প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন

জোনাকী অনলাইন লাইব্রেরীতে আপনাকে স্বাগতম | জোনাকী যদি আপনার ভালো লাগে তবে আপনার বন্ধুদের সাথে লিংকটি শেয়ার করার অনুরোধ জানাচ্ছি | এছাড়াও যারা ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করতে আগ্রহী তারা jaherrahman@gmail.com এ মেইল করার অনুরোধ করা হচ্ছে | আপনার অংশগ্রহণে সমৃদ্ধ হোক আপনার প্রিয় অনলাইন লাইব্রেরী। আমাদের সকল লেখক, পাঠক- শুভানুধ্যায়ীদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা- অভিনন্দন।

রাখাল ছেলে | জসীম উদ্দিন



রাখাল ছেলে রাখাল ছেলে বারেক ফিরে চাও
বাঁকা গাঁয়ের পথটি বেয়ে কোথায় চলে যাও?

ঐ যে দূরে মাঠের পারে সবুজ ঘেরা গাঁ
কলার পাতা দোলায় চামর শিশির ধোয়ায় পা৷
সেথায় আছে ছোট্টো কুটির সোনার পাতায় ছাওয়া
সাঁঝ আকাশে ছড়িয়ে পড়া আবীর রঙে নাওয়া৷
সেই ঘরেতে একেলা বসে ডাকছে আমার মা
সেথায় যাবো ও ভাই এবার আমায় ছাড়ো না৷

রাখাল ছেলে রাখাল ছেলে আবার কোথায় ধাও?
পুব আকাশে ছাড়লো সবে রঙীন মেঘের নাও৷

ঘুম হতে আজ জেগেই দেখি শিশিরঝরা ঘাসে
সারা রাতের স্বপন আমার মিঠেল রোদে হাসে৷
চলতে পথে মটরশুঁটি জড়িয়ে দুখান পা
বলছে যেন গাঁয়ের রাখাল একটু খেলে যা।


মামার বাড়ি | জসীম উদ্দিন


আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা,
ফুল তুলিতে যাই
ফুলের মালা গলায় দিয়ে
মামার বাড়ি যাই।
মামার বাড়ি পদ্মপুকুর
গলায় গলায় জল,
এপার হতে ওপার গিয়ে
নাচে ঢেউয়ের দল।
দিনে সেথায় ঘুমিয়ে থাকে
লাল শালুকের ফুল,
রাতের বেলা চাঁদের সনে
হেসে না পায় কূল।
আম-কাঁঠালের বনের ধারে
মামা-বাড়ির ঘর,
আকাশ হতে জোছনা-কুসুম
ঝরে মাথার ‘পর।
রাতের বেলা জোনাক জ্বলে
বাঁশ-বাগানের ছায়,
শিমুল গাছের শাখায় বসে
ভোরের পাখি গায়।
ঝড়ের দিনে মামার দেশে
আম কুড়াতে সুখ
পাকা জামের শাখায় উঠি
রঙিন করি মুখ।
কাঁদি-ভরা খেজুর গাছে
পাকা খেজুর দোলে
ছেলেমেয়ে, আয় ছুটে যাই
মামার দেশে চলে।


আসমানী | জসীম উদ্দিন


আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও,
রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।
বাড়ি তো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি,
একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি।
একটুখানি হাওয়া দিলেই ঘর নড়বড় করে,
তারি তলে আসমানীরা থাকে বছর ভরে।
পেটটি ভরে পায় না খেতে, বুকের ক-খান হাড়,
সাক্ষী দিছে অনাহারে কদিন গেছে তার।
মিষ্টি তাহার মুখটি হতে হাসির প্রদীপ-রাশি
থাপড়েতে নিবিয়ে দেছে দারুণ অভাব আসি।
পরনে তার শতেক তালির শতেক ছেঁড়া বাস,
সোনালি তার গা বরণের করছে উপহাস।
ভোমর-কালো চোখ দুটিতে নাই কৌতুক-হাসি,
সেখান দিয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু রাশি রাশি।
বাঁশির মতো সুরটি গলায় ক্ষয় হল তাই কেঁদে,
হয় নি সুযোগ লয় যে সে-সুর গানের সুরে বেঁধে।
আসমানীদের বাড়ির ধারে পদ্ম-পুকুর ভরে
ব্যাঙের ছানা শ্যাওলা-পানা কিল্-বিল্-বিল করে।
ম্যালেরিয়ার মশক সেথা বিষ গুলিছে জলে,
সেই জলেতে রান্না-খাওয়া আসমানীদের চলে।
পেটটি তাহার দুলছে পিলেয়, নিতুই যে জ্বর তার,
বৈদ্য ডেকে ওষুধ করে পয়সা নাহি আর।


কবর || জসীম উদ্দীন


এই খানে তোর দাদির কবর ডালিম-গাছের তলে,
তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।
এতটুকু তারে ঘরে এনেছিনু সোনার মতন মুখ,
পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেল বলে কেঁদে ভাসাইত বুক।
এখানে ওখানে ঘুরিয়া ফিরিতে ভেবে হইতাম সারা,
সারা বাড়ি ভরি এত সোনা মোর ছড়াইয়া দিল কারা!
সোনালি ঊষার সোনামুখ তার আমার নয়নে ভরি
লাঙল লইয়া খেতে ছুটিলাম গাঁয়ের ও-পথ ধরি।
যাইবার কালে ফিরে ফিরে তারে দেখে লইতাম কত
এ কথা লইয়া ভাবি-সাব মোরে তামাশা করিত শত।
এমনি করিয়া জানি না কখন জীবনের সাথে মিশে
ছোট-খাট তার হাসি ব্যথা মাঝে হারা হয়ে গেনু দিশে।
বাপের বাড়িতে যাইবার কাল কহিত ধরিয়া পা
আমারে দেখিতে যাইও কিন্তু উজান-তলীর গাঁ।
শাপলার হাটে তরমুজ বেচি পয়সা করি দেড়ী,
পুঁতির মালার একছড়া নিতে কখনও হত না দেরি।
দেড় পয়সার তামাক এবং মাজন লইয়া গাঁটে,
সন্ধাবেলায় ছুটে যাইতাম শ্বশুরবাড়ির বাটে!
হেস না­ হেস না­ শোন দাদু, সেই তামাক মাজন পেয়ে,
দাদি যে তোমার কত খুশি হত দেখিতিস যদি চেয়ে!
নথ নেড়ে নেড়ে কহিত হাসিয়া, এতদিন পরে এলে,
পথ পানে চেয়ে আমি যে হেথায় কেঁদে মরি আঁখিজলে।
আমারে ছাড়িয়া এত ব্যথা যার কেমন করিয়া হায়,
কবর দেশেতে ঘুমায়ে রয়েছে নিঝঝুম নিরালায়!
হাত জোড় করে দোয়া মাঙ দাদু, আয় খোদা! দয়াময়,
আমার দাদীর তরেতে যেন গো ভেস্ত নসিব হয়।
তারপর এই শূন্য জীবনে যত কাটিয়াছি পাড়ি
যেখানে যাহারে জড়ায়ে ধরেছি সেই চলে গেছে ছাড়ি।
শত কাফনের, শত কবরের অঙ্ক হৃদয়ে আঁকি,
গণিয়া গণিয়া ভুল করে গণি সারা দিনরাত জাগি।
এই মোর হাতে কোদাল ধরিয়া কঠিন মাটির তলে,
গাড়িয়া দিয়াছি কত সোনামুখ নাওয়ায়ে চোখের জলে।
মাটিরে আমি যে বড় ভালবাসি, মাটিতে মিশায়ে বুক,
আয়-আয় দাদু, গলাগলি ধরি কেঁদে যদি হয় সুখ।
এইখানে তোর বাপজি ঘুমায়, এইখানে তোর মা,
কাঁদছিস তুই? কী করিব দাদু! পরাণ যে মানে না।
সেই ফালগুনে বাপ তোর এসে কহিল আমারে ডাকি,
বা-জান, আমার শরীর আজিকে কী যে করে থাকি থাকি।
ঘরের মেঝেতে সপটি বিছায়ে কহিলাম বাছা শোও,
সেই শোওয়া তার শেষ শোওয়া হবে তাহা কী জানিত কেউ?
গোরের কাফনে সাজায়ে তাহারে চলিলাম যবে বয়ে,
তুমি যে কহিলা বা-জানরে মোর কোথা যাও দাদু লয়ে?
তোমার কথার উত্তর দিতে কথা থেমে গেল মুখে,
সারা দুনিয়ার যত ভাষা আছে কেঁদে ফিরে গেল দুখে!
তোমার বাপের লাঙল-জোয়াল দুহাতে জঢ়ায়ে ধরি,
তোমার মায়ে যে কতই কাঁদিতে সারা দিনমান ভরি।
গাছের পাতার সেই বেদনায় বুনো পথে যেতো ঝরে,
ফালগুনী হাওয়া কাঁদিয়া উঠিত শুনো-মাঠখানি ভরে।
পথ দিয়া যেতে গেঁয়ো পথিকেরা মুছিয়া যাইত চোখ,
চরণে তাদের কাঁদিয়া উঠিত গাছের পাতার শোক।
আথালে দুইটি জোয়ান বলদ সারা মাঠ পানে চাহি,
হাম্বা রবেতে বুক ফাটাইত নয়নের জলে নাহি।
গলাটি তাদের জড়ায়ে ধরিয়া কাঁদিত তোমার মা,
চোখের জলের গহীন সায়রে ডুবায়ে সকল গাঁ।
ঊদাসিনী সেই পল্লী-বালার নয়নের জল বুঝি,
কবর দেশের আন্ধারে ঘরে পথ পেয়েছিল খুজি।
তাই জীবনের প্রথম বেলায় ডাকিয়া আনিল সাঁঝ,
হায় অভাগিনী আপনি পরিল মরণ-বিষের তাজ।
মরিবার কালে তোরে কাছে ডেকে কহিল, বাছারে যাই,
বড় ব্যথা র’ল, দুনিয়াতে তোর মা বলিতে কেহ নাই;
দুলাল আমার, যাদুরে আমার, লক্ষী আমার ওরে,
কত ব্যথা মোর আমি জানি বাছা ছাড়িয়া যাইতে তোরে।
ফোঁটায় ফোঁটায় দুইটি গন্ড ভিজায়ে নয়ন­জলে,
কী জানি আশিস করে গেল তোরে মরণ­ব্যথার ছলে।
ক্ষণপরে মোরে ডাকিয়া কহিল­ আমার কবর গায়
স্বামীর মাথার মাথালখানিরে ঝুলাইয়া দিও বায়।
সেই যে মাথাল পচিয়া গলিয়া মিশেছে মাটির সনে,
পরাণের ব্যথা মরে নাকো সে যে কেঁদে ওঠে ক্ষণে ক্ষণে।
জোড়মানিকেরা ঘুমায়ে রয়েছে এইখানে তরু­ছায়,
গাছের শাখারা স্নেহের মায়ায় লুটায়ে পড়েছে গায়।
জোনকি­মেয়েরা সারারাত জাগি জ্বালাইয়া দেয় আলো,
ঝিঁঝিরা বাজায় ঘুমের নূপুর কত যেন বেসে ভালো।
হাত জোড় করে দোয়া মাঙ দাদু, রহমান খোদা! আয়;
ভেস্ত নসিব করিও আজিকে আমার বাপ ও মায়!
এখানে তোর বুজির কবর, পরীর মতন মেয়ে,
বিয়ে দিয়েছিনু কাজিদের বাড়ি বনিয়াদি ঘর পেয়ে।
এত আদরের বুজিরে তাহারা ভালবাসিত না মোটে,
হাতেতে যদিও না মারিত তারে শত যে মারিত ঠোঁটে।
খবরের পর খবর পাঠাত, দাদু যেন কাল এসে
দুদিনের তরে নিয়ে যায় মোরে বাপের বাড়ির দেশে।
শ্বশুর তাহার কশাই চামার, চাহে কি ছাড়িয়া দিতে
অনেক কহিয়া সেবার তাহারে আনিলাম এক শীতে।
সেই সোনামুখ মলিন হয়েছে ফোটে না সেথায় হাসি,
কালো দুটি চোখে রহিয়া রহিয়া অশ্রু উঠিছে ভাসি।
বাপের মায়ের কবরে বসিয়া কাঁদিয়া কাটাত দিন,
কে জানিত হায়, তাহারও পরাণে বাজিবে মরণ­বীণ!
কী জানি পচানো জ্বরেতে ধরিল আর উঠিল না ফিরে,
এইখানে তারে কবর দিয়েছি দেখে যাও দাদু! ধীরে।
ব্যথাতুরা সেই হতভাগিনীরে বাসে নাই কেহ ভালো,
কবরে তাহার জড়ায়ে রয়েছে বুনো ঘাসগুলি কালো।
বনের ঘুঘুরা উহু উহু করি কেঁদে মরে রাতদিন,
পাতায় পাতায় কেঁপে উঠে যেন তারি বেদনার বীণ।
হাত জোড় করে দোয়া মাঙ দাদু, আয় খোদা! দয়াময়।
আমার বু­জীর তরেতে যেন গো বেস্ত নসিব হয়।
হেথায় ঘুমায় তোর ছোট ফুপু, সাত বছরের মেয়ে,
রামধনু বুঝি নেমে এসেছিল ভেস্তের দ্বার বেয়ে।
ছোট বয়সেই মায়েরে হারায়ে কী জানি ভাবিত সদা,
অতটুকু বুকে লুকাইয়াছিল কে জানিত কত ব্যথা!
ফুলের মতন মুখখানি তার দেখিতাম যবে চেয়ে,
তোমার দাদির ছবিখানি মোর হদয়ে উঠিত ছেয়ে।
বুকেতে তাহারে জড়ায়ে ধরিয়া কেঁদে হইতাম সারা,
রঙিন সাঁঝেরে ধুয়ে মুছে দিত মোদের চোখের ধারা।
একদিন গেনু গজনার হাটে তাহারে রাখিয়া ঘরে,
ফিরে এসে দেখি সোনার প্রতিমা লুটায় পথের পরে।
সেই সোনামুখ গোলগাল হাত সকলি তেমন আছে।
কী জানি সাপের দংশন পেয়ে মা আমার চলে গেছে।
আপন হস্তে সোনার প্রতিমা কবরে দিলাম গাড়ি,
দাদু! ধর­ধর­ বুক ফেটে যায়, আর বুঝি নাহি পারি।
এইখানে এই কবরের পাশে আরও কাছে আয় দাদু,
কথা কস নাকো, জাগিয়া উটিবে ঘুম­ভোলা মোর যাদু।
আস্তে আস্তে খুঁড়ে দেখ দেখি কঠিন মাটির তলে,
ওই দূর বনে সন্ধ্যা নামিয়ে ঘন আবিরের রাগে,
অমনি করিয়া লুটায়ে পড়িতে বড় সাধ আজ জাগে।
মজিদ হইতে আযান হাঁকিছে বড় সুকরুণ সুরে,
মোর জীবনের রোজকেয়ামত ভাবিতেছি কত দূরে।
জোড়হাত দাদু মোনাজাত কর, আয় খোদা! রহমান।
ভেস্ত নসিব করিও সকল মৃত্যু­ব্যথিত প্রাণ।


প্রতিদান || জসীম উদ্দিন


আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যে বা আমি বাঁধি তার ঘর
আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর
যে মোরে করিল পথের বিবাগি_
পথে পথে আমি ফিরি তার লাগি
দিঘল রজনী তার তরে জাগি ঘুম যে হরেছে মোর
আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যে বা আমি বাঁধি তার ঘর

আমার্ এ কূল ভাঙিয়াছে যে বা আমি তার কুল বাঁধি
যে গেছে বুকেতে আঘাত করিয়া তার লাগি আমি কাঁদি
যে মোরে দিয়েছে বিষে ভরা বাণ
আমি দেই তারে বুক ভরা গান
কাঁটা পেয়ে তারে ফুল করি দান সারাটি জনম ভর
আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর।

মোর বুকে যে বা কবর বেঁধেছে আমি তার বুক ভরি
রঙিন ফুলের সোহাগ জড়ানো ফুল মালঞ্চ ধরি
যে মুখে কহে সে নিঠুরিয়া বাণী
আমি লয়ে করে তারি মুখখানি
কত ঠাঁই হতে কত কী যে আনি সাঁজাই নিরন্তর
আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর।


জসীম উদ্দীনের কবিতায় পল্লী বংলার রূপ || ডক্টর সন্দীপক মল্লিক


১.

ধ্যানসিদ্ধ সাহিত্যবিশেস্নষকের উচ্চারণঃ
‘প্রত্যেক সভ্যজাতির মধ্যেই সাহিত্য সংস্কৃতির দুইটি ধারা আছে-একটি লৌকিক আর একটি শিৰাগত৷ ইহাদের মধ্যে আদান-প্রদান চলিতে থাকে৷ (১)
বস্তুতঃ
ঋড়ষশ সধঃবত্‍রধ রং নবরহম ধনংড়ত্‍নবফ নু ঢ়ড়বঃং ধহফ ধত্‍ঃরংঃং (২)
এমন সত্যানুসরণে আধুনিক যুগে জন্মে আধুনিক শিৰাদীৰাপ্রাপ্ত হয়েও জসীমউদ্দীন লোকসাহিত্যের আকর্ষণে লোককাব্যের ভান্ডার থেকে রস সংগ্রহ করে, লোকজীবন নিয়ে কাব্য সাধনায় অগ্রসর হয়েছেন৷ (৩) আর তার এমন শৈল্পিক আয়োজন সম্পর্কে স্বয়ং কবীন্দ্র রবীন্দ্রনাথ উচ্চারণ করেছেনঃ
‘জসীমউদ্দীনের কবিতার ভাব, ভাষা ও রস সম্পূর্ণ নূতন ধরনের৷
প্রকৃত কবির হৃদয় এই লেখকের আছে৷ (৪)
চেক সাহিত্যসমালোচক উঁংধহ তনধাঃবষ জসীমউদ্দীনের কাব্যপ্রতিভার তিনটি উত্‍সের কথা উলেস্নখ করেছেনঃ
ক. বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ও মধ্যযুগের কাহিনী ও সঙ্গীতাশ্রয়ী বিচিত্র কাব্য ঐতিহ্য
খ. বাংলাদেশের গ্রাম্যসাহিত্য ও গ্রাম্যগানের ধারা
গ. জনসাধারণের প্রতি অপরিসীম দরদ যাকে সাহিত্যের ভাষায় বলা হয় ঢ়ড়বঃরপ যঁসধহরংস. (৫)
জসীমউদ্দীনের বাংলা সাহিত্যে পলস্নীরই প্রতিনিধিত্ব করেছেন৷ তার কবিতার আবহে স্বতঃস্ফূর্ততা৷ আনত্মরিকতা, স্পষ্টতা ও অকৃত্রিম সরলতা (ঁহংঃঁফরবফ ংরসঢ়ষরপরঃু) ঋদ্ধ হয়ে আছে৷ এ বিষয়ে তিনি স্কচ কবি জড়নবত্‍ঃ জঁত্‍হং এর সঙ্গে তুলনীয়৷ বস্তুতঃ পলস্নীবাংলার মাটিতেই তার শিল্প মনস্বিতার মূলটি প্রোথিত থেকে গেছে৷ (৬) তিনি পূর্ববাংলার প্রাণকেন্দ্র গ্রামগুলোর নিঝুম অনত্মঃপুরে আপনাকে স্থাপন করতে পেরেছিলেন৷ (৭) তার কাব্যশরীরে পলস্নীর রূপ সৌন্দর্যের অপরূপ মায়ালোকই সৃজিত হয়েছে৷ (৮) তিনি সুন্দরকে পলস্নীরাখালের হাসিতে গ্রাম্যবালিকার চঞ্চলগতি ভঙ্গিমায় কিংবা প্রকৃতির সনাতন প্রসাধনে সজ্জিত অবস্থায় প্রত্যৰ করেছেন (৯)

জসীমউদ্দীনের স্বকীয় সংলাপঃ
আমাকে সকলে পলস্নী কবি বলেন৷ আমি এজন্য নিজেকে ধন্য মনে করি৷ (১০)
২.
কবি জসীমউদ্দীনের আবির্ভাব ০১ জানুয়ারি ১৯০৩ খ্রিঃ এ ফরিদপুরের তাম্বুলখানা পলস্নীতে তার মামার বাড়িতে৷ তিরোভাব ১৪ মার্চ, ১৯৭৬ খ্রি এ ঢাকায়৷
বিশেষভাবে উলেস্নখ্য যে, কবির পিতা মৌলবী আনসারউদ্দীন ছিলেন স্বভাবজ কবিত্বশক্তির ধারক৷ তিনি ছিলেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি বিশেষভাবে অনুরাগী৷ গ্রামেরই স্কুল শিৰক ছিলেন তিনি৷ মাতা মোসাম্মাত্‍ আমিনা খাতুন ছিলেন সরল স্নেহদাতা৷ তার পলস্নীসৌন্দর্যময় মাতৃহৃদয়ের স্নেহধারায় নিষিক্ত হয়েই জসীমউদ্দীনের কবিপ্রাণ প্রতিভাপ্রদীপ্ত হয়ে উঠেছিলো৷ (১১)
জসীমউদ্দীনের প্রাথমিক শিৰার হাতে খড়ি পাশর্্ববতর্ী গ্রাম শোভারামপুরের অম্বিকা মাস্টারের পাঠশালায়৷ কিন্তু সাঁকো পারাপারের জন্য তার পিতা তাকে নিজের প্রতিষ্ঠা করা ফরিদপুর হিতৈষী এম ই স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন৷ তৃতীয় শ্রেণীতে উঠলে এসডিও বিশ্বেকর ভট্টাচার্যের ছেলে মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের সঙ্গে জসীমউদ্দীনের বন্ধুত্ব গড়ে উঠে৷ মনোরঞ্জনের বাড়িতে শিশুতোষ গ্রন্থের সংখ্যা কম ছিলো না৷ জসীমউদ্দীনের বই পড়ার সখ তখন থেকেই উপ্ত হয়৷ তার শিল্পীসত্তার উন্মেষ ও বিকাশে এ সময়টি গুরম্নত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলো৷ (১২)
নিকটতম আত্মীয় অন্ধ চাচা দানু মোলস্নার কেচ্ছা, শেস্নাক, রূপকথা, গ্রাম্যগান ইত্যাদি শুনে শুনেও শিশু জসীমউদ্দীনের প্রাণ পলস্নীকৃষ্টিসমৃদ্ধ হয়েছিলো৷ (১৩)
ফরিদপুর হিতৈষী স্কুলে চতুর্থ শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হলে জসীমউদ্দীনের পিতা তাকে ফরিদপুর জিলা স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন৷ এই সময় তিনি ও তার বন্ধু ধীরেন্দ্র মিলিত হয়ে ঊষা নামক একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করার সিদ্ধানত্ম নেন৷ পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় জসীমউদ্দীনের নায়ের মাঝি সম্পর্কিত এই কবিতাটি স্থান পায়৷
নায়ের মাঝি নায়ের মাঝি
এখনো কেন শুয়ে?
বেয়ে চল তোর না খানি ভাই
পাল তুলিয়া দিয়ে৷ (১৪)
জসীমউদ্দীন যখন নবম শ্রেণীর ছাত্র, তখন অসহযোগ আন্দোলন উন্মাতাল হয়ে ওঠে মাতৃভূমি৷ স্কুল ছেড়ে তিনি কলকাতায় পাড়ি জমান৷ এই সময়ে তিনি ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’র সম্পাদক মোজাম্মেল হক (জন্ম ১৮৮৩ খ্রিঃ-মৃতু্যঃ ১৯৭৬ খ্রি) এর সংস্পর্শে আসেন এবং তার পরামর্শে কবি নজরম্নলের সঙ্গে পরিচিত হন৷ কবির ব্যক্তিত্ব, স্নেহ আর মধুর ব্যবহার জসীম উদ্দীনের কবিসত্তাকে সঞ্জীবিত করে৷(১৫) ১৯২১ খ্রি. ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় তাঁর মিলনগান’ নামক একটি কবিতা প্রকাশিত হয়৷ উলেস্নখ্য, পত্রিকাটির একই সংখ্যায় নজরম্নলের জনমননন্দিত কবিতা ‘বিদ্রোহী’ও প্রকাশিত হয়৷(১৬)

১৯২১ খ্রি. এই জসীমউদ্দীন দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন৷ ১৯২৪ খি.-এ পাস করেন আই এ৷ বিশেষভাবে উলেস্নখ্য যে, ম্যাট্রিক পরীৰায় পাস করবার পূর্বেই তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘কবর’ কবিতাটি রচনা করেন৷ ‘কলেস্নাল’ পত্রিকার পিছনের দিকে ছোটো অৰরে প্রায় ছয়মাস পরে কবিতাটি প্রকাশিত হয়৷(১৭) মহাত্মা দীনেশচন্দ্র সেন কবিতাটি পাঠ ক’রে বিমুগ্ধ হন৷

প্রায় এক মাস পরে ডক্টর দীনেশচন্দ্র ‘ফরওয়ার্ড’ পত্রিকার ‘তিলক’ সংখ্যায় ‘কবর’ কবিতার প্রশংসা ক’রে অহ ুড়ঁহম গড়যধসবফধহ ঢ়ড়বঃ নামে জসীমউদ্দীন-সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ লেখেন তিনি এ প্রবন্ধে নজরম্নলের কবি-কৃতিত্বের পর মুসলমান কবিদের মধ্যে জসীমউদ্দীনের স্থানই নির্দেশ করেন৷(১৮) উলেস্নখ্য, জসীমউদ্দীন যখন বিএ ক্লাসের ছাত্র, তখনই দীনেশচন্দ্র সেন ‘কবর’ কবিতাটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাট্রিক সিলেকশনে পাঠ্য করেন৷

জসীমউদ্দীনের ছাত্রাবস্থায় ১৯২৭ খ্রি-এ ‘রাখালী’ কাব্য প্রকাশিত হয়৷ ১৯২৯ খ্রি-এ তিনি বি.এ. পাস করেন ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে৷ ১৯৩১ খ্রি-এ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ পাস করার পর ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেনের অধীনে ‘রামতনু লাহিড়ী গবেষক’ হিসেবে নিযুক্ত পান৷ ১৯৩৮ খ্রি. অব্দি তিনি এই পদে বহাল ছিলেন৷(১৯)
আমরা অনুধাবন করতে পারি- ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেনই জসীমউদ্দীনের কবিসত্তার বিকাশে প্রধান সহায়কের ভূমিকা পালন করেন পরম যত্নে৷(২০)
দীনেশচন্দ্রের ব্যাকুল উচ্চারণঃ
‘তাঁর কবিতা আমার কাছে শেলী, কীটস, বায়রণ এমনকি
ওয়ার্ডসওযার্থের কবিতার চেয়েও ভালো লাগে৷ঃ তাঁর কবিতায়
ঃ ঃ আম-কাঁঠালের ছায়ায় ঘেরা সেই পলস্নীমায়ের শীতল
স্পর্শ পাই৷ মায়ের চেয়ে আপন বলতে আমি আর
কাউকে জানিনে৷ তার পদ্ম-শালুক ফোটা খালবিল, ভাটিয়ালী
গানে মুখর পদ্মা-যমুনা নদী, অতসী-অপরাজিতা, টগর-চামেলী
ফুলের সুবাস-ভরা আঙিনার কোল মায়ের এই অপরূপ
মূর্তি আমি পাই জসীমের কবিতায়৷(২১)

৩.
পলস্নীপ্রাণ কবি জসীমউদ্দীন সর্বমোট ২০ খানি কাব্যগ্রন্থের রচয়িতা৷ সেগুলি হলোঃ
রাখালী (১৯২৭ খ্রি.), নক্সী কাঁথার মাঠ (১৯২৯ খ্রি.), বালুচর (১৯৩০ খ্রি.), ধানৰেত (১৯৩২ খ্রি.), সোজনবাদিয়ার ঘাট (১৯৩৩ খ্রি.), রঙিলা নায়ের মাঝি (১৯৩৫ খ্রি.), হাসু (১৯৩৮ খ্রি.), রূপবতর্ী (১৯৪৬ খ্রি.), এক পয়সার বাঁশী (১৯৪৯ খ্রি.), পদ্মাপার (১৯৫০ খ্রি.), মাটির কান্না (১৯৫১ খ্রি.), গাঙের পার (১৯৫৪ খ্রি.), সকিনা (১৯৫৯ খ্রি.), সুচয়নী (১৯৬১ খ্রি.), মা যে জননী কান্দে (১৯৬৩ খ্রি.), হলুদবরণী (১৯৬৬ খ্রি.), জলের লেখন (১৯৬৯ খ্রি.), পদ্মানদীর দেশে (রিয়াজ আনোয়ার রচিত উদর্ুকাব্য ‘আওয়াজো কা তাঁওয়ার’-এর বঙ্গানুবাদ-১৯৬৯ খ্রি.), ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে (১৯৭২ খ্রি.) ও মাগো জ্বালিয়ে রাখিস আলো (১৯৭৬ খ্রি.)৷ উলেস্নখ্য, প্রায় সকল কাব্যেরই ছন্দায়তনে পলস্নীবাংলার রূপ রূপমা, শ্যামলিম ঐশ্বর্য প্রাণসঞ্জীবনী প্রভা, পলস্নীমানব মানবীর দৈনন্দিন জীবনায়োজন, ঐহিক তৃষ্ণাবাহার- প্রীতিসমুজ্জ্বল চিত্রকল্পনা সদ্ধৃত হয়ে আছে বর্ণনাধারায় তা সুবিন্যসত্ম হোক প্রামাণ্য বিভায়ঃ
ক. ওই দূর বনে সন্ধ্যা নামিছে ঘন আবীরের রাগে৷
(‘কবর’, রাখালী)
খ. সন্ধ্যার পরে দাবায় বসিয়া রূপাই বাজায় বাঁশী,
মহাশূন্যের পথে সে ভাসায় শূন্যের সুররাশি!
(‘নক্সী কাঁথার মাঠ’)
গ. শীতের তাপসী কারে বা স্মরিছে আভরণ গার খুলি?
(‘কাল সে আসিবে’, বালুচর)
ঘ. তপস্যা-রত জল-ভরা মেঘ গগনে ঘোরে,
(‘কল্যাণী’, রূপবতী)
ঙ. শেষ রাত্রের পান্ডুর চাঁদ নামিছে চক্রপলে
রজনীগন্ধা রূপসীর আঁখি জড়াইছে ঘুমজালে৷
(‘রজনীগন্ধার বিদায়’, মাটির কান্না)
এসব ছন্দিত পঙ্ক্তিতে পলস্নীবাংলার রূপশ্রীর সত্যায়িত বর্ণায়োজনই বিধৃত৷ ষড়ঋতুর পরিক্রমায় পলস্নীবাংলা বিচিত্র শৈলীতে রূপমণ্ডিত হয়৷ কবির দৃষ্টিনন্দনায় তা সমুদ্ভাসিত৷
লোকজ বাকভঙ্গি অনুসরণে জসীমউদ্্দীনের কৃতিত্ব অবিসংবাদিত৷ পলস্নী মানব-মানবীর দৈনন্দিন প্রতিকৃতি- প্রীতিময় দিনযাপনা-আনুপূর্বিক সবুজ সৌন্দর্যময় জীবন সুঘ্রাণ জসীমউদ্্দীনের কাব্যায়তনে সঞ্চয়িত৷ সুরসম্পৃক্ত কথামালা উচ্চারণ করা যাক:
ক. রাখালভাবে কলসখানি না থাকলে তার সরম্ন কাঁখে
রূপের ভারেই হয়তো বালা পড়ত ভেঙে পথের বাঁকে৷
(রাখালী)
খ. সেথায় আছে ছোট্ট কুটির সোনার পাতায় ছাওয়া,
সাঁঝ আকাশের ছড়িয়ে পড়া আবির রঙে নাওয়া৷
(‘রাখাল ছেলে’, রাখালী)
গ. নতুন চাষা ও নতুন চাষাণী পাতিল নতুন ঘর
বাবুই পাখিরা নীড় বাঁধে যথা তালের গাছের পর৷
(‘নকসি কাঁথার মাঠ’)
ঘ. কৃষাণী কি বসি সাঁঝের বেলায়
মিহি চাল ঝাড়ে মেঘের কুলায়
ফাগের মতন কুঁড়া উড়ে যায়
আলোক ধারেঃ.
(‘উড়ানীর চর’, বালুচর)
পলস্নীর বিশ্বসত্ম ছবির আবহ-সৃষ্টির নৈপুণ্য কবি জসীমউদ্্দীনের স্বভাবজ৷ মমতাপুণ্যের গরিমায় তাঁর হৃদয়পুর ছিলো পরিপূর্ণ৷ সে কারণেই তিনি গ্রাম্যশব্দের ‘চুমকি’ বসাতে হয়েছিলেন দ্বিধাহীন৷ (২২) উদ্ধৃত হোক ছন্দিত কথামালা:
ক. রাখিও ‘ঢঁ্যাপের মোয়া’ বেঁধে তুমি সাতনরি শিকা ভরে
খেজুড়ে গুড়ের নয়া পাটালিতে ‘হুড়ুমের কোলা ভরে৷’ (‘পলস্নীজননী’, রাখালী)
খ. দশ ‘খান্দা’ জমি রূপার, তিনটা গরম্ন হালে,
ধানের ‘বেড়ী’ ঠেকে তাহার বড় ঘরের চালে৷
(‘নকসী কাঁথার মাঠ’)
গ. শেয়াল চলে শ্বশুরবাড়ী ‘খালুই’ মাথায় দিয়ে৷
(‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’)
পলস্নীবাংলার মানব-মানবীর জীবনযাত্রার ছবি অঙ্কনে নিরেট পলস্নীবাসী কবি-গীতিকারদের আঞ্চলিক শব্দ, বাক্যাংশ তথা ভাবসম্পদকেও জসীমউদ্্দীন আত্ম:স্থ করেছেন৷ কিছু উদ্ধৃতি:
ক. ভাটির দ্যাশের কাজলমায়ায়
পরাণডা মোর কাইন্দা বেড়ায় রে৷
(‘রঙিলা নায়ের মাঝি’)
খ. ও বাবু সেলাম বারে বারে
আমার নাম গয়া বাইদ্যা বাবু
বাড়ী পদ্মাপার৷
(‘পদ্মাপার’)
পলস্নীবাংলার মানব-মানবীর অধ্যাত্ম্য সাধনা সম্পর্কিত ভাবমূর্তিকেও জসীমউদ্্দীন ছন্দমণ্ডিত করেছেন৷ আরবী-ফাসর্ী শব্দ সহযোগে তিনি জীবন বাসত্মবতার ভূষণকেই সমুজ্জ্বল করেছেন৷
উদ্ধৃত হোক কিছু পঙ্ক্তি:
ক. মজিদ হইতে আজান হাঁকিছে বড় সকরম্নণ সুর,
মোর জীবনের রোজ কেয়ামত ভাবিতেছি কতদূর!
(‘কবর’, রাখালী)
খ. সামনে লইয়া কোরান শরীফ সুরে-ফাতেহার চরণ পড়ি
সারে জাহানের ক্রন্দনে যে চোখ দুটো্ তার আসিছে ভরি৷
(‘সোজনবাদিয়ার ঘাট’)
জসীমউদ্্দীন কুশলী শব্দশিল্পী৷ পলস্নী সংবেদ্য অনুভবের সন্দীপনা তার শব্দচয়ন প্রক্রিয়ায় সুস্থিত৷
অলংকৃত কিছু পঙক্তি উচ্চারিত হোক:
ক. গাঙের জল ছল্্ ছল্্ বাহুর বাঁধন সে কি মানে?
(‘রাখালী’)
খ. বাহিরিতে নাচে জোনাকী আলোর থম্্থম্ কাল-রাত৷
(‘পলস্নীজননী’, রাখালী)
গ. আম-কাঁঠালের পিঁড়িখানি ভরি সরম্ন সরম্ন করে লতাফুল আঁকা,
(‘সোজনবাদিয়ার ঘাট’)
অনুপ্রাস অলঙ্কারের যথার্থ ব্যবহারে জসীমউদ্্দীন পলস্নীবাংলার রূপমাধুর্যের আল্পনা অঙ্কন করেছেন৷ যেমন:
ক. কলমীফুলের নোলক দেব, হিজল ফুলের দেব মালাঃ.
(‘রাখালী’)
খ. বধুর কোলেতে বধূয়া ঘুমায় খোলে না বাহুর বাঁধ৷
(‘তরম্নণ কিশোর’, রাখালী)
পলস্নীর মনোমোহন দৃশ্যপট বর্ণনায় জসীমউদ্দীন ধ্বনু্যক্তি-অলঙ্কারেরও ব্যবহার করেছেন সুকৌশলে৷ যেমনঃ
ক. তেপানত্মরের মাঠেরে ভাই, রোদ ঝিম ঝিম করে
(এক পয়সার বাঁশী)
খ. আরও দূরে সোঁ সোঁ নদী, মধ্যে বালুচর৷ (‘সকিনা’)
উপমা-অলঙ্কারকেও পলস্নীর রূপ-চিত্রণে ব্যবহার করেছেন জসীমউদ্দীন৷ উদ্ধৃতিঃ
ক. কাঁচা ধানের পাতার মতো কচিমুখের মায়া
(‘নকসী কাঁথার মাঠ’)
খ. জালি লাউয়ের ডগার মতো বাহু দু’খান সরম্ন
(‘নকসী কাঁথার মাঠ’)
সমাসোক্তির ব্যবহারে জসীমউদ্দীন সার্থক৷ পলস্নীর রূপ বর্ণনায় তিনি এ অলঙ্কারের ব্যবহার দেখিয়েছেন এমনি ছন্দ সহযোগেঃ
ক. সরষে ফুলের পাঁপড়ি নাড়ি ডাকছে মোরে তাই
(‘রাখাল ছেলে’, রাখালী)
খ. হেমনত্মের চাঁদ অর্ধেক হেলি জ্যোত্‍স্নার জাল পাতি
(‘নকসী কাঁথার মাঠ’)
পলস্নীর শ্রীদীপ্তি চিরনত্মনী স্বরূপ্য লাভ করেছে জসীমউদ্দীনের অপহৃূতি-অলঙ্কারের ব্যবহারশৈলীতে৷ উদাহরণঃ
মেয়ে ত নয়, হলদে পাখীর ছা
(‘নকসী কাঁথার মাঠ’)
পলস্নীর সবুজ-সংস্থিতির বর্ণনাতে স্বভাবোক্তি অলঙ্কারের বিশুদ্ধ প্রয়োগ ঘটিয়েছেন জসীমউদ্দীন৷ যেমনঃ
ক. এই এক গাঁও৷ ওই এক গাঁও-মধ্যে ধূ ধূ মাঠ
ধান-কাউনের লিখন লিখি করছে নিতুই পাঠ৷ (‘নকসী কাঁথার মাঠ’)
খ. ছোট গেঁয়ো নদী, দুই ধারে লিখি নতুন ধানের লেখা (‘বিদায়, বালুচর)
গ. জাগে বনপথে কাননকুমারী ফুলের কৌটা খুলি
(‘আজি পুষ্পের জনমের তিথি’, ধানৰেত)

বিশেষ দৃকপাত্‍
দ্বিধাহীন সংলাপঃ ছন্দ-স্রোত তথা ছন্দ-বিনোদন কবি জসীমউদ্দীনের মত্তাসৌকর্যের নামানত্মর৷ পলস্নীর শ্যামলিম রূপ-মাধুর্য পলস্নী মানব-মানবীর আত্যনত্মিক প্রাণভূষণ, তাদের অনুভবকানত্মি- সকল কিছুরই বিশ্বসত্ম চিত্রার্পিত জসীমউদ্দীনের কাব্যকলায় সংন্যসত্ম হয়েছে৷ তা যে আধুনিক আর্থদলনীক্লিষ্টতা, অস্থির-অব্যবস্থা সমাজক্লিন্নতা-বিদূরণের যত্নময় মাধ্যম, তা বোধ করতে অসুবিধে হয় না৷ জসীমউদ্দীনের কাব্য পলস্নীবাংলার সাত্ব ও শাশ্বত প্রাণ-প্রণোদনারই সংবাহিকাশক্তির অমৃত-অাঁধার৷

তথ্যসূত্রঃ
১. ডক্টর আশুতোষ ভট্টাচার্য, বাংলার লোকসাহিত্যঃ সংজ্ঞা ও প্রকৃতি, প্রথম সংস্করণ; কলিকাতাঃ ক্যালকাটা বুক হাউস, ১৯৫৪ খ্রিঃ পৃঃ ২৬৷
২. অ. ঐ. কত্‍ধঢ়ঢ়ব, ঝউঋগখ, চ-৪০৪ পুনঃউদ্ধৃতঃ সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায়, জসীমউদ্দীন, ঢাকাঃ সিটি লাইব্রেরী, ১৯৭৩ খ্রিঃ পৃঃ ৭৷
৩. সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায়, পূর্বোক্ত৷
৪. নকসী কাঁথার মাঠ সম্পর্কে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৌহিত্র মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের লিখিত রবীন্দ্রনাথের পত্র থেকে উদ্ধৃত৷ জসীমউদ্দীন, যাদের দেখেছি, ঢাকাঃ প্রেসিডেন্সী লাইব্রেরী, ১৯৫২ খ্রিঃ পৃঃ ৮৪৷ জসীমউদ্দীন, ঠাকুরবাড়ীর আঙিনায়, পঞ্চম সংস্করণ, ঢাকাঃ পলাশ প্রকাশনী, ১৯৭৮ খ্রিঃ পৃঃ ৭৷ পুনঃ উদ্ধৃতঃ সেলিমা খালেক, জসীমউদ্দীনের কবিতাঃ অলঙ্কার ও চিত্রকল্প, প্রথম প্রকাশ, ঢাকাঃ বাংলা একাডেমী, ১৯৯৩ খ্রিঃ পৃঃ ১২৷
৫. উঁংধহ তনধরত্‍ঃবষ, সোজন বাদিয়ার ঘাট (৭ম সংস্করণ, ১৯৬০ খ্রিঃ) কাব্যের পরিশিষ্টে সংযোজিত জসীমউদ্দীনের কবি-প্রতিভা সম্পর্কিত বক্তব্য দ্রষ্টব্য, পৃঃ ১৫০-৫২৷ পুনঃউদ্ধৃতঃ সেলিমা খালেক, পূর্বোক্ত, পৃঃ ১৮-১৯৷
৬. সুনীল, পূর্বোক্ত, পৃঃ ৫৩২৷
৭. মুহম্মদ আব্দুল হাই, কবি জসীমউদ্দীন, ভাষা ও সাহিত্য, ৪৩, ঢাকাঃ বেঙ্গল পাবলিশার্স, ১৩৬৬, বঙ্গাব্দ, পৃঃ ২১৬-১৭৷
৮. মুসত্মাফা নূরউল ইসলাম, ‘জসীমউদ্দীন ও তার কবিতা-একটি ভূমিকা’, মুসলিম বাংলা সাহিত্য, দ্বিতীয় সংস্করণ; ঢাকাঃ পাকিসত্মান বুক কর্পোরেশন, ১৯৬৯ খ্রিঃ পৃঃ ১৫১৷
৯. সুনীল, পূর্বোক্ত, পৃঃ ৫৩১৷
১০. কবি জসীমউদ্দীনের পত্র, সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায়, স্মৃতিকথা, ঢাকা ডাইজেস্ট, ৫ম বর্ষ, ৩য় সংখ্যা, জুন, ১৯৭৭ খ্রিঃ পৃৃঃ ৭১৷
১১. সুনীল, পূর্বোক্ত, পৃঃ ৫৩৩৷
১২. জসীমউদ্দীন, জীবনকথা (১ম খণ্ড), তৃতীয় মুদ্রণ; ঢাকাঃ পলাশ প্রকাশনী, ১৯৭৬ খ্রিঃ পৃঃ ৪৯-৫০৷
১৩. জসীমউদ্দীন, পূর্বোক্ত, পৃঃ ৪৪৷
১৪. এম, ইয়াসিন, ‘কবি জসীমউদ্দীন’৷ গ্রামের কথা (বিজয় সংখ্যা, ২য় বর্ষ, ১৬শ’ ও ১৭শ’ সংখ্যা, মুন্সীগঞ্জ, ঢাকা, ১লা ফেব্রম্নয়ারি, ১৯৬৫ খ্রিঃ পৃঃ ৮৷ পুনঃউদ্ধৃতঃ সেলিমা খালেক, পূর্বোক্ত, পৃঃ ৪৩৷
১৫. জসীমউদ্দীন, যাঁদের দেখেছি, পৃঃ ১৬-২০৷
১৬. জসীমউদ্দীন, ঐ, পৃঃ ২৪৷
১৭. এম, ইয়াসিন, পূর্বোক্ত, পৃঃ ১০৷
১৮. জসীমউদ্দীন, পূর্বোক্ত, পৃঃ ৭২৷
১৯. সেলিমা খালেক, পূর্বোক্ত, পৃঃ ৪৮৷
২০. জসীমউদ্দীন, পূর্বোক্ত৷
২১. জসীমউদ্দীন, স্মরণের স্মৃতিবাহি, প্রথম প্রকাশ; ঢাকাঃ পলাশ প্রকাশনী, ১৯৭৮ খ্রিঃ পৃঃ ৫১৷


পালের নাও || জসীম উদ্দিন


পালের নাও, পালের নাও, পান খেয়ে যাও -
ঘরে আছে ছোট বোনটি তারে নিয়ে যাও।
কপিল-সারি গাইয়ের দুধ যেয়ো পান করে'
কৌটা ভরি সিঁদুর দেব কপালটি ভরে'!
গুয়ার গায়ে ফুল চন্দন দেব ঘসে' ঘসে',
মামা-বাড়ীর বলব কথা শুনো বসে বসে!

কে যাওরে পাল ভরে' কোন্ দেশে ঘর
পাছা নায়ে বসে আছে কোন্ সওদাগর?
কোন্ দেশে কোন্ গাঁয়ে হিরে ফুল ঝরে।
কোন্ দেশে হিরামন পাখী বাস করে!
কোন্ দেশে রাজ-কনে খালি ঘুম যায়,
ঘুম যায় আর হাসে হিম্-সিম্ বায়।
সেই দেশে যাব আমি কিছু নাহি চাই,
ছোট মোর বোনটিরে যদি সাথে পাই!

পালের নাও, পালের নাও, পান খেয়ে যাও,
তোমার যে পাল নাচে ফুলঝুরি বাও।
তোমার যে না'র ছই আবের ঢাকনী
ঝলমল জ্বলিতেছে সোনার বাঁধনী।
সোনার না বাঁধন্ রে তার গোড়ে গোড়ে
হিরামন পঙ্খীর লাল পাখা ওড়ে।
তারপর ওড়েরে ঝালরের ছাতি,
ঝলমল জলে জ্বলে রতনের বাতি।
এই নাও বেয়ে যায় কোন্ সদাগর,
কয়ে যাও - কয়ে যাও কোন্ দেশে ঘর?

পালের নাও, পালের নাও, পান খেয়ে যাও,
ঘরে আছে ছোট বোন্ তারে নিয়ে যাও, -
চেনা গাঙে সাত ধার করে গলাগলি,
সেথা বাস কেহেলার - লোকে গেছে বলি।
পারাপার দুই নদী - মাঝে বালুচর
সেইখানে বাস করে চাঁদ সওদাগর।

এ পারে ধুতুমের বাসা ও পারেতে টিয়া -
সেখানেতে যেও না রে নাও খানি নিয়া।
ভাইটাল গাঙ্ দোলে ভাটা গেঁয়ো সোতে,
হবে নারে নাও বাওয়া সেথা কোন মতে।


পালের নাও ।। জসীম উদ্দিন


পালের নাও, পালের নাও, পান খেয়ে যাও---
ঘরে আছে ছোট বোনটি তারে নিয়ে যাও |
কপিল-সারি গাইয়ের দুধ যেয়ো পান করে'
কৌটা ভরি সিঁদুর দেব কপালটি ভরে'!
গুয়ার গায়ে ফুল চন্দন দেব ঘসে' ঘসে',
মামা-বাড়ীর বলব কথা শুনো বসে বসে!


পুতা লইয়া যাও :: জসীমউদ্দীন


হাটে একটি প্রকাণ্ড বোয়াল মাছ উঠিয়াছে। এক ফকীর ভাবিল, এই বোয়াল মাছটার পেটি দিয়া যদি চারটি ভাত খাইতে পারিতাম! সে মাছের দোকানের কাছে দাঁড়াইয়া রহিল। একজন চাষী আসিয়া মাছটি কিনিয়া লইল। মুসাফির তাহার পিছে পিছে যাইতে লাগিল। লোকটি যখন বাড়ির ধারে আসিয়াছে তখন মুসাফির তাহার নিকটে যাইয়া বলিল, ‘সাহেব! আমি মুসাফির লোক। ভিক্ষা করিয়া খাই। কোনোদিন ভালো খাওয়া হয় না। আজ হাটে যাইয়া যখন ঐ বড় মাছটি দেখিলাম, মনে বড় ইচ্ছা হইল এই মাছটির পেটি দিয়া যদি চারটি ভাত খাইতে পারিতাম! তাই আপনার পিছে পিছে আসিয়াছি। দয়া করিয়া যদি আমার মনের ইচ্ছা পূরণ করেন বড়ই সুখী হইব।’


সোনার বরণী কন্যা by জসীম উদ্দিন


সোনার বরণী কন্যা সাজে নানা রঙ্গে,
কালো মেঘ যেন সাজিলরে।
সিনান করিতে কন্যা হেলে দুলে যায়,
নদীর ঘাটেতে এসে ইতি উতি চায়।
বাতাসে উড়িছে শাড়ী, ঘুরাইয়া চোখ,
শাসাইল তারে করি কৃত্রিম রোখ।


পূর্ণিমা by জসীম উদ্দিন


পূর্নিমাদের আবাস ছিল টেপাখোলার গাঁয়,
একধারে তার পদ্মনদী কলকলিয়ে যায়।
তিনধারেতে উধাও হাওয়া দুলতো মাঠের কোলে,
তৃণফুলের গন্ধে কভু পড়তো ঢলে ঢলে।
সেখান দিয়ে পুর্ণিমারা ফিরতো খেলে নিতি,
বাঁকাপথে বাজতো তাদের মুখর পায়ের গীতি।


মা ও খোকন by জসীম উদ্দিন


মা বলিছে, খোকন আমার! যাদু আমার মানিক আমার!
উদয়তারা খোকন আমার! ঝিলিক মিলিক সাগর-ফেনার!
ফিনকি হাসি ক্ষণিকজ্বলা বিজলী-মালার খোকন আমার!
খোকন আমার দুলকি হাসি, ফুলকি হাসি জোছনা ধারার।
তোমায় আমি দোলার উপর দুলিয়ে দিয়ে যাই যে দুলে, -
যাই যে দুলে, সকল ভুলে, রাঙা মেঘের পালটি তুলে,
দেই তোমারে দোলায় দুলে।


রাতের পরী by জসীম উদ্দিন


রাতের বেলায় আসে যে রাতের পরী,
রজনীগন্ধা ফুলের গন্ধে সকল বাতাস ভরি।
চরণের ঘায়ে রাতের প্রদীপ নিভিয়া নিভিয়া যায়,
হাসপাতালের ঘর ভরিয়াছে চাঁদিমার জোছনায়।
মানস সরের তীর হতে যেন ধবল বলাকা আসে,
ধবল পাখায় ঘুম ভরে আনে ধবল ফুলের বাসে।


বাস্তু ত্যাগী by জসীম উদ্দিন


দেউলে দেউলে কাঁদিছে দেবতা পূজারীরে খোঁজ করি,
মন্দিরে আজ বাজেনাকো শাঁখ সন্ধ্যা-সকাল ভরি।
তুলসীতলা সে জঙ্গলে ভরা, সোনার প্রদীপ লয়ে,
রচে না প্রণাম গাঁয়ের রুপসী মঙ্গল কথা কয়ে।
হাজরাতলায় শেয়ালের বাসা, শেওড়া গাছের গোড়ে,
সিঁদুর মাখান, সেই স্থান আজি বুনো শুয়োরেরা কোড়ে।


বস্তীর মেয়ে by জসীম উদ্দিন


বস্তীর বোন, তোমারে আজিকে ছেড়ে চলে যেতে হবে,
যত দূরে যাব তোমাদের কথা চিরদিন মনে রবে।
মনে রবে, সেই ভ্যাঁপসা গন্ধ অন্ধ-গলির মাঝে,
আমার সে ছোট বোনটির দিন কাটিছে মলিন সাজে।
পেটভরা সে যে পায় না আহার, পরনে ছিন্নবাস,
দারুণ দৈন্য অভাবের মাঝে কাটে তার বারোমাস।


জলের কন্যা by জসীম উদ্দিন


জলের উপরে চলেছে জলের মেয়ে,
ভাঙিয়া টুটিয়া আছড়িয়া পড়ে ঢেউগুলি তটে যেয়ে।
জলের রঙের শাড়ীতে তাহার জড়ায়ে জড়ায়ে ঘুরি,
মাতাল বাতাস অঙ্গের ঘ্রাণ ফিরিছে করিয়া চুরি।
কাজলে মেখেছে নতুন চরের সবুজ ধানের কায়া,
নয়নে ভরেছে ফটিকজলের গহন গভীর মায়া।


এ লেডী উইথ এ ল্যাম্প by জসীম উদ্দিন


গভীর রাতের কালে,
কুহেলী আঁধার মূর্ছিত প্রায় জড়ায়ে ঘুমের জালে।
হাসপাতালের নিবিয়াছে বাহি; দমকা হাওয়ার ঘায়,
শত মুমূর্ষু রোগীর কাঁদন শিহরিছে বেদনায়।
কে তুমি চলেছ সাবধান পদে বয়স-বৃদ্ধা-নারী!
দুই পাশে তব রুগ্ন-ক্লিন্ন শুয়ে আছে সারি সারি।


অনুরোধ by জসীম উদ্দিন


ছিপ ছিপে তার পাতলা গঠন, রাঙা যে টুকটুক
সোনা রূপায় ঝলমল দেখলে তাহার মুখ।
সেই মেয়েটি বলল মোরে দিয়ে একখান খাতা,
সেই মেয়েটি বলল মোরে দিয়ে একখান খাতা,
লিখো কবি ইহার মাঝে যখন খুশী যা তা।


কবিতা by জসীম উদ্দিন


তাহারে কহিনু, সুন্দর মেয়ে! তোমারে কবিতা করি,
যদি কিছু লিখি ভুরু বাঁকাইয়া রবে না ত দোষ ধরি।”
সে কহিল মোরে, “কবিতা লিখিয়া তোমার হইবে নাম,
দেশে দেশে তব হবে সুখ্যাতি, আমি কিবা পাইলাম ?”
স্তব্ধ হইয়া বসিয়া রহিনু কি দিব জবাব আর,
সুখ্যাতি তরে যে লেখে কবিতা, কবিতা হয় না তার।


উপহার by জসীম উদ্দিন


ফুলদিয়ে গেলে মেয়ে!
এরে রাখিব কেমন ছলে,
এরে মালায় পরিলে জ্বালা
গলে শৃঙ্খল হযে দোলে।
এরে ধরিতে ছুঁইতে করে
এ যে, ভোরের শিশির ফোঁটা
এ যে, খনেক জীবন ধরে।


নির্বাচিত বিষয়গুলো দেখুন

কবিতা ছোটগল্প গল্প নিবন্ধ ছড়া টিপস রম্য গল্প প্রেমের কবিতা ইসলামী সাহিত্য স্বাস্থ্য কথা কৌতুক কম্পিউটার টিপস জানা অজানা লাইফ স্ট্যাইল স্বাধীনতা স্থির চিত্র ইসলাম ফিচার শিশুতোষ গল্প কবি পরিচিতি প্রবন্ধ ইতিহাস চিত্র বিচিত্র প্রকৃতি বিজ্ঞান রম্য রচনা লিরিক ঐতিহ্য পাখি মুক্তিযুদ্ধ শরৎ শিশু সাহিত্য বর্ষা আলোচনা বিজ্ঞান ও কম্পিউটার বীরশ্রেষ্ঠ লেখক পরিচিতি স্বাস্থ টিপস উপন্যাস গাছপালা জীবনী ভিন্ন খবর হারানো ঐতিহ্য হাসতে নাকি জানেনা কেহ ছেলেবেলা ফল ফুল বিরহের কবিতা অনু গল্প প্রযুক্তি বিউটি টিপস ভ্রমণ মজার গণিত সংস্কৃতি সাক্ষাৎকার ঔষধ গবেষণা ডাউনলোড প্যারডী ফেসবুক মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য রম্য কবিতা সাধারণ জ্ঞান সাহিত্যিক পরিচিতি সায়েন্স ফিকশান স্বাধীনতার কবিতা স্বাধীনতার গল্প কৃষি তথ্য চতুর্দশপদী প্রেমের গল্প মোবাইল ফোন রুপকথার গল্প কাব্য ক্যারিয়ার গৌরব জীবনের গল্প ফটোসপ সবুজ সভ্যতা
অতনু বর্মণ অদ্বৈত মারুত অধ্যাপক গোলাম আযম অনন্ত জামান অনিন্দ্য বড়ুয়া অনুপ সাহা অনুপম দেব কানুনজ্ঞ অমিয় চক্রবর্তী অরুদ্ধ সকাল অর্ক অয়ন খান আ.শ.ম. বাবর আলী আইউব সৈয়দ আচার্য্য জগদীশচন্দ্র বসু আজমান আন্দালিব আতাউর রহমান কাবুল আতাউস সামাদ আতোয়ার রহমান আত্মভোলা (ছন্দ্রনাম) আদনান মুকিত আনিসা ফজলে লিসি আনিসুর রহমান আনিসুল হক আনোয়ারুল হক আন্জুমান আরা রিমা আবদুল ওহাব আজাদ আবদুল কুদ্দুস রানা আবদুল গাফফার চৌধুরী আবদুল মান্নান সৈয়দ আবদুল মাবুদ চৌধুরী আবদুল হাই শিকদার আবদুল হামিদ আবদুস শহীদ নাসিম আবিদ আনোয়ার আবু মকসুদ আবু সাইদ কামাল আবু সাঈদ জুবেরী আবু সালেহ আবুল কাইয়ুম আহম্মেদ আবুল মোমেন আবুল হাসান আবুল হায়াত আবুল হোসেন আবুল হোসেন খান আবেদীন জনী আব্দুল কাইয়ুম আব্দুল মান্নান সৈয়দ আব্দুল হালিম মিয়া আমানত উল্লাহ সোহান আমিনুল ইসলাম চৌধুরী আমিনুল ইসলাম মামুন আরিফুন নেছা সুখী আরিফুর রহমান খাদেম আল মাহমুদ আলম তালুকদার আশীফ এন্তাজ রবি আসমা আব্বাসী আসাদ চৌধুরী আসাদ সায়েম আসিফ মহিউদ্দীন আসিফুল হুদা আহমদ - উজ - জামান আহমদ বাসির আহমেদ আরিফ আহমেদ খালিদ আহমেদ রাজু আহমেদ রিয়াজ আহসান হাবিব আহসান হাবীব আহাম্মেদ খালিদ ইকবাল আজিজ ইকবাল খন্দকার ইব্রাহিম নোমান ইব্রাহীম মণ্ডল ইমদাদুল হক মিলন ইলিয়াস হোসেন ইশতিয়াক ইয়াসির মারুফ উত্তম মিত্র উত্তম সেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এ কে আজাদ এ টি এম শামসুজ্জামান এ.বি.এম. ইয়াকুব আলী সিদ্দিকী একরামুল হক শামীম একে আজাদ এনামুল হায়াত এনায়েত রসুল এম আহসাবন এম. মুহাম্মদ আব্দুল গাফফার এম. হারুন অর রশিদ এরশাদ মজুদার এরশাদ মজুমদার এস এম নাজমুল হক ইমন এস এম শহীদুল আলম এস. এম. মতিউল হাসান এসএম মেহেদী আকরাম ওমর আলী ওয়াসিফ -এ-খোদা ওয়াহিদ সুজন কবি গোলাম মোহাম্মদ কমিনী রায় কাজী আনিসুল হক কাজী আবুল কালাম সিদ্দীক কাজী নজরুল ইসলাম কাজী মোস্তাক গাউসুল হক শরীফ কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম কাপালিক কামরুল আলম সিদ্দিকী কামাল উদ্দিন রায়হান কার্তিক ঘোষ কায়কোবাদ (কাজেম আলী কোরেশী) কৃষ্ণকলি ইসলাম কে এম নাহিদ শাহরিয়ার কেজি মোস্তফা খন্দকার আলমগীর হোসেন খন্দকার মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ্ খান মুহাম্মদ মইনুদ্দীন খালেদ রাহী গাজী গিয়াস উদ্দিন গিরিশচন্দ সেন গিয়াস উদ্দিন রূপম গোলাম কিবরিয়া পিনু গোলাম নবী পান্না গোলাম মোস্তফা গোলাম মোহাম্মদ গোলাম সরোয়ার চন্দন চৌধুরী চৌধুরী ফেরদৌস ছালেহা খানম জুবিলী জ. রহমান জসিম মল্লিক জসীম উদ্দিন জহির উদ্দিন বাবর জহির রহমান জহির রায়হান জাওয়াদ তাজুয়ার মাহবুব জাকির আবু জাফর জাকির আহমেদ খান জাকিয়া সুলতানা জান্নাতুল করিম চৌধুরী জান্নাতুল ফেরদাউস সীমা জাফর আহমদ জাফর তালুকদার জাহাঙ্গীর আলম জাহান জাহাঙ্গীর ফিরোজ জাহিদ হোসাইন জাহিদুল গণি চৌধুরী জায়ান্ট কজওয়ে জিয়া রহমান জিল্লুর রহমান জীবনানন্দ দাশ জুবাইদা গুলশান আরা জুবায়ের হুসাইন জুলফিকার শাহাদাৎ জেড জাওহার জয়নাল আবেদীন বিল্লাল ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া ড. কাজী দীন মুহম্মদ ড. ফজলুল হক তুহিন ড. ফজলুল হক সৈকত ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ ড. মুহা. বিলাল হুসাইন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ড. রহমান হাবিব ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ডক্টর সন্দীপক মল্লিক ডা. দিদারুল আহসান ডা: সালাহ্উদ্দিন শরীফ তমিজ উদদীন লোদী তাজনীন মুন তানজিল রিমন তাপস রায় তামান্না শারমিন তারক চন্দ্র দাস তারাবাঈ তারেক রহমান তারেক হাসান তাসনুবা নূসরাত ন্যান্সী তাসলিমা আলম জেনী তাহমিনা মিলি তুষার কবির তৈমুর রেজা তৈয়ব খান তৌহিদুর রহমান দর্পণ কবীর দিলওয়ার হাসান দেলোয়ার হোসেন ধ্রুব এষ ধ্রুব নীল নঈম মাহমুদ নবাব আমিন নাইমুর রশিদ লিখন নাইয়াদ নাজমুন নাহার নাজমুল ইমন নাফিস ইফতেখার নাবিল নাসির আহমেদ নাসির উদ্দিন খান নাহার মনিকা নাহিদা ইয়াসমিন নুসরাত নিজাম কুতুবী নির্জন আহমেদ অরণ্য নির্মলেন্দু গুণ নিসরাত আক্তার সালমা নীল কাব্য নীলয় পাল নুরে জান্নাত নূর মোহাম্মদ শেখ নূর হোসনা নাইস নৌশিয়া নাজনীন পীরজাদা সৈয়দ শামীম শিরাজী পুলক হাসান পুষ্পকলি প্রাঞ্জল সেলিম প্রীতম সাহা সুদীপ ফকির আবদুল মালেক ফজল শাহাবুদ্দীন ফররুখ আহমদ ফাতিহা জামান অদ্রিকা ফারুক আহমেদ ফারুক নওয়াজ ফারুক হাসান ফাহিম আহমদ ফাহিম ইবনে সারওয়ার ফেরদৌসী মাহমুদ ফয়সাল বিন হাফিজ বাদশা মিন্টু বাবুল হোসেইন বিকাশ রায় বিন্দু এনায়েত বিপ্রদাশ বড়ুয়া বেগম মমতাজ জসীম উদ্দীন বেগম রোকেয়া বেলাল হোসাইন বোরহান উদ্দিন আহমদ ম. লিপ্স্কেরভ মঈনুল হোসেন মজিবুর রহমান মন্জু মতিউর রহমান মল্লিক মতিন বৈরাগী মধু মনসুর হেলাল মনিরা চৌধুরী মনিরুল হক ফিরোজ মরুভূমির জলদস্যু মর্জিনা আফসার রোজী মশিউর রহমান মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর মা আমার ভালোবাসা মাইকেল মধুসূদন দত্ত মাওলানা মুহাম্মাদ মাকসুদা আমীন মুনিয়া মাখরাজ খান মাগরিব বিন মোস্তফা মাজেদ মানসুর মুজাম্মিল মানিক দেবনাথ মামুন হোসাইন মারজান শাওয়াল রিজওয়ান মারুফ রায়হান মালিহা মালেক মাহমুদ মাসুদ আনোয়ার মাসুদ মাহমুদ মাসুদা সুলতানা রুমী মাসুম বিল্লাহ মাহফুজ উল্লাহ মাহফুজ খান মাহফুজুর রহমান আখন্দ মাহবুব আলম মাহবুব হাসান মাহবুব হাসানাত মাহবুবা চৌধুরী মাহবুবুল আলম কবীর মাহমুদা ডলি মাহমুদুল বাসার মাহমুদুল হাসান নিজামী মাহ্‌মুদুল হক ফয়েজ মায়ফুল জাহিন মিতা জাহান মু. নুরুল হাসান মুজিবুল হক কবীর মুন্সি আব্দুর রউফ মুফতি আবদুর রহমান মুরাদুল ইসলাম মুস্তাফিজ মামুন মুহম্মদ নূরুল হুদা মুহম্মদ শাহাদাত হোসেন মুহাম্মদ আনছারুল্লাহ হাসান মুহাম্মদ আবু নাসের মুহাম্মদ আমিনুল হক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল মুহাম্মদ মহিউদ্দিন মুহাম্মাদ হাবীবুল্লাহ মুহিউদ্দীন খান মেজবাহ উদ্দিন মেহনাজ বিনতে সিরাজ মেহেদি হাসান শিশির মো. আরিফুজ্জামান আরিফ মো: জামাল উদ্দিন মোঃ আহসান হাবিব মোঃ তাজুল ইসলাম সরকার মোঃ রাকিব হাসান মোঃ রাশেদুল কবির আজাদ মোঃ সাইফুদ্দিন মোমিন মেহেদী মোর্শেদা আক্তার মনি মোশাররফ মোশাররফ হোসেন খান মোশারেফ হোসেন পাটওয়ারী মোহসেনা জয়া মোহাম্মদ আল মাহী মোহাম্মদ জামাল উদ্দীন মোহাম্মদ নূরুল হক মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ্ মোহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ মোহাম্মদ সা'দাত আলী মোহাম্মদ সাদিক মোহাম্মদ হোসাইন মৌরী তানিয় যতীন্দ্র মোহন বাগচী রজনীকান্ত সেন রণক ইকরাম রফিক আজাদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রহমান মাসুদ রহিম রায়হান রহিমা আখতার কল্পনা রাখাল রাজিব রাজিবুল আলম রাজীব রাজু আলীম রাজু ইসলাম রানা হোসেন রিয়াজ চৌধুরী রিয়াদ রুমা মরিয়ম রেজা উদ্দিন স্টালিন রেজা পারভেজ রেজাউল হাসু রেহমান সিদ্দিক রোকনুজ্জামান খান রোকেয়া খাতুন রুবী শওকত হোসেন শওকত হোসেন লিটু শওগাত আলী সাগর শফিক আলম মেহেদী শরীফ আতিক-উজ-জামান শরীফ আবদুল গোফরান শরীফ নাজমুল শাইখুল হাদিস আল্লামা আজীজুল হক শামছুল হক রাসেল শামসুজ্জামান খান শামসুর রহমান শামস্ শামীম হাসনাইন শারমিন পড়শি শাহ আব্দুল হান্নান শাহ আলম শাহ আলম বাদশা শাহ আহমদ রেজা শাহ নেওয়াজ চৌধুরী শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ শাহজাহান কিবরিয়া শাহজাহান মোহাম্মদ শাহনাজ পারভীন শাহাদাত হোসাইন সাদিক শাহাবুদ্দীন আহমদ শাহাবুদ্দীন নাগরী শাহিন শাহিন রিজভি শিউল মনজুর শিরিন সুলতানা শিশিরার্দ্র মামুন শুভ অংকুর শেখ হাবিবুর রহমান সজীব সজীব আহমেদ সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত সাইদা সারমিন রুমা সাইফ আলি সাইফ চৌধুরী সাইফ মাহাদী সাইফুল করীম সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদূদী সাকিব হাসান সাজ্জাদুর রহমান সাজ্জাদ সানজানা রহমান সাবরিনা সিরাজী তিতির সামছুদ্দিন জেহাদ সামিয়া পপি সাযযাদ কাদির সারোয়ার সোহেন সালমা আক্তার চৌধুরী সালমা রহমান সালেহ আকরাম সালেহ আহমদ সালেহা সুলতানা সিকদার মনজিলুর রহমান সিমু নাসের সিরহানা হক সিরাজুল ইসলাম সিরাজুল ফরিদ সুকান্ত ভট্টাচার্য সুকুমার বড়ুয়া সুকুমার রায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সুফিয়া কামাল সুভাষ মুখোপাধ্যায় সুমন সোহরাব সুমনা হক সুমন্ত আসলাম সুমাইয়া সুহৃদ সরকার সৈয়দ আরিফুল ইসলাম সৈয়দ আলমগীর সৈয়দ আলী আহসান সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন সিরাজী সৈয়দ তানভীর আজম সৈয়দ মুজতবা আলী সৈয়দ সোহরাব হানিফ মাহমুদ হামিদুর রহমান হাসান আলীম হাসান ভূইয়া হাসান মাহবুব হাসান শরীফ হাসান শান্তনু হাসান হাফিজ হাসিনা মমতাজ হুমায়ূন আহমেদ হুমায়ূন কবীর ঢালী হেলাল মুহম্মদ আবু তাহের হেলাল হাফিজ হোসেন মাহমুদ হোসেন শওকত হ্নীলার বাঁধন

মাসের শীর্ষ পঠিত

 
রায়পুর তরুণ ও যুব ফোরাম

জোনাকী অনলাইন লাইব্রেরী - Jonaaki Online Library © ২০১১ || টেমপ্লেট তৈরি করেছেন জোনাকী টিম || ডিজাইন ও অনলাইন সম্পাদক জহির রহমান || জোনাকী সম্পর্কে পড়ুন || জোনাকীতে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ