ইসলামে কোনো আমলের বাহ্যিক সৌন্দর্য বা পরিমাণের চেয়ে তার অন্তর্নিহিত নিয়ত ও ইখলাছ অধিক গুরুত্বপূর্ণ। ইখলাছ ইবাদতের রূহ বা প্রাণসত্তা।
শায়খ আব্দুর রহমান বিন নাছির আস-সা‘দী (রহঃ) বলেন,
اِعْلَمْ أَنَّ الْإِخْلَاصَ لِلَّهِ أَسَاسُ الدِّينِ وَرُوحُ التَّوْحِيدِ وَالْعِبَادَةِ
‘জেনে রাখুন! আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠতা (ইখলাছ) হল দ্বীনের ভিত্তি, তাওহীদের প্রাণ এবং ইবাদতের আত্মা’।(আল-কাওলুস সাদীদ শারহু কিতাবিত তাওদীদ, পৃ. ২১৯)
ইখলাছ হল, বান্দার সকল ইবাদত ও সৎকর্মে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টিকে লক্ষ্য নির্ধারণ করা, আর এর বিপরীত হল রিয়া বা লৌকিকতা, যা মানুষের প্রশংসা, সম্মান বা মর্যাদা লাভের উদ্দেশ্যে আমল করা। রিয়া এমন এক অন্তরব্যাধি, যা নিঃশব্দে মানুষের নেক আমলকে গ্রাস করে এবং আল্লাহর নিকট তার মর্যাদাকে নষ্ট করে দেয়। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর উম্মতকে রিয়া সম্পর্কে বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন এবং একে ‘শিরকে আছগার’বা ছোট শিরক হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন।
মানুষের আত্মশুদ্ধি, আমলের বিশুদ্ধতা এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য রিয়ার বিধিবিধান সম্পর্কে জ্ঞান লাভ অত্যন্ত যরূরী। কারণ যে ব্যক্তি রিয়ার ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারে, সে নিজের নিয়তকে পরিশুদ্ধ করতে সচেষ্ট হয় এবং আমলকে আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ করার প্রয়াস পায়। তাই ইসলামী জীবনব্যবস্থায় রিয়ার বিধিবিধান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ইসলামে রিয়া(লৌকিকতা)’র বিধান:
ইসলামে রিয়া সুস্পষ্টভাবে হারাম, এ ব্যাপারে কোন মতভেদ নেই।
• ইমাম নববী (রহঃ) ‘রিয়াযুছ ছালেহীন’গ্রন্থে রিয়া হারাম হওয়ার দলীল হিসাবে তিনটি আয়াত (বাইয়িনাহ ৫; বাক্বারাহ ২৬৪; নিসা ১৪২) এবং ৫টি হাদীছ নিয়ে এসে তিনি এটিকে শিরক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। (রিয়াযুছ ছালেহীন হা/১৬১৬-১৬২০)
• ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, فَالرِّيَاءُ كُلُّهُ شِرْكٌ ‘রিয়া সম্পূর্ণটাই শিরক’। তবে তা শিরকে আছগার বা ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত। (আল-জাওয়াবুল কাফী, পৃ. ১৩৩ )
• ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) শিরকে আছগারের উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেছেন,
وَأَمَّا الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ فَكَيَسِيرِ الرِّيَاءِ.
‘পক্ষান্তরে ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত হল অল্প পরিমাণ রিয়া বা লৌকিকতা’। (মাদারিজুস সালিকীন ১/২৮১) ।
কখনো কখনো এটি শিরকে আকবার বা বড় শিরকে পরিণত হতে পারে।
• শায়খ মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল-উছায়মীন (রহঃ) বলেন,
وَالرِّيَاءُ يَسِيرُهُ مِنَ الشِّرْكِ الْأَصْغَرِ، وَكَثِيرُهُ مِنَ الشِّرْكِ الْأَكْبَرِ.
‘অল্প পরিমাণ রিয়া ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত আর বেশী পরিমাণ বড় শিরকের অন্তর্ভুক্ত’। (শারহু রিয়াযিছ ছালেহীন (রিয়াদ : দারুল ওয়াতান, ২য় সংস্করণ, ১৪২৭হি.), ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃ. ৩৩৮) ।
উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে আমরা এ কথা বুজতে পারি যে, রিয়া বা লৌকিকতা যে কোন ইবাদাতের জন্য মহাবিপদ, যে ইবাদতের মাধ্যমে রিয়া করা হচ্ছে তার মর্যাদার তারতম্য অনুযায়ী এর গুনাহ ও অপরাধের মাত্রাও ভিন্ন ভিন্ন হয়। সুতরাং যে ইবাদত যত বেশী মর্যাদাপূর্ণ, তা নিয়ে রিয়া করা তত বেশী গুনাহের কারণ।
ইবাদতের সাথে রিয়া মিশ্রিত হওয়ার তিনটি অবস্থা:
ইবাদতের সাথে রিয়া মিশ্রিত হলে তার তিনটি অবস্থা রয়েছে।
• প্রথম অবস্থা : মূল ইবাদতে রিয়া চলে আসা। অর্থাৎ ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য যদি হয় মানুষকে দেখানো ও তাদের প্রশংসা লাভ। যেমন: কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নয়; বরং মানুষকে দেখানোর জন্য নামাজ আদায় করে। মূলত মুনাফিকদের ছালাতের অবস্থা এরকম হয়।
মহান আল্লাহ বলেন,
وَإِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلَاةِ قَامُوا كُسَالَى يُرَاءُونَ النَّاسَ وَلَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلًا.
‘যখন তারা নামাজে দাঁড়ায়, তখন অলসভাবে দাঁড়ায়। তারা লোকদের দেখায় এবং আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে’ (নিসা ৪/১৪২) ।
• ইবনু রজব হাম্বলী (রহঃ) এ ধরনের রিয়াকে رِيَاءٌ مَحْضٌ বা খাঁটি রিয়া হিসাবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, ‘এই খাঁটি রিয়া সাধারণত কোন মুমিনের পক্ষ থেকে নামাজ ও সিয়ামের মতো ফরয ইবাদতে প্রকাশ পায় না। কখনো কখনো এটি ওয়াজিব সাদাক্বা বা হজ্জ এবং এ জাতীয় প্রকাশ্য আমলের ক্ষেত্রে প্রকাশিত হতে পারে। অথবা এমন আমলের ক্ষেত্রে প্রকাশিত হতে পারে যার কল্যাণ অন্যদের কাছে পৌঁছে। কারণ এ ধরনের আমলে ইখলাছ বা একনিষ্ঠতা বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন ও দুরূহ’। (জামেউল উলূম ওয়াল হিকাম, তাহকীক্ব : শু‘আইব আরনাউত্ব ও ইবরাহীম বাজিস (রিয়াদ : দারাতুল মালিক আব্দুল আযীয, ৯ম মুদ্রণ, ২০০২ খ্রি.), ১ম খন্ড, পৃ. ৭৯, ১ম হাদীছের ব্যাখ্যা দ্র.) ।
• আল-হারিছ আল-মুহাসিবী একে ( الرِّيَاءُ الأَعْظَمُ وَالأَشَدُّ ) বা বড় ও গুরুতর রিয়া হিসাবে আখ্যায়িত করে বলেছেন,
وَإِنَّمَا الْوَجْهُ الَّذِي هُوَ أَشَدُّ الرِّيَاءِ وَأَعْظَمُهُ: إِرَادَةُ الْعَبْدِ الْعِبَادَ بِطَاعَةِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، لَا يُرِيدُ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ بِذَلِكَ.
‘রিয়ার সবচেয়ে ভয়াবহ ও গুরুতর রূপ হল, বান্দা মহান আল্লাহর আনুগত্যমূলক কাজের মাধ্যমে মানুষের সন্তুষ্টি ও প্রশংসা কামনা করে। কিন্তু এর দ্বারা সে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে না’। (আর-রিয়া (দামেশক : দারু কালিমাত, ১৪৪৬ হি./২০২৫ খ্রি.), পৃ. ২১) ।
• শায়খ বিন বায (রহঃ) এ ধরনের রিয়াকে ( رِيَاءٌ أَكْبَرُ ) বা ‘বড় রিয়া’ হিসাবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, وَهُوَ رِيَاءُ الْمُنَافِقِينَ، وَأَهْلُهُ فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ ‘এটি মুনাফিকদের রিয়া। এ ধরনের রিয়াকারীরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে’। (শায়খ বিন বায, শারহু রিয়াযিছ ছালেহীন (বৈরুত : দারু কুরতুবাহ, ১ম প্রকাশ, ১৪৪০ হি. ২০১৯ খ্রি.), ৪র্থ খন্ড, পৃ. ৩৬৮) ।
এ ধরনের রিয়া মিশ্রিত আমলের বিধান:
• ইবনু রজব হাম্বলী (রহঃ) বলেন,
وَهَذَا الْعَمَلُ لَا يَشُكُّ مُسْلِمٌ أَنَّهُ حَابِطٌ، وَأَنَّ صَاحِبَهُ يَسْتَحِقُّ الْمَقْتَ مِنَ اللَّهِ وَالْعُقُوبَةَ.
‘এ ধরনের আমল যে বিনষ্টকারী ও সম্পূর্ণরূপে বাতিল-এ বিষয়ে কোন মুসলিমেরই সন্দেহ নেই। এমন আমলকারীর উপর আল্লাহর ক্রোধ, অসন্তোষ ও শাস্তি উপযুক্ত হয়ে যায়’। (জামেউল উলূম ওয়াল হিকাম ১/৭৯) ।
• ইবনু কুদামা মাকদেসী বলেন,
أَمَّا الْعَمَلُ الَّذِي لَا يُرِيدُ بِهِ إِلَّا الرِّيَاءَ فَهُوَ عَلَى صَاحِبِهِ لَا لَهُ، وَهُوَ سَبَبٌ لِلْعِقَابِ، كَمَا أَنَّ الْعَمَلَ الْخَالِصَ لِوَجْهِ اللَّهِ تَعَالَى سَبَبٌ لِلثَّوَابِ. وَلَا إِشْكَالَ فِي هَذَيْنِ الْقِسْمَيْنِ.
‘আর যে আমলের উদ্দেশ্যই শুধু লোক দেখানো, তা আমলকারীর পক্ষে নয়; বরং তার বিরুদ্ধেই যায়। এটি শাস্তির কারণ। যেমন একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে সম্পাদিত আমল ছওয়াবের কারণ। এই দুই প্রকার আমলের ব্যাপারে কোনো সংশয় নেই’। (মুখতাছার মিনহাজুল কাছেদীন, পৃ. ৩৬৭) ।
• শায়খ উছায়মীন (রহঃ) বলেন, فَهَذَا شِرْكٌ، وَالْعِبَادَةُ بَاطِلَةٌ. ‘এটি শিরক আর ইবাদত বাতিল’। (আল-কাওলুল মুফীদ আলা কিতাবিত তাওহীদ, পৃ. ৪৪৯) ।
• দ্বিতীয় অবস্থা :
ইবাদতের মাঝখানে রিয়া এতে শরীক হয়ে যাওয়া অর্থাৎ শুরুতে ইবাদত আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ ছিল, পরে ইবাদতের মাঝে রিয়া এসে পড়ল।
এক্ষেত্রে যদি ইবাদতের প্রথম অংশ শেষ অংশের উপর নির্ভরশীল না হয়, তাহলে প্রথম অংশ ছহীহ (শুদ্ধ) হবে এবং শেষ অংশ বাতিল হবে। যেমন, একজন ব্যক্তি একশত টাকা দান করার ইচ্ছা পোষণ করল। সে পঞ্চাশ টাকা খাঁটি ইখলাছের সাথে দান করল। আর বাকী পঞ্চাশ টাকা দান করল লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে। এক্ষণে প্রথম পঞ্চাশ টাকা দানের ছওয়াব সে পাবে। আর দ্বিতীয় পঞ্চাশ টাকা দানের ছওয়াব বাতিল বলে গণ্য হবে।
যদি ইবাদতের শেষ অংশ প্রথম অংশের উপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে তার দু’টি অবস্থা রয়েছে-
এক. যদি ব্যক্তি সাথে সাথে রিয়াকে প্রতিহত করে এবং তার দিকে ঝুঁকে না পড়ে; বরং তাকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং তা অপছন্দ করে, তাহলে এতে তার কোন ক্ষতি হবে না। কারণ নবী (ছাঃ) বলেছেন,
إِنَّ اللهَ تَجَاوَزَ لِأُمَّتِي عَمَّا وَسْوَسَتْ أَوْ حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا مَا لَمْ تَعْمَلْ بِهِ أَوْ تَكَلَّمْ.
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা আমার উম্মতের অন্তরে উদিত কুমন্ত্রণা ও চিন্তাগুলো ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না তারা তা কাজে পরিণত করে অথবা মুখে প্রকাশ করে’। (বুখারী হা/৬৬৬৪; মুসলিম হা/১২৭) ।
দুই. যদি সে এই রিয়ার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যায় এবং তা প্রতিহত না করে, তাহলে তার পুরো ইবাদত বাতিল হয়ে যাবে। কারণ ইবাদতের শেষ অংশ প্রথম অংশের সাথে সম্পর্কযুক্ত ও তার উপর ভিত্তিশীল।
উদাহরণ : একজন ইখলাছের সাথে দুই রাক‘আত ছালাত শুরু করল। দ্বিতীয় রাক‘আতে কারো দৃষ্টি তার উপর পড়েছে অনুভব করে তার মনে রিয়ার উদ্রেক হল, আর সে এতে সন্তুষ্ট হয়ে গেল ও তার প্রতি ঝুঁকে পড়ল। ফলে তার পুরো ছালাত বাতিল হয়ে যাবে। কারণ এর এক অংশ অন্য অংশের সাথে সম্পর্কযুক্ত।
• তৃতীয় অবস্থা : ইবাদত শেষ হওয়ার পর রিয়ার কিছু অনুভূতি আসা। ইবাদত শেষ হওয়ার পর যদি রিয়ার কিছু অনুভূতি আসে তাহলে তা ইবাদতের কোন ক্ষতি করবে না। তবে যদি এর মধ্যে অন্যের প্রতি যুলুম থাকে- যেমন দান করার পর খোঁটা দেওয়া বা কষ্ট দেওয়া- তাহলে এই অন্যায়ের গুনাহ ছাদাক্বার ছাওয়াবের মোকাবিলায় দাঁড়াবে এবং তা বাতিল করে দিবে।
মহান আল্লাহ বলেন,
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُبْطِلُوا صَدَقَاتِكُمْ بِالْمَنِّ وَالْأَذَى كَالَّذِي يُنْفِقُ مَالَهُ رِئَاءَ النَّاسِ وَلَا يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَمَثَلُهُ كَمَثَلِ صَفْوَانٍ عَلَيْهِ تُرَابٌ فَأَصَابَهُ وَابِلٌ فَتَرَكَهُ صَلْدًا لَا يَقْدِرُونَ عَلَى شَيْءٍ مِمَّا كَسَبُوا وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ.
‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা খোটা দিয়ে ও কষ্ট দিয়ে তোমাদের দানগুলিকে বিনষ্ট করোনা। সেই ব্যক্তির মত, যে তার ধন-সম্পদ ব্যয় করে লোক দেখানোর জন্য এবং সে আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাস করেনা। ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্ত একটি মসৃণ প্রস্তরখন্ডের মত, যার উপরে কিছু মাটি ছিল। অতঃপর সেখানে প্রবল বৃষ্টিপাত হ’ল ও তাকে ধুয়ে ছাফ করে রেখে গেল। এভাবে তারা যা উপার্জন করে, তা থেকে কোনই সুফল তারা পায় না। বস্ত্ততঃ আল্লাহ অবিশ্বাসী সম্প্রদায়কে সুপথ প্রদর্শন করেন না’ (বাক্বারাহ ২/২৬৪)। [জামেউল উলূম ওয়াল হিকাম ১/৭৯-৮৩; আল-কাত্তলুস সাদীদ শারহু কিতাবিত তাওহীদ, পৃ. ২১৯-২২০; আল-কাত্তলুল মুফীদ, পৃ ৪৪৯-৪৫০]
যা কিছু রিয়া নয়:
ইবাদত শেষ হওয়ারপর মানুষ তার সে ইবাদতের কথা জেনে গেছে দেখে যদি সে আনন্দিত হয়, তাহলে তা রিয়া নয়। কারণ এই অনুভূতি ইবাদত শেষ হওয়ার পরে এসেছে।
হাফেয ইবনু কাছীর (রহঃ) সূরা মাঊনের ৬নং আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন,
أَنَّ مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لِلَّهِ فَاطَّلَعَ عَلَيْهِ النَّاسُ فَأَعْجَبَهُ ذَلِكَ، أَنَّ هَذَا لَا يُعَدُّ رِيَاءً.
‘কোন মানুষ যদি আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোন আমল করে, অতঃপর মানুষ তা জেনে ফেলে এবং এতে সে আনন্দিত হয়, তবে এটিকে রিয়া হিসাবে গণ্য করা হবে না’। (তাফসীর ইবনে কাছীর ৮/৪৬৫)
ইবনু কুদামা মাকদেসী বলেন,
فَإِنْ وَرَدَ عَلَيْهِ بَعْدَ الْفَرَاغِ سُرُورٌ بِالظُّهُورِ مِنْ غَيْرِ إِظْهَارٍ مِنْهُ، فَهَذَا لَا يُحْبِطُ الْعَمَلَ، لِأَنَّهُ قَدْ تَمَّ عَلَى نَعْتِ الْإِخْلَاصِ، فَلَا يَنْعَطِفُ مَا طَرَأَ عَلَيْهِ بَعْدَهُ، لَا سِيَّمَا إِذَا لَمْ يَتَكَلَّفْ هُوَ إِظْهَارَهُ وَالتَّحَدُّثَ بِهِ.
‘যদি ইবাদত শেষ হওয়ার পর মানুষের কাছে প্রকাশ পাওয়ার কারণে তার মনে আনন্দাভূতি সৃষ্টি হয়- যা সে নিজে প্রকাশ বা প্রচার করেনি- তাহলে তা আমলকে বাতিল করে না। কারণ আমলটি তো ইখলাছের সাথেই সম্পাদিত হয়েছে। সুতরাং পরে উদ্ভূত বিষয় তার উপর প্রভাব ফেলবে না; বিশেষত যখন সে নিজে তা প্রকাশ বা প্রচারের চেষ্টা করেনি’। (মুখতাছার মিনহাজুল কাছেদীন, পৃ. ২২১)
অনুরূপভাবে কোনো ব্যক্তির নিজে সৎকর্ম করতে পেরে অন্তরে আনন্দ অনুভব করাও রিয়া নয়; বরং এটি তার ঈমানের বহিঃপ্রকাশ। নবী (ছাঃ) বলেছেন,
مَنْ سَرَّتْهُ حَسَنَتُهُ وَسَاءَتْهُ سَيِّئَتُهُ فَذَلِكَ الْمُؤْمِنُ .
‘যার নেক কাজ তাকে আনন্দিত করে এবং গুনাহ তাকে কষ্ট দেয়, সেই মুমিন’। (মুসনাদ আহমাদ হা/২২২২০; তিরমিযী হা/২১৬৫) ।
এ ব্যাপারে নবী (সাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ( تِلْكَ عَاجِلُ بُشْرَى الْمُؤْمِنِ ) ‘এটাই হলো মুমিনের জন্য দুনিয়াতেই প্রাপ্ত অগ্রিম সুসংবাদ’। (মুসলিম হা/২৬৪২) ।
লৌকিকতার ভয়ে আমল পরিত্যাগের বিধান :
কিছু মানুষ সৎকর্মে অভ্যস্ত থাকে। কিন্তু কখনো তার মনে রিয়ার আশংকা জাগে। ফলে সে এই আশংকার ভয়ে ইবাদত বা নেক আমল ছেড়ে দেয়। অথবা কোন মানুষ দেখছে এই কারণেই সে সৎকাজ পরিত্যাগ করে। অথচ এ ধরনের চিন্তা ভুল।
• ফুযাইল বিন ইয়ায বলেন,
تَرْكُ الْعَمَلِ مِنْ أَجْلِ النَّاسِ رِيَاءٌ، وَالْعَمَلُ مِنْ أَجْلِ النَّاسِ شِرْكٌ، وَالْإِخْلَاصُ أَنْ يُعَافِيَكَ اللَّهُ مِنْهُمَا.
‘মানুষের কথা ভেবে আমল ত্যাগ করা রিয়া আর মানুষের জন্য আমল করা শিরক। পক্ষান্তরে প্রকৃত ইখলাছ হল, আল্লাহ তোমাকে এ উভয় ব্যাধি থেকে হেফাযত করুন’। (শু‘আবুল ঈমান হা/৬৮৭৯; মু‘জামুত তাওহীদ ২/২৭৯) ।
তবে কেউ যদি কিছু নফল ইবাদত কিছু মানুষের সামনে এ কারণে ছেড়ে দেয় যে, তারা তার এমন প্রশংসা করবে যা তার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, অথবা সে নিজের ব্যাপারে ফিতনার আশংকা করে- তাহলে সেটিও রিয়ার অন্তর্ভুক্ত নয়। কিন্তু ওয়াজিব আমল কোন শারঈ ওযর ছাড়া ত্যাগ করার অনুমতি নেই’। (ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা ১/৭৬৮-৬৯, ফাতাওয়া নং ৩৪১৯) ।
রিয়ায় নিপতিত হওয়ার আশংকায় আমল পরিত্যাগ শয়তানী চক্রান্ত ও ফাঁদ:
• ইমাম ইবনু হাযম আন্দালুসী বলেন,
لِإِبْلِيسَ فِي ذَمِّ الرِّيَاءِ حِبَالَةٌ، وَذَلِكَ أَنَّهُ رُبَّ مُمْتَنِعٍ مِنْ فِعْلِ خَيْرٍ مَخَافَةَ أَنْ يُظَنَّ بِهِ الرِّيَاءُ، فَإِذَا أَطْرَقَكَ مِنْهُ هَذَا فَامْضِ عَلَى فِعْلِكَ، فَهُوَ شَدِيدُ الْأَلَمِ عَلَيْهِ.
‘রিয়ার নিন্দার মধ্যেও ইবলীসের একটি ফাঁদ রয়েছে। তা হল, অনেক মানুষ রিয়াকার আখ্যায়িত হওয়ার ভয়ে ভাল কাজ ছেড়ে দেয়। সুতরাং তোমার মনেও যদি শয়তানের পক্ষ থেকে এ ধরনের কুমন্ত্রণা আসে, তবে তুমি তোমার সৎকর্ম চালিয়ে যাও। কারণ এটি ইবলীসের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক’। (আল-আখলাক ওয়াস সিয়ার, তাহকীক্ব : ইফা রিয়ায (বৈরূত : দারু ইবনি হাযম, ২য় সংস্করণ, ২০০৭ খ্রি.), পৃ. ৮০)
রিয়ার আশংকায় আমল পরিত্যাগের ইমামদের বক্তব্য:
ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন,
وَمَنْ نَهَى عَنْ أَمْرٍ مَشْرُوعٍ بِمُجَرَّدِ زَعْمِهِ أَنَّ ذَلِكَ رِيَاءٌ، فَنَهْيُهُ مَرْدُودٌ عَلَيْهِ مِنْ وُجُوهٍ.
‘যে ব্যক্তি কেবল এই ধারণায় কোন শরী‘আতসম্মত কাজ থেকে নিষেধ করে যে, তা রিয়া- তার এ নিষেধাজ্ঞা কয়েকটি দিক থেকে প্রত্যাখ্যাত’।
১. রিয়ার আশংকায় শরী‘আতসম্মত আমলগুলো থেকে নিষেধ করা হয় না; বরং সেগুলো সম্পাদন করতে এবং তাতে ইখলাছ বজায় রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়। কারণ শরী‘আতসম্মত কাজ প্রকাশ না করার ক্ষতি, তা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে প্রকাশ করার ক্ষতির চেয়েও বড়। যেমন ঈমান ও নামাজ প্রকাশ না করার ক্ষতি, তা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে প্রকাশ করার ক্ষতির চেয়ে অধিক ভয়াবহ। কারণ নিষেধাজ্ঞা তো তখনই প্রযোজ্য হয়, যখন ঐ কাজটি মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে প্রকাশ করার মধ্যে ক্ষতি থাকে।
২. নিষেধ ঐ বিষয়ের উপর প্রযোজ্য হয়, শরী‘আত যেটিকে অপছন্দ করেছে। আর রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, (
إِنِّي لَمْ أُؤْمَرْ أَنْ أَنْقُبَ عَنْ قُلُوبِ النَّاسِ ) ‘নিশ্চয়ই আমি মানুষের বুক চিরে দেখতে আদিষ্ট হইনি’। (বুখারী হা/৪৩৫১; মুসলিম হা/১০৬৪) ।
৩. এ ধরনের ধারণাকে বৈধ মনে করলে এর পরিণতি হবে- শিরক ও ফাসাদ সৃষ্টিকারী লোকেরা যখনই কোন দ্বীনদার ও সৎ মানুষকে কোন শরী‘আতসম্মত ও সুন্নাহসম্মত কাজ প্রকাশ্যে করতে দেখবে, তখনই বলবে, সে রিয়া করছে। ফলে সত্যবাদী ও মুখলিছ ব্যক্তিরা মানুষের নিন্দা ও কটূক্তির ভয়ে শরী‘আতসম্মত কাজ প্রকাশ করা ছেড়ে দিবে। এতে কল্যাণমূলক কাজ স্থবির হয়ে পড়বে আর শিরকপন্থীরা শক্তিশালী হয়ে উঠবে। তারা প্রকাশ্যে মন্দ কাজ করবে অথচ কেউ তাদের বাধা দেবে না। এটি বড় ধরনের অনিষ্টের শামিল।
৪. এ ধরনের আচরণ মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্যের অন্তর্ভুক্ত। তারা শরী‘আতসম্মত আমল প্রকাশকারীদের দোষারোপ করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
الَّذِينَ يَلْمِزُونَ الْمُطَّوِّعِينَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ فِي الصَّدَقَاتِ وَالَّذِينَ لَا يَجِدُونَ إِلَّا جُهْدَهُمْ فَيَسْخَرُونَ مِنْهُمْ سَخِرَ اللَّهُ مِنْهُمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ.
‘যারা স্বেচ্ছায় ছাদাকা দানকারী মুমিনদের প্রতি বিদ্রুপ করে এবং যাদের স্বীয় পরিশ্রমলব্ধ বস্ত্ত ছাড়া কিছুই নেই তাদেরকে ঠাট্টা করে, আল্লাহ তাদেরকে লাঞ্ছিত করেন এবং তাদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি’ (তওবা ৯/৭৯)। (মাজমূউল ফাতাওয়া ২৩/১৭৪) ।
আবু মাসউদ আনছারী (রাঃ) বলেন,
لَمَّا أُمِرْنَا بِالصَّدَقَةِ كُنَّا نَتَحَامَلُ فَجَاءَ أَبُوْ عَقِيْلٍ بِنِصْفِ صَاعٍ وَجَاءَ إِنْسَانٌ بِأَكْثَرَ مِنْهُ فَقَالَ الْمُنَافِقُوْنَ إِنَّ اللهَ لَغَنِيٌّ عَنْ صَدَقَةِ هَذَا وَمَا فَعَلَ هَذَا الآخَرُ إِلَّا رِئَاءً فَنَزَلَتْ (الَّذِيْنَ يَلْمِزُوْنَ الْمُطَّوِّعِيْنَ مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ فِي الصَّدَقَاتِ وَالَّذِيْنَ لَا يَجِدُوْنَ إِلَّا جُهْدَهُمْ) الآيَةَ.
‘(তাবুক যুদ্ধের দিন) যখন আমাদের ছাদাকা করার নির্দেশ দেওয়া হল, তখন আমরা কষ্ট করে (উপার্জন করে) ছাদাকা দিতাম। এমন সময় আবু আকীল অর্ধ ছা পরিমাণ দান নিয়ে এলেন। আরেকজন ব্যক্তি তার চেয়ে বেশী দান নিয়ে এলেন। তখন মুনাফিকরা বলল, আল্লাহ তো এ ব্যক্তির এই সামান্য ছাদাকার মুখাপেক্ষী নন। আর অন্য ব্যক্তি সম্পর্কে বলল, ‘সে তো শুধু লোক দেখানোর জন্যই তা করেছে’। তখন উক্ত আয়াতটি (তওবা ৯/৭৯) নাযিল হল। [বুখারী হা/৪৬৬৮] ।
ইমাম নববী (রহঃ) রিয়ার আশংকায় আমল পরিত্যাগের ভয়াবহতা সম্পর্কে বলেন,
ثمَّ لَا يَنْبَغِي أَنْ يُتْرَكَ الذِّكْرُ بِاللِّسَانِ مَعَ الْقَلْبِ خَوْفًا مِنْ أَنْ يُظَنَّ بِهِ الرِّيَاءُ، بَلْ يَذْكُرُ بِهِمَا جَمِيعًا وَيَقْصِدُ بِهِ وَجْهَ اللَّهِ تَعَالَى وَلَوْ فَتَحَ الْإِنْسَانُ عَلَى نَفْسِهِ بَابَ مُلَاحَظَةِ النَّاسِ، وَالِاحْتِرَازِ مِنْ تَطَرُّقِ ظُنُونِهِمُ الْبَاطِلَةِ، لَانْسَدَّ عَلَيْهِ أَكْثَرُ أَبْوَابِ الْخَيْرِ، وَضَيَّعَ عَلَى نَفْسِهِ شَيْئًا عَظِيمًا مِنْ مُهِمَّاتِ الدِّينِ، وَلَيْسَ هَذَا طَرِيقَ الْعَارِفِينَ.
‘রিয়াকার মনে করার আশংকায় অন্তরসহ জিহবার যিকির ত্যাগ করা উচিত নয়; বরং উভয়ভাবেই যিকির করবে এবং এর দ্বারা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টিই উদ্দেশ্য রাখবে। মানুষ যদি সবসময় লোকদের দৃষ্টি ও তাদের ভ্রান্ত ধারণার ভয় করতে থাকে এবং তা থেকে বাঁচতে সচেষ্ট হয়, তবে তার জন্য কল্যাণের অধিকাংশ দরজাই বন্ধ হয়ে যাবে। সে দ্বীনের বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবে। আর এটি আল্লাহওয়ালাদের পথ নয়’। [আল-আযকার (জেদ্দা : দারুল মিনহাজ, ৪র্থ সংস্করণ, ১৪৩৩হি./২০১২খ্রি.), পৃ. ৩৭-৩৮] ।
যেসব বিষয় রিয়া-র অন্তর্ভুক্ত নয় :
কিছু বিষয় রয়েছে যেগুলোকে মানুষ রিয়া মনে করে অথচ সেগুলো রিয়ার অন্তর্ভুক্ত নয়। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোকপাত করা হল-
১. বান্দার সংকর্মের প্রশংসা করা : কোন মানুষ যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোন সৎকর্ম সম্পাদন করে অতঃপর মানুষ তা জেনে যায়। অথচ সে নিজে সেটি প্রকাশ বা প্রচার করতে চায়নি। এতে আমলকারীর মনে আনন্দানুভূতির উদ্রেক হলে এবং মানুষ তার আমলের প্রশংসা করলে সেটি রিয়া হিসাবে গণ্য হবে না। বরং এক্ষেত্রে মানুষের প্রশংসা লাভ তার প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও তার জন্য আগাম সুসংবাদ বলে বিবেচিত হবে। (তাফসীর ইবনে কাছীর ৮/৪৬৫, মাঊন ৬ আয়াতের তাফসীর দ্র.; মুখতাছার মিনহাজুল কাছেদীন, পৃ. ২২১)
মহান আল্লাহ বলেন, قُلْ بِفَضْلِ اللهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَلِكَ فَلْيَفْرَحُوا هُوَ خَيْرٌ مِمَّا يَجْمَعُونَ. ‘বল, আল্লাহর এই দান ও তার অনুগ্রহের কারণে তাদের আনন্দিত হওয়া উচিত। এটি সবকিছু থেকে উত্তম যা তারা সঞ্চয় করে’ (ইউনুস ১০/৫৮)।
আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করা হল, ঐ ব্যক্তির ব্যাপারে আপনার মতামত কী যে সৎকর্ম করে এবং এজন্য মানুষ তার প্রশংসা করে? অন্য বর্ণনায় রয়েছে, এজন্য মানুষ তাকে ভালোবাসে। তিনি বললেন, تِلْكَ عَاجِلُ بُشْرَى الْمُؤْمِنِ. ‘এটি মুমিনের জন্য নগদ সুসংবাদ’। (মুসলিম হা/২৬৪২; ইবনু মাজাহ হা/৩৪২৩)।
ইমাম নববী (রহ.) বলেন, ‘আলেমগণ বলেছেন, এর অর্থ হ’ল মানুষের পক্ষ থেকে কোন নেককার বান্দার প্রশংসা হওয়া তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অগ্রিম সুসংবাদ। এটি এ কথার প্রমাণ যে, আল্লাহ তা‘আলা তার প্রতি সন্তুষ্ট এবং তিনি তাকে ভালবাসেন। ফলে আল্লাহ তাকে মানুষের কাছে প্রিয় করে তোলেন, অতঃপর পৃথিবীতে তার গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি করে দেন। এসবই তখন হবে, যখন মানুষ তার প্রশংসা করবে তার পক্ষ থেকে প্রশংসা পাওয়ার কোন চেষ্টা বা আকাঙ্ক্ষা ছাড়াই। কিন্তু যদি সে মানুষের প্রশংসা কামনা করে, তবে তা হবে নিন্দনীয়’। (আল-মিনহাজ শারহু ছহীহ মুসলিম হা/২৬৪২-এর ব্যাখ্যা দ্র.) ।
এভাবেই মুখলিছ ব্যক্তি সুনাম-সুখ্যাতি ও প্রশংসা অপছন্দ করে এবং তা থেকে পালায়, কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবীতে তার জন্য গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি করে দেন। এটি কেবল আল্লাহর অনুগ্রহেই সম্ভব হয়।
২. সুন্দর পোষাক-পরিচ্ছদ পরিধান : নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর পোষাক এবং জুতা-স্যান্ডেল পরিধান করা রিয়ার অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে এক্ষেত্রে অহংকার ও অপচয় থেকে বিরত থাকতে হবে।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
كُلُوا وَاشْرَبُوا وَتَصَدَّقُوا وَالْبَسُوا مَا لَمْ يُخَالِطْهُ إِسْرَافٌ أَوْ مَخِيلَةٌ.
‘তোমরা খাও, পান করো, দান-ছাদাকা করো এবং পোষাক পরিধান করো- যতক্ষণ না তাতে অপচয় ও অহংকারের ছোঁয়া থাকে’। (নাসাঈ হা/২৫৫৯; ইবনু মাজাহ হা/৩৬০৫, হাদীছ হাসান) ।
অন্য হাদীছে এসেছে, إِنَّ اللهَ يُحِبَّ أَنْ يُرَى أَثَرُ نِعْمَتِهِ عَلَى عَبْدِهِ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা তার বান্দার উপর তার নে‘মতের সৌন্দর্য ও প্রভাব দেখতে পছন্দ করেন’। (তিরমিযী হা/২৮১৯, হাসান ছহীহ) ।
৩. ইসলামের নিদর্শনসমূহ প্রকাশ করা : স্বতঃসিদ্ধ মূলনীতি হল,
مَبْنَى الشَّعَائِرِ عَلَى الْإِشْهَارِ وَالْإِظْهَارِ دُونَ الْإِخْفَاءِ.
‘ইসলামের প্রতীক ও নিদর্শনসমূহের ভিত্তি হল সেগুলোকে প্রকাশ ও প্রচার করা; গোপন রাখা নয়’। এজন্য ইসলামে এমন কিছু ইবাদত রয়েছে, যেগুলো গোপন করা সম্ভব নয়। যেমন: হজ্জ, ওমরা, জুম‘আ, জামা‘আত, জিহাদ ইত্যাদি। এগুলো প্রকাশ করার মাধ্যমে বান্দা রিয়াকারী হিসাবে গণ্য হয় না। কেননা ফরয আমলগুলোর দাবী হল, সেগুলো ঘোষণা দেওয়া ও প্রচার করা। এসকল আমল দ্বীনের প্রতীক ও ইসলামের নিদর্শন। উপরন্তু এ আমলগুলো পরিত্যাগকারী নিন্দা, তিরস্কার ও ঘৃণার যোগ্য। তাই কুধারণা দূর করার জন্য এগুলো প্রকাশ করা জরূরী। (সালীম আল-হেলালী, আর-রিয়া, পৃ. ৫৮) ।
৪. পাপ গোপন রাখা : পাপ গোপন রাখা এবং সে সম্পর্কে কাউকে কিছু না বলা রিয়া নয়। বরং ইসলামে নিজেদের ও অন্যদের দোষ গোপন রাখার নির্দেশনা রয়েছে। কিছু মানুষ মনে করে, অপরাধ প্রকাশ করা যরূরী, যাতে সে মুখলিছ বান্দা বলে গণ্য হতে পারে। এটি ভুল ধারণা ও শয়তানী ধোঁকা ছাড়া কিছুই নয়। কেননা পাপের কথা বলে বেড়ানো মুমিনদের মাঝে অশ্লীলতা ছড়িয়ে দেওয়ার অন্তর্ভুক্ত। (মুখতাছার মিনহাজুল কাছেদীন, পৃ. ২২৪; মুহাম্মাদ ছালেহ আল-মুনাজ্জিদ, আ‘মালুল কুলূব, পৃ. ৪৭) ।
মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ.
‘নিশ্চয়ই যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য রয়েছে ইহকালে ও পরকালে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। বস্ত্ততঃ আল্লাহ জানেন কিন্তু তোমরা জানো না’ (নূর ২৪/১৯)।
৫. সৎকর্মশীল বান্দাদের সংস্পর্শে ইবাদতের স্পৃহা বৃদ্ধি : কেউ কেউ কখনো কোন উদ্যমী ইবাদতকারীকে দেখে এবং সৎকর্মপরায়ণ ও মুখলিছ ব্যক্তিদের সংস্পর্শে এসে সৎকর্ম ও ইবাদতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। এটা রিয়া বা লৌকিকতা নয়। এগুলো আমলকারীর সংকল্পকে দৃঢ় করে এবং তার অন্তরে কর্মস্পৃহা ও প্রফুল্লতা সৃষ্টি করে। ইবনু কুদামা মাকদেসী (রহঃ) এর উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘কখনো একজন ব্যক্তি তাহাজ্জুদগুযারদের সাথে রাত যাপন করে। তারা রাতের অধিকাংশ সময় জুড়ে তাহাজ্জুদ ছালাতে নিমগ্ন থাকে। অথচ তার নিজের অভ্যাস হল অল্প সময় ক্বিয়াম করা। কিন্তু তাদের সঙ্গ পেয়ে সেও অধিক সময় ইবাদতে মশগুল হয়ে যায়। অথবা তারা ছিয়াম পালন করে। তাই সেও ছিয়াম রাখে। তাদের সঙ্গ না পেলে হয়তো তার মাঝে এধরনের উদ্যম সৃষ্টি হতো না। এ অবস্থাকে কেউ কেউ রিয়া মনে করতে পারে। অথচ এটা মোটেও রিয়া নয়’। (মুখতাছার মিনহাজুল কাছেদীন, পৃ. ২২৫) ।
উপসংহার : রিয়া এমন একটি মারাত্মক আত্মিক ব্যাধি, যা মানুষের আমলের প্রাণশক্তি তথা ইখলাছকে ধ্বংস করে দেয় এবং আখিরাতের সফলতাকে বিপন্ন করে। বাহ্যিকভাবে নেক আমল যতই সুন্দর ও প্রশংসনীয় হোক না কেন, যদি তার অন্তরে আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে মানুষের সন্তুষ্টি বা প্রশংসা লাভের আকাঙ্ক্ষা থাকে, তবে সেই আমল আল্লাহর নিকট মূল্যহীন। এ কারণে সালাফে ছালেহীন রিয়াকে অত্যন্ত ভয় করতেন এবং সর্বদা নিজেদের নিয়ত পরিশুদ্ধ রাখার চেষ্টা করতেন।






