প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন

জোনাকী অনলাইন লাইব্রেরীতে আপনাকে স্বাগতম | জোনাকী যদি আপনার ভালো লাগে তবে আপনার বন্ধুদের সাথে লিংকটি শেয়ার করার অনুরোধ জানাচ্ছি | এছাড়াও যারা ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করতে আগ্রহী তারা jaherrahman@gmail.com এ মেইল করার অনুরোধ করা হচ্ছে | আপনার অংশগ্রহণে সমৃদ্ধ হোক আপনার প্রিয় অনলাইন লাইব্রেরী। আমাদের সকল লেখক, পাঠক- শুভানুধ্যায়ীদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা- অভিনন্দন।

স্বাধীনতার গল্প | রেজা পারভেজ


ছোটমামা, আজ কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের গল্প বলতে হবে- বীথি ও আল আমিনের আবদার শুনে হাসলেন ছোটমামা আবু আবদুল্লাহ। একটু অবাকও হলেন। যে সময়ে স্কুলপড়ুয়া ছাত্রছাত্রীরা পাঠ্যবই, টেলিভিশন ও ইন্টারনেটের বাইরে অন্য কিছু নিয়ে ভাবতে পারে না, সে সময়ে ওরা দেশ নিয়ে ভাবছে। মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনতে চাচ্ছে। ছোটমামা থাকেন ঢাকার চকবাজারে। তিনি কেবলমাত্র বাংলাদেশের স্বনামধন্য একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স পাস করেছেন। কোথাও বেড়াতে গেলে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা গল্প শোনার জন্য চেপে ধরলে বাধ্য হয়ে তিনি শুনাতে থাকেন নতুন যুগের নতুন সেনাপতিদের গল্প। ঢাকা থেকে বাড়িতে এলে বোনদের বাড়িতে বেড়াতে যান। ছোট বোনের সন্তান দু’টি। বড় মেয়ে বীথি আর ছোট ছেলে আল আমিন। দু’জনই খুব মেধাবী। তারা নিজ নিজ ক্লাসে শ্রেষ্ঠ। তাদের স্বপ্ন মুক্তিযোদ্ধারা যেমনি এই দেশকে নিজেদের রক্ত, শ্রম ও দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন করেছিলেন তেমনি তারাও এই দেশকে একটি সোনার বাংলা রূপে গড়ে তুলবে। মার্চ মাস। স্বাধীনতা ঘোষণার মাস। পত্রপত্রিকা, টিভি চ্যানেল সবগুলোতে মহান স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বীথি ও আল আমিন মাঝে মাঝে চ্যানেল খুলে একটু আধটু দেখে। এ মাসে ছোটমামা তাদের বাড়িতে বেড়াতে আসায় স্বাধীনতাযুদ্ধের গল্প শোনার জন্য চেপে ধরেছে। তাদের চাপাচাপিতে স্বাধীনতাযুদ্ধের সঠিক গল্প তুলে ধরলেন মামা। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশকে শাসন করত ব্রিটিশরা। তাদের থেকে স্বাধীন হয় ভারত ও পাকিস্তান। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে গঠিত হয় পাকিস্তান এবং হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয় ভারত। পাকিস্তানের দু’টি অংশ, পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান। জন্মলগ্ন থেকেই পূর্ব অংশ পশ্চিম অংশের তুলনায় নানাভাবে বঞ্চিত হতে থাকে। পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ আমাদের বাংলাদেশের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানিরা বৈষম্যমূলক আচরণ শুরু করে। এ দেশের ধন-সম্পদ তারা কুক্ষিগত করে। আর এরই প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠে আপামর জনসাধারণ। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন। ২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ ৯ মাস স্বাধীনতাযুদ্ধ স্থায়ী হয়। অবশেষে যুদ্ধে টিকতে না পেরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পরাজয় বরণ করতে বাধ্য হয়। ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ নামক একটি ভুখন্ডের সূচনা হয়। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন বাংলার কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, জনতা, নারী-পুরুষ তথা আপামর জনসাধারণ। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হলো আমাদের লাল-সবুজের পতাকা। যুদ্ধের গল্প শুনতে শুনতে আল আমিন বলল, ‘আচ্ছা মামা, মুক্তিযুদ্ধ আর হবে না?’ মামা প্রশ্ন শুনে হেসে বললেন, মুক্তিযুদ্ধ কখনো শেষ হয় না। আমাদের মুক্তিযুদ্ধও শেষ হয়নি। আমাদের অনেক অর্জন থাকলেও সকল স্বপ্ন পূরণ হয়নি। এখনও অনেকে প্রতিদিন দুইবেলা আহার পায় না। এখনও সবাই পড়ালেখা করার সুযোগ পায় না। অনেকে ফুটপাথে ঘুমায়, এখনও সকল মানুষের মুখে হাসি ফোটেনি। বীথি বলে উঠল, ‘মামা, আমরা ছোট, আমরা কিভাবে যুদ্ধ করব?’ মামা হাসতে হাসতে বললেন, ‘আমাদের দেশ গঠনের যুদ্ধে সবাই ভূমিকা রাখতে পারে। আমরা যদি আমাদের টিফিনের টাকা থেকে টাকা বাঁচিয়ে অল্প অল্প করে জমিয়ে ক্লাসের যে ছাত্রটির টিফিন কেনার সামর্থ্য নেই, তাকে একদিন টিফিন করাই। নানা কারণে যে ছেলেটি স্কুলে যেতে পারে না, তাকে লেখাপড়া করালে এক সময় আমাদের স্বপ্ন সার্থক হবে।’ বীথি ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে। সে ঘাড় নেড়ে বলল, ‘ক্লাসের কয়েক বন্ধু মিলে প্রতিদিন একজনকে টিফিন করাতে পারি।’ মামা আরও বলতে লাগলেন, ‘আমাদের দেশের বাজারে দেশীয় পণ্যের পাশাপাশি বিদেশী পণ্যও আছে। বিদেশী পণ্যের পরিবর্তে আমাদের দেশীয় পণ্য ব্যবহার করলে দেশের অর্থনীতির উপকারে আসবে। হয়তো আমাদের দেশীয় পণ্য একটু কম উন্নত হতে পারে, কিন্তু আমরা সবাই ব্যবহার করলে চাহিদা বাড়বে, দেশীয় উৎপাদকরা উন্নতমানের পণ্য উৎপাদন করবেন।’ আল আমিন বলল, মামা, ‘আমাদের বেশি ব্যবহারের কারণে কখনও কি এমন হয়েছে?’ মামা উত্তর দিলেন, ‘হবে না কেন? আজ থেকে তেতাল্লিশ বছর আগে আমাদের দেশের ওষুধের বাজার বিদেশী ওষুধের দখলে ছিল। এখন কিন্তু অল্প কিছু ওষুধ ছাড়া বাকি সকল ওষুধ আমরা উৎপাদন করি। অনেক ওষুধ বিদেশেও রফতানি হয়। ইলেকট্রনিকস পণ্যও দেশে উৎপাদিত হয়ে বিদেশে রফতানি হচ্ছে।’ মুক্তিযুদ্ধে নিজেদের ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে দেখে বীথি ও আল আমিনের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তারা দু’জন কানে কানে কী যেন বলল, তারপর এক সাথে দু’জনে মামাকে বলল, ‘ছোটমামা, আমরাও আজ থেকে দেশ গড়ার মুক্তিযুদ্ধ শুরু করলাম।


আমার যতো ইচ্ছে | মালিহা


কিছুই ভালো লাগে না, মনে হয় লেখাপড়ার নামে সবাই আমাকে বন্দি করে রেখেছে। মা বলেন, ‘জন্মের পর ১২ বছর কেটেছে তোমার হাসতে খেলতে আনন্দ করতে করতে। সামনের ১২টা বছর তোমাকে প্রতিযোগিতায় নামতে হবে। ভালো ভালো রেজাল্ট আনতে হবে। ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে হবে। ভালো পদবিতে চাকরি করতে হবে।’ আমার শুধু ইচ্ছে করে একটা মাঠে একা একা দৌড়াতে—ঘাসে ভরা সবুজ মাঠে। চারপাশে গাছ আর গাছ। মাঠের প্রান্তজুড়ে থাকবে সবুজ আর অরণ্য। আর মাঠের মাঝখানে ছনের বাড়ি। বাড়িটা ঘিরে ফুলের বাগান। বাগানের পাশে একটা পাকা দোতলা বাড়ি থাকবে। সেই বাড়ির প্রতিটি দেয়ালে থাকবে আলমারি বোঝাই বই, বই আর বই। আমি যখন ইচ্ছে তখনই পড়ব। কেউ আমায় বাঁকা চোখে দেখবে না। কেউ ধমক দিয়ে আমার হাত থেকে বই কেড়ে নেবে না। রেগে রেগে কেউ আমায় বলবে না—যাও, স্কুলের পড়া পড়তে বসো।
বর্ষাকালে বৃষ্টি পড়বে, আমি বৃষ্টির পানিতে ভিজবো। কিছুক্ষণ একা একা বৃষ্টির গান গাইবো আর ভিজবো। পরে অন্যদেরও সঙ্গে নেবো। ভালো হয় আমার সঙ্গে অনেকগুলো ছোট ছোট বাচ্চা ভিজতে এলে। সবাই আমায় মালিহাপু বলে ডাকবে। ওদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে বৃষ্টিতে ভেজা খেলা খেলবো। মাঝেমধ্যে ওরা সবাই আমায় দূর থেকে পানি ছিটিয়ে দেবে, আমি আনন্দ পাবো। পশু-পাখি পুষতে খুব ইচ্ছা করে, যেমন—ব্লাড হাউন্ড, অ্যালসেশিয়ান, পুডল কুকুর, অনেক লোমে ভরা সাদা বড় বিড়াল আর ছোট কালো, নীল বিড়াল, যত রকম পাখি আছে—সব আমি চাই। সবগুলো থাকবে জোড়ায় জোড়ায়। আরেকটা পাখি চাই, যার কোনো জোড়া নেই। সেটা হলো ফিনিক্স।
বাগানে থাকবে অনেক প্রজাপতি। ফুল আর বাগানটা প্রজাপতিদের জন্য। পাশে থাকবে একটা বড় দীঘি আর সেই দীঘিতে রক্তকমল আর সাদা শাপলা ফুটবে। দীঘির পাড় ঘিরে থাকবে গাছের সারি। আমি পাড়ে বসবো আর চারপাশ দেখবো। দোতলা বাড়িটার একটা বড় রুমে থাকবে গিটার, বাঁশি, হারমোনিয়াম, ড্রাম, সেতার আর সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র। যারা বাজাতে চায় তারা আসবে এখানে। ওরা বাজাবে আমি শুনবো। আমি গিটার বাজাব। বাঁশি বাজানো শিখবো। একটা ঘরে আমার প্রিয়-অপ্রিয় গানের সিডি, ক্যাসেট, সিডি প্লেয়ার ওয়াকম্যান ইত্যাদি থাকবে। একটা ঘরে থাকবে অনেক রকম পুতুল, ছোট-বড় সাদা লাল কালো—সব রকমের পুতুল।
ছাদের ওপরে আর বাংলো বাড়ির সামনে দোলনা থাকবে। সেখানে বসে গান শুনবো, বই পড়বো। আর বৃষ্টির সময় ছাদে বসে বৃষ্টির রুমঝুম শব্দ শুনবো। মাঝেমধ্যে মনে হয়, দীঘির ওপর যদি একটা ঝুলন্ত দোলনা থাকত। দোল খেতে খেতে যদি দোলনা উল্টে যায় তাহলে তো পানিতে পড়ে যাবো। আমি তো সাঁতার জানি না। সাঁতার শিখতে হবে আমায়। শীতের সময় ছাড়া সব সময় দীঘিতে নেমে গোসল করবো। কী মজা! এত বড় জায়গায় আমি একা থাকবো।
বৃষ্টির সময় ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা আসবে ভিজতে। বইপ্রিয় মানুষরা আসবে বই পড়তে আর গানপ্রিয় মানুষ আসবে গান গাইতে। সবাই থাকবে দোতলা বাড়িটাতে আর আমি থাকবো ছনের ঘরে। আমার কারও সঙ্গে থাকতে ভালো লাগে না। রবিনসন ক্রুসো নামে এক নাবিক একাকী কাটিয়েছিলেন। মাঝে মাঝে আমারও ইচ্ছে করে সেই রবিনসন ক্রুসো হয়ে যেতে ।
গল্প করতে ভালো লাগে। গল্প নিশ্চই একা করবো না। থাক না, মানুষের সব ইচ্ছা পূরণের দরকার নেই। আমার গান গাইতে নাচ করতে ইচ্ছে করে, ছবি আঁকতে মন চায়। কিছুই করতে পারি না। তখন নিজেকে অলস মনে হয়। মা অনেক বই কিনে দেন। ভালো লাগে লাবণ্যের বাসায় গেলে, দোলনায় চড়তে পারি। আমি কার্টুন আঁকতে পারি। এগুলো সব ভালো লাগে। যদিও তাল ঠিক থাকে না, তবুও সারাক্ষণ নাচতে থাকি।
আমার অনেক ভালো বন্ধু আছে। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে ভালোই লাগে। আমরা মারামারি করি। ওদের নিয়ে গল্প লিখি। ওরা পড়ে ভুল পেলে আমায় ধরে উত্তমমধ্যম দেয়। এটাও ভালো লাগে। স্কুলের ক্যাম্পের কথা খুব মনে পড়ে। তখন সবাই মিলে তাঁবু বানিয়েছি, কী যে মজা হয়েছিল। অনেক রাত পর্যন্ত টিচাররাসহ গল্প করেছি।
একবার লাবণ্য আর আমি লিফটে আটকে পড়েছিলাম। খুব ভয় পেয়েছিলাম সেদিন। ভূতের ভয় হয়েছিল। লাবণ্য হাসতে হাসতে কাঁধের ওপর ঢলে পড়েছিল। তখন ওকে মিসেস ড্রাকুলা মনে হচ্ছিল। ছোট বোন ফারিহার সঙ্গে অনেক দুষ্টামি করি। বিদ্যুত্ চলে গেলে অন্ধ ঘরে ওর সঙ্গে লুকোচুরি খেলা খেলি। খুব ভালো লাগে। এই সব ছেড়ে কোথায় যাব? লাবণ্য, আদিবা, তাসনুবা, নাতাসা, সুস্মিতা, যূথি, মিলা, ঋত,ু মৌমি ওদের ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না। ফারিহাটা বোন হয়েছে বলে অনেক খুশি হয়েছি। এখন কীভাবে ওকে ছেড়ে চলে যাব? তবুও বুঝি লেখাপড়া করতেই হবে। আমার স্বপ্ন পূরণ করতে হলে লেখাপড়া করতেই হবে। স্বপ্নগুলো মনের মাঝে আছে। এগুলো পরে পূরণ করবো।

সূত্র: আমার দেশ/এক্কাদোক্কা


পরী রাজ্যের পরী তারা সুন্দরী | সুহৃদ সরকার


 সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ চলে গেছে তো গেছেই। আসার নামটি পর্যন্ত নেই। গ্রামজুড়ে ভুতুড়ে অন্ধকার। জানালা দিয়ে খোলা আকাশ দেখা যায়। আকাশে অগুনতি তারা। কোনোটি জুঁই ফুলের মতো সাদা। কোনোটি একটু উজ্জ্বল।
আচ্ছা! এতো তারা আকাশে আসে কোত্থেকে। কীভাবেইবা সৃষ্টি তাদের! কাল বিজ্ঞান স্যার দূর আকাশের ওই তারা নিয়েই তো আলোচনা করবেন। অথচ আলোর অভাবে কিছুই পড়া হয়নি তার। কী যে হবে কাল? আবোল-তাবোল ভাবতে ভাবতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে বেলতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র প্রদীপ্ত জামান। ডাক নাম শেলী।
'ওঠো শেলী, ওঠো!'
একটি নরম হাতের ছোঁয়ায় চোখ মেলে শেলী। সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক পরী। তার ডানায় অনেক তারা ঝিকমিক করছে। ঝিকিমিকি তারার আলোয় চোখ দুটো কেমন যেন ঝলসে যায় শেলীর। চমকে ওঠে সে।
'কী ভাবছো শেলী! আমাকে বসতে বলবে না,' পরী মিষ্টি করে হেসে বলে।
'বসতে তো বলব; কিন্তু তুমি কে? কোথা থেকে এসেছ তুমি?' বলে শেলী। 'আমি পরীরাজ্যের তারা সুন্দরী। থাকি দূরে, ওই তারার দেশে।' তারার দিকে হাত দেখিয়ে বলে পরী।
'তুমি কেন এসেছো এখানে?' শেলী জিজ্ঞাসা করে।
'বারে! তুমি না একটু আগে তারা নিয়ে ভাবছিলে?'
'হ্যাঁ, তা ভাবছিলাম। কিন্তু তুমি সে খবর জানলে কি করে?'
'জানব না? আমি তোমাদের মতো শিশুদের মনের খবর জানতে পারি।' মাথায় হাত বুলিয়ে বললো পরী সুন্দরী।
'তা, আমি তোমায় কি নামে ডাকবো?'
'পরীমা। পরীমা বলেই ডাকবে আমাকে!'
'সে-ই ভালো! আমি তোমাকে পরীমা বলেই ডাকবো। জানো পরীমা, আমি আমার মাকে কতদিন দেখি না। বাবা বলেন, মা নাকি ওই আকাশের তারাদের সঙ্গে মিশে গেছে। আচ্ছা তুমিই বলো, মানুষ কি কখনও আকাশের তারা হতে পারে?'
'কী জানি বাপু, অতোশতো বুঝি না। তবে আমি যে তোমার পরীমা, এটুকুই শুধু বুঝি। থাকগে, বাদ দাও ওসব কথা। এখন বলো, আকাশের ওই তারা নিয়ে তোমার কি কি প্রশ্ন আছে?'
'তারা সৃষ্টি হলো কীভাবে?' শেলী প্রশ্ন করে।
'গ্যাস আর ধুলার মেঘ দিয়েই তারকামণ্ডলীর সৃষ্টি। মহাশূন্যে আছে গ্যাস আর ধূলিকণার অসংখ্য মেঘ। গ্যাস আর ধূলিকণার এ মেঘ দিয়েই তৈরি হয়েছে এই তারা।'
'পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের তারা কোনটি পরীমা?'
'পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের যে তারাটি আমরা দেখতে পাই সেটিই তো সূর্য। আর সূর্যটাও জ্বলন্ত গ্যাসের আধার।' উত্তর দেয় পরী।
'সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা কোনটি?'
'সূর্য হচ্ছে সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা। এ তারাটি পৃথিবীর অনেক কাছে।
তুমি কি বলতে পারো, আকাশে কত তারা আছে?'
রাতের আকাশ যখন খুবই পরিষ্কার থাকে তখন তুমি বড়জোর দুই হাজার তারা গুনতে পারো। পৃথিবীর সব দিক থেকে প্রায় ছয় হাজার তারা আমরা দেখতে পাই। অথচ মহাবিশ্বে লাখ লাখ কোটি কোটি তারা। সবচেয়ে আমাদের কাছে রয়েছে সূর্য। তাই এটিকে এতো বড় দেখা যায়। সূর্যের চেয়ে অনেক বড় তারা রয়েছে মহাকাশে। সেগুলো এতো দূরে যে, সাধারণ টেলিস্কোপের সাহায্যে তা দেখা যায় না।'
'দাঁড়াও পরীমা, দাঁড়াও। আমার মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছে। শেলী বললো।'
'ও বুঝেছি! আমি খুব ভারী কথা বললাম, তাই তো! পরী বললো।'
শেলী আবার বলে, 'ঠিক আছে। তুমি শুরু করো। আমি রেডি।'
'সুপারনোভা নামে আরেক ধরনের তারা আছে। তা সব সময় দেখা যায় না। এই জ্বলে আর এই নেভে। শেষ সুপারনোভাটি দেখা গিয়েছিলো ১৬০৪ খ্রিস্টাব্দে।'
'বাব্বা! এতো কিছু জানো তুমি!' চোখ দুটো কপালে তুলে বললো শেলী।
'জানবো না? আমি তোমার মতো ঘুমকাতুরে নই! আমি সুযোগ পেলেই বই নিয়ে বসি। পরী বলল।
তোমাদের পরীরাজ্যে কি স্কুল-কলেজ আছে?
আছে না! ঢের আছে। তবে সেখানে ছাত্রছাত্রীরা দারুণ পড়ূয়া। আমার এখন ফেরার সময় হলো। আমি তবে যাই।
যেতে পার। তবে কথা দিতে হবে, আবার আসবে তুমি। আমাকে আদার করবে, পড়াবে। পরীর হাত দুটো ধরে শেলী বলল।
আসব। তবে তোমাকেও কথা দিতে হবে, তুমি ভালোভাবে পড়াশোনা করবে। কথা দিলাম। বলতেই বাবার ডাকে ঘুম ভেঙে যায় শেলীর।
পুবের জানালা দিয়ে তখন উঁকি দিচ্ছে সোনার থালার মতো ভোরের সূর্য।
এ সূর্যই তো আমাদের পৃথিবীর নিটকতম তারা। এই তারা আমাদের আলো দেয়, তাপ দেয়। স্বপ্ন দেখায় অন্ধকার থেকে আলোর পথে চলার। 

সূত্র : সমকাল


তিথির চাওয়া | মানিক দেবনাথ



দাদুর ঘুমপাড়ানি গল্প বলা একদম ভালো লাগছে না তিথির। কেমন যেনো পানসে মনে হচ্ছে। রেডিও’র মতো অনর্গল বলে যাচ্ছেন তো যাচ্ছেনই, গল্প শেষই হচ্ছে না তার।
তিথির মা নেই। বাবা থাকেন সারাক্ষণ ব্যস্ত। বাবা সকালে বের হন, ফেরেন দুপুর রাতে। বাবার সঙ্গে তিথির প্রায় দেখা হয় না। তাই দাদুই তার সবকিছু। খাওয়া-দাওয়া, খেলাধুলা আর ঘুমানো, সবই দাদুর সঙ্গে।
তিথির মন একেবারেই ভালো নেই আজ। বাবা অনেক দামি দামি পোশাক এনেছেন তিথির জন্যে। তারপর থেকে একটা বিষয় নিয়ে ভাবতে ভাবতে অস্থির হয়ে পড়ছে তিথি। ভাবছে বাবাকে বিষয়টি বললে তো হয়! বাবার আলমারিতে অনেক টাকা। বাবা ইচ্ছে করলেই তার আশা পূরণ করতে পারেন। কিন্তু বাবা এখন নেই! তাহলে উপায়?
কথাগুলো ভাবতে না ভাবতেই তিথি থমকে গেলো! তার রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে অপরূপ সুন্দরী এক মেয়ে। তাকে সে আগে কখনো দেখেনি। তিথির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে হাসছে মেয়েটি। মনে হলো যেন তিথি মেয়েটির অনেক দিনের চেনা। তিথি একটু ঘাবড়ে গেলো! এক-পা দু-পা করে তিথির দিকে এগিয়ে গেলো মেয়েটি। তারপর বললো—ভয় পেয়ো না। আমি তোমাকে দেখতে এলাম, বুঝলে!
তিথি বললো, তুমি কে?
সেই মেয়েটি বললো, আমি কিংকরি। আমাকে চিনতে পারছো না? আমি পরীর দেশের রানী! দেশে দেশে ঘুরে বেড়াই আর ছোট্ট সোনাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করি।
: তুমি কি পরী! প্রশ্ন করলো তিথি।
পরী বললো—হ্যাঁ, তোমার দাদুর কাছ থেকে আমার অনেক গল্প শুনেছো, তাই তোমাকে দেখতে এলাম। তুমি কি পরীর দেশে যাবে? আমার ডানার ওপর উঠে বসবে আর আমি উড়ে যাবো আমাদের দেশে! তুমি চোখ মেলে দেখবে পরীর দেশের ফুল-ফল, রঙ-বেরঙের পাখি, আরও কত কী! তোমাকে অনেক কিছু খাওয়াবো যা তোমাদের দেশে নেই। ও-মা, তুমি যে কিছু বলছো না! তোমার কি মন খারাপ?
তিথি গোমরা মুখে বসে আছে। কোনো কিছুই বলছে না সে।
পরী এবার তিথিকে জড়িয়ে ধরে বললো, তিথি সোনা, বলো তো তোমার কী হয়েছে! আমাকে বলো, আমি তোমার সব সমস্যা সমাধান করে দেবো। চটপট বলো!
তিথির মনে একটু আশার সঞ্চার হলো। সে পরীকে তার ইচ্ছার কথা বলবে বলে ভাবছে। দাদু বলেছেন, পরীরা অনেক কিছু করতে পারে। তাদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তারা অনেক ভালো, মানুষের উপকারও করে।
তিথি বললো, তুমি আমার একটা উপকার করবে?
পরী বললো—বলে দেখোই না। সঙ্গে সঙ্গে কাজ হয়ে যাবে। তিথি বললো, তুমি কি জানো, পরশু ঈদ? তো যাদের টাকা আছে তারাই ঈদের পোশাক কিনবে, ভালো ভালো খাবার খাবে। আর যাদের নেই তারা ভালো ভালো খেতে পারবে না। ভালো পোশাক পরতে পারবে না। এটা কি ঠিক?
পরী রানী কিংকরি তিথির কথা বুঝতে পেরে তারপর উত্তর দিলো—না। কিছুতেই ঠিক নয়! তাহলে তুমি কী করতে চাও?
তিথি বললো, আমি সবাইকে ভালো-মন্দ খেতে দিতে চাই। ভালো পোশাক দিতে চাই। তুমি আমাকে হেল্প করবে পরী? তুমি আমাকে কিছু টাকা দেবে, বাবা এলে তোমাকে সব টাকা দিয়ে দেবো!
পরী এতোক্ষণ তিথির কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলো আর ভাবলো এ শিশু মেয়েটির কথা। পরীর দেশের রানী কিংকরি হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ করে হেসে উঠলো। আহা রে তিথি সোনা। ভাবছো কেনো, আমি আছি না! এই নাও জাদুর বাক্স। সঙ্গে সঙ্গে তিথির টেবিলের ওপর একটা বাক্স চলে এলো। তিথি দেখে তো অবাক! অসম্ভব সুন্দর একটা বাক্স। বাক্সটির চারপাশে ঝিকমিক করে আলো জ্বলছে। দাদু ঠিক বলেছেন, পরীরা জাদু জানে, না জানি এটার ভেতর কী আছে!
পরী রানী কিংকরী বললো, তিথি মণি, এই বাক্সটি এখন তোমার। এই বাক্সে দুটি জাদুর কাঠি আছে। একটি ধনদৌলতের, অন্যটি পোশাকের। প্রথম কাঠিটি কারো ঘরে গিয়ে বলবে—ইং বিং লিং, এই কথাটি তিনবার বলার সঙ্গে সঙ্গে দেখবে সেই বাড়ির সিন্দুকে টাকা-পয়সা ভরে গেছে। ওই টাকা সে কখনো শেষ করতে পারবে না। আর দ্বিতীয় কাঠিটি কারো স্পর্শ করে বলবে, টিং টং জং—এই কথাটিও তিনবার বলবে। সঙ্গে সঙ্গে দেখবে তার ঘর ভরতি পছন্দের পোশাক আর পোশাক এসে গেছে।
এ বলে পরীটি এক নিমিষে উড়ে তার দেশে চলে গেলো। আর যাওয়ার সময় বলে গেলো, আমার দরকার হলে বাক্সটির ওপর হাত রেখে বলবে—‘আয় ছুটে আয় পরী রানী’। এ কথাটি তিনবার বলার সঙ্গে সঙ্গে আমি তোমার সামনে হাজির হবো।
পরীর কথামতো তিথি দাদুকে নিয়ে বস্তিতে চলে গেলো। সঙ্গে নিলো সেই জাদুর বাক্সটি। খবর পেয়ে দলেবলে ছুটে এলো তার বন্ধুরাও। শুরু হলো অভিযান। একে একে বস্তির ঘরে ঘরে টাকা-পয়সা ধনদৌলতে ভরে যেতে লাগলো। চারদিকে নাম ছড়িয়ে পড়তে লাগলো তিথির।
কেউ আর এখন গরিব নেই। চারদিকে খুশির বন্যা বয়ে গেলো। এতোদিন যারা গরিব ছিল, তাদের আর নোংরা-আবর্জনা-ময়লার স্তূপে বাস করতে হবে না। কেউ আর তাদের টোকাই বলবে না। তারাও বানাবে বাড়ি, হবে গাড়ি। তাদের ছেলেমেয়েরা এখন স্কুলে যাবে, পড়ালেখা করবে। উফ! ভাবতেই ভালো লাগছে তিথির! শুধু এই ঈদটা নয়, সারা জীবনে যত ঈদ আসে, সবগুলো তাদের অনেক ভালো যাবে। যা তারা কখনো ভাবতেই পারেনি!
এমন আনন্দের মাঝে এক সময় তিনি অনুভব করলো, কে যেনো তার কোমরে ধাক্কা দিচ্ছে। বারবার সে হাত সরিয়ে দিচ্ছে তিথি। কিন্তু একবার-দুইবার-তিনবার, বারবার, এবার তিথি বকা দিলো তাকে, বললো দেখতে পারছো না আমি কাজে ব্যস্ত! তারপর ভালো করে দেখতে গিয়ে অবাক হলো সে! তিথি দেখলো, সে তার বিছানায় শুয়ে আছে! পাছে দাঁড়িয়ে আছে দাদু! তিথিকে বলছেন, তাড়াতাড়ি করো দাদুভাই। তোমার হোম টিউটর এসেছেন।
তিথি তাড়াতাড়ি চোখ মেলে দেখতে চাইলো জাদুর বাক্সটি! কিন্তু বাক্সটি আর নেই! তিথি ভাবছে, ব্যাপারটি তাহলে কী হলো? বস্তি থেকে আমি কখন এলাম বা কখন ঘুমিয়ে পড়লাম কিছুই তো বুঝতে পারছি না! দাদুকে জাদুর বাক্সের কথা জিজ্ঞেস করতেই দাদু বুঝলো তিথি স্বপ্ন দেখেছে। দাদু জাদুর বাক্সের কোনো খোঁজ দিতে পারলো না দেখে, তিথি কান্না শুরু করে দিলো।
তিথির সব ঘটনা শুনলো দাদু। তারপর ভাবলেন, এতোটুকু মেয়ের অনুভূতি সত্যিই প্রশংসনীয়। তার এই ভালো অনুভূতিকে নষ্ট করা যাবে না। মানুষকে ভালোবাসতে শেখাতে হবে। মানুষ তো মানুষের জন্য।
দাদু তিথিকে কোলে নিয়ে আদর করে বললেন, আমি হচ্ছি তোমার বন্ধু। তোমার চাওয়া তো আমার চাওয়া। নাও, তোমার আশা পূরণ হয়ে গেছে। তোমার বাবা প্রতি বছর জাকাত দেয়, সেখানে শাড়ি-লুঙ্গি রয়েছে। এবার তোমাদের মতো বন্ধুদেরও পোশাক আনা হয়েছে! চলো, আমরা সেগুলো বস্তিতে দিয়ে আসি।
এই মুহূর্তে তিথির সেই পরীটির ওপর ভীষণ রাগ হলো! পরীটি তাকে ফাঁকি দিয়েছে। পরীটির মতো মানুষের মুখে সব সময়ের জন্য হাসি ফুটিয়ে দিতে চায় সে। সামান্য কয়টা পোশাক দিয়ে কি সে আশা পূরণ হবে? বাবার মতো যাদের অনেক টাকা, তারা ইচ্ছা করলেই তো গরিব মানুষদের দিতে পারে, তাতে তো সেই পরীর জাদুর কাঠির ছোঁয়া লেগে যাবে প্রতি ঘরে ঘরে। একে অন্যকে সাহায্য করবে! কারো আর দুঃখ থাকবে না। কেউ আর না খেয়ে থাকবে না। সবার মুখে হাসি ফুটবে। এটাই ছিল তিথির চাওয়া।
সূত্র : আমার দেশ


দোয়েল এবং প্রজাপতিটা রাগ করেছিলো | আবেদীন জনী


এক খুকির নাম টুসটুসি। খুব পুচ্চি খুকি। কেবল অ আ ক খ পড়ে। তার একটা বর্ণমালার বই আছে। বইটা খুব সুন্দর। পাতায় পাতায় রঙিন বর্ণমালা। রঙিন রঙিন ছবি। প্রজাপতির ছবি। পাখির ছবি। ফুলের ছবি। হাঁসের ছবি। গাছের ছবি। মাছের ছবি। আরও অনেক অনেক ছবি। জানালার পাশে বসে টুসটুসি বর্ণমালার বই পড়ে। প্রতিদিন। সকাল-বিকেল।
জানালার ওপাশেই একটি গোলাপের গাছ। গাছে সবুজ পাতা। পাতার ফাঁকে ফাঁকে টুকটুকে লাল ফুল। বাতাসে দোল খায়। মিষ্টি গন্ধ ছড়ায়। সেই গন্ধ জানালা দিয়ে এসে টুসটুসিকে ছুঁয়ে যায়। টুসটুসি পড়ে আর পাতার দিকে তাকায়। ফুলের দিকে তাকায়। কখনও কোনো কারণে যদি ওর মন খারাপ হয়, তাহলে ফুল-পাতার দিকে তাকিয়ে থাকে অপলক চোখে। সঙ্গে সঙ্গে মনটা ভালো হয়ে যায় তার। এরপর মন রাখে বর্ণমালার বইয়ে। লেখার খাতায়।
একটা দোয়েল পাখি উড়ে এসে গোলাপ গাছে বসে। পাখা নাড়ে আর গান গায়। কিচমিচ, কিচিরমিচির। টুসটুসি অবাক হয়। এতো সুন্দর পাখি। মন ভোলানি তার গানের সুর। কিচমিচ, কিচিরমিচির। দোয়েলটার সঙ্গে ওর একসময় বন্ধুত্ব হয়ে যায়। ও পড়তে বসলেই কোথা থেকে যেন পাখিটা উড়ে আসে। এসেই গান জুড়ে দেয়। টুসটুসি গান শোনে আর বইয়ের পাতা ওল্টায়।
হঠাৎ একদিন টুসটুসি দেখলো কি_ গোলাপ গাছের পাতায় একটা প্রজাপতি। হায়, হায়, কী সুন্দর ডানা! কী অপরূপ! রূপ তো নয়, যেন রঙের কারখানা। টুসটুসি ওটা দেখা মাত্রই চিনে ফেলে। ওটা প্রজাপতি। চেনার কারণ হলো, ওর বর্ণমালার বইয়েও ঠিক একই রকম একটা ছবি আছে। ছবির নিচে লেখা প-তে প্রজাপতি। ও দোয়েল পাখি দেখে যতোটা অবাক হয়েছে, তার চেয়ে বেশি অবাক হলো প্রজাপতি দেখে। এমন জাদুমাখা রূপ যেন আর কারও নেই।
প্রজাপতিটাও গোলাপ গাছের পাতায় বসে থাকে। ফুলেও বসে। আর নাড়াচাড়া করে কোমল ডানা দুটি। মাঝে মধ্যে কোথায় যেন চলে যায় উড়তে উড়তে। একটু পর আবার আসে। টুসটুসি পড়তে বসলেই দোয়েলটা আসে। প্রজাপতিও আসে। ওরা হয়তো টুসটুসিকে ভীষণ ভালোবাসে। টুসটুসি তো মিষ্টি সুরে বর্ণমালা পড়ে। পড়া শুনতেও বুঝি ওরা খুব মজা পায়।
দোয়েল, প্রজাপতি ও টুসটুসি_ এই তিনজন এখন একে অপরের বন্ধু। কীভাবে এমন নিবিড় বন্ধুত্ব হলো, টুসটুসি ভেবে পায় না। তবে এটুকু বুঝতে পারে যে, দোয়েলের শিস না শুনলে, প্রজাপতির রূপ-ডানা দেখতে না পারলে ওর পড়ালেখাই হবে না।
কিন্তু একদিন একটা ঘটনা ঘটলো। টুসটুসির বাবা কেটে ফেললো গোলাপ গাছটা। কারণ ওই গাছটার জন্য নাকি জানালা দিয়ে পর্যাপ্ত বাতাস ঘরে ঢুকতে পারে না। টুসটুসি তো খুবই আদরের মেয়ে। টাটকা বাতাস না পেলে ওর মন ভালো থাকবে কী করে! মন ভালো না থাকলে তো পড়ালেখাও ভালো হবে না। ওকে নিয়ে মা-বাবার অনেক স্বপ্ন। পড়ালেখা করে আলোয় আলোয় বড় হবে ও। মানুষ হবে। অনেক বড় মানুষ। ও যাতে ঠিকমতো আলো-বাতাস পায়, পড়ালেখায় যাতে কোনো অসুবিধা না হয়, সে জন্যই কেটে ফেলা হয়েছে গাছটি।
যে জন্য গাছ কাটা হলো, ঘটলো তার উল্টো। টুসটুসির এখন মন ভালো থাকে না একটুও। বইয়ের পাতায়, লেখায় মন বসে না। গোলাপ গাছটা কাটার পর থেকে দোয়েলটাও আসে না। প্রজাপতিটাও না। আসবে যে, বসবে কোথায়? দোয়েলটা এখন হয়তো দূরের কোনো গাছে বসে শিস কাটে। প্রজাপতিও চলে গেছে অন্য কোথাও। অন্য কোনো ফুল বাগানে। টুসটুসির এখন দোয়েল ও প্রজাপতির সঙ্গে কথা বলা হয় না। তাকিয়ে থাকা হয় না লাল লাল ফুলের দিকে। তাহলে ওর মন ভালো থাকবে কেমন করে? মন ভালো না থাকলে পড়তেও ইচ্ছা হয় না। ওর মনে পড়ে দোয়েলের কথা। প্রজাপতির কথা। লাল লাল গোলাপ ফুলের কথা। টুসটুসি শুধু শুধু জানালার পাশে পড়ার টেবিলে বই-খাতা-কলম নিয়ে মুখ ভার করে বসে থাকে। পড়তে চেষ্টা করে। মুখস্থ হয় না। একসময় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে পানি। মা এসে বলেন, 'তোমার কী হয়েছে মামণি? তুমি কাঁদছো কেন?'
_আমার গোলাপ গাছটা চাই মা। বাবা যে গাছ কেটে ফেলেছে; সেই গাছ। লাল লাল ফুল চাই। দোয়েল বন্ধু চাই। চাই প্রজাপতি বন্ধু।
_কেটে ফেলেছে তো কী হয়েছে? আজই একটা গোলাপ চারা জানালার পাশে রোপণ করে দেবো। সেটা বড় হলে আবারও ফুল ফুটবে। দোয়েল আসবে। প্রজাপতি আসবে।
_বড় হতে তো অনেক দিন লাগবে। আমি যে এক্ষুনি চাই। না হলে দোয়েল বন্ধুটা আসবে না। আসবে না প্রজাপতি। গোলাপের গাছ না পেলে আমি কথা বলবো না। খাবো না। পড়বো না। ইশকুলে যাবো না।
টুসটুসির মন খারাপ হওয়ার ব্যাপারটা ওর বাবাও জেনে গেলেন। তিনিও বুঝতে পারলেন যে, গোলাপ গাছটা কেটে ফেলা ঠিক হয়নি। এখন কী করে মেয়ের মন ভালো করা যায়, সেই চিন্তা করতে লাগলেন তিনি। তারপর খুঁজে পেলেন সমস্যা সমাধানের উপায়। নার্সারি থেকে কিনে আনলেন গোলাপের টব। টবের গাছে থোকা থোকা লাল ফুল। আগে যেখানে গাছটি ছিলো, ঠিক সেই জায়গায় টবটি বসিয়ে দিলেন।
গোলাপ গাছ ফিরে পেয়ে টুসটুসির মন খুশিতে এক্কেবারে টইটম্বুর। সেদিন বিকেলেই জানালার পাশে পড়তে বসলো টুসটুসি। তারপর পাতার দিকে তাকালো। ফুলের দিকে তাকালো। দু'চোখ জুড়িয়ে গেলো পাতার সবুজ আর রাঙা ফুলের সৌন্দর্য দেখে। এখন দোয়েল এবং প্রজাপতির জন্য অপেক্ষা করছে ও। কিছুক্ষণের মধ্যেই কোথা থেকে শিস কাটতে কাটতে উড়ে এলো দোয়েল। উড়ে এলো প্রজাপতি। গোলাপ গাছে বসলো ওরা। টুসটুসির মনটাও তখন আনন্দে দোয়েল হয়ে উঠলো। প্রজাপতি হয়ে উড়তে লাগলো।
টুসটুসি দোয়েল ও প্রজাপতিকে বললো, 'গোলাপ গাছটা কেটে ফেলেছিলো বলে তোমরা খুব রাগ করছিলে, তাই না?'
দোয়েল কিচমিচ, কিচিরমিচির শব্দে বললো, 'হ্যাঁ, খুব রাগ করেছিলাম।' প্রজাপতি পাখা নেড়ে সে কথাই বুঝিয়ে দিলো।
_এবার রাগ ভেঙেছে তো? আজ থেকে তোমরা প্রতিদিন আসবে। আসবে কিন্তু!
দোয়েল শিস কেটে বলল, 'আসবো বন্ধু, আসবো।'
প্রজাপতি পাখা ঝাঁকিয়ে বললো, আসবো বন্ধু, আবার আসবো।' 

সূত্র : সমকাল


বাঘ মামা আর শিয়াল ভাগ্নে | উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী



শিয়াল ভাবে,`বাঘমামা, দাড়াঁও তোমাকে দেখাচ্ছি!' এখন সে আর নরহরি দাসের ভয় তার পুরোনো গর্তে যায় না, সে একটা নতুন গর্ত খুজে বার করেছে।
সেই গর্তের কাছে একটা কুয়ো ছিল।
একদিন শিয়াল নদির ধারে একটা মাদুর দেখতে পেয়ে, সেটাকে তার বাড়িতে নিয়ে এল। এনে, সেই কুয়োর মুখের উপর তাকে বেশ করে বিছিয়ে বাঘকে গিয়ে বললে,'মামা, আমার নতুন বাড়ি দেখতে গেলে না?' শুনে বাঘ তখুনি তার নতুন বাড়ি দেখতে এল। শিয়াল তাকে সেই কুয়োর মুখে বিছানো মাদুরটা দেখিয়ে বললে, `মামা, একটু বস, জলখাবার খাবে।'
জলখাবারের কথা শুনে বাঘ ভরি খুশি হয়ে, লাফিয়ে সেই মাদুরের উপর বসতে গেল, আর অমনি সে কুয়োর ভিতরে পড়ে গেল। তখন শিয়াল বললে, `মামা, খুব করে জল খাও, একটুও রেখ না যেন!'
সেই কুয়োর ভিতরে কিন্তু বেশি জল ছিল না, তাই বাঘ তাতে ডুবে মারা যায়নি। সে আগে খুবই ভয় পেয়েছিল, কিন্তু শেষে অনেক কষ্টে উঠে এল। উঠেই সে বললে, `কোথায় গেলি রে শিয়ালের বাচ্চা? দাঁড়া তোকে দেখাচ্ছি।' কিন্তু শিয়াল তার আগেই পালিয়ে গিয়েছিল, তাকে কিছুতেই খুঁজে পাওয়া গেল না।
তারপর থেকে বাঘের ভয়ে শিয়াল তার বাড়িতেও আসতে পারে না, খাবার খুঁজতেও যেতে পারে না। দুর থেকে দেখতে পেলেই বাঘ তাকে মারতে আসে। বেচারা না-খেয়ে না-খেয়ে শেষে আধমরা হয়ে গেল।
তখন সে ভাবলে, `এমন হলে তো মরেই যাব। তার চেয়ে বাঘ মামার কাছে যাই না কেন? দেখি যদি তাকে খুশি করতে পারি।'
এই মনে করে সে বাঘের সাথে দেখা করতে গেল। বাঘের বাড়ি থেকে অনেক দুরে থাকতেই সে নমস্কার করছে আর বলছে, `মামা, মামা!'
শুনে বাঘ আশ্চর্য হয়ে বললে, `তাই তো, শিয়াল যে!'
শিয়াল অমনি ছুটে এসে, তার পায়ের ধুলো নিয়ে বললে, `মামা, আমাকে খুঁজতে গিয়ে তোমার বড় কষ্ট হচ্ছিল, দেখে আমার কান্না পাচ্ছিল। মামা, আমি তোমাকে বড্ড ভালোবাসি তাই এসেছি। আর কষ্ট করে খুঁজতে হবে না, ঘরে বসেই আমাকে মার।'
শিয়ালের কথায় বাঘ তো ভারি থতমত খেয়ে গেল। সে তাকে মারলে না, খালি ধমকিয়ে বললে, `হতভাগা পাজি, আমাকে কুয়োয় ফেলে দিয়েছিলি কেন?'
শিয়াল জিভ কেটে কানে হাত দিয়ে বললে, `রাম-রাম। তোমাকে আমি কুয়োয় ফেলতে পারি? সেখানকার মাটি বড্ড নরম ছিল, তার উপর তুমি লাফিয়ে পড়েছিলে, তাই গর্ত হয়ে গিয়েছিল। তোমার মত বীর কি মামা আর কেউ আছে?'
তা শুনে বোকা বাঘ হেসে বললে, `হ্যাঁ-হ্যাঁ ভাগ্নে সে কথা ঠিক। আমি তখন বুঝ্তে পারিনি।'
এমনি করে তাদের আবার ভাব হয়ে গেল।
তারপর একদিন শিয়াল নদীর ধারে গিয়ে দেখল যে, বিশ হাত লম্বা একটা কুমির ডাঙায় উঠে রোদ পোয়াচ্ছে। তখন সে তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে বাঘকে বললে, `মামা, মামা একটা নৌকা কিনেছি, দেখবে এসো।'
বোকা বাঘ এসে সেই কুমিরটাকে সত্যি-সত্যি নৌকা মনে করে লাফিয়ে তার উপর উঠতে গেল, আর অমনি কুমির তাকে কামড়ে ধরে জলে গিয়ে নামল।
তা দেখে শিয়াল নাচতে নাচতে বাড়ি চলে গেল।


টুনটুনি আর রাজার কথা | উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী



রাজার বাগানের কোণে টুনটুনির বাসা ছিল। রাজার সিন্দুকের টাকা রোদে শুকোতে দিয়েছিল, সন্ধ্যার সময় তার একটি টাকা ঘরে তুলতে ভুলে গেল।
টুনটুনি সেই চকচকে টাকাটি দেখতে পেয়ে তার বাসায় এসে রেখে দিলে, আর ভাবলে, `ঈস্! আমি কত বড়োলোক হয়ে গেছি। রাজার ঘরে যে ধন আছে, আমার ঘরে সেই ধন আছে!' তারপর থেকে সে কেবলি এই কথাই ভাবে, আর বলে---
রাজার ঘরে যে ধন আছে
টুনির ঘরে সে ধন আছে!
রাজা সভায় বসে সে কথা শুনতে পেয়ে জিগগেস করলেন, `হ্যাঁরে! পাখিটা কি বলছে রে?'
সকলে হাত জোড় করে বললে, `মহারাজ, পাখি বলছে, `আপনার ঘরে যে ধন আছে, ওর ঘরেও নাকি সেই ধন আছে!' শুনে রাজা খিল্‌খিল্ করে হেসে বললেন, `দেখ তো ওর বাসায় কি আছে।'
তারা দেখে এসে বললে, `মহারাজ, বাসায় একটি টাকা আছে।'
শুনে রাজা বললেন, `সে তো আমারই টাকা, নিয়ে আয় সেটা।'
তখুনি লোক গিয়ে টুনটুনির বাসা থেকে টাকাটি নিয়ে এল। সে বেচারা আর কি করে, সে মনের দূঃখে বলতে লাগল---
রাজা বড় ধনে কাতর
টুনির ধন নিলে বাড়ির ভিতর!
শুনে রাজা আবার হেসে বললেন, `পাখিটা বড় ঠ্যাঁটা রে! যা, ওর টাকা ওকে ফিরিয়ে দিয়ে আয়।'
টাকা ফিরে পেয়ে টুনির বড় আনন্দ হয়েছে। তখন সে বলছে---
রাজা ভারি ভয় পেল
টুনির টাকা ফিরিয়ে দিল
রাজা জিগগেস করলেন, `আবার কি বলছে রে?'
সভার লোকেরা বললে, `বলছে মহারাজ নাকি বড্ড ভয় পেয়েছেন, তাই ওর টাকা ফিরিয়ে দিয়েছেন।'
শুনে তো রাজামশাই রেগে একেবারে অস্থির! বললেন, `কি এত বড় কথা! আন তো ধরে, বেটাকে ভেজে খাই!'
যেই বলা অমনি লোক গিয়ে টুনটুনি বেচারাকে ধরে আনলে! রাজা তাকে মুঠোয় করে নিয়ে বাড়ির ভিতর গিয়ে রানীদের বললেন, `এই ভেজে আজ আমাকে খেতে দিতে হবে!'
বলে তো রাজা চলে এসেছেন, আর রানিরা সাতজনে মিলে সেই পাখিটাকে দেখছেন।
একজন বললেন, `কি সুন্দর পাখি! আমার হাতে দাও তে একবার দেখি।' বলে তিনি তাকে হাতে নিলেন। তা দেখে আবার আর একজন দেখতে চাইলেন। তাঁর হাত থেকে যখন আর একজন নিতে গেলেন, তখন টুনটুনি ফস্কে উড়ে পালাল!
কি সর্ব্বনাশ! এখন উপায় কি হবে? রাজা জানতে পারলে তো রক্ষা থাকবে ন!
এমনি করে তারা দুঃখ করছেন, এমন সময় একটা ব্যাঙ সেইখান দিয়ে থ্প-থ্প করে যাচ্ছে। সাত রানী তাকে দেখতে পেয়ে খপ করে ধরে ফেললেন, আর বললেন, `চুপ-চুপ! কেউ যেন জানতে না পারে! এইটেকে ভেজে দি, আর রাজামশায় খেয়ে ভাববেন টুনটুনিই খেয়েছেন।'
সেই ব্যাঙটার ছাল ছাড়িয়ে তাকে ভেজে রাজামশাইকে দিলে তিনি ভারি খুশি হলেন।
তারপর সবে তিনি সভায় গিয়ে বসেছেন, আর ভাবছেন, `এবারে পাখির বাছাকে জব্দ করেছি।'
অমনি টুনি বলছে---
বড় মজা, বড় মজা,
রাজা খেলেন ব্যাঙ ভাজা!
শুনেই তো রাজামশাই লাফিয়ে উঠেছেন! তখন তিনি থুতু ফেলেন, ওয়াক তোলেন, মুখ ধোন, আর কত কি করেন। তারপর রেগে বললেন, `সাত রানীর নাক কেটে ফেল।'
অমনি জল্লাদ গিয়ে সাত রানীর নাক কেটে ফেললে।
তা দেখে টুনটুনি বললে---
এক টুনিতে টুনটুনাল
সাত রানীর নাক কাটাল!
তখ্ন রাজা বললেন, `আন বেটাকে ধরে! এবার গিলে খাব! দেখি কেমন করে পালায়!'
টুনটুনিকে ধরে আনলে।
রাজা বললেন, `আন জল!'
জল এল। রাজা মুখ ভরে জল নিয়ে টুনটুনিকে মুখে পুরেই চোখ বুজে ঢক করে গিলে ফেললেন।
সবাই বলে, `এবার পাখি জব্দ!'
বলতে বলতেই রাজামশাই ভোক্ করে একটা ঢেকুর তুললেন।
সভার লোক চমকে উঠল, আর টুনটুনি সেই ঢেকুরের সঙ্গে বেরিয়ে এসে উড়ে পালাল।
রাজা বললেন, `গেল, গেল! ধর, ধর!' অমনি দুশো লোক ছুটে গিয়ে আবার বেচারাকে ধরে আনল।
তারপর আবার জল নিয়ে এল, আর সিপাই এসে তলোয়ার নিয়ে রাজামশায়ের কাছে দাঁড়াল, টুনটুনি বেরুলেই তাকে দু টুকরো করে ফেলবে।
এবার টুনটুনিকে গিলেই রাজামশাই দুই হাতে মুখ চেপে বসে থাকলেন, যাতে টুনটুনি আর বেরুতে না পারে। সে বেচারা পেটের ভেতর গিয়ে ভয়ানক ছটপট করতে লাগল!
খানিক বাদে রাজামশাই নাক সিঁটকিয়ে বললেন, `ওয়াক!' অমনি টুনটুনিকে সুদ্ধ তার পেটের ভিতরেও সকল জিনিস বেরিয়ে এল।
সবাই বললে, `সিপাই, সিপাই! মারো, মারো! পালালো!'
সিপাই তাতে থতমত খেয়ে তলোয়ার দিয়ে যেই টুনটুনিকে মারতে যাবে, অমনি সেই তলোয়ার টুনটুনির গায়ে না পড়ে, রাজামশায়ের নাকে গিয়ে পড়্ল।
রাজামশাই তো ভয়ানক চ্যাঁচালেন, সঙ্গে-সঙ্গে সভার সকল লোক চ্যাঁচাতে লাগল। তখন ডাক্তার এসে পটি বেঁধে অনেক কষ্টে রাজামশাইকে বাঁচাল।
টুনটুনি তা দেখে বলতে লাগল---
নাক কাটা রাজা রে
দেখ তো কেমন সাজা রে!
বলেই সে উড়ে সে দেশ থেকে চলে গেল। রাজার লোক ছুটে এসে দেখল, খালি বাসা পড়ে আছে।


নাসির উদ্দিন হোজ্জার কৌতুক | ২ |


গায়ের জামা
হোজ্জার বাড়িতে এক বন্ধু এসেছেন বেড়াতে। সন্ধ্যায় প্রতিবেশীদের সাথে পরিচয় করাতে নিয়ে যাওয়ার সময় হোজ্জা নিজের একটি ভাল পোশাক ধার দিলেন। প্রথম বাড়িতে হোজ্জাকে বন্ধুকে পরিচয় করিয়ে দেবার সময় এও জানালেনঃ "এঁর গায়ে যে পোশাকটি দেখছেন, তা আসলে আমার।"
সেখান থেকে বেরিয়ে বন্ধু মহা ক্ষ্যাপা। "কী দরকার ছিল ওটা বলে আমাকে অপমান করার?" হোজ্জা ক্ষমা চাইলেন।
দ্বিতীয় বাড়িতে গিয়ে বললেন, "এঁর গায়ে যে পোশাকটি দেখছেন, তা আসলে এঁরই।" এবার তো বন্ধু আরো ক্ষ্যাপলেন। "পোশাকটি নিয়ে তুমি কিছু না বলাই ভাল"
তৃতীয় বাড়িতে গিয়ে তাই হোজ্জা বললেন, "ইনি আমার ঘনিষ্ট বন্ধু আর এঁর গায়ে যে পোশাকটি দেখছেন, সে সম্পর্কে কিছু না বলাই ভাল!"

আঙুর বিক্রেতা হোজ্জা
হোজ্জা বাজারে বসেছেন আঙুর বিক্রেতা হিসেবে। এক বন্ধুকে দেখে তার কাছেই আঙুর বেচতে চাইলেন। কিন্তু, বন্ধু বললেন যে, তার কাছে টাকা নেই। হোজ্জা উদার মানুষ। বললেন, "আপনি বন্ধু মানুষ। টাকা পরে দিলেও চলবে। দুটো আঙুর মুখে দিয়ে দেখুন, মধুর মত মিষ্টি।" বন্ধু অপারগতা জানিয়ে বললেন যে, তিনি রোজাদার। হোজ্জার জিজ্ঞাস্য, রোজার মাস আসতে এখনো দুই মাস বাকি। এখনই রোজা? বন্ধু বিগত বছরের ভাঙা রোজাগুলো পূরণ করার কথা জানালেন। সাথে সাথে হজ্জা বললেন, " ভাই আমি তোমার কাছে আঙুর বেচব না, যে লোক খোদার বাকি পূরণ করতে দশ মাস লাগায়, সে আমার বাকি টাকা দিতে ক'বছর লাগাবে?"


সূর্য ও পাতার গল্প || হোসেন শওকত


লোকটা নাকি জাদুকর দেখতে রবীন্দ্রনাথের মতো বড় বড় চুল আর দাড়ি সকালে ঘুম থেকে উঠে চুল শুকাতে দেয় সেই চুল এতো বড় যে, পৃথিবী অব্দি চলে আসে
পৃথিবী একটা সবুজ গ্রহ। সেটার প্রতি সবার লোভ। সেখানে মানুষের বাস। ওই গ্রহের সবাই ভাবে, পৃথিবীটা দখল করার জন্যই বুঝি বুড়োর এই পাঁয়তারা, ফন্দি-ফিকির। চুলের মায়াজাল ফেলে পৃথিবীকে বশ করতে চায় সে। আবার কেউ কেউ বলে, আগে চুল ফেলে পৃথিবীর প্রতিক্রিয়া পরখ করে নিচ্ছে সে। তেমন প্রতিবাদ না দেখলে আস্তে ধীরে পা ফেলবে। তারপর সারা শরীর। ধীরে ধীরে দখল করে নেওয়ার বুদ্ধি।
পৃথিবীর মানুষজন তো আর বোকা নয়! ধরে ফেললো জাদুকরের বুদ্ধি। ভাবলো, বুড়োকে বাড়তে দেওয়া যাবে না। পাটকাঠিতে আগুন ধরিয়ে লাগিয়ে দিলো বুড়োর চুলে। ধিকিধিকি জ্বলতে লাগলো সেই আগুন। ছড়াতে লাগলো। চুল বেয়ে বেয়ে আগুন পেঁৗছে গেলো বুড়োর মাথা পর্যন্ত।
লক্ষ লক্ষ চুল বেয়ে আগুন যখন মাথায় পেঁৗছালো, তখন বিরাট অগি্নপিণ্ডে পরিণত হলো। কত্তো বিরাট? বোঝানো কষ্টকর। যারা সূর্য দেখেছো, তারাই বুঝবে! সেখানে আগুনের শিখা দাউদাউ জ্বলছে। কিন্তু তবুও পুড়ছে না মুখ। জাদুকরের মুখ বলে কথা!
দিনভর জ্বলে সেই চুল। এতো মিহি চুল_ খালি চোখে ধরা পড়ে না। সবুজ পাতার ফাঁক গলে কেউ তাকালে শুধু চোখে পড়ে সূক্ষ্ম রেখার মতো চুল। অবশ্য তাপ ঠিকই টের পাওয়া যায়। দুপুর হলে সবাই অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে। চুলগুলো ধরে টানাটানি শুরু করে। টানতে টানতে নামিয়ে আনে বুড়োকে নিচে।
কিন্তু জাদুকর বলে কথা! নামানো কি এতো সোজা! বড়শিতে মাছ ধরা পড়লে কতো কসরত করে তুলতে হয়; কত্তো সময় লাগে! তাই নামতে নামতে সন্ধ্যা। সবাই হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। ভাবে, যাক জাদুকরের হাত থেকে বাঁচা গেলো। তাই নিশ্চিন্ত মনে ঘরে ফেরে। খেয়ে-দেয়ে ঘুমোতে যায়।
কিন্তু কী দুর্ভাগ্য! মানুষ অজ্ঞান হলে যে রকম মাথায় পানি দেওয়া হয়, জাদুকরকেও সে রকম ঢালা হয়। তবে বিন্দু বিন্দু। ফলে অজ্ঞান ভাব কাটে তার। আবার জেগে ওঠে। ভোর বেলা। পুবদিকে। যদিও তাকে টেনে নামানো হয়েছিলো পশ্চিমে। কিন্তু ভেসে ওঠে পূর্বে। কীভাবে, জানো? পৃথিবীর মানুষ তো মারমুখী হয়ে তাকে নামিয়ে আনলো। সে ভয় পেলো খুব। সুড়ঙ্গে লুকালো। তারপর পথ হারিয়ে ফেললো। সুড়ঙ্গের গোলকধাঁধায় ঘুরতে ঘুরতে ভেসে ওঠলো পূর্বে। ভয়ে আর উদ্বেগে চোখমুখ লাল।
আকাশ মাঝে মাঝে কালো চাদরে ঢেকে দেয় বুড়োকে। পৃথিবী তখন কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। ভাবে, গুণ্ডা সূর্যটা বুঝি নেই! কিন্তু সূর্য তো জাদুকর। এইসব আড়াল কি তার সহ্য হয়? এক সময় ঠিকই আড়াল ভেদ করে বেরিয়ে আসে। মেঘের ফাঁকে ফিক করে হাসি দেয়। টিটকিরি মেরে বলে, 'কী, পারলে আমাকে চাপা দিয়ে রাখতে? ছাই দিয়ে কি আগুন চেপে রাখা যায়?'
অবশ্য জাদুকর যে সব সময় জেতে, তা কিন্তু নয়। মাঝে মধ্যে মেঘের সঙ্গে বেধে যায় ধুন্ধুমার যুদ্ধ। কড়কড় শব্দ করে একজন আরেকজনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। দুজনের হাতের তরবারিতে আলো পড়ে ঝিলিক দিয়ে ওঠে। দাঁতে দাঁত ঘষে কিড়মিড় করে। সে কী বিকট শব্দ! দুজনের সংঘর্ষ দেখে বাতাস পর্যন্ত ছুটে পালাতে চায়। গাছপালা ভয়ে তটস্থ। কাঁপতে থাকে। নারকেল গাছ দুহাত জোড় করে মিনতি করে, 'আমায় বাঁচাও। তোমার সঙ্গে নিয়ে যাও।'
বাতাসের বয়েই গেলো এসব উটকো ঝামেলা কাঁধে নিতে!
এ যুদ্ধ কখনও চলে দশ-পনেরো মিনিট। কখনও এক-দুই ঘণ্টা। তারপর সব শুনসান। সন্ধি হয় দুই পক্ষে। শান্ত হয় বাতাস। জাদুকরকে তখন অনেক ঝলমলে, উজ্জ্বল মনে হয়। যেন পুরনো শার্টকে কাপড় কাচার সাবান দিয়ে ঝকঝকে করে ধোয়া হয়েছে। দ্যুতি ছড়াচ্ছে। ঝড় জলের ওয়াশিং মেশিনে গাছের পাতাগুলো ঝকমকে ধোয়া হয়ে যায়। পরদিন পাতাগুলো জাদুকরের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। বলে, 'আমাকে একটু উত্তাপ দাও। আলো দাও।'
_কী করবে তুমি উত্তাপ আর আলো দিয়ে?
_রান্না করবো।
_কী রান্না করবে?
_খাবার।
_তোমার নিজের জন্য? সে জন্য তোমার এক-সূর্য আলো দরকার?
_শুধু কি আমার নিজের জন্য?
_তাহলে আর?
_আর রাঁধবো সারা পৃথিবীর জন্য। সব প্রাণীর জন্য।
_বলো কী! সারা পৃথিবীর জন্য রান্না করছো তুমি! তাহলে তো তোমার চুলা অনেক বড়। কোথায় রেখেছো তোমার সেই বিশাল চুলা?
_এই যে আমার শিরায় শিরায়। সব পাতাতে ছড়িয়ে রাখা। সবাই ভাগাভাগি করে নিলে বিশাল কাজও সাধ্যের মধ্যে চলে আসে।
_এতো বড় কাজ করলে তো আমরা হুলস্থূল বাধিয়ে দিতাম। তোমাদের ভাব দেখে তো বোঝাই যায় না।
_কাজটা করি আমরা অন্তর থেকে। ভেতরে ভেতরে। বাহিরে তাই হাঁকডাক নেই। ভালোবেসে কোনো কাজ করলে এ রকমই ঘটে। চুপচাপ। কিন্তু নিখাদ আর নির্ভুল।
জাদুকরের আলো মসৃণ পাতায় পড়ে ঠিকরে যায়। একটু বিষণ্ন হয়। সে ভেবেছিলো, সবার মধ্যে সে-ই সেরা। এখন বুঝলো, তার ধারণা ভুল। ফলাও না করলেও অথবা চকচক না করেও অনেকে অনেক বড় কাজ করছে। করে যাচ্ছে। চুপচাপ, নীরবে-নিভৃতে।
সূত্র : সমকাল


জলহস্তী ও কচ্ছপ || সুহৃদ সরকার


অনেক অনেক দিন আগের কথা। এক জলহস্তীর নাম ছিলো পবন ঠাকুর। স্থলরাজ্যের বেশ বড়-সড় প্রাণী। হাতির পরেই ছিলো তার স্থান। তবে সে নিজেকে প্রাণীদের রাজা বলে ঘোষণা করেছিলো। তো রাজা জলহস্তীর ছিলো সাত সাতটি রানী। যখন তখন সে বড় বড় ভোজসভার আয়োজন করতো। রাজ্যের সবাইকে সে ভোজসভায় ডাকা হতো। মজার ব্যাপার ছিলো, জলহস্তীর সাত স্ত্রী ছাড়া কেউ তার আসল নামটি জানতো না। এক ভোজসভায় সব অতিথি ভোজনের জন্য তৈরি। ঠিক সেই সময় রাজা জলহস্তী বললো, যদি তোমরা আমার নাম না বলতে পারো তবে তোমরা সবাই ভোজন না করেই চলে যাও।
কেউ যেহেতু তার নাম জানতো না তাই তারা খাওয়া-দাওয়া না করেই ভোজসভা ত্যাগ করলো। স্থান ত্যাগ করার আগে একটি কচ্ছপ মাথা উঁচু করে বললো, আগামী ভোজসভায় যদি আমি আপনার নাম বলতে পারি তখন কী উপহার দেবেন?
আমার নাম যদি কেউ বলতে পারে, তবে তখনই আমি আমার পুরো পরিবারসহ এই রাজ্য ছেড়ে চলে যাবো। আর সারাজীবন জলের মধ্যে বাস করবো।
প্রতিদিন সকালে জলহস্তী ও তার সাত রাণী নদীতে যেতো গোসল আর জলপানের জন্য। এই অভ্যাস ছিলো কচ্ছপেরও। জলহস্তী দ্রুত চলতো। পিছে পিছে যেতো সাত রানী। একদিন নদীতে গোসল করতে নেমেছে তারা সবাই। রাস্তার ওপর ছোট একটি গর্ত খুঁড়লো কচ্ছপ। তারপর বসে বসে অপেক্ষা করছে কচ্ছপটি। গোসল সেরে তারা ফিরে আসছে প্রাসাদে। দুই রানী বেশ খানিকটা পেছনে পড়ে গেলো। কচ্ছপটি তখন আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে এবং গর্তের মধ্যে অর্ধেকটা শরীর ঢুকিয়ে রাখলো। সে তার পিঠের খোলসের বেশি অংশ বাইরে রাখলো।
জলহস্তীর দুই রানীর একজনের পা পড়লো কচ্ছপের খোলসের ওপর। ভয়ে সে রাজাকে চিৎকার করে বললো, শোনো পবন ঠাকুর, শোনো। ও আমার স্বামী। আমি পায়ে ব্যথা পেয়েছি গো ...।
জলহস্তীর নাম জানতে পেরে নাচতে নাচতে বাড়ি ফিরে গেলো কচ্ছপটি।
পরদিন আবার ভোজসভার আয়োজন করা হলো। আবার একই শর্ত জুড়ে দিলো জলহস্তী।
কচ্ছপ উঠে দাঁড়িয়ে বললো, প্রতিজ্ঞা করুন, আমি আপনার নাম বলতে পারলে আমাকে মারবেন না।
জলহস্তী প্রতিজ্ঞা করলো।
কচ্ছপ চিৎকার করে বললো, আপনার নাম পবন ঠাকুর।
উপস্থিত সবাই তখন কচ্ছপের নামে জয়ধ্বনি দিয়ে ভোজসভায় যোগ দিলো।
ভোজ শেষ হওয়ার পর প্রতিজ্ঞামতো জলহস্তী ও তার সাত রানী নদীতে চলে গেলো। আর কচ্ছপকে দিলো সারা রাজ্যময় ঘুরে বেড়ানোর অধিকার। সেই থেকে জলহস্তী ও তার স্ত্রীরা আজও নদীর মধ্যেই বাস করছে। রাতের বেলায় তারা ডাঙায় এলেও দিনে তাদের কখনও ডাঙায় দেখা যায় না। তারা হয়ে গেলো জলবাসী।
সূত্র : সমকাল


শালিক ও কাঠঠোকরার গল্প || ইকবাল খন্দকার


কাঁঠাল গাছটা বেশ পুরোনো। বয়স কম করে হলেও পঞ্চাশ তো হবেই। এই গাছের ডালেই ছোটখাটো একটা গর্ত। আর এই গর্তে বাস করে একটা শালিক। বেশিরভাগ সময়ই অবশ্য সে গর্তের বাইরে থাকে। এমনকি রাতের বেলায়ও। কিন্তু ঝড় বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই। সোজা ঢুকে পড়ে ডালের গর্তে। মুষলধারে যতই বৃষ্টি হোক, তার গায়ে একটা ফোঁটাও লাগে না। এমন চমৎকার একটা জায়গা পেয়ে দারুণ খুশি শালিকটা। এই জায়গাটা না পেলে হয়তো তাকেও ভিজতে হতো অন্যান্য পাখিদের মতো। তারপর জ্বর ঠাণ্ডা আরো কত কী হতে পারত!
সেদিন গর্তে বসে ঘুমোচ্ছিলো শালিকটা। হঠাৎ ঠকঠক শব্দে তার ঘুম ভেঙে গেলো। এমন কাঁচা একটা ঘুম ভেঙে যাওয়ার কারণে মেজাজটা ভালোই খারাপ হলো শালিকের। তড়িঘড়ি করে সে বের হলো গর্ত থেকে। দেখতে পেলো তার বাসার পাশেই গর্ত খুঁড়ছে এক কাঠঠোকরা। খুব রাগ হলো শালিকের। খুব কড়া করে বললো_আরে বাপু, তুমি আর জায়গা পেলে না? আমার বাসার পাশে এসে বাসা বানাচ্ছো! আমার ঘুমের সমস্যা করছো? কাঠঠোকরা বললো_আমার ভুল হয়ে গেছে শালিক ভাই। আমি জানতাম না তুমি যে ঘুমুচ্ছো।
শালিক আগের মতোই বললো_তোমার জেনে নেওয়া উচিত ছিলো। কারো বাসার পাশে এসে ঠকঠক করবে, এটা তো ঠিক না। তুমি আমার অনুমতি নিয়ে নিলে পারতে। শত হলেও এই বাসাটা আমার। আমার বাসার পাশে তোমাকে কোন কাজ করতে দেবো কি দেবো না, সেটা আমার ব্যাপার। শালিকের মুখে বারবার 'আমার বাসা আমার বাসা' শুনে কাঠঠোকরা বললো_তুমি ভুল করছো শালিক ভাই। তুমি যে বাসাটাকে তোমার বাসা বলছো, সেটা কিন্তু আমারই বানানো। অনেক কষ্ট করে ডাল খুঁড়ে খুঁড়ে বানিয়েছিলাম।
কাঠঠোকরার কথাগুলো ভালো লাগলো না শালিকের। কারণ কে বানিয়েছে সেটা বড় কথা না। বাসাটা এখন তার নিজের, সেটাই হলো বড় কথা। তাই শালিকটা মুখ কালো করে ঢুকে গেলো গর্তের ভেতরে। কাঠঠোকরাও আর কোনো কথা না বলে উড়ে গেলো অন্যদিকে। শালিকের কথায় সে কষ্ট পেলো না। সে ধরে নিলো শালিকের হয়তো কোন কারণে মন খারাপ তাই এসব কথা বলেছে। মন ভালো হলে নিশ্চয়ই হাসিমুখে কথা বলবে। এই ভেবে কাঠঠোকরার খুব ভালো লাগলো, তার বানানো বাসায় আরেকজন খুব আরাম করে থাকতে পারছে।
একমাস পরের ঘটনা। খাবার খেতে গিয়ে দোয়েলের সঙ্গে দেখা হলো কাঠঠোকরার। দোয়েল বললো, একটা খারাপ খবর আছে। খারাপ খবর! কী খারাপ খবর? ব্যস্ত হয়ে জানতে চাইলো কাঠঠোকরা। দোয়েল বললো_কাঁঠাল গাছে একটা শালিক থাকতো না? অই যে তোমার সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়েছিলো। হ্যাঁ হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি। তারপর বলো। দোয়েল মুখ ভার করে বললো_তার অনেক বিপদ। বাঁচবে কিনা সন্দেহ আছে। জানো, ওর জন্যে আমার খুব মায়া হচ্ছে। বেচারার ভাগ্যটাই খারাপ। নইলে এমন বিপদে পড়তে যাবে কেন।
এবার অস্থির হয়ে গেলো কাঠঠোকরা_কী বিপদ আমাকে তাড়াতাড়ি বলো। দেখি কিছু করা যায় কিনা।
দোয়েল বললো_তুমি কিছু করতে পারবে কিনা জানি না। তবে আমরা অনেক চেষ্টা করেছি। কিছুই করতে পারিনি। ও যে গর্তে থাকে, গতরাতের ঝড়ে সেই গর্তের মুখে একটা ডাল ভেঙে পড়েছে। ডালটা খুব মোটা না অবশ্য। তবু আমরা চেষ্টা করেও সরাতে পারিনি। এখন শালিকটা গর্তের ভেতরে আটকা পড়ে আছে। না পারছে বের হতে, না পারছে খেতে। খেতে না পেলে কীভাবে বাঁচবে বলো।
দোয়েলের কথা শুনে আর দেরি করলো না কাঠঠোকরা। এক উড়ালে চলে গেলো কাঁঠাল গাছে। ডালে গিয়ে বসতেই সে শুনতে পেলো ভেতর থেকে শালিকের কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। শালিকের কান্না শুনে খুব কান্না পেলো কাঠঠোকরারও। সে সিদ্ধান্ত নিলো, যেভাবেই হোক শালিককে উদ্ধার করবে। গর্তের একেবারে কাছে গিয়ে বসলো কাঠঠোকরা। যে ডালটা ভেঙে পড়েছে সেটা মোটা না হলেও সে যে ধাক্কা দিয়ে সরাতে পারবে না, তা সে বুঝতে পারলো। তাই বলে সে হার মানবে না। যেভাবেই হোক, শালিককে সে উদ্ধার করবেই।
কিছুক্ষণ বসে থেকে কাঠঠোকরা তার ধারালো ঠোঁট চালিয়ে দিলো। অল্প সময়ের মধ্যেই কেটে দুই ভাগ করে ফেললো গর্তের মুখে পড়ে থাকা ডালটা। একদম পরিস্কার হয়ে গেলো গর্তের মুখ। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো শালিকটা। এসেই জড়িয়ে ধরলো
কাঠঠোকরাকে। কান্নার জন্যে অনেকক্ষণ কোন কথাই বলতে পারলো না সে। তারপর যখন কান্না থামলো তখন বললো_তুমি না থাকলে আজ আমার কী হতো জানি না। অথচ তোমার সঙ্গে সেদিন আমি কী খারাপ ব্যবহারটাই না করেছিলাম। তুমি আমাকে ক্ষমা...শালিককে আর কিছুই বলতে দিল না কাঠঠোকরা। শুধু বুকে
জড়িয়ে নিল।
সূত্র : সমকাল


ইঁদুর দিল ভোঁ-দৌড় || সহীদ সরকার অনূদিত


বিড়াল আর ইঁদুরে বড়ই ভাব। সিদ্ধান্ত নিলো তারা একসঙ্গে এক চালের নিচে বাস করবে। যেই বলা সেই কাজ। শুরু হলো একই বাড়িতে বসবাস। শীতকালে খাবার-দাবারের খুবই অভাব। শীতের জন্য তারা কিনলো একটি চর্বির পাত্র। লুকিয়ে রাখলো দূরের একটি গির্জার পেছনে। যখন খাবারে টান পড়বে তখন এই পাত্রের খাবার খাবে তারা।
একদিন বিড়ালটি বলল, শোনো পুচ্চি ইঁদুর, আমার চাচাতো বোনের চাঁদের মতো ফুটফুটে একটি ছেলে হয়েছে। তার ছেলেটির উৎসর্গের দিনে আমার সেখানে নিমন্ত্রণ। তাই তোমাকে একাকী এখানে রেখে আমাকে যেতে হবে।
ঠিক আছে, যাও। তবে ভালো খাবার পেলে আমার কথাও একটু ভেবো। কতদিন আমি লাল তেঁতুলের শরবত খাই না, বলল ইঁদুরটি।
বিড়ালটি সোজা চলে গেল গির্জার পেছনে। লুকিয়ে রাখা চর্বির পাত্রের ওপর থেকে খানিকটা চর্বি হাপুস হুপুস করে খেয়ে নিল। তারপর ধীর পায়ে চলে গেল শহরে। বাড়ি ফিরলো সন্ধ্যার পরে।
নিশ্চয়ই বেশ ভালোই কেটেছে তোমার সময়টা। তা কী নাম রাখলে ভাগ্নের? ইঁদুর জিজ্ঞাসা করলো। টফ-অফ, টফ-অফ নাম রেখেছি ভাগ্নের।
টফ-অফ, ভারি মজার নাম তো! এমন নাম তো আগে কখনো শুনিনি।
কিছুক্ষণ পর আর একটি ফন্দি আঁটলো বিড়ালটি।
সে ইঁদুরটিকে ডেকে বলল, আমাকে আবার দ্বিতীয় ভাগ্নেটির কাছে যেতে হবে। আজ তার হাতে সাদা আংটি পরাতে যেতে হবে। আমি বোনটাকে না বলতে পারিনি। তোমাকে এবারও আমাকে সাহায্য করতে হবে। বাড়িটির দিকে একটু নজর রেখো ভাই।
মাথা নেড়ে সায় দিল ইঁদুরটি। চতুর বিড়াল গির্জার পেছনে গিয়ে চর্বির অর্ধেকটা খেয়ে কিছুক্ষণ পর বাড়ি ফিরে এলো।
আচ্ছা, তোমার বোনটির নাম তো জানা হলো না। কী নাম তার? ইঁদুর জিজ্ঞাসা করলো।
হাফ-গন!
হাফ-গন! কী বলছো তুমি! এমন নামতো আমি জীবনেও শুনিনি! নামের বইয়েও তো এ রকম নাম খুঁজে পাওয়া যাবে না।
বিড়ালটির মাথায় তখনো চর্বির কৌটার চিন্তা।
তৃতীয়বারের মতো আমাকে তারা দাওয়াত করেছে। এবারের ভাগ্নেটা কালো। কিন্তু তার পা দুটো সাদা। সারা শরীরে আর কোথাও সাদা রঙ নেই। এমন ঘটনা খুব কমই দেখতে পাওয়া যায়। যাই হোক তুমি আমাকে যাওয়ার জন্য অনুমতি দাও। বিড়ালটি হাসতে হাসতে বলল।
টফ-অফ, হাফ-গন! নামগুলো বেশ রহস্যের মধ্যে ফেলছে আমাকে। ঠিক আছে, যাও_ ইঁদুর বলল। ইঁদুরটি ছিল হাবাগোবা। বাড়ি, ঘরদোর সে সুন্দরভাবে পরিষ্কার করে রাখে। আর এর মধ্যে চর্বির কৌটা থেকে সবটুকু চর্বি খেয়ে সাবাড় করে ফেলেছে ধূর্ত বিড়াল। রাতে বেশ চনমনে হয়ে বাড়ি ফিরলো বিড়ালটি।
তৃতীয় ভাগ্নেটির নাম কী রাখলে বল্পুব্দ?
অল-গান!
অল-গন! বেশ ভয়ঙ্কর নাম তো! এ নামের অর্থ কী? কোনো বইপত্রে এমন নাম দেখিনি! মাথা নাড়তে নাড়তে ঘুমোতে গেল বেচারা ইঁদুর।
চতুর্থবারের মতো কেউ আর বিড়ালটিকে দাওয়াত করলো না। অবশেষে শীতকাল চলে এলো। খাবার-দাবারের খুবই অভাব।
ইঁদুর বিড়ালকে বলল, চলো গির্জার পেছন থেকে লুকিয়ে রাখা চর্বির কৌটাটি নিয়ে আসি।
দু'জন সেখানে গিয়ে খুঁজে পেল খালি কৌটাটি।
বুঝতে পারলাম তোমার চালাকি। তুমি তাহলে এখানেই এসেছ দাওয়াত খেতে। প্রথমবার টফ-অফ, দ্বিতীয় বার হাফ-গন, আর তৃতীয়বার অল-গন?
চুপ করো। বেশি হম্বিতম্বি করলে আমি তোমাকেই খেয়ে ফেলবো।
ধমক শুনে থমকে গেল বেচারা ইঁদুর।
তৃতীয় ভাগ্নের নাম তাহলে অল-গান। বলেই বিড়াল তাকে ধরে ফেলার পূর্বেই মাথা নিচু করে দিল ভোঁ-দৌড়। পেছনে তার বল্পুব্দরূপী চতুর বিড়াল।
সূত্র : সমকাল


পাতার পাখি || মামুন হোসাইন


ফাল্গুন মাস। ঝিরঝিরে বাতাস। পুকুরপাড়ে ছোট একটা মেহগনি গাছ। হাওয়ায় দুলছে গাছটা। গাছটার ছোট একটা ডালের সব পাতা বাতাসে উড়ে গেছে। দুটি পাতা ছাড়া। একটা হলুদ পাতা, একটা কমলা পাতা। এরাও উড়ে যাবে। কারণ এই মাসটাই এখন পাতা ওড়ার।
গত বছর এই সময়ে পাতা দুটি যখন মেহগনির শক্ত কাঠ ফুঁড়ে বের হয়েছিল, তখন ওরা ছিল নরম তুলতুলে, আর চকচকে-ঝকঝকে। শুধু ওরা না, ওদের সঙ্গে আরও অনেক পাতা ছিল। ওরা সবাই বাতাসে উড়ে গিয়েছে। কেউ উড়ে গিয়েছে পুকুরের ওই পাড়টায়, কেউ একেবারে পুকুরের পানিতে। কেউ পড়েছে গাছের নিচেই উড়তে উড়তে। কিন্তু কেউই নিজের ইচ্ছায় গাছ ছেড়ে উড়তে চায়নি। আঁকড়ে থাকতে চেয়েছে মেহগনির ডালপালা। কিন্তু কী আর করা, সবই ফাল্গুনের হাওয়া। উড়তে তো হবেই। তা ছাড়া নতুন সবুজ পাতা এলে হলুদ-কমলা পাতাদের তো উড়তে হবেই। এটাই নিয়ম।
কমলা পাতা আর হলুদ পাতা। দু'জনেরই মন খারাপ। আর বোধ হয় গাছে থাকা যাবে না। উড়ে যেতে হবে। কমলা বললো হলুদ পাতাকে_
আচ্ছা ভাই হলুদ, উড়তে তো হবেই। তো উড়ে উড়ে কোথায় যেতে চাও তুমি?
হলুদ পাতা বললো_
উড়তে তো মন চায় না রে ভাই। তবে উড়তে উড়তে যদি আকাশে যাওয়া যেত, তাহলে মন্দ হতো না। এই বলে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো হলুদ পাতা, তারপর কমলা পাতাকে জিজ্ঞেস করলো_
তো কমলা ভাই, তোমার কী ইচ্ছা? তুমি কোথায় উড়ে যেতে চাও?
কমলা বললো_ বাহ! তোমার ইচ্ছার সঙ্গে আমার ইচ্ছার তো দারুণ মিল ভাই। আমিও তো আকাশে উড়ে যেতে চাই। সেটা কি সম্ভব? কীভাবে সম্ভব? ভাবনায় পড়ে গেল পাতা দুটি। অনেকক্ষণ তারা ভাবলো। ভাবতে... ভাবতে... ভাবতে... ভাবতে... কমলা বললো_ আচ্ছা, আমরা যদি একসঙ্গে ওড়া শুরু করি ঠিক যেমন করে পাখি ওড়ে। আমরা বোঁটায় বোঁটা লাগিয়ে ঝাপটানো শুরু করবো পাখির মতো করে। তারপর আকাশে উড়ে যাবো।
হলুদ বললো, বাহ, আমরা দু'জন মিলে তাহলে পাখির ডানা হয়ে যাব? পাখি হয়ে যাব?
ঠিক তাই! কমলা বললো।
খুশিতে হলুদ পাতা নেচে উঠলো আর গেয়ে উঠলো_
কী মজা কী মজা পাতা হবে পাখির ডানা
কী মজা কী মজা উড়তে পাখির নেইকো মানা।
কমলা পাতা হলুদ পাতার গান থামিয়ে দিয়ে বললো_ কিন্তু ভাই, এত সহজে কিন্তু সেটা সম্ভব নয়। এই ঝিরঝিরে ফাল্গুনী হাওয়ায় কিন্তু আকাশে ওড়া যাবে না। তার জন্য দরকার ঝড়ো হাওয়ার। সেটা আসতে এখনও অনেক দেরি। কেবল তো ফাল্গুন, তারপর চৈত্র, তারপর বৈশাখ। এত সময় পর্যন্ত কি আর থাকা সম্ভব! আমাদের বোঁটার শক্তি তো কমে এসেছে। কখন জানি টুক করে পড়ে যাই!
হলুদ বললো, সেটা একটা সমস্যা বটে। কিন্তু মনের জোর থাকলে আসলে কোনো সমস্যা না। আমরা আমাদের বোঁটা দিয়ে বৈশাখ পর্যন্ত আঁকড়ে থাকবো এই ডালটা। তারপর উড়াল দেব কালবৈশাখী ঝড়ে।
কমলা বললো, ঠিক আছে, তা-ই হবে।
তারপর হলুদ পাতা আর কমলা পাতা মনের প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলো। আর কয়েকদিন পরেই বৈশাখ মাস। এর মধ্যেই মেহগনি গাছের সব পাতা উড়ে গেছে। হলুদ পাতা আর কমলা পাতাও নিজেদের শরীরের রঙ বদল করে ফেলেছে।
হলুদ হয়েছে কমলা আর কমলা হয়েছে লাল। তবে মনের শক্তি তাদের কমেনি একটুও। আকাশে তারা উড়বেই। তারা অপেক্ষা করতেই থাকে, কখন বৈশাখী ঝড় আসবে আর তারা ভাসবে বাতাসে। উড়বে আকাশে, পাখির মতো করে।
তারপর একদিন আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে গেল। আর শুরু হলো কালবৈশাখী ঝড়। আকাশ-বাতাস তোলপাড় করা ঝড়। অপেক্ষার পালা শেষ, লাল পাতা আর কমলা পাতা নিজেদের বোঁটা ছেড়ে দিল ডাল থেকে। তারপর বোঁটা দুটো একসঙ্গে করে পাখির মতো পাতা ঝাপটাতে থাকলো।
আর আকাশের দিকে উড়তে থাকলো। উড়তে উড়তে উড়তে উড়তে পাতা দুটো ছোট হতে থাকলো। ছোট হতে হতে একসময় লাল আর কমলা বিন্দুর মতো দেখা গেল তাদের। মনে হলো, লাল আর কমলা ডানাঅলা একটা পাখি উড়ে যাচ্ছে বুঝি।
সূত্র : সমকাল


পরীক্ষা || সুমন্ত আসলাম


বাতেন সাহেব অফিস থেকে বাসায় ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে রাবিদ বলল, 'বাবা, জরুরি কিছু কথা আছে তোমার সঙ্গে। তুমি জামা-কাপড় খুলে ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি কম্পিউটারটা বন্ধ করে আসি।'
কিছু বললেন না বাতেন সাহেব। ছেলের চঞ্চলতা দেখে সামান্য হাসলেন। ঘরে ঢুকে সোফায় বসে জুতোর ফিতা খুলতে খুলতে স্ত্রীকে বললেন, 'নিতু, তোমার ছেলের কী হয়েছে বলো তো?'
'জানি না তো।'
'ভীষণ অস্থির মনে হচ্ছে আজ ওকে।'
'কই, আমি তো কিছু টের পেলাম না। দাঁড়াও-।' নিতু ঘুরে দাঁড়িয়ে চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে বাতেন সাহেবকে দিয়ে বলল, 'রাবিদ আর ওর বন্ধুরা মিলে কী একটা যেন ক্লাব গঠন করেছে। নামও দিয়েছে একটা-আনলাকি থার্টিন!'
'এটা আবার কী ধরনের নাম হলো!'
'ওরা সবাই এবার তের বছরে পড়বে তো, তাই ওই নামটা দিয়েছে। মজা করে দিয়েছে আর কী।' অফিসে যাওয়ার জামা-কাপড় আর জুতো জোড়া হাতে নিয়ে নিতু বলল, 'তুমি চা খাওয়া শেষ করো, আমি একটু রান্নাঘর থেকে আসছি।'
খুব মনোযোগ দিয়ে চা খাচ্ছেন বাতেন সাহেব। ছোটখাটো একটা সমস্যা হয়েছে অফিসে। অবশ্য তার সমস্যা না। তার কলিগ মনোয়ার সাহেবের সমস্যা। খুবই ভালোমানুষ মনোয়ার সাহেব। তার মতো ভালোমানুষ সমস্যায় পড়লে তো সবারই চিন্তা হওয়ার কথা। বাতেন সাহেবও চিন্তা করতে ছিলেন। তার চিন্তা করার একটা ধরন আছে, মাথা যতটা সম্ভব নিচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে চিন্তা করেন তিনি। হাতে চা থাকলে ওরকম মাথা নিচু করে চিন্তা করতে করতেই চা খাওয়ার অভ্যাস তার।
চা শেষ করে কাপটা পাশে রাখতে গিয়েই বাতেন সাহেব দেখলেন, রাবিদ দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। তিনি খুব আন্তরিক গলায় বললেন, 'কী যেন জরুরি কথা আছে তোমার, বলো।'
বাবার সামনের সোফাটাতে বসল রাবিদ। তারপর বাবার দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে বলল, 'বাবা, তুমি বলতে পারবে-মহাশূন্যে যদি কাউকে ছেড়ে দেওয়া হয় তাহলে সে ভেসে বেড়াবে কেন?'
কপাল কুঁচকে ফেললেন বাতেন সাহেব। একটু চিন্তা করে বললেন, 'আমি তো সায়েন্সের ছাত্র ছিলাম না। মহাশূন্যের ব্যাপারটা তাই জানি না।'
'আচ্ছা, সাগরের পানি লবণাক্ত কেন, এটা কি তুমি জানো?'
অসহায় ভঙ্গি করলেন বাতেন সাহেব। খুক খুক করে এমনি এমনি কাশতে লাগলেন তিনি। তাই দেখে রাবিদ একটু হেসে বলল, 'এটাও জানো না তুমি, না?'
কোনো কথা বললেন না বাতেন সাহেব, কেবল মাথা উঁচু-নিচু করলেন তিনি।
রাবিদ বাবার দিকে একটু ঝুঁকে বসল। কিছুক্ষণ মনোযোগ দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, 'বাবা, তুমি কি বলতে পারবে প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব শব্দটার ইংরেজি কী?'
বাতেন সাহেব হেসে হেসে বললেন, 'ওই শব্দটার বাংলা অর্থ কি সেটাই তো জানি না।'
'তার মানে কী দাঁড়াল বাবা? সবাই সব কিছু জানবে_ এটা ঠিক না।' রাবিদ বাবার দিকে বিশেষ ভঙ্গিমায় তাকিয়ে বলল, 'আর সবাইকে সব কিছু জানতেই হবে, এটাও ঠিক না। তুমি এসব না জেনেও তো ভালো একটা চাকরি করছ, তাই না?' রাবিদ বাবার পাশের সোফাটায় গিয়ে বসে বলল, 'কাজী নজরুল ইসলাম তো আমাদের জাতীয় কবি। আমাদের জাতীয় কবি কোন ক্লাস পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন, তুমি জানো?'
'খুব বেশি ক্লাস পর্যন্ত লেখাপড়া করতে পারেননি তিনি।'
'বিশ্বের শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় ম্যারাডোনা?'
'তিনিও তো খুব বেশি লেখাপড়া করেননি।'
'শচীন টেন্ডুলকারও না।'
'হ্যাঁ, তিনিও তেমন লেখাপড়া করেননি।' বাতেন সাহেব অভিজ্ঞ হেডমাস্টারের মতো বললেন।
রাবিদ একটু সোজা হয়ে বসে বলল, 'তাহলে কী বুঝা গেল-লেখাপড়া না করেও বড় কিছু হওয়া যায়। তাই না বাবা?'
বাতেন সাহেব কোনো জবাব দিলেন না। হঠাৎ তিনি সোজা হয়ে বসে চঞ্চল গলায় বললেন, 'আজ তো তোমার রেজাল্ট দেওয়ার কথা, রাবিদ। অফিসের ব্যস্ততায় ভুলেই গিয়েছিলাম। তা তোমার রেজাল্ট কী বলো তো?'
রাবিদও সোজা হয়ে বসল। কী একটা ভেবে উঠে দাঁড়াল সে। একটু ফাঁকে বাতেন সাহেবের সামনের সোফায় গিয়ে বসল আবার। কিছুটা আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বলল, 'তুমি তো জানো, আমাদের ক্লাসে এক ডাক্তারের ছেলে আছে, ওর নাম সুজন। সুজন না ফেল করেছে, বাবা।'
'তাই নাকি!'
'হ্যাঁ।' রাবিদ উৎফুল্ল হয়ে বলল, 'ফখরুল আঙ্কেলকে তো তুমি চেনো, উনি তো ইঞ্জিনিয়ার। ওনার ছেলের নাম মিঠুন। আমার সঙ্গে পড়ে। সেও ফেল করেছে, বাবা।'
বাতেন সাহেব অবাক হয়ে বললেন, 'বলো কী?'
'জি, বাবা।' রাবিদ আগের চেয়ে উৎফুল্লতা নিয়ে বলল, 'লিওনের বাবা হচ্ছেন ভার্সিটির টিচার। কিন্তু কী লজ্জার ব্যাপার জানো বাবা, লিওনও ফেল করেছে। টিচারের ছেলে কখনও ফেল করে! কেমন একটা লাগে না!'
বাতেন সাহেব আরও একটু সোজা হয়ে বসলেন। চোখ দুটো বেশ বড় দেখাচ্ছে তার। নিঃশ্বাস আটকে রাখার মতো তিনি প্রচণ্ড উদ্বিগ্ন গলায় বললেন, 'তা তুমি পাস করেছ তো?'
'সেটা কীভাবে সম্ভব! ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-শিক্ষকের ছেলেই পাস করতে পারল না, আমি তো সামান্য একজন অফিসারের ছেলে! ওরা ফেল করলে আমার কি পাস করা উচিত, বাবা!' মেঝেতে পড়ে গিয়ে সামনের একটা দাঁত ভেঙে ফেলেছিল রাবিদ। সেই ভাঙা দাঁত বের করে হাসতে থাকে সে।
সূত্র : সমকাল


সাতরঙের দরোজা || উত্তম সেন


এখানে কী করে এলো সে! একেবারে অচেনা জায়গা। এর আগে কোনোদিন এসেছিল বলে মনে পড়ে না তার। তবে রঙগুলো খুব চেনা তার। রঙধনুর সাত রঙ। সাতটা দরোজাই খোলা। প্রত্যেক খোলা দরোজার ভেতর থেকে সাত রকমের আলোর দ্যুতি বেরুচ্ছে। কোথাও কোনো সাড়া-শব্দ নেই।
এবার আরেকটু সামনে এগিয়ে গেল ছেলেটা; একেবারে সাত দরোজার সামনে। প্রথমেই সে এসে পড়ল বেগুনি দ্যুতি বেরুনো একটা দরোজার সামনে। ভেতরটায় চোখ পড়তেই হিম হয়ে গেল সে। বেগুনি রঙটাকে তার খুব ভয় এমনিতেই। এরপর যা তার চোখে পড়ল তাতে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াতে ইচ্ছে হলো না তার। ইতিহাসে যেসব ঘৃণিত মানুষের কথা সে পড়েছে তারাই একে একে দেখা দিয়ে গেল তাকে। নাহ্, এ দরোজার সামনে আর দাঁড়ানো যায় না।
এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল নীল দরোজার সামনে। নীল পর্দাটা উঠতেই চোখে পড়ল_ নীলকণ্ঠধারী এক মহামানবকে। 'জগতের কল্যাণের জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য আমি নীলবর্ণ বিষাক্ত দ্রব্যকে নিজের কণ্ঠে ধারণ করে রেখেছি, মনে রেখো_ দুঃখ, বিষাদ, বেদনা_ এসবের রঙ নীল। তাই এই দরোজা তোমার নয়, এগিয়ে যাও সামনে।' মন্ত্রমুগ্ধের মতো মহামানবের কথা সে শুনল, মহামানব নয়, তাকে দেবতাই মনে হলো তার। দরোজার সামনে থেকে সরে গেল সে।
এখন সে যে দরোজাটার সামনে দাঁড়াল তার রঙ আসমানি। পর্দাটা দুলছে মায়াবী বাতাসে। একজন লোক নির্বিকার বসে আছেন। তার দৃষ্টি স্থির। ছেলেটা স্পষ্ট দেখল, লোকটার দু'চোখের মণিতে যেন দুটো পৃথিবী ঘুরছে। এক চোখে পৃথিবীর সত্যিকারের রূপ; কখনও আলো কখনও অন্ধকার, মানুষের দুঃখ, বেদনা। আর অন্যটা সম্পূর্ণ অস্পষ্ট, ধূসর; বোঝা যাচ্ছে না কিছুই, তবে এটাই যে পৃথিবীর আরেক রূপ, আরেক চেহারা যাতে মৃত্যু, জরা, ভয়ে ভরা_ এটা বুঝতে কষ্ট হয় না তার। এবার ছেলেটার মনে পড়ল এই লোকটাকেই সে দেখেছে বইয়ের পাতায়। উনি নাকি নীরব, নিভৃতচারী এক মহান কবি_ জীবনানন্দ দাশ। তার কবিতাও পড়েছে।
সবুজ দরোজার সামনে এসে সে বুঝতে পারল, বয়সটা অনেক অনেক কমে গেছে। দরোজার সামনে সবুজ পর্দাটা অদ্ভুত আভা ছড়িয়ে দুলছে তো দুলছেই; সঙ্গে তার মনটাও। ভেতরে যেন দেবদূতদের মহাসম্মেলন। চোখ তুলে না তাকিয়েও বোঝা যায় এরা যেন একেকজন শিশু। মৃত্যু, দুঃখ, আনন্দ সব জয় করে চিরসবুজ রঙ ধারণ করে বসে আছে। সবুজ দরোজাটাই আপাতত সবচেয়ে প্রিয় মনে হলো তার। সরতে ইচ্ছে হলো না ওখান থেকে। তবু আরও তিনটা দরোজার ভেতরটা দেখতে না পারলে অসমাপ্তই থেকে যাবে। তাই অন্য দরোজার দিকে পা বাড়াল সে।
সামনে তার হলুদ দরোজা। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। দরোজাটা খুলে গেল আর সঙ্গে সঙ্গেই হলুদ পর্দাটা সরে গেল। উফ্ কী দুর্গন্ধময়!
উষ্ণ বাতাস তাকে যেন ক্ষণিক সময়ের জন্য মৃত্যুযন্ত্রণা দিয়ে গেল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভেতরে চোখ রাখল সে। দেখল, মৃতপ্রায় গাছ-পালা, জীর্ণ-শীর্ণ-বিবর্ণ অসংখ্য মানুষ। সবারই গায়ের রঙ হলুদ_ সবাই যেন পাণ্ডুর রোগী। অসহ্য ঠেকলো তার কাছে। দ্রুত সামনের দরোজার কাছে এলো সে। দরোজার রঙ কমলা। যারা বসে আছেন কিংবা পায়চারি করছেন তাদের বেশিরভাগই গেরুয়া পোশাকধারী। তাদের সবাইকে ভোরের প্রথম আলোতে স্বর্ণমাখা আলোয় রাঙা করছে স্বয়ং সূর্যদেব। সেই রাঙা আলোয় প্রথম দর্শনে যাকে সে দেখল তাতেই এ জীবনটা সার্থক হলো। জগৎ-জোড়া যার খ্যাতি, যার পায়ের পাতা সবখানে পাতা। আলোকের এই ঝর্ণাধারায় নেয়ে উঠছেন রবীন্দ্রনাথ। তারপর একে একে যাদের দেখা গেল_ শ্রী চৈতন্য, লালনসহ অনেক মহামানবকে। আলোময় এ দরোজার সামনে থেকে চলে যেতে মন চাইছে না। তবু যেতে হবে। আর একটাই দরোজা শুধু বাকি।
উষ্ণ হাওয়ার তালে তালে দরোজাটা খুলে গেল। সরে গেল লাল পর্দা। নিজের চোখ জোড়াকে বিশ্বাস করানোই কষ্টকর মনে হলো ছেলেটার। যাকে না চেনা পাপ; ইনিই সেই বঙ্গবন্ধু মুজিব। হাত নেড়ে ছেলেটাকে অভিবাদন জানাতে জানাতে সরে গেলেন। আবেগে পাথর হলো যেন সে। তার উচিত ছিল_ সৈনিকের ভঙ্গিতে তাকে স্যালুট করা, কিন্তু নার্ভাস হলে যা হয়, সে পারেনি। এরপর দীর্ঘ এক মিছিল দেখল_ প্রথম সারিতেই আছেন ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন, সুভাষ বোস, ঈশা খাঁ, প্রীতিলতা। মিছিলটা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। সবাই হাত তুলে ছেলেটাকে অভিবাদন জানাতে জানাতে মিছিলটা সামনের দিকে এগিয়ে এগিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। এবার ছেলেটার মুখেও এসে পড়ল আলোর ছটা। আনন্দ-উচ্ছলতায় সেও রেঙে উঠল যেন। ডান হাত নেড়ে নেড়ে সে মিছিলটাকে স্বাগত জানাতে জানাতে হঠাৎ খেয়াল করল তার বাম হাত বজ্রমুষ্টিতে ওপরে উঠে আছে।
সূত্র: সমকাল


ফড়িঙের ভাই পাখিদের মামা || ধ্রুব এষ


লাল ফড়িং, নীল ফড়িং, হলুদ ফড়িং, সবুজ ফড়িং_ দুনিয়ার সব ফড়িং ভাই হয় তার।
ভাই হয়?
হ্যাঁ, ভাই হয়।
এ আবার কী রকমের কথা? ছেলে ফড়িংরা ভাই হয়, আচ্ছা! মেয়ে ফড়িংরাও তার ভাই হয়?
হয়। সে বলে। কেন? পিপিকে তো সে ডাকে পিপি ভাই। পুপিকে ডাকে পুপি ভাই। পুপুকে ডাকে পুপু ভাই। পিপি হলো একটা লাল মেয়ে ফড়িং। পুপি হলো একটা নীল মেয়ে ফড়িং। পুপু হলো একটা সবুজ মেয়ে ফড়িং।
কী অদ্ভুত!
এ আর কী অদ্ভুত! দুনিয়ার সব মেঘ হলো তার দাদা। বড় দাদা, মেজ দাদা, ছোট দাদা, ন দাদা। আকাশে দাদারা উড়লেই সে অনেক কথা বলে দাদাদের সঙ্গে। এতদিন কোথায় ছিলে গো দাদারা?
দাদারা বলে, আর কোথায়রে ভাই! ছিলাম পাহাড়ে।
পাহাড়ে? আহারে! সে বলে, আমার বোনপো বোনঝিদের কেমন দেখলে গো?
এই আরেক কথা। তার বোনপো, তারা বোন ঝি। তারা হলো পাখি। দুনিয়ার সব পাখির মামা হয় সে। বলে তার একটা কাক বোনঝি আছে ঋঋ।
ঋঋ রোজ সকালে তাকে অনেক ডেকে ঘুম থেকে ওঠায়, 'মামা! মামা! ওঠো। ওঠো। সূলজো উঠে গেসে মামা। ওঠো! ওঠো!
মা-মা! ও মামা...!' ঋঋ এখনও অনেক ছেলে মানুষ বলে সূর্যকে বলে 'সূলজো।' আর 'গেছে'কে বলে 'গেসে।'
সূর্য আবার কিছু হয় না তো তার?
তা আর হয় না। সূর্য শুধু! দুনিয়ার কে তার কী হয় না? সূর্য, চাঁদ, তারার আত্মীয় সে। দুনিয়ার সব ঘাসের আত্মীয়। দুনিয়ার সব নদীর আত্মীয়। দুনিয়ার সব মাঠের আত্মীয়। ফিরিস্তি শেষ করা যাবে না।
দরকার নেই বাপু অত ফিরিস্তির। লোকটা কে? থাকে কোথায়?
কোথাও থাকে না।
কোথাও থাকে না? মানে কী এর?
লোকটা কেউ হলে না থাকবে। লোকটা কেউ না।
কেউ না মানে?
কেউ না মানে কেউই না। এমন আবার কোনো লোক হয় নাকি?
তবে?
তবে কী?
এত করে এমন একটা লোকের কথা বলা কেন?
কেন আবার? দুনিয়ায় এমন একটা লোক থাকলে কি ভালো হতো না?
তা হতো।
তবে আর কী?
সূত্র : সমকাল


গাধার কাণ্ড || তাপস রায়


গাধা তো আসলে গাধাই, তাই না? গাধা না হয়ে তার নাম 'হাঁদা' হলেও বেশ মানাতো। কেননা একটু হাবাগোবা হিসেবেই তাকে প্রাণীরা জানে। এতে গাধার কিছু এসে যায় না। সে নিজেকে চতুর মনে করে।
গাধা হাঁদা হলেও বনে তার যে বন্ধু নেই এমন নয়। এই যেমন পিচ্চি খরগোশ, দুষ্টু কাঠবিড়ালী, পণ্ডিত ভালুক এমন কি জেব্রা মামাও গাধার বন্ধু। বন্ধুরা কত বলে, ও গাধা এবার একটু চালাক হও। আর কত বোকা হয়ে থাকবে?
কিন্তু কে শোনে কার কথা। তবে এ নিয়ে গাধার যে একেবারেই লজ্জাবোধ নেই তাও নয়। একবার তো রাগ করে সে খরগোশের সঙ্গে কথা বলাই বন্ধ করে দিলো। আসলে সেদিন হয়েছে কি, খরগোশটা কি কারণে যেন গাধার পেছনে লেগেছে। বিভিন্নভাবে গাধাকে ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্টা করছে। তাকে তাল দিয়ে যাচ্ছে জেব্রা। জেব্রার আস্কারা পেয়ে খরগোশের মস্করা গেলো আরো বেড়ে। একসময় সে গাধাকে বলেই ফেললো, গাধা তুমি সবসময় পিঠে বেশী বোঝা চাপাও কেন? কম বোঝা নিলে তোমার হাঁটতে কষ্ট হয় বুঝি?
শুনেই গাধার মেজাজ গেলো বিগড়ে। এ কেমন কথা! কেউ কী কখনও চায় নিজের পিঠে বেশী বোঝা চাপাতে? গাধা রেগে উল্টো জানতে চাইলো, তোমায় কে বলেছে আমি পিঠে কম বোঝা নিয়ে হাঁটতে পারি না?
সবাই বলে তো তাই জানতে চাইলাম, বললো খরগোশ। গাধা বলে, কে বললো এমন কথা?
খরগোশ এবার কাঠবিড়ালী এবং জেব্রার দিকে তাকিয়ে এ কথা ঠিক কিনা জানতে চায়। কাঠবিড়ালী শুনেই লাফিয়ে হ্যাঁ, ঠিক্ ঠিক বলে ওঠে।
জেব্রাও মুচকি হেসে লেজ নাড়াতে নাড়াতে বলে, আমিও শুনেছি, একদম ঠিক্।
এবার গাধা বিব্রত হয়। লজ্জায়, অভিমানে চোখে পানি এসে যায়। তাই দেখে পিচ্চি খরগোশ আর দুষ্ট কাঠবিড়ালীর সে কি হি হি হি হি হাসি! ওদের হাসি দেখে গাধার পিত্তি জ্বলে যায়। ভাগ্যিস ভালুক পাশ দিয়েই যাচ্ছিলো। হৈ চৈ শুনে ভালুক এগিয়ে এসে দেখে, সবাই মিলে গাধার পিছনে লেগেছে। গাধার অসহায় অবস্থা দেখে ভালুকের খুব মায়া হয়। সে সবাইকে ধমক দিয়ে বলে, এই খবরদার! চুপ, একদম চুপ!
ভালুকের ধমক খেয়ে চুপসে যায় সবাই। ভালুক কাঠবিড়ালীকে আচ্ছা করে শাসিয়ে বলে, এরপর ওর পেছনে লাগবি তো তোর লেজ ছিঁড়ে দেবো।
ভালুক খরগোশকেও খুব করে বকা দিয়ে বলে, তোর কান টেনে আরো লম্বা বানিয়ে দেবো।
আর জেব্রা? জেব্রা ভালুককে দেখেই ভয়ে লেজ গুটিয়ে উল্টো দিকে হাঁটতে শুরু করে। সেদিনের পর থেকেই গাধা খরগোশের সঙ্গে কথা বলে না।
আড়ি।
আড়ি।
আড়ি।
কিন্তু তারপরও কীভাবে কীভাবে যেন গাধার সব কথা দুষ্টু খরগোশটা জেনে যায়। তারপর এ-কান ও-কান হয়ে সেই ঘটনা জেনে যায় পুরো বন। গাধার পানি ঘোলা করে খাওয়ার ঘটনাও এভাবে বনে ছড়িয়ে পড়ে। অথচ গাধা বুঝে উঠতে পারে না এখানে তার ভুলটা কোথায়?
একদিনের ঘটনা। হয়েছে কী, অনেকদিন বৃষ্টির দেখা নেই বনে। তার উপর খা খা রোদ্দুর। তেষ্টায় গলা শুকিয়ে গলা খসখসে হয়ে গেছে গাধার। পানি পান না করলেই নয়। বনের বাম পাশে ছোট্ট নদী, ডান পাশে সরু রূপালী ঝর্ণা। হেঁটে নদীর পাড়ে যেতে লাগবে বড়জোর বিশ মিনিট। অন্যদিকের ঝর্ণা বেশ দূরে। গাধা ভাবনায় পড়ে গেলো সে কোনদিকে যাবে? শেষে অনেক চিন্তা করে গাধা দেখলো কষ্ট না করলে তো আর কেষ্ট মিলবে না। দূর হয়েছে তাতে কী, সে ওদিকটার ঝর্ণাতেই যাবে। এই না হলে গাধা! যেমন ভাবা তেমন কাজ। গাধা হেলেদুলে হাঁটতে শুরু করলো। অর্ধেক পথ যেতেই তার দম বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। তার অবস্থা দেখে গাছের মগডালে পাতার আড়াল থেকে মুখ বাড়িয়ে কাঠবিড়ালী জানতে চাইলো, ও গাধা, কই যাও?
যাচ্ছি ঝর্ণার দিকে। খুব তেষ্টা পেয়েছে। বলে গাধা।
তাহলে তো তুমি নদীতে গেলেই পারতে! কাঠবিড়ালী বলে আবার।
এ কথা শুনে গাধা আরো জোড়ে পা চালালো। সে কথা বাড়িয়ে হাসির পাত্র হতে রাজী নয়। এমনিতে তার সবকিছুতেই অন্যেরা বোকামী খুঁজে পায়। এ সুযোগ সে আর কাউকে দিতে চায় না। অনেক কষ্টে একসময় গাধা ঠিকই ঝর্ণার কাছে গিয়ে পৌঁছালো।
পাহাড়ের ওপর থেকে সরু ঝর্ণার স্বচ্ছ পানি সমতলে এসে ছোট্ট ঝিল তৈরী করেছে। সেই ঝিলের চারপাশে নাম না জানা পাখি আর প্রজাপতিদের ওড়াউড়ি দেখে গাধার ক্লান্তি মুহূর্তেই দূর হয়ে গেলো। ঝিলের চারপাশটা কত সবুজ আর শান্ত। একটু দূরে হরিণের দল আনমনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একটা হরিণকে গাধার খুব মনে ধরলো। আহা! কী টানাটানা চোখ। মায়াভরা মুখ। সেই মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে গাধা পানি পান করার কথা বেমালুম ভুলে গেলো। হরিণের দিকে গাধার ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকা দেখে ঝিলের পাখিরাও যেন মজা পেলো। দোয়েল তো লেজ দোলাতে দোলাতে শীষ বাজাতে শুরু করলো। শীষ শুনে হুঁশ ফিরলো গাধার। বেচারার তখন লজ্জায় মাথা কাটা যাওয়ার উপক্রম! লজ্জা ঢাকতে তাড়াতাড়ি পানি পান করার জন্য ঝিলের জলে মুখ নামাতেই ঘটলো বিপত্তি। এ কি! তার আগেই সেখানে আরেকটি গাধা এলো কীভাবে? এ যে হুবহু তার মতো দেখতে। গাধা ঝিলের জলে মুখ নামালে সেও মুখ নামায়। গাধা তাকে তাড়ানোর জন্য দাঁত-মুখ খিচিয়ে ভয় দেখালে সেও ভয় দেখায়। ভারী বিপদ তো! এতো কষ্ট করে এতো দূর এসে তারই জাতি ভাই একটা গাধার জন্য সে পিপাসা মেটাতে পারবে না? এ হতে পারে না। তাছাড়া অই পাখিগুলোই বা এখন কী ভাববে? মেজাজটাই খারাপ হয়ে যায় গাধার। এবার সে ঝিলের পানিতে নেমে দাঁত-মুখ খিচিয়ে, হাত-পা ছুড়ে সেই গাধাকে তাড়ানোর চেষ্টা করলো। ফলে মুহূর্তেই ঝিলের স্বচ্ছ পানিতে কাদামাটি মিশে ঘোলা হয়ে গেলো এবং সেই ঘোলা পানিতে গাধার চেহারা আর দেখা গেলো না।
যাক্ বাবা, বাঁচা গেলো! বলে গাধা হাপ ছাড়লো। অবশেষে গাধাটাকে সে তাড়াতে পেরেছে! এবার নিশ্চিন্ত মনে গাধা ঝিলের সেই ঘোলা পানি খেয়ে তেষ্টা মেটালো।
এই ঘটনার পর থেকেই বনের দুষ্টু পশু-পাখিরা বলে বেড়ায় গাধা নাকি পানি ঘোলা করে খায়। কেন যে ওরা সবাই এমন কথা বলে গাধা আজো তা বুঝতে পারে না।
সূত্র : সমকাল


দোলনা এলো যেমন করে || মারজান শাওয়াল রিজওয়ান


তোমরা সবাই দোলনায় চড়তে ভালো বাসো, তাই না? তা বলি, এই দোলনা এলো কী ভাবে? জানি, তোমরা একেক জন একেক রকম করে বিষয়টা জানো। আমিও কিন্তু জানি। কাছে এসো। কানটা ঠিকঠাক করে নাও। শোনো, এবার বলছি-অনেক দিন আগে নীলা, নীহা, টুকি, রিপা, মিলা, মিরা, তিহা, মিনা, বীথি ও নোহা নামের দশ বান্ধবী খেলছিলো। হঠাৎ ওরা দেখতে পেলো, এক বানর গাছের ডাল ধরে ঝুলছে। তা দেখে দশ বন্ধুরও ঝুলতে ইচ্ছে হলো। কিন্তু ওরা তো বানরের মতো গাছে চড়তে পারে না! তারা কী করবে, কী করবে যখন ভাবছিলো; তখন তারা কাছাকাছি একটা মোটা দড়ি ও বেশ বড়-সড় কাঠের টুকরো দেখলো। তাড়াহুড়ো করে তারা দড়িটা গাছে বেঁধে তাতে কাঠ চাপিয়ে নিলো। তারপর দোল খেলায় মেতে উঠলো। তারা একবারের জন্যও ভাবার সময় পেলো না যে, তারা কেমন করে চটাচট এসব করে পেলতে পারলো। তারা দেখলো, খেলাটা বেশ মজার! তো এর একটা নামওতো চাই? একজন বললো, বানরঝোলা, একজন বললো, ঝুলুনি। আরেকজন বললো, দুলুনি। এভাবে বলতেই থাকলো। কোনো সমাধান বের হলো না। নয় জন দায়িত্ব দিলো রিপাকে। তাদের দলের সবচে বুদ্ধিমান রিপা। তারা বলে, তুই একটা নাম দে না বুদ্ধিমতী! রিপা মুখে আঙুল দিয়ে ভেবে-টেবে নাম দিলো- দোলনা। সবার মনে ধরে গেলো নামটা। তাদের মুখ থেকে মুখ হয়ে নামটা ছড়িয়ে পড়লো পুরো দুনিয়ায়। পুঁচকে পাঁচকেরা তো নামটা খেয়ে ফেলতেই চাইলো। কিন্তু নাম যে খাওয়া যায় না। তাই তারা দিনমান তাতে চড়তে শুরু করে দিলো। সেই থেকে আজও দোলনা নামটা চড়িয়ে আছে।
সূত্র : সমকাল


নির্বাচিত বিষয়গুলো দেখুন

কবিতা ছোটগল্প গল্প নিবন্ধ ছড়া টিপস রম্য গল্প প্রেমের কবিতা স্বাস্থ্য কথা কৌতুক ইসলামী সাহিত্য কম্পিউটার টিপস জানা অজানা লাইফ স্ট্যাইল স্বাধীনতা স্থির চিত্র ফিচার শিশুতোষ গল্প ইসলাম কবি পরিচিতি প্রবন্ধ ইতিহাস চিত্র বিচিত্র প্রকৃতি বিজ্ঞান রম্য রচনা লিরিক ঐতিহ্য পাখি মুক্তিযুদ্ধ শরৎ শিশু সাহিত্য বর্ষা আলোচনা বিজ্ঞান ও কম্পিউটার বীরশ্রেষ্ঠ লেখক পরিচিতি স্বাস্থ টিপস উপন্যাস গাছপালা জীবনী ভিন্ন খবর হারানো ঐতিহ্য হাসতে নাকি জানেনা কেহ ছেলেবেলা ফল ফুল বিরহের কবিতা অনু গল্প প্রযুক্তি বিউটি টিপস ভ্রমণ মজার গণিত সংস্কৃতি সাক্ষাৎকার ঔষধ ডাউনলোড প্যারডী ফেসবুক মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য রম্য কবিতা সাধারণ জ্ঞান সাহিত্যিক পরিচিতি সায়েন্স ফিকশান স্বাধীনতার কবিতা স্বাধীনতার গল্প কৃষি তথ্য চতুর্দশপদী প্রেমের গল্প মোবাইল ফোন রুপকথার গল্প কাব্য ক্যারিয়ার গবেষণা গৌরব জীবনের গল্প ফটোসপ সবুজ সভ্যতা
অতনু বর্মণ অদ্বৈত মারুত অধ্যাপক গোলাম আযম অনন্ত জামান অনিন্দ্য বড়ুয়া অনুপ সাহা অনুপম দেব কানুনজ্ঞ অমিয় চক্রবর্তী অরুদ্ধ সকাল অর্ক অয়ন খান আ.শ.ম. বাবর আলী আইউব সৈয়দ আচার্য্য জগদীশচন্দ্র বসু আজমান আন্দালিব আতাউর রহমান কাবুল আতাউস সামাদ আতোয়ার রহমান আত্মভোলা (ছন্দ্রনাম) আদনান মুকিত আনিসা ফজলে লিসি আনিসুর রহমান আনিসুল হক আনোয়ারুল হক আন্জুমান আরা রিমা আবদুল ওহাব আজাদ আবদুল কুদ্দুস রানা আবদুল গাফফার চৌধুরী আবদুল মান্নান সৈয়দ আবদুল মাবুদ চৌধুরী আবদুল হাই শিকদার আবদুল হামিদ আবদুস শহীদ নাসিম আবিদ আনোয়ার আবু মকসুদ আবু সাইদ কামাল আবু সাঈদ জুবেরী আবু সালেহ আবুল কাইয়ুম আহম্মেদ আবুল মোমেন আবুল হাসান আবুল হায়াত আবুল হোসেন আবুল হোসেন খান আবেদীন জনী আব্দুল কাইয়ুম আব্দুল মান্নান সৈয়দ আব্দুল হালিম মিয়া আমানত উল্লাহ সোহান আমিনুল ইসলাম চৌধুরী আমিনুল ইসলাম মামুন আরিফুন নেছা সুখী আরিফুর রহমান খাদেম আল মাহমুদ আলম তালুকদার আশীফ এন্তাজ রবি আসমা আব্বাসী আসাদ চৌধুরী আসাদ সায়েম আসিফ মহিউদ্দীন আসিফুল হুদা আহমদ - উজ - জামান আহমদ বাসির আহমেদ আরিফ আহমেদ খালিদ আহমেদ রাজু আহমেদ রিয়াজ আহসান হাবিব আহসান হাবীব আহাম্মেদ খালিদ ইকবাল আজিজ ইকবাল খন্দকার ইব্রাহিম নোমান ইব্রাহীম মণ্ডল ইমদাদুল হক মিলন ইলিয়াস হোসেন ইশতিয়াক ইয়াসির মারুফ উত্তম মিত্র উত্তম সেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এ কে আজাদ এ টি এম শামসুজ্জামান এ.বি.এম. ইয়াকুব আলী সিদ্দিকী একরামুল হক শামীম একে আজাদ এনামুল হায়াত এনায়েত রসুল এম আহসাবন এম. মুহাম্মদ আব্দুল গাফফার এম. হারুন অর রশিদ এরশাদ মজুদার এরশাদ মজুমদার এস এম নাজমুল হক ইমন এস এম শহীদুল আলম এস. এম. মতিউল হাসান এসএম মেহেদী আকরাম ওমর আলী ওয়াসিফ -এ-খোদা ওয়াহিদ সুজন কবি গোলাম মোহাম্মদ কমিনী রায় কাজী আনিসুল হক কাজী আবুল কালাম সিদ্দীক কাজী নজরুল ইসলাম কাজী মোস্তাক গাউসুল হক শরীফ কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম কাপালিক কামরুল আলম সিদ্দিকী কামাল উদ্দিন রায়হান কার্তিক ঘোষ কায়কোবাদ (কাজেম আলী কোরেশী) কৃষ্ণকলি ইসলাম কে এম নাহিদ শাহরিয়ার কেজি মোস্তফা খন্দকার আলমগীর হোসেন খন্দকার মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ্ খান মুহাম্মদ মইনুদ্দীন খালেদ রাহী গাজী গিয়াস উদ্দিন গিরিশচন্দ সেন গিয়াস উদ্দিন রূপম গোলাম কিবরিয়া পিনু গোলাম নবী পান্না গোলাম মোস্তফা গোলাম মোহাম্মদ গোলাম সরোয়ার চন্দন চৌধুরী চৌধুরী ফেরদৌস ছালেহা খানম জুবিলী জ. রহমান জসিম মল্লিক জসীম উদ্দিন জহির উদ্দিন বাবর জহির রহমান জহির রায়হান জাওয়াদ তাজুয়ার মাহবুব জাকির আবু জাফর জাকির আহমেদ খান জাকিয়া সুলতানা জান্নাতুল করিম চৌধুরী জান্নাতুল ফেরদাউস সীমা জাফর আহমদ জাফর তালুকদার জাহাঙ্গীর আলম জাহান জাহাঙ্গীর ফিরোজ জাহিদ হোসাইন জাহিদুল গণি চৌধুরী জায়ান্ট কজওয়ে জিয়া রহমান জিল্লুর রহমান জীবনানন্দ দাশ জুবাইদা গুলশান আরা জুবায়ের হুসাইন জুলফিকার শাহাদাৎ জেড জাওহার জয়নাল আবেদীন বিল্লাল ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া ড. কাজী দীন মুহম্মদ ড. ফজলুল হক তুহিন ড. ফজলুল হক সৈকত ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ ড. মুহা. বিলাল হুসাইন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ড. রহমান হাবিব ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ডক্টর সন্দীপক মল্লিক ডা. দিদারুল আহসান ডা: সালাহ্উদ্দিন শরীফ তমিজ উদদীন লোদী তাজনীন মুন তানজিল রিমন তাপস রায় তামান্না শারমিন তারক চন্দ্র দাস তারাবাঈ তারেক রহমান তারেক হাসান তাসনুবা নূসরাত ন্যান্সী তাসলিমা আলম জেনী তাহমিনা মিলি তুষার কবির তৈমুর রেজা তৈয়ব খান তৌহিদুর রহমান দর্পণ কবীর দিলওয়ার হাসান দেলোয়ার হোসেন ধ্রুব এষ ধ্রুব নীল নঈম মাহমুদ নবাব আমিন নাইমুর রশিদ লিখন নাইয়াদ নাজমুন নাহার নাজমুল ইমন নাফিস ইফতেখার নাবিল নাসির আহমেদ নাসির উদ্দিন খান নাহার মনিকা নাহিদা ইয়াসমিন নুসরাত নিজাম কুতুবী নির্জন আহমেদ অরণ্য নির্মলেন্দু গুণ নিসরাত আক্তার সালমা নীল কাব্য নীলয় পাল নুরে জান্নাত নূর মোহাম্মদ শেখ নূর হোসনা নাইস নৌশিয়া নাজনীন পীরজাদা সৈয়দ শামীম শিরাজী পুলক হাসান পুষ্পকলি প্রাঞ্জল সেলিম প্রীতম সাহা সুদীপ ফকির আবদুল মালেক ফজল শাহাবুদ্দীন ফররুখ আহমদ ফাতিহা জামান অদ্রিকা ফারুক আহমেদ ফারুক নওয়াজ ফারুক হাসান ফাহিম আহমদ ফাহিম ইবনে সারওয়ার ফেরদৌসী মাহমুদ ফয়সাল বিন হাফিজ বাদশা মিন্টু বাবুল হোসেইন বিকাশ রায় বিন্দু এনায়েত বিপ্রদাশ বড়ুয়া বেগম মমতাজ জসীম উদ্দীন বেগম রোকেয়া বেলাল হোসাইন বোরহান উদ্দিন আহমদ ম. লিপ্স্কেরভ মঈনুল হোসেন মজিবুর রহমান মন্জু মতিউর রহমান মল্লিক মতিন বৈরাগী মধু মনসুর হেলাল মনিরা চৌধুরী মনিরুল হক ফিরোজ মরুভূমির জলদস্যু মর্জিনা আফসার রোজী মশিউর রহমান মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর মা আমার ভালোবাসা মাইকেল মধুসূদন দত্ত মাওলানা মুহাম্মাদ মাকসুদা আমীন মুনিয়া মাখরাজ খান মাগরিব বিন মোস্তফা মাজেদ মানসুর মুজাম্মিল মানিক দেবনাথ মামুন হোসাইন মারজান শাওয়াল রিজওয়ান মারুফ রায়হান মালিহা মালেক মাহমুদ মাসুদ আনোয়ার মাসুদ মাহমুদ মাসুদা সুলতানা রুমী মাসুম বিল্লাহ মাহফুজ উল্লাহ মাহফুজ খান মাহফুজুর রহমান আখন্দ মাহবুব আলম মাহবুব হাসান মাহবুব হাসানাত মাহবুবা চৌধুরী মাহবুবুল আলম কবীর মাহমুদা ডলি মাহমুদুল বাসার মাহমুদুল হাসান নিজামী মাহ্‌মুদুল হক ফয়েজ মায়ফুল জাহিন মিতা জাহান মু. নুরুল হাসান মুজিবুল হক কবীর মুন্সি আব্দুর রউফ মুফতি আবদুর রহমান মুরাদুল ইসলাম মুস্তাফিজ মামুন মুহম্মদ নূরুল হুদা মুহম্মদ শাহাদাত হোসেন মুহাম্মদ আনছারুল্লাহ হাসান মুহাম্মদ আবু নাসের মুহাম্মদ আমিনুল হক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল মুহাম্মদ মহিউদ্দিন মুহাম্মাদ হাবীবুল্লাহ মুহিউদ্দীন খান মেজবাহ উদ্দিন মেহনাজ বিনতে সিরাজ মেহেদি হাসান শিশির মো. আরিফুজ্জামান আরিফ মো: জামাল উদ্দিন মোঃ আহসান হাবিব মোঃ তাজুল ইসলাম সরকার মোঃ রাকিব হাসান মোঃ রাশেদুল কবির আজাদ মোঃ সাইফুদ্দিন মোমিন মেহেদী মোর্শেদা আক্তার মনি মোশাররফ মোশাররফ হোসেন খান মোশারেফ হোসেন পাটওয়ারী মোহসেনা জয়া মোহাম্মদ আল মাহী মোহাম্মদ জামাল উদ্দীন মোহাম্মদ নূরুল হক মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ্ মোহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ মোহাম্মদ সা'দাত আলী মোহাম্মদ সাদিক মোহাম্মদ হোসাইন মৌরী তানিয় যতীন্দ্র মোহন বাগচী রজনীকান্ত সেন রণক ইকরাম রফিক আজাদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রহমান মাসুদ রহিম রায়হান রহিমা আখতার কল্পনা রাখাল রাজিব রাজিবুল আলম রাজীব রাজু আলীম রাজু ইসলাম রানা হোসেন রিয়াজ চৌধুরী রিয়াদ রুমা মরিয়ম রেজা উদ্দিন স্টালিন রেজা পারভেজ রেজাউল হাসু রেহমান সিদ্দিক রোকনুজ্জামান খান রোকেয়া খাতুন রুবী শওকত হোসেন শওকত হোসেন লিটু শওগাত আলী সাগর শফিক আলম মেহেদী শরীফ আতিক-উজ-জামান শরীফ আবদুল গোফরান শরীফ নাজমুল শাইখুল হাদিস আল্লামা আজীজুল হক শামছুল হক রাসেল শামসুজ্জামান খান শামসুর রহমান শামস্ শামীম হাসনাইন শারমিন পড়শি শাহ আব্দুল হান্নান শাহ আলম শাহ আলম বাদশা শাহ আহমদ রেজা শাহ নেওয়াজ চৌধুরী শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ শাহজাহান কিবরিয়া শাহজাহান মোহাম্মদ শাহনাজ পারভীন শাহাদাত হোসাইন সাদিক শাহাবুদ্দীন আহমদ শাহাবুদ্দীন নাগরী শাহিন শাহিন রিজভি শিউল মনজুর শিরিন সুলতানা শিশিরার্দ্র মামুন শুভ অংকুর শেখ হাবিবুর রহমান সজীব সজীব আহমেদ সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত সাইদা সারমিন রুমা সাইফ আলি সাইফ চৌধুরী সাইফ মাহাদী সাইফুল করীম সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদূদী সাকিব হাসান সাজ্জাদুর রহমান সাজ্জাদ সানজানা রহমান সাবরিনা সিরাজী তিতির সামছুদ্দিন জেহাদ সামিয়া পপি সাযযাদ কাদির সারোয়ার সোহেন সালমা আক্তার চৌধুরী সালমা রহমান সালেহ আকরাম সালেহ আহমদ সালেহা সুলতানা সিকদার মনজিলুর রহমান সিমু নাসের সিরহানা হক সিরাজুল ইসলাম সিরাজুল ফরিদ সুকান্ত ভট্টাচার্য সুকুমার বড়ুয়া সুকুমার রায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সুফিয়া কামাল সুভাষ মুখোপাধ্যায় সুমন সোহরাব সুমনা হক সুমন্ত আসলাম সুমাইয়া সুহৃদ সরকার সৈয়দ আরিফুল ইসলাম সৈয়দ আলমগীর সৈয়দ আলী আহসান সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন সিরাজী সৈয়দ তানভীর আজম সৈয়দ মুজতবা আলী সৈয়দ সোহরাব হানিফ মাহমুদ হামিদুর রহমান হাসান আলীম হাসান ভূইয়া হাসান মাহবুব হাসান শরীফ হাসান শান্তনু হাসান হাফিজ হাসিনা মমতাজ হুমায়ূন আহমেদ হুমায়ূন কবীর ঢালী হেলাল মুহম্মদ আবু তাহের হেলাল হাফিজ হোসেন মাহমুদ হোসেন শওকত হ্নীলার বাঁধন

মাসের শীর্ষ পঠিত

 
রায়পুর তরুণ ও যুব ফোরাম

.::jonaaki online::. © ২০১১ || টেমপ্লেট তৈরি করেছেন জোনাকী টিম || ডিজাইন ও অনলাইন সম্পাদক জহির রহমান || জোনাকী সম্পর্কে পড়ুন || জোনাকীতে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ