাফফার চৌধুরী আবদুল মান্নান সৈয়দ আবদুল মাবুদ চৌধুরী আবদুল হাই শিকদার আবদুল হামিদ আবদুস শহীদ নাসিম আবিদ আনোয়ার আবু মকসুদ আবু সাইদ কামাল আবু সাঈদ জুবেরী আবু সালেহ আবুল কাইয়ুম আহম্মেদ আবুল মোমেন আবুল হাসান আবুল হায়াত আবুল হোসেন আবুল হোসেন খান আবেদীন জনী আব্দুল কাইয়ুম আব্দুল মান্নান সৈয়দ আব্দুল হালিম মিয়া আমানত উল্লাহ সোহান আমিনুল ইসলাম চৌধুরী আমিনুল ইসলাম মামুন আরিফুন নেছা সুখী আরিফুর রহমান খাদেম আল মাহমুদ আলম তালুকদার আশীফ এন্তাজ রবি আসমা আব্বাসী আসাদ চৌধুরী আসাদ সায়েম আসিফ মহিউদ্দীন আসিফুল হুদা আহমদ - উজ - জামান আহমদ বাসির আহমেদ আরিফ আহমেদ খালিদ আহমেদ রাজু আহমেদ রিয়াজ আহসান হাবিব আহসান হাবীব আহাম্মেদ খালিদ ইকবাল আজিজ ইকবাল খন্দকার ইব্রাহিম নোমান ইব্রাহীম মণ্ডল ইমদাদুল হক মিলন ইলিয়াস হোসেন ইশতিয়াক ইয়াসির মারুফ উত্তম মিত্র উত্তম সেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এ কে আজাদ এ টি এম শামসুজ্জামান এ.বি.এম. ইয়াকুব আলী সিদ্দিকী একরামুল হক শামীম একে আজাদ এনামুল হায়াত এনায়েত রসুল এম আহসাবন এম. মুহাম্মদ আব্দুল গাফফার এম. হারুন অর রশিদ এরশাদ মজুদার এরশাদ মজুমদার এস এম নাজমুল হক ইমন এস এম শহীদুল আলম এস. এম. মতিউল হাসান এসএম মেহেদী আকরাম ওমর আলী ওয়াসিফ -এ-খোদা ওয়াহিদ সুজন কবি গোলাম মোহাম্মদ কমিনী রায় কাজী আনিসুল হক কাজী আবুল কালাম সিদ্দীক কাজী নজরুল ইসলাম কাজী মোস্তাক গাউসুল হক শরীফ কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম কাপালিক কামরুল আলম সিদ্দিকী কামাল উদ্দিন রায়হান কার্তিক ঘোষ কায়কোবাদ (কাজেম আলী কোরেশী) কৃষ্ণকলি ইসলাম কে এম নাহিদ শাহরিয়ার কেজি মোস্তফা খন্দকার আলমগীর হোসেন খন্দকার মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ্ খান মুহাম্মদ মইনুদ্দীন খালেদ রাহী গাজী গিয়াস উদ্দিন গিরিশচন্দ সেন গিয়াস উদ্দিন রূপম গোলাম কিবরিয়া পিনু গোলাম নবী পান্না গোলাম মোস্তফা গোলাম মোহাম্মদ গোলাম সরোয়ার চন্দন চৌধুরী চৌধুরী ফেরদৌস ছালেহা খানম জুবিলী জ. রহমান জসিম মল্লিক জসীম উদ্দিন জহির উদ্দিন বাবর জহির রহমান জহির রায়হান জাওয়াদ তাজুয়ার মাহবুব জাকির আবু জাফর জাকির আহমেদ খান জাকিয়া সুলতানা জান্নাতুল করিম চৌধুরী জান্নাতুল ফেরদাউস সীমা জাফর আহমদ জাফর তালুকদার জাহাঙ্গীর আলম জাহান জাহাঙ্গীর ফিরোজ জাহিদ হোসাইন জাহিদুল গণি চৌধুরী জায়ান্ট কজওয়ে জিয়া রহমান জিল্লুর রহমান জীবনানন্দ দাশ জুবাইদা গুলশান আরা জুবায়ের হুসাইন জুলফিকার শাহাদাৎ জেড জাওহার জয়নাল আবেদীন বিল্লাল ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া ড. কাজী দীন মুহম্মদ ড. ফজলুল হক তুহিন ড. ফজলুল হক সৈকত ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ ড. মুহা. বিলাল হুসাইন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ড. রহমান হাবিব ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ডক্টর সন্দীপক মল্লিক ডা. দিদারুল আহসান ডা: সালাহ্উদ্দিন শরীফ তমিজ উদদীন লোদী তাজনীন মুন তানজিল রিমন তাপস রায় তামান্না শারমিন তারক চন্দ্র দাস তারাবাঈ তারেক রহমান তারেক হাসান তাসনুবা নূসরাত ন্যান্সী তাসলিমা আলম জেনী তাহমিনা মিলি তুষার কবির তৈমুর রেজা তৈয়ব খান তৌহিদুর রহমান দর্পণ কবীর দিলওয়ার হাসান দেলোয়ার হোসেন ধ্রুব এষ ধ্রুব নীল নঈম মাহমুদ নবাব আমিন নাইমুর রশিদ লিখন নাইয়াদ নাজমুন নাহার নাজমুল ইমন নাফিস ইফতেখার নাবিল নাসির আহমেদ নাসির উদ্দিন খান নাহার মনিকা নাহিদা ইয়াসমিন নুসরাত নিজাম কুতুবী নির্জন আহমেদ অরণ্য নির্মলেন্দু গুণ নিসরাত আক্তার সালমা নীল কাব্য নীলয় পাল নুরে জান্নাত নূর মোহাম্মদ শেখ নূর হোসনা নাইস নৌশিয়া নাজনীন পীরজাদা সৈয়দ শামীম শিরাজী পুলক হাসান পুষ্পকলি প্রাঞ্জল সেলিম প্রীতম সাহা সুদীপ ফকির আবদুল মালেক ফজল শাহাবুদ্দীন ফররুখ আহমদ ফাতিহা জামান অদ্রিকা ফারুক আহমেদ ফারুক নওয়াজ ফারুক হাসান ফাহিম আহমদ ফাহিম ইবনে সারওয়ার ফেরদৌসী মাহমুদ ফয়সাল বিন হাফিজ বাদশা মিন্টু বাবুল হোসেইন বিকাশ রায় বিন্দু এনায়েত বিপ্রদাশ বড়ুয়া বেগম মমতাজ জসীম উদ্দীন বেগম রোকেয়া বেলাল হোসাইন বোরহান উদ্দিন আহমদ ম. লিপ্স্কেরভ মঈনুল হোসেন মজিবুর রহমান মন্জু মতিউর রহমান মল্লিক মতিন বৈরাগী মধু মনসুর হেলাল মনিরা চৌধুরী মনিরুল হক ফিরোজ মরুভূমির জলদস্যু মর্জিনা আফসার রোজী মশিউর রহমান মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর মা আমার ভালোবাসা মাইকেল মধুসূদন দত্ত মাওলানা মুহাম্মাদ মাকসুদা আমীন মুনিয়া মাখরাজ খান মাগরিব বিন মোস্তফা মাজেদ মানসুর মুজাম্মিল মানিক দেবনাথ মামুন হোসাইন মারজান শাওয়াল রিজওয়ান মারুফ রায়হান মালিহা মালেক মাহমুদ মাসুদ আনোয়ার মাসুদ মাহমুদ মাসুদা সুলতানা রুমী মাসুম বিল্লাহ মাহফুজ উল্লাহ মাহফুজ খান মাহফুজুর রহমান আখন্দ মাহবুব আলম মাহবুব হাসান মাহবুব হাসানাত মাহবুবা চৌধুরী মাহবুবুল আলম কবীর মাহমুদা ডলি মাহমুদুল বাসার মাহমুদুল হাসান নিজামী মাহ্‌মুদুল হক ফয়েজ মায়ফুল জাহিন মিতা জাহান মু. নুরুল হাসান মুজিবুল হক কবীর মুন্সি আব্দুর রউফ মুফতি আবদুর রহমান মুরাদুল ইসলাম মুস্তাফিজ মামুন মুহম্মদ নূরুল হুদা মুহম্মদ শাহাদাত হোসেন মুহাম্মদ আনছারুল্লাহ হাসান মুহাম্মদ আবু নাসের মুহাম্মদ আমিনুল হক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল মুহাম্মদ মহিউদ্দিন মুহাম্মাদ হাবীবুল্লাহ মুহিউদ্দীন খান মেজবাহ উদ্দিন মেহনাজ বিনতে সিরাজ মেহেদি হাসান শিশির মো. আরিফুজ্জামান আরিফ মো: জামাল উদ্দিন মোঃ আহসান হাবিব মোঃ তাজুল ইসলাম সরকার মোঃ রাকিব হাসান মোঃ রাশেদুল কবির আজাদ মোঃ সাইফুদ্দিন মোমিন মেহেদী মোর্শেদা আক্তার মনি মোশাররফ মোশাররফ হোসেন খান মোশারেফ হোসেন পাটওয়ারী মোহসেনা জয়া মোহাম্মদ আল মাহী মোহাম্মদ জামাল উদ্দীন মোহাম্মদ নূরুল হক মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ্ মোহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ মোহাম্মদ সা'দাত আলী মোহাম্মদ সাদিক মোহাম্মদ হোসাইন মৌরী তানিয় যতীন্দ্র মোহন বাগচী রজনীকান্ত সেন রণক ইকরাম রফিক আজাদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রহমান মাসুদ রহিম রায়হান রহিমা আখতার কল্পনা রাখাল রাজিব রাজিবুল আলম রাজীব রাজু আলীম রাজু ইসলাম রানা হোসেন রিয়াজ চৌধুরী রিয়াদ রুমা মরিয়ম রেজা উদ্দিন স্টালিন রেজা পারভেজ রেজাউল হাসু রেহমান সিদ্দিক রোকনুজ্জামান খান রোকেয়া খাতুন রুবী শওকত হোসেন শওকত হোসেন লিটু শওগাত আলী সাগর শফিক আলম মেহেদী শরীফ আতিক-উজ-জামান শরীফ আবদুল গোফরান শরীফ নাজমুল শাইখুল হাদিস আল্লামা আজীজুল হক শামছুল হক রাসেল শামসুজ্জামান খান শামসুর রহমান শামস্ শামীম হাসনাইন শারমিন পড়শি শাহ আব্দুল হান্নান শাহ আলম শাহ আলম বাদশা শাহ আহমদ রেজা শাহ নেওয়াজ চৌধুরী শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ শাহজাহান কিবরিয়া শাহজাহান মোহাম্মদ শাহনাজ পারভীন শাহাদাত হোসাইন সাদিক শাহাবুদ্দীন আহমদ শাহাবুদ্দীন নাগরী শাহিন শাহিন রিজভি শিউল মনজুর শিরিন সুলতানা শিশিরার্দ্র মামুন শুভ অংকুর শেখ হাবিবুর রহমান সজীব সজীব আহমেদ সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত সাইদা সারমিন রুমা সাইফ আলি সাইফ চৌধুরী সাইফ মাহাদী সাইফুল করীম সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদূদী সাকিব হাসান সাজ্জাদুর রহমান সাজ্জাদ সানজানা রহমান সাবরিনা সিরাজী তিতির সামছুদ্দিন জেহাদ সামিয়া পপি সাযযাদ কাদির সারোয়ার সোহেন সালমা আক্তার চৌধুরী সালমা রহমান সালেহ আকরাম সালেহ আহমদ সালেহা সুলতানা সিকদার মনজিলুর রহমান সিমু নাসের সিরহানা হক সিরাজুল ইসলাম সিরাজুল ফরিদ সুকান্ত ভট্টাচার্য সুকুমার বড়ুয়া সুকুমার রায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সুফিয়া কামাল সুভাষ মুখোপাধ্যায় সুমন সোহরাব সুমনা হক সুমন্ত আসলাম সুমাইয়া সুহৃদ সরকার সৈয়দ আরিফুল ইসলাম সৈয়দ আলমগীর সৈয়দ আলী আহসান সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন সিরাজী সৈয়দ তানভীর আজম সৈয়দ মুজতবা আলী সৈয়দ সোহরাব হানিফ মাহমুদ হামিদুর রহমান হাসান আলীম হাসান ভূইয়া হাসান মাহবুব হাসান শরীফ হাসান শান্তনু হাসান হাফিজ হাসিনা মমতাজ হুমায়ূন আহমেদ হুমায়ূন কবীর ঢালী হেলাল মুহম্মদ আবু তাহের হেলাল হাফিজ হোসেন মাহমুদ হোসেন শওকত হ্নীলার বাঁধন

মাসের শীর্ষ পঠিত

 
রায়পুর তরুণ ও যুব ফোরাম

জোনাকী অনলাইন লাইব্রেরী - Jonaaki Online Library © ২০১১ || টেমপ্লেট তৈরি করেছেন জোনাকী টিম || ডিজাইন ও অনলাইন সম্পাদক জহির রহমান || জোনাকী সম্পর্কে পড়ুন || জোনাকীতে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ