ভূমিকা
খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্তর্ভুক্ত। মানব শরীরের বিকাশ, ক্ষয়রোধ ও পুষ্টি চাহিদা মেটানোর অত্যাবশকীয় উপাদান খাদ্য। পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে ইসলাম মানব জীবনের প্রতিটি দিকের জন্য প্রয়োজনীয় সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। কুরআন ও হাদীসে মানুষের খাদ্য গ্রহনের ক্ষেত্রে পরিমিত, স্বাস্থ্যকর, রুচিসম্মত হালাল ও পবিত্রতার উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, যা ইসলামের সামগ্রিক জীবনবিধানের একটি অপরিহার্য অংশ। বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও আধুনিকায়নের ফলে খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থায় নানা চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে, ফলে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ এখন সামাজিক ও জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনায় কিছু আইন ও নিয়মনীতি রয়েছে যা খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থার উপর গুরুত্ব দেয়। এর সাথে যদি ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে ফিকহী মূলনীতির আলোকে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব অনুধাবন করা হয়, তাহলে তা ব্যক্তি ও সমাজের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি ন্যায়বিচার, বিশ্বাসযোগ্যতা ও নৈতিকতার মতো ইসলামি মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে ইনশা-আল্লাহ!।
ফিকহী মূলনীতির আলোকে নিরাপদ খাদ্য:
যুগে যুগে ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞরা কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বিভিন্ন ফিকহী মূলনীতি গ্রহণ করেছেন এবং সেগুলোর আলোকে বিভিন্ন বিষয়ের সমাধান দিয়েছেন। নিম্নে তা নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থার নিরিখে বিশ্লেষণ করা হলো
· মূলনীতি এক : أصْلُ الشَّيءِ الإباحَة : (কোন বিষয়ের মূল অবস্থা হলো অনুমোদিত বা বৈধ)
ইসলামে কোন জিনিস হারাম করতে দলিলের প্রয়োজন পড়ে, কিন্তু হালাল হওয়ার জন্য কোন দলিল প্রয়োজন পড়ে না। কারণ প্রত্যেক জিনিসের মূল অবস্থাই হলো বৈধ। যদি কেউ কোন বস্তু হারাম করতে চায় সে ক্ষেত্রে তার হারাম হওয়ার পক্ষে দলিল উপস্থাপন করতে হবে।
যেমন আল্লাহ তায়া'লা কুরআনুল কারিমে বলেন,
هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُم مَّا فِي الْأَرْضِ جَمِيعً
জমিনে যা কিছু রয়েছে সবকিছু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। ( সুরা আল-বাকারাহ, ২৯)
আল্লাহ তায়া’লা আরো বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُحَرِّمُوا طَيِّبَاتِ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا ۚ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ
হে ঈমানদারগণ! তোমরা সেই পবিত্র বস্তুসমূহকে হারাম করো না, যা আল্লাহ তোমাদের জন্য হালাল করেছেন এবং সীমালঙ্ঘন কোরো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না। ( সুরা মায়েদা, ৮৭)
উক্ত আয়াতসমূহে বলা হয়েছে আল্লাহ তায়া'লা জমিনে যা কিছু সৃষ্টি করেছেন সবকিছু আমাদের জন্য। এই আয়াতের আলোকে আমাদের জন্য সকল বস্তু ব্যবহারযোগ্য ও সকল খাবার গ্রহণযোগ্য, যদি এর বিপক্ষে কোন দলিল না থাকে। যদি কোন বস্তু বা খাদ্য হারাম করা হয় তাহলে সেটা আমাদের জন্য নয়। হাদিস শরীফে এসেছে রাসূল ﷺ বলেছেন,
كَانَ أَهْلُ الْجَاهِلِيَّةِ يَأْكُلُونَ أَشْيَاءَ، وَيَتْرُكُونَ أَشْيَاءَ تَقَذُّرًا، فَبَعَثَ اللهُ تَعَالَى نَبِيَّهُ، وَأَنْزَلَ كِتَابَهُ، وَأَحَلَّ حَلَالَهُ، وَحَرَّمَ حَرَامَهُ، فَمَا أَحَلَّ فَهُوَ حَلَالٌ، وَمَا حَرَّمَ فَهُوَ حَرَامٌ، وَمَا سَكَتَ عَنْهُ فَهُوَ عَفْوٌ
জাহেলী যুগের লোকেরা কিছু জিনিস খেত এবং কিছু জিনিস ঘৃণাবশত পরিত্যাগ করত। এরপর আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে প্রেরণ করলেন এবং তাঁর কিতাব নাযিল করলেন। তিনি যা হালাল করেছেন, তা হালাল, এবং যা হারাম করেছেন, তা হারাম। আর যার ব্যাপারে তিনি নীরব থেকেছেন, তা ক্ষমার যোগ্য (অনুমোদিত)। (আবু দাউদ- ৩৮০০)
উক্ত মূলনীতির আলোকে সকল খাবার বৈধ, যদি স্পষ্টভাবে কুরআন এবং হাদিসে কোন খাবারের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আসে তাহলে তা অবৈধ। যেমনটা আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারিমে বলেন,
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنْزِيْرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللهِ بِهِ وَالْمُنْخَنِقَةُ وَالْمَوْقُوْذَةُ وَالْمُتَرَدِّيَةُ وَالنَّطِيْحَةُ وَمَا أَكَلَ السَّبُعُ إِلَّا مَا ذَكَّيْتُمْ وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ وَأَنْ تَسْتَقْسِمُوْا بِالْأَزْلَامِ ذٰلِكُمْ فِسْقٌ.
তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত জন্তু, রক্ত, শূকরের গোস্ত, আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে যবেহ করা পশু, গলা চিপে মারা যাওয়া জন্তু, প্রহারে মারা যাওয়া জন্তু, উপর থেকে পড়ে মারা যাওয়া জন্তু, অন্য প্রাণীর শিং এর আঘাতে মারা যাওয়া জন্তু এবং হিংস্র পশুতে খাওয়া জন্তু; তবে যা তোমরা যবেহ করতে পেরেছ তা ছাড়া, আর যা মূর্তি পূজার বেদীর উপর বলী দেয়া হয় তা এবং জুয়ার তীর দিয়ে ভাগ্য নির্ণয় করা, এসব পাপ কাজ। (সুরা মায়েদা- ৩)
যেহেতু আল্লাহ তায়ালা এ সকল খাবার হারাম করেছেন তাই এগুলো খাওয়া যাবে না, বিক্রিও করা যাবে না। মাছ ও মাছজাত পণ্য (পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০২০ এর ধারা ৪-৫ অনুসারে মাছ ও মাছজাত পণ্যের উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণে মান নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি পরিদর্শনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রকৃতিগতভাবে মাছ হালাল, পবিত্র, স্বাস্থ্যসম্মত; যদি না তাতে কোনো ভেজাল মিশ্রণ না হয়। তাই প্রকৃতিগতভাবে হালাল ও পবিত্র এ পণ্যের পবিত্রতা যেন রক্ষিত হয়, সে লক্ষ্যে এ আইন প্রণীত হয়েছে।
বাংলাদেশে হোটেল ও রেস্টুরেন্ট আইন ২০১৪ এর ধারা ১০ অনুসারে হোটেল ও রেস্টুরেন্টে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে খাদ্য প্রস্তুত, সংরক্ষণ ও পরিবেশন করতে হবে। খাদ্য প্রস্তুত ও পরিবেশনের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা ইসলামের তাহারাত নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্য আইন ২০১০ এর ধারা ৪-৫ অনুসারে মাছ ও প্রাণী খাদ্যের মান নির্ধারণ এবং পরীক্ষা নিরীক্ষা করে নিশ্চিত করতে হবে যে খাদ্য স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ। মাছ স্বভাবতই হালাল, হালাল প্রাণীর মাংসও স্বভাবতই হালাল, তাই এগুলো উৎপাদনে যেন কোনো ক্ষতিকর উপাদানের প্রয়োগ।
না হয়, তা নিশ্চিত করা ইসলামের নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি কুরআনের “হালাল ও তায়্যিব” নীতির সাথে সামঞ্জস্য। মহান আল্লাহ বলেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا
হে মানবজাতি! পৃথিবীর হালাল ও পবিত্র বস্তু ভক্ষণ কর। ( সুরা বাকারাহ, ১৬৮)
আইনের এই ধারা খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, যা ইসলামের “তায়্যিব” (স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ খাদ্য) নীতির বাস্তব প্রয়োগ।
বাংলাদেশ সরকার গৃহীত নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩-এর ধারা ৩০-৩২ দ্বারা খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে মান ও স্বাস্থ্যবিধি রক্ষার্থে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো খাদ্য উৎপাদন ও সংরক্ষণে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা। এটি ইসলামের পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
الطُّهُورُ شَطْرُ الْإِيمَانِ - পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক। ( সহীহ মুসলিম, ই.ফা. ২য় খন্ড, ৪২৫)
সর্বোপরি, খাদ্য উৎপাদনের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা ইসলামের তাহারাত নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
· মূলনীতি দুই : الضَّرُورَةُ تُبِيحُ الْمَحْظُورَاتِ (প্রয়োজন নিষিদ্ধ বিষয়কে বৈধ করে)
এই মূলনীতি ফিকহের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান। এটি দেখায় যে ইসলাম কষ্ট ও কঠোরতার ধর্ম নয়; বরং প্রয়োজনে নিষিদ্ধ বিষয়কেও সীমিত পরিসরে বৈধতা দেয়। তবে শর্ত হলো, তা শুধু চরম প্রয়োজনের জন্য হতে হবে এবং প্রয়োজন শেষ হলে স্বাভাবিক বিধান পুনরায় কার্যকর হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَمَا لَكُمْ أَلَّا تَأْكُلُوا مِمَّا ذُكِرَ اسْمُ اللَّهِ عَلَيْهِ وَقَدْ فَصَّلَ لَكُم مَّا حَرَّمَ عَلَيْكُمْ إِلَّا مَا اضْطُرِرْتُمْ إِلَيْهِ
আর তোমাদের কি হয়েছে যে, যাতে আল্লাহর নাম নেয়া হয়েছে তোমরা তা থেকে খাবে না? যা তোমাদের জন্য তিনি হারাম করেছেন তা তিনি বিশদভাবেই তোমাদের কাছে বিবৃত করেছেন, তবে তোমরা নিরুপায় হলে তা স্বতন্ত্র। (সুরা আনআম, ১১৯)
إِنَّمَا حَرَّمَ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمَ وَلَحْمَ الْخِنْزِيرِ وَمَا أُهِلَّ بِهِ لِغَيْرِ اللَّهِ فَمَنِ اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغٍ وَلَا عَادٍ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
“তিনি আল্লাহ তো কেবল তোমাদের উপর হারাম করেছেন মৃত জন্তু, রক্ত, শুকরের গোশত এবং যার উপর আল্লাহর নাম ছাড়া অন্যের নাম উচ্চারিত হয়েছে, কিন্তু যে নিরুপায় অথচ নাফরমান এবং সীমালঙ্ঘনকারী নয় তার কোনো পাপ হবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। ( সুরা বাকারাহ, ১৭৩)
فَمَنِ اضْطُرَّ فِي مَخْمَصَةٍ غَيْرَ مُتَجَانِفٍ لِّإِثْمٍ فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
অতঃপর কেউ পাপের দিকে না ঝুঁকে ক্ষুধার তাড়নায় বাধ্য হলে তবে নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
(সুরা মায়েদা, ৩)
এই আয়াতগুলোতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, যদি কেউ চরম প্রয়োজনের মুখোমুখি হয় (যেমন অনাহারে মৃত্যুর শঙ্কা থাকে), তাহলে সাধারণত নিষিদ্ধ বস্তু খাওয়ার অনুমতি রয়েছে। রাসূল ﷺ বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِأُمَّتِي عَنِ الْخَطَاءِ وَالنِّسْيَانِ وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ
নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের জন্য ভুল, বিস্মৃতি এবং যে বিষয়ে তাদের বাধ্য করা হয়েছে, তা ক্ষমা করে দিয়েছেন। ( ইবনু মাজাহ, ২০৪৫)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, কেউ যদি চরম প্রয়োজনের কারণে নিষিদ্ধ কোনো কাজে বাধ্য হয়, তবে তা ক্ষমাযোগ্য।
এ মূলনীতি অনুসারে হারাম খাদ্যও গ্রহণ করা যাবে যদি তা গ্রহণ করা ছাড়া অন্য কোন উপায় না থাকে। যেমন ঔষধের ক্ষেত্রে আমরা অনেক নেশা জাতীয় দ্রব্য মেশানোর কথা জানি তবুও আমাদের সুস্থতার জন্য আমাদের তা গ্রহণ করতে হয়। এছাড়াও কোন ব্যক্তি যদি এমন জায়গায় অবস্থান করেন যেখানে হালাল খাদ্য পাওয়া যায় না বা হালাল খাদ্য কিনার সামর্থ্য নেই সেক্ষেত্রেও প্রয়োজন অনুপাতে ক্ষুধা নিবারণের জন্য হারাম খাদ্য গ্রহণ করতে পারবে। ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৫ এর ধারা ৪ অনুসারে সরকারি অনুমতি বা লাইসেন্স ছাড়া ফরমালিন উৎপাদন, আমদানি বা সংরক্ষণ করা অপরাধ। এই ধারা ক্ষতিকর রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার প্রতিরোধ করে সমাজের কল্যাণ নিশ্চিত করে। ফরমালিন প্রকৃত অর্থে খাদ্যদ্রব্য বিবেচনায় ক্ষতিকর হলেও ঔষধসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এটির ব্যবহার মানবদেহের জন্য উপকারী। তাই এ আইনে এর নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিশ্চিত করনে লাইসেন্স ব্যতীত উৎপাদন, আমদানি ও সংরক্ষণ নিষিদ্ধ করেছে। এটি ফিকহী মূলনীতি ‘প্রয়োজনে হারাম তথা নিষিদ্ধ বস্তুও হালাল বিবেচনা’ রীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এছাড়াও ইসলামে সমাজের ক্ষতিকর কাজ প্রতিরোধের জন্য রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বৈধ হওয়ার রীতিও এখানে প্রয়োগযোগ্য।
কুরআনে ইরশাদ করা হয়েছে:
وَلَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ بَعْدَ إِصْلَاحِهَا - পৃথিবীতে সংশোধনের পর আবার অশান্তি সৃষ্টি করো না।
( সুরা আ’রাফ, ৫৬)
· মূলনীতি তিন : لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ (নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ো না, অপরকেও ক্ষতিগ্রস্ত করো না)
এটি একটি হাদিস তবে ফকিহগণ এটাকে ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা হিসাবে গ্রহণ করেছেন, যা মুসলিম সমাজে ন্যায়বিচার ও ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করার জন্য ব্যবহৃত হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَلَا تَقْتُلُوا أَنفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا
তোমরা নিজেদের হত্যা করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়ালু। (সুরা নিসা, ২৯)
وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ
নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না। ( সুরা বাকারাহ, ১৯৫)
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ
নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার ও সদাচার করার নির্দেশ দেন। ( সুরা আন-নাহল, ৯০)
হাদিস শরীফে এসেছে রাসূল ﷺ বলেছেন,
لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ - নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ো না, এবং অন্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করো না। ( মুয়াত্তা মালেক, ২/৭৪৫)
রাসুল সাঃ আরো বলেছেন,
مَنْ ضَارَّ ضَارَّ اللَّهُ بِهِ، وَمَنْ شَاقَّ شَاقَّ اللَّهُ عَلَيْهِ.
যে ব্যক্তি (অন্যের) ক্ষতি করবে, আল্লাহ তার ক্ষতি করবেন, এবং যে ব্যক্তি (অন্যের জন্য) কষ্ট সৃষ্টি করবে, আল্লাহ তাকে কষ্টে ফেলবেন। ( আবু দাউদ, ৩৬৩৫)
উল্লিখিত কুরআন ও হাদিসের আলোকে স্পষ্ট হয় যে, ইসলাম ক্ষতির নীতিকে নিরুৎসাহিত করে এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে ক্ষতি এড়ানোর নির্দেশ দেয়। এটি ইসলামি আইনের একটি মৌলিক নীতি, যা মানুষের কল্যাণ ও ইনসাফ নিশ্চিত করে।
এই মূলনীতির আলোকে খাদ্য ভেজাল দেওয়া যাবে না, হারাম খাদ্য বিক্রি করা যাবে না, কাউকে ওজনে কম দেওয়া যাবে না, খাদ্যের ক্ষতিকর কোন দ্রব্য মেশানো যাবে না। একই সাথে ব্যক্তি নিজেও ভেজাল খাদ্য, হারাম খাদ্য, নেশা জাতীয় দ্রব্য, ক্ষতিকর কোন খাবার গ্রহণ করতে পারবে না। বাংলাদেশে খাদ্যে বিষাক্ত বা ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার আইনত নিষিদ্ধ।
এ বিষয়ে নিরাপদ খাদ্য অধ্যাদেশ ১৯৫৯ (সংশোধিত ২০০৫)-এর ধারা ৬ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক বা বিষাক্ত উপাদান খাদ্যদ্রব্যে ব্যবহার, মিশ্রণ, মজুদ বা বিক্রয় করতে পারবে না। এই বিধানের আওতায় ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ফরমালিন, সোডিয়াম সাইক্লামেট, ডি.ডি.টি., পি.সি.বি. তেলসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক, কীটনাশক, রঞ্জক বা অন্যান্য বিষাক্ত সংযোজন খাদ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়াও নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩-এর ধারা ৩৪ অনুসারে কোনো ব্যক্তি বা তার পক্ষে নিয়োজিত কেউ যদি ছোঁয়াচে ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তি দ্বারা খাদ্যদ্রব্য বা খাদ্যোপকরণ তৈরি, পরিবেশন বা বিক্রয় করায়, তা নিষিদ্ধ। এর দ্বারা মূলত খাদ্যদ্রব্যের মাধ্যমে রোগ সংক্রমণ প্রতিরোধের বিধান করা হয়েছে।
এ আইনের ৩৫ অনুসারে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ সংরক্ষণ/প্রক্রিয়া অনুশীলনের মানদণ্ড ও শর্তের ব্যত্যয় ঘটিয়ে, এমন কোনো প্রক্রিয়ায় প্রস্তুতকৃত খাদ্যদ্রব্য বা খাদ্যোপকরণ উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ বা বিক্রয় করা নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ আইনের ধারা ৩৬ অনুসারে কোনো ব্যক্তি বা তার পক্ষে নিয়োজিত কেউ মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যদ্রব্য বা খাদ্যোপকরণ আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, সরবরাহ বা বিক্রয় করতে পারবেন না। এছাড়াও এ আইনের ৪১, ৪২ এর দ্বারা খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক, বিষাক্ত বা ক্ষতিকর উপাদান মেশানো নিষিদ্ধ এবং অপরাধীদের শাস্তির বিধান রয়েছে। কোনো ব্যক্তি নিজে বা তার পক্ষে নিয়োজিত অন্য কোনো ব্যক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রবিধান বা প্রচলিত অন্য আইনে নির্ধারিত মাত্রার অতিরিক্ত তেজস্ক্রিয়তাসম্পন্ন বা বিকিরণযুক্ত পদার্থ, কিংবা প্রাকৃতিকভাবে বা অন্য কোনোভাবে উপস্থিত ভারী ধাতু খাদ্যদ্রব্য বা খাদ্যোপকরণে ব্যবহার বা অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে না। অতএব, নির্ধারিত নিরাপদ সীমার অতিরিক্ত তেজস্ক্রিয় উপাদান বা ভারী ধাতুসমন্বিত খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, বিপণন বা বিক্রয় করা উক্ত আইনের অধীনে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ আইনের ধারা ৪৪ দ্বারা খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল মেশানোর উদ্দেশ্যে শিল্প-কারখানায় ব্যবহৃত তেল, বর্জ্য বা দূষণকারী দ্রব্য খাদ্য স্থাপনায় সংরক্ষণ করা আইনত নিষিদ্ধ। এই ধারাগুলো ইসলামি আইনের ক্ষতি প্রতিরোধ নীতির বাস্তব প্রতিফলন।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এর ৪২ ধারা ভেজাল বা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর খাদ্য উৎপাদন বা বিক্রি করাকে অপরাধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ আইনের ৫৯ ধারায় ভোক্তার অভিযোগের ভিত্তিতে জরিমানা ও ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে। ইসলামে অন্যের অধিকার নষ্ট করলে ক্ষতিপূরণ বা প্রতিকার দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لِأَخِيهِ فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ
কারও প্রতি অন্যায় করলে তার কাছ থেকে ক্ষমা বা প্রতিকার গ্রহণ কর। ( বুখারী, ৬৫৩৪)
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এর ধারা ৪৫ অনুসারে ওজনে বা পরিমাপে কম দেওয়া বা প্রতারণা করা অপরাধ। ওজনে কম দেওয়া ইসলামে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এটি ইসলামি নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কুরআনে বলা হয়েছে:
وَيْلٌ لِّلْمُطَفِّفِينَ الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُوا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ وَإِذَا كَالُوهُمْ أَوْ وَّزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ
ধ্বংস যারা পরিমাপে কম দেয় তাদের জন্য। যারা লোকদের কাছ থেকে মেপে নেয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে। আর যখন তাদের মেপে দেয় অথবা ওজন করে দেয় তখন কম দেয়। ( সুরা মুত্বফফিফীন, ১-৩)
বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনায় দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর কয়েকটি ধারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই ধারাগুলো ইসলামের ন্যায়বিচার, প্রতারণা নিষিদ্ধকরণ এবং জনস্বার্থ রক্ষার নীতির সঙ্গে সুস্পষ্টভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। দণ্ডবিধির ধারা ২৭২ অনুসারে খাদ্য বা পানীয়তে এমন কিছু মেশানো যাতে তা মানুষের জন্য ক্ষতিকর বা অখাদ্য হয়ে যায়, তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ইসলামি শাস্তি আইন অনুসারে খাদ্যে ভেজাল মিশ্রণের জন্য শাস্তি দেওয়ার বিধান রয়েছে। এ সকল অপরাধের জন্য হুদুদ তথা নির্ধারিত শাস্তি না থাকলেও তাযীরী শাস্তির আওতায় বিচারক শাস্তি দিতে পারেন। ফলে বিচারক তাকে অন্যদেশে সাময়িক ও চিরস্থায়ী ভাবে বহিষ্কার করতে পারে। ইমাম মালেকের মতে অনৈতিক উপায় অবলম্বন করে অর্জিত মাল গরীব অনাথ ও জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করার ব্যবস্থা সংশোধন ও তওবা না করা পর্যন্ত তাকে ব্যবসা থেকে দূরে রাখতে হবে।
ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৫ এর ধারা ৫ অনুসারে লাইসেন্স ছাড়া ফরমালিন বিক্রি বা ব্যবহার করা যাবে না এবং নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ছাড়া এটি ব্যবহার নিষিদ্ধ। এ আইনের ধারা ১৫ অনুসারে ফরমালিনের অবৈধ ব্যবহার, বিক্রি বা সংরক্ষণের জন্য কারাদণ্ড ও জরিমানার ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন অধ্যাদেশ ১৯৮৫ এর ধারা ১৪ অনুসারে যেসব পণ্য নির্ধারিত মান পূরণ করবে সেগুলোকে BSTI মানচিহ্ন ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে। এ মানচিহ্ন ভোক্তাকে পণ্যের মান সম্পর্কে নিশ্চিত করে, যা ব্যবসায়িক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে। এ অধ্যাদেশের ধারা ১৬ অনুসারে অনুমতি ছাড়া BSTI মানচিহ্ন ব্যবহার করা বা জাল মানচিহ্ন ব্যবহার করা অপরাধ। এ আইনে ধারা ১৮ অনুসারে নির্ধারিত মান অনুসরণ না করে নিম্নমানের পণ্য উৎপাদন বা বিক্রয় করলে ২ বছরের কারাদণ্ড অথবা অনধিক ১ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। ইসলামে সমাজের ক্ষতিকর কাজ প্রতিরোধের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। মাছ ও মাছজাত পণ্য (পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০২০ এর ধারা ১০ অনুসারে মানহীন বা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর মাছ বা মাছজাত পণ্য উৎপাদন, বিক্রি বা রপ্তানি করা যাবে না। এ আইনে ধারা ১৭ অনুসারে মান নিয়ন্ত্রণ বিধি লঙ্ঘন করলে জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। বাংলাদেশে হোটেল ও রেস্টুরেন্ট আইন ২০১৪ এর ধারা ১২ অনুসারে হোটেল বা রেস্টুরেন্টে মানুষের জন্য ক্ষতিকর বা নিম্নমানের খাদ্য পরিবেশন করা যাবে না। এ আইনের ধারা ২০ অনুসারে আইনের বিধান লঙ্ঘন করলে জরিমানা বা অন্যান্য শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্য আইন ২০১০ এর ধারা ১০ অনুসারে অবৈধ বা ক্ষতিকর উপাদান যুক্ত মাছ ও প্রাণী খাদ্য উৎপাদন, বিক্রয় বা সরবরাহ করা যাবে না। এ আইনে ধারা ১৫ অনুসারে মান লঙ্ঘন, ভেজাল বা ক্ষতিকর খাদ্য সরবরাহ করলে জরিমানা বা কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩-এর ধারা ৪৩ দ্বারা ভোক্তাকে প্রতারণা করে নিম্নমানের বা ভেজাল খাদ্য বিক্রি করা অপরাধ হিসেবে গণ্য করা। ইসলামি নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنَّا - যে প্রতারণা করে সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। (মুসলিম, ১০২)
খাদ্যে ভেজাল দেওয়া মূলত ভোক্তার সাথে প্রতারণা। তাই এই ধারা ইসলামের ব্যবসায়িক নৈতিকতার সঙ্গে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। নিম্নমানের, ক্ষতিকর বা ভেজাল খাদ্য মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকিপূর্ণ করে, ভেজাল খাদ্য পরিবেশন ভোক্তার সাথে প্রতারণা; যা ইসলামের ক্ষতি প্রতিরোধ নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইসলামে এমন কাজ নিষিদ্ধ যা মানুষের ক্ষতির কারণ হয়। ফরমালিনযুক্ত খাদ্য মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর; তাই এই ধারা ইসলামের ক্ষতি প্রতিরোধ নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইসলামে সমাজের ক্ষতিকর অপরাধ প্রতিরোধের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।
· মূলনীতি চার : دَرْءُ الْمَفَاسِدِ مُقَدَّمٌ عَلَى جَلْبِ الْمَصَالِحِ (কল্যাণ সাধনের চেয়ে অকল্যাণ প্রতিরোধ প্রাধান্যপ্রাপ্ত)
ইসলামি আইন শাস্ত্রবিদ তথা ফকিহগণের নিকট এটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি। এই মূলনীতিকে কুরআন এবং হাদিসের আলোকে উনারা ব্যাখ্যা করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ قُلْ فِيهِمَا إِثْمٌ كَبِيرٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَإِثْمُهُمَا أَكْبَرُ مِن نَّفْعِهِمَا
তারা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। আপনি বলুন, উভয়ের মধ্যে রয়েছে বড় পাপ এবং মানুষের জন্য কিছু উপকারও রয়েছে, তবে তাদের পাপ উপকারের চেয়ে বড়। ( সুরা বাকারাহ, ২১৯)
এই আয়াতে বলা হয়েছে যে মদ ও জুয়াতে কিছু উপকার থাকতে পারে, কিন্তু যেহেতু তাদের ক্ষতি উপকারের চেয়ে বেশি, তাই এগুলো হারাম করা হয়েছে। এটি স্পষ্টভাবে দেখায় যে ক্ষতির প্রতিরোধ কল্যাণের চেয়ে অগ্রগণ্য।
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত রাসূল ﷺ বলেছেন,
لَوْلَا أَنَّ قَوْمَكِ حَدِيثُ عَهْدٍ بِجَاهِلِيَّةٍ لَهَدَمْتُ الْكَعْبَةَ وَجَعَلْتُ لَهَا بَابَيْنِ –
“যদি না তোমার জাতি নতুন জাহেলিয়াত থেকে বের হয়ে আসতো, তাহলে আমি কাবা ঘর ভেঙে দিতাম এবং তার জন্য দুটি দরজা বানাতাম। (বুখারী, ১৫৮৬)
এখানে নবী ﷺ কা'বাকে ইব্রাহিম (আ.)-এর প্রকৃত ভিত্তির উপর পুনর্নির্মাণ করার কল্যাণকর কাজ পরিত্যাগ করেছেন, কারণ এতে মানুষের মধ্যে ফিতনার (গোত্রীয় বিদ্বেষ ও বিভ্রান্তি) সম্ভাবনা ছিল। এটি দেখায় যে সম্ভাব্য ক্ষতি প্রতিরোধ করা কল্যাণকর কাজের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
খাবারের ক্ষেত্রে এই মূলনীতির প্রয়োগ কয়েকভাবে করা যায়। যেমন:
১. ক্ষতিকর খাবার থেকে বেঁচে বাঁচা: যদি কোনো খাবার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয় (যেমন: দূষিত, বিষাক্ত, হারাম বা স্বাস্থ্যহানিকর), তবে তা পরিহার করা উচিত, যদিও তা স্বাদে বা পুষ্টিগুণে উপকারী হতে পারে। কারণ, ক্ষতি থেকে বাঁচা উপকার পাওয়ার চেয়ে অগ্রাধিকারযোগ্য।
২. অ্যালার্জি বা অসহিষ্ণুতা:
যদি কোনো খাবার কারও শরীরের জন্য ক্ষতিকর হয় (যেমন: কোনো নির্দিষ্ট খাবারে অ্যালার্জি বা ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স), তবে তা খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত, যদিও তা পুষ্টিকর বা সুস্বাদু হয়।
৩. অপবিত্র বা সন্দেহযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা:
ইসলামি বিধানের আলোকে যদি কোনো খাবার হারামের সন্দেহে পড়ে, তবে তা বর্জন করা শ্রেয়, যদিও তা স্বাদে আকর্ষণীয় বা পুষ্টিগুণসম্পন্ন হয়।
৪. অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ না করা: অতিরিক্ত খাবার গ্রহণে স্থূলতা, হজমের সমস্যা বা অন্যান্য স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই উপকারিতা থাকলেও সংযত থাকা উত্তম, কারণ ক্ষতি প্রতিরোধই মূলনীতি অনুসারে অগ্রাধিকার পাবে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এর ধারা ৪৪ দ্বারা পণ্য বা সেবার বিষয়ে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন প্রচার করাকে শাস্তিমূলক অপরাধ ঘোষণা করা হয়েছে। মিথ্যা বিজ্ঞাপন ভোক্তাকে প্রতারণা করার একটি উপায়, যা ইসলামি নৈতিকতার পরিপন্থী, ছাড়াও এটি ইসলামে ব্যবসায় সত্যবাদিতা নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
التَّاجِرُ الصَّدُوقُ الْأَمِينُ مَعَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ
সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে। (তিরমিজি, ১২০৯)
জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা-২০১৪’ এর ৪.২.২ ধারায় উল্লেখ রয়েছে, “বিজ্ঞাপনে প্রতিযোগী পণ্যের তুলনা বা নিন্দা করে শ্রেষ্ঠত্ব দাবী করা যাবে না এবং এমন কোন বর্ণনা বা দাবী প্রচার করা যাবে না যাতে জনগণ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রতারিত হতে পারে। মিথ্যা বিজ্ঞাপন দ্বারা ব্যবসায়ীর বিক্রি বেশি হলেও এর দ্বারা ক্রেতার প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় এটি নিষিদ্ধ।
ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা একটি সাধারণ রীতি, কিন্তু অসম প্রতিযোগিতা বা অসৎ প্রতিযোগিতা নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি তৈরি করে। বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে প্রতিযোগিতা আইন ২০১২ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ আইনের ধারা ১৫ অনুসারে ষড়যন্ত্রমূলক যোগসাজশ ৪৭, মনোপলি ৪৮, ওলিগোপলি ৪৯, জোটবদ্ধতা ও কর্তৃত্বময় অবস্থানের অপব্যবহার নিষিদ্ধ। ইসলামে এ সকল অসৎ ও অসম প্রতিযোগিতা নিষিদ্ধের বিষয়টি কল্যাণ সাধনের চেয়ে অকল্যাণ প্রতিরোধ প্রাধান্যপ্রাপ্ত হওয়ার মূলনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
· মূলনীতি পাঁচ : বাজার তদারকিতে আল হিসবাহ নীতির প্রয়োগ:
বাংলাদেশ সরকার গৃহীত নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩-এর ধারা ৫ দ্বারা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে। এটি খাদ্য নিরাপত্তা তদারকি করার জন্য একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ গঠন। প্রতিযোগিতা আইনের ধারা ৫ এর মাধ্যমে সরকার প্রতিযোগিতা কমিশন গঠন করে। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার পরিবেশ তথা উৎপাদনকারী, বাজারজাতকারী, ক্রেতা ও বিক্রেতা সকলের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য ‘আল-হিসবাহ’ ব্যবস্থাপনার আওতায় মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে মহানবী (সা.) বাজার পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) কখনো কখনো নিজেই বাজার পর্যবেক্ষণ করতেন। খলীফা উমর রা. নিজেই বাজারে ঘুরে বেড়াতেন এবং এ ধরনের অসাধু ব্যবসায়িক তৎপরতা রোধে ভূমিকা রাখতেন । উমর রা. চাবুক হাতে নিয়ে বাজারে প্রবেশ করতেন, ব্যবসায়ীদেরকে সব ধরনের প্রতারণা বর্জনের নির্দেশ দিতেন, সতর্ক করতেন এবং প্রতারণাকারী ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিকারীর বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করতেন। তিনি আবদুল্লাহ ইবনু ওতবাহকে বাজার ব্যবস্থাপনার জন্য নিয়োগ করেছিলেন। উমর রা. হিসবাহ ব্যবস্থা জোরদার করার জন্য আল-হারিছ ইবনুল আস ও সুলায়মান ইবনু ইয়াসারকেও দায়িত্ব প্রদান করেছিলেন। আলী রা.-ও হিসবাহ ব্যবস্থা প্রয়োগ করে অপরাধীদের শাস্তি দিতেন। ইসলামি খিলাফতের সকল খলীফা এবং ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামি শাসনামলে নিয়মিত বাজার তদারকি করা হতো।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও প্রতিযোগিতা কমিশন গঠন ইসলামের হিসবা ব্যবস্থার আধুনিক রূপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ইসলামি দৃষ্টিকোণে বাজার ব্যবস্থা তদারকির জন্য রাষ্ট্র বাজার-প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করবে এবং বাজার ব্যবস্থাপনা তদারকির জন্য কর্মচারী নিয়োগ করবে।
এ সম্পর্কে হাদিসের বাণী,
عَنِ السَّائِبِ بْنِ يَزِيدَ ؛ أَنَّهُ قَالَ : كُنْتُ عَامِلاً مَعَ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُتْبَةَ بْنِ مَسْعُودٍ ،
عَلَى سُوقِ الْمَدِينَةِ ، فِي زَمَانِ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ . فَكُنَّا نَأْخُذُ مِنَ النَّبَطِ الْعُشْرَ
হযরত সায়েব বিন ইয়ায়িদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত উমর রা.-এর খিলাফতকালে আবদুল্লাহ বিন উতবা বিন মাসূদের সাথে মদীনার বাজার কর্মচারী ছিলাম এবং আমরা নবতীদের কাছ থেকে আমদানি কর এক দশমাংশ আদায় করতাম। (মুয়াত্তা মালেক, ৯৭৭)
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন অর্ডিনেন্স ১৯৮৫ এর মাধ্যমে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI) প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ অধ্যাদেশের ধারা ৩ ও ৪ অনুসারে BSTI পণ্যের মান নির্ধারণ, পরীক্ষা এবং মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করবে। মান নির্ধারণের মাধ্যমে নিম্নমানের বা ভেজাল পণ্য বাজারে আসা প্রতিরোধ করা হয়, যা ইসলামের বাজার ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম ‘আল হিসবাহ’-এর অন্তর্ভুক্ত।
মাছ ও মাছজাত পণ্য (পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০২০ এর ধারা ৭ অনুসারে মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধন ও লাইসেন্স গ্রহণ করতে হবে। লাইসেন্স ও নিবন্ধন ব্যবস্থা বাজারে শৃঙ্খলা ও মান বজায় রাখতে সহায়ক। মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯ এর ধারা ৫ অনুসারে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে তাৎক্ষণিকভাবে অপরাধের বিচার করতে পারেন। এ আইনের ধারা ৬ অনুসারে মোবাইল কোর্ট বিভিন্ন বিশেষ আইনের অধীনে (যেমন নিরাপদ খাদ্য আইন, ভোক্তা অধিকার আইন ইত্যাদি) অভিযান পরিচালনা করতে পারে। এ আইনের ধারা ৭ অনুসারে অপরাধ প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে জরিমানা বা অন্যান্য শাস্তি প্রদান করা যায়। ইসলামে অপরাধ দমন ও সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে শাস্তির বিধান রয়েছে। এ আইনের ধারা ৯ এর ক্ষমতাবলে মোবাইল কোর্ট বাজার তদারকি ও জনস্বার্থ রক্ষায় অভিযান পরিচালনা করতে পারে। বাংলাদেশে হোটেল ও রেস্টুরেন্ট আইন ২০১৪ এর ধারা ৬ অনুসারে হোটেল বা রেস্টুরেন্ট পরিচালনার জন্য সরকারি লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক। মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্য আইন ২০১০ এর ধারা ৭ অনুসারে মাছ ও প্রাণী খাদ্য উৎপাদন ও বিক্রির জন্য লাইসেন্স ও অনুমোদন গ্রহণ বাধ্যতামূলক ।
লাইসেন্স ব্যবস্থা বাজারে শৃঙ্খলা ও মান বজায় রাখতে সহায়ক। ইসলামে সমাজের ক্ষতি প্রতিরোধ ও জনস্বার্থ রক্ষার জন্য রাষ্ট্রীয় তদারকি বৈধ। ইসলামি শাসনব্যবস্থায় বাজার তদারকির জন্য হিসবা ব্যবস্থা চালু ছিল। সর্বোপরি, মোবাইল কোর্ট ব্যবস্থা, ভোক্তা অধিকার, বিএসটিআই, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, প্রতিযোগিতা কমিশন ইত্যাদি ইসলামের হিসবা ব্যবস্থার আধুনিক প্রয়োগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ঐতিহাসিকভাবে ইসলামি রাষ্ট্রে বাজার তদারকি ব্যবস্থা (হিসবা) চালু ছিল। ইসলামে সমাজের ক্ষতিকর কাজ প্রতিরোধ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সে হিসেবে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গঠন ইসলামের ‘আল হিসবাহ’ ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ।
· মূলনীতি ছয় : মাকাসিদুশ শরিয়াহ (مقاصد الشريعة)
ইসলামি শরীয়াহর প্রধান উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, জীবন রক্ষা ( حفظ النفس) ও সম্পদ রক্ষা (حفظ المال), যার সাথে স্বাস্থ্য রক্ষার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কারণ অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণ ভোক্তার জীবনের জন্য ঝুঁকি এবং অর্থ অপচয় ঘটায়। এছাড়াও মাকাসিদুশ শরিয়ার মূলনীতি ‘মাসলেহে আল মুরসালা’ তথা সমাজের কল্যাণ নিশ্চিত করার নীতিটি নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনার সাথে সম্পর্কিত। খাদ্য নিরাপত্তা ও ভোক্তা সুরক্ষার বিদ্যমান আইন মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় সহায়ক, যা মাকাসিদুশ শরীয়াহর মৌলিক উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এর ৪১ দ্বারা পণ্যে অনিরাপদ বা মানহীন পণ্য বিক্রি করলে শাস্তির বিধান রয়েছে। এটি ইসলামি নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। অনিরাপদ খাদ্য মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর, সুতরাং মাকাসিদুশ শরিয়ার জীবন সুরক্ষা নীতির আওতায়ও খাদ্যে ভেজাল নিষিদ্ধ।
দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ২৭৩ ধারানুসারে মানুষের জন্য ক্ষতিকর খাদ্য বা পানীয় বিক্রি করা অপরাধ। এই ধারা জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি প্রতিরোধ করে, যা ইসলামের ক্ষতি প্রতিরোধ নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ধারা ২৭৪ অনুসারে ভেজাল ওষুধ প্রস্তুত করা বা মানুষের জন্য ক্ষতিকর ওষুধ তৈরি করা অপরাধ। দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ধারা ২৭৫ অনুসারে ভেজাল বা ক্ষতিকর ওষুধ বিক্রি করাও অপরাধ। ধারা ২৭৬ অনুসারে ওষুধ বা খাদ্যের প্রকৃতি বা গুণমান সম্পর্কে ভুল তথ্য দেওয়া অপরাধ। ইসলামে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
يَا عِبَادَ اللهِ تَدَاوَوْا - হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ কর। (তিরমিজি, ২০৩৮)
ভেজাল ওষুধ মানুষের জীবন বিপন্ন করে, যা ইসলামের জীবন রক্ষার নীতির পরিপন্থী। ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৫ এর ধারা ৬ অনুসারে ফরমালিন সংরক্ষণ, পরিবহন ও ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হবে। ইসলামে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা মাকাসিদুশ শরীয়াহ-এর অন্যতম উদ্দেশ্য। ফরমালিনের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সহায়ক। নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়াদি মাসালেহ (المصالح), সাদ্দু যারায়ে (سد الذرائع) ও মাকাসিদুস শরীয়াহ (مقاصد الشريعة) ইত্যাদি ফিকহী কায়দার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ইমাম আল-গাযালী মাকাসিদুশ শরীয়ার ভিত্তিতে বিধান প্রণয়নে তিনটি শর্ত প্রদান করেছেন-
১. কল্যাণ অত্যাবশ্যক হওয়া, ২. কল্যাণের পরিধি সার্বজনীন হওয়া, ব্যক্তিবিশেষের কল্যাণ ধর্তব্য নয়, ৩. কল্যাণ বাস্তবসম্মত হওয়া, ধারণাপ্রসূত না হওয়া। ইমাম গাযালীর তিনটির শর্তের উপযোগিতা থাকায় খাদ্যে ভেজাল মিশ্রণ, ক্ষতিকর উপাদান, মেয়াদউত্তীর্ণ খাদ্য বিক্রি ইত্যাদি নিষিদ্ধ। মাকাসিদুশ শরীয়ার পাঁচটি বিষয়ের সম্পদের নিরাপত্তা রক্ষার্থেও খাদ্যে ভেজাল, ক্ষতিকর উপাদান মিশ্রণ নিষিদ্ধ।
ইসলামি দিকনির্দেশনার আলোকে বাংলাদেশের খাদ্যব্যবস্থা নিরাপদকরণে কতিপয় সুপারিশ:
বর্তমান বাংলাদেশে যেই পরিমাণ ভেজাল ও অনিরাপদ খাদ্যের ছড়াছড়ি তা থেকে উত্তরণ এবং ইসলামি দিকনির্দেশনা অনুসরণের মাধ্যমে বাংলাদেশের খাদ্যব্যবস্থা উন্নতিকরণ ও নিরাপদকরণে কতিপয় সুপারিশ পেশ করা হলো। যথা:
* নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩, ভোক্তা অধিকার আইন ২০০৯ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট আইনসমূহের মধ্যে সমন্বিত প্রয়োগ নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত আইনগত কাঠামো গঠন করা।
* বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও বিএসটিআই হালাল সার্টিফিকেট দিলেও এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সীমিত। তাই স্বতন্ত্র ‘হালাল-তায়্যিব সার্টিফিকেশন কর্তৃপক্ষ’ নামে হালাল সার্টিফিকেশন বোর্ড গঠন করা।
* নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অধীনে বিএসটিআই, ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন ও ইসলামি স্কলারদের সমন্বয়ে জেলা পর্যায়ে ‘সমন্বিত টাস্কফোর্স গঠন’ করা ।
* হোটেল, রেস্টুরেন্ট, খাদ্য উৎপাদকদের লাইসেন্স নবায়নকে অডিট কার্যক্রমের সাথে যুক্ত করা।
নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনায় প্রতিবন্ধকতার ক্ষেত্রে সতর্কতা ও প্রশিক্ষণ, জরিমানা, লাইসেন্স স্থগিত, কারাদণ্ড ইত্যাদি শাস্তি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা।
* মোবাইল কোর্ট অভিযান নিয়মিত করণ এবং অভিযানের সংখ্যা বাড়ানো।
* খাদ্য ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও পরিদর্শকদের জন্য বাধ্যতামূলক খাদ্য নিরাপত্তা ট্রেনিং দেওয়া।
* ইমাম, খতিব ও ইসলামি স্কলারদের মাধ্যমে ‘খাদ্যে প্রতারণা হারাম’ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি।
* স্কুল কারিকুলামে ‘খাদ্য নিরাপত্তা ও ইসলামি নৈতিকতা’ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা।
লেখকঃ
হাফেজ মাওলানা ইমরান বিন বোরহান
খতিব, রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স জামে মসজিদ, রায়পুর, লক্ষ্মীপুর।







0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
লেখাটি সম্পর্কে আপনার মূল্যবান মতামত দিন