প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন

জোনাকী অনলাইন লাইব্রেরীতে আপনাকে স্বাগতম | জোনাকী যদি আপনার ভালো লাগে তবে আপনার বন্ধুদের সাথে লিংকটি শেয়ার করার অনুরোধ জানাচ্ছি | এছাড়াও যারা ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করতে আগ্রহী তারা jaherrahman@gmail.com এ মেইল করার অনুরোধ করা হচ্ছে | আপনার অংশগ্রহণে সমৃদ্ধ হোক আপনার প্রিয় অনলাইন লাইব্রেরী। আমাদের সকল লেখক, পাঠক- শুভানুধ্যায়ীদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা- অভিনন্দন।

এবং একদিন | তাজনীন মুন


 -মা, এমা,  দেইখা যাও আব্বায় আইজ কত্তো বাজার পাঠাইছে। সুগন্ধি চাইল রান্তে কইছে আইজ।
রমিলা কিছু জমানো টাকায় কয়েকটা নারিকেল কিনেছিলো -ছেলে নাড়ু খেতে খুব পছন্দ করে ।নারিকেল কোড়ানোর মধ্যেই ছেলের ডাক শুনে ছুট্টে এলো আর এতো বাজার দেখে নিজের উত্তেজনা চেপে মুখে বিরক্তি ভাব এনে বললো-” তোর বাপ কি জমিদারের প্যাটের থিকা আইছিলো, নাকি জমিদার বইনা গেছে? এডি পাঠাইছে ক্যান কইছে কিছু? ”
– না তো। আমারে খালি বাজার হাতে দিয়া কইলো তর মারে কবি আইজকা মাংস পুলাও রান্তে।
– রান্তে কইলেই হইলো? সাথে আরো মশল্লাপত্তর দেয়া লাগবো এডি কে দিবো? যা যা তোর বাপরে যায়া ক আমি ডাকি।

সবুজ এক গাল হেসে ছুট্টে দৌড় দিলো ওদের দোকানের দিকে। ওদের ছোট্ট দোকান। যে দোকানে বিক্রি হয় মৃত্যুর পরে লাশকে কবরস্থ করার যাবতীয় সামগ্রী। কাফনের কাপড়, খাটিয়া,গোলাপ জল,আগরবাতি, সুগন্ধি। ক্রেতার সমাগম খুব একটা হয় না এই দোকানে। সবুজ দিনের বেশির সময় ওর বাবার সাথে থাকে সেখানেই নতুন স্কুলের পড়া সারে সবুজ। বাবাকেও শেখায়। দোকানের আশপাশ দিয়ে কেউ হেটে গেলে সবুজের বাবা গর্ব করে তার ছেলের বিদ্যে জাহির করেন।
“আব্বা, মায় তোমারে ডাকতাছে। আমি বইলাম এয়ানে,তুমি যাও। মায়ে আইজ নাড়ুও বানায় জানো!  আমি আইজ ম্যালা খামু। ” – হাপাতে হাপাতে একটানা বাবাকে বলেই সবুজ বসে পরে দোকানে।

রমিলা বেগম ওইদিকে উদ্বেগ,  হয়তো ঘরে মেহমান কেউ আসবে। কতটুকু রাঁধবে, কতটুকু মশলা বাজার থেকে কিনে আনবে। এরই মধ্যে নিজের স্বামীকে দেখে ছুট্টে গিয়ে বললো-” বাসায় কি কেউ আইবো? আইজ এতো কিছু ক্যান?”
– আরে কেউ আইবো না। আমরাই পেট ভইরা খামু। দোকানের সামনের বাড়িত এক বাসার সবডি মানুষ মরছে। আমার দোকান থিকাই সব গেছে বুঝলা! আইজ ম্যালা কামাইছি! দামও হাকাইছি ভালোই।
– সবডি! কন কি? ক্যামনে মরলো?
-এত জাইনা কি করবি? তোরে রান্তে কইছি রান্ধ। শুনছি কাইল নাকি হরতাল ডাকছে। কাইলো ইনকাম খারাপ হইবো না মনে অয়।
-আইচ্ছা আপনে যাইয়া সবুজরে পাঠান।বাজারে যাওন লাগবো।

কথা শুনেই রওনা দিলো হেলাল। মনে মনে ভাবছে রোজ রোজ এমন  বেচাকেনা হলে এক ওয়াক্ত নামাজও বাদ দিতো না সে। একজনের জিনিসপত্র বিক্রি করতে পারলেই চলে যাবে প্রতিদিন। কিন্তু প্রতিদিন একজন পাওয়াই যায় না।টানা হরতালে যদি তার ইনকাম কিছু বাড়ে তাহলে দোকানটাকে একটু সাজাবে। বড় করে নেমপ্লেট লাগাবে ‘শেষ বিদায়’।
ভাবতে ভাবতেই দোকান এসে গেলো হেলালের। ছেলেকে ডেকে বললেন -” তর মায় ডাকে তরে যা। একদিন না পড়লে কিচ্চু হইবো না। যা বাপ!”
সবুজ আবারো একগাল হেসে দৌড়ে চলে যাচ্ছে। হেলাল ছেলের দিকে তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে আর মনে মনে  প্রার্থনা করছে দোকানে ক্রেতা যাতে বাড়ে একটু, ছেলেটাকে ভালো স্কুলে ভর্তি করতে হবে। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়েই আছে । এরই মধ্যে শুধু দেখলো একটা মাইক্রোবাস চলে গেলো সবুজের উপর দিয়ে।  একটা চিৎকার! আর এক খন্ড ভিড় এখন হেলালের চোখে! আরেকটি মৃত্যু ,যেই মৃত্যু হেলাল চায়নি!


আমার যতো ইচ্ছে | মালিহা


কিছুই ভালো লাগে না, মনে হয় লেখাপড়ার নামে সবাই আমাকে বন্দি করে রেখেছে। মা বলেন, ‘জন্মের পর ১২ বছর কেটেছে তোমার হাসতে খেলতে আনন্দ করতে করতে। সামনের ১২টা বছর তোমাকে প্রতিযোগিতায় নামতে হবে। ভালো ভালো রেজাল্ট আনতে হবে। ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে হবে। ভালো পদবিতে চাকরি করতে হবে।’ আমার শুধু ইচ্ছে করে একটা মাঠে একা একা দৌড়াতে—ঘাসে ভরা সবুজ মাঠে। চারপাশে গাছ আর গাছ। মাঠের প্রান্তজুড়ে থাকবে সবুজ আর অরণ্য। আর মাঠের মাঝখানে ছনের বাড়ি। বাড়িটা ঘিরে ফুলের বাগান। বাগানের পাশে একটা পাকা দোতলা বাড়ি থাকবে। সেই বাড়ির প্রতিটি দেয়ালে থাকবে আলমারি বোঝাই বই, বই আর বই। আমি যখন ইচ্ছে তখনই পড়ব। কেউ আমায় বাঁকা চোখে দেখবে না। কেউ ধমক দিয়ে আমার হাত থেকে বই কেড়ে নেবে না। রেগে রেগে কেউ আমায় বলবে না—যাও, স্কুলের পড়া পড়তে বসো।
বর্ষাকালে বৃষ্টি পড়বে, আমি বৃষ্টির পানিতে ভিজবো। কিছুক্ষণ একা একা বৃষ্টির গান গাইবো আর ভিজবো। পরে অন্যদেরও সঙ্গে নেবো। ভালো হয় আমার সঙ্গে অনেকগুলো ছোট ছোট বাচ্চা ভিজতে এলে। সবাই আমায় মালিহাপু বলে ডাকবে। ওদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে বৃষ্টিতে ভেজা খেলা খেলবো। মাঝেমধ্যে ওরা সবাই আমায় দূর থেকে পানি ছিটিয়ে দেবে, আমি আনন্দ পাবো। পশু-পাখি পুষতে খুব ইচ্ছা করে, যেমন—ব্লাড হাউন্ড, অ্যালসেশিয়ান, পুডল কুকুর, অনেক লোমে ভরা সাদা বড় বিড়াল আর ছোট কালো, নীল বিড়াল, যত রকম পাখি আছে—সব আমি চাই। সবগুলো থাকবে জোড়ায় জোড়ায়। আরেকটা পাখি চাই, যার কোনো জোড়া নেই। সেটা হলো ফিনিক্স।
বাগানে থাকবে অনেক প্রজাপতি। ফুল আর বাগানটা প্রজাপতিদের জন্য। পাশে থাকবে একটা বড় দীঘি আর সেই দীঘিতে রক্তকমল আর সাদা শাপলা ফুটবে। দীঘির পাড় ঘিরে থাকবে গাছের সারি। আমি পাড়ে বসবো আর চারপাশ দেখবো। দোতলা বাড়িটার একটা বড় রুমে থাকবে গিটার, বাঁশি, হারমোনিয়াম, ড্রাম, সেতার আর সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র। যারা বাজাতে চায় তারা আসবে এখানে। ওরা বাজাবে আমি শুনবো। আমি গিটার বাজাব। বাঁশি বাজানো শিখবো। একটা ঘরে আমার প্রিয়-অপ্রিয় গানের সিডি, ক্যাসেট, সিডি প্লেয়ার ওয়াকম্যান ইত্যাদি থাকবে। একটা ঘরে থাকবে অনেক রকম পুতুল, ছোট-বড় সাদা লাল কালো—সব রকমের পুতুল।
ছাদের ওপরে আর বাংলো বাড়ির সামনে দোলনা থাকবে। সেখানে বসে গান শুনবো, বই পড়বো। আর বৃষ্টির সময় ছাদে বসে বৃষ্টির রুমঝুম শব্দ শুনবো। মাঝেমধ্যে মনে হয়, দীঘির ওপর যদি একটা ঝুলন্ত দোলনা থাকত। দোল খেতে খেতে যদি দোলনা উল্টে যায় তাহলে তো পানিতে পড়ে যাবো। আমি তো সাঁতার জানি না। সাঁতার শিখতে হবে আমায়। শীতের সময় ছাড়া সব সময় দীঘিতে নেমে গোসল করবো। কী মজা! এত বড় জায়গায় আমি একা থাকবো।
বৃষ্টির সময় ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা আসবে ভিজতে। বইপ্রিয় মানুষরা আসবে বই পড়তে আর গানপ্রিয় মানুষ আসবে গান গাইতে। সবাই থাকবে দোতলা বাড়িটাতে আর আমি থাকবো ছনের ঘরে। আমার কারও সঙ্গে থাকতে ভালো লাগে না। রবিনসন ক্রুসো নামে এক নাবিক একাকী কাটিয়েছিলেন। মাঝে মাঝে আমারও ইচ্ছে করে সেই রবিনসন ক্রুসো হয়ে যেতে ।
গল্প করতে ভালো লাগে। গল্প নিশ্চই একা করবো না। থাক না, মানুষের সব ইচ্ছা পূরণের দরকার নেই। আমার গান গাইতে নাচ করতে ইচ্ছে করে, ছবি আঁকতে মন চায়। কিছুই করতে পারি না। তখন নিজেকে অলস মনে হয়। মা অনেক বই কিনে দেন। ভালো লাগে লাবণ্যের বাসায় গেলে, দোলনায় চড়তে পারি। আমি কার্টুন আঁকতে পারি। এগুলো সব ভালো লাগে। যদিও তাল ঠিক থাকে না, তবুও সারাক্ষণ নাচতে থাকি।
আমার অনেক ভালো বন্ধু আছে। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে ভালোই লাগে। আমরা মারামারি করি। ওদের নিয়ে গল্প লিখি। ওরা পড়ে ভুল পেলে আমায় ধরে উত্তমমধ্যম দেয়। এটাও ভালো লাগে। স্কুলের ক্যাম্পের কথা খুব মনে পড়ে। তখন সবাই মিলে তাঁবু বানিয়েছি, কী যে মজা হয়েছিল। অনেক রাত পর্যন্ত টিচাররাসহ গল্প করেছি।
একবার লাবণ্য আর আমি লিফটে আটকে পড়েছিলাম। খুব ভয় পেয়েছিলাম সেদিন। ভূতের ভয় হয়েছিল। লাবণ্য হাসতে হাসতে কাঁধের ওপর ঢলে পড়েছিল। তখন ওকে মিসেস ড্রাকুলা মনে হচ্ছিল। ছোট বোন ফারিহার সঙ্গে অনেক দুষ্টামি করি। বিদ্যুত্ চলে গেলে অন্ধ ঘরে ওর সঙ্গে লুকোচুরি খেলা খেলি। খুব ভালো লাগে। এই সব ছেড়ে কোথায় যাব? লাবণ্য, আদিবা, তাসনুবা, নাতাসা, সুস্মিতা, যূথি, মিলা, ঋত,ু মৌমি ওদের ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না। ফারিহাটা বোন হয়েছে বলে অনেক খুশি হয়েছি। এখন কীভাবে ওকে ছেড়ে চলে যাব? তবুও বুঝি লেখাপড়া করতেই হবে। আমার স্বপ্ন পূরণ করতে হলে লেখাপড়া করতেই হবে। স্বপ্নগুলো মনের মাঝে আছে। এগুলো পরে পূরণ করবো।

সূত্র: আমার দেশ/এক্কাদোক্কা


‘কি মুসকিল, তোরা কি আমাকে পাগল করে দিবি’| অতনু বর্মণ


দেওয়ালে অথবা পোস্টারে, সাইনবোর্ডে কিংবা হোর্ডিংয়ে বিচিত্র বিপর্যয় আকছার চোখে পড়ে। তার কোনওটা, যে লিখেছে, তার বানান বোধের অভাব অথবা নিছক কোনও একটা শব্দ অসাবধানে বাদ পড়ে যাওয়াই হোক, কিংবা রসিকজনের ইচ্ছাকৃত কোনও শব্দ মুছে দেওয়াই হোক-এককথায় বিষয়টি মজাদার। কখনও কখনও আবার অতিরিক্ত একটি লাইন সংযোজনেও খেলাটা জমে ওঠে। যেমন আশির দশকের শেষের দিকে টালা ব্রিজের গায়ে বিশাল অক্ষরে লেখা ‘বাঙালি জাগো’-র ঠিক নিচেই কে যেন লিখেছিলেন-‘আঃ, কাঁচা ঘুম ভাঙাইবেন না।’ মনে পড়তে বাধ্য মনীভূষণ ভট্টাচার্যের সেই সপাটে চাবুক মারার মত ভাবনাটির কথা। যেখানে সত্তর দশকের দেওয়াল লিখলে ‘বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস’ জ্বল-জ্বল করে। ‘রাজনৈতিক’ শব্দটি কিভাবে যেন বাদ পড়ে যায়। বীরভূমের প্রান্তিক রেলস্টেশনের টিকিট কাউন্টারে দেখেছিলাম লেখা আছে- ‘টিকিঘর ছাড়িবার পূর্বে টিকি ও টাক দেখিয়া লইবেন।’ রসিক বাঙালি টিকিটের ‘ট’ এবং টাকার আ’কার একটু মাথা খাটিয়ে মুছে দিয়েছিলেন মাত্র। লিখন বিপর্যয়ের সুপার ডুপার হিট একটি গল্প অনেকেরই হয়তো জানা। অবশ্য সেটিকে মুদ্রণ বিপর্যয় বললেই যথোপযুক্ত হয়। খবর কাগজে ছাপা হল-পুলিশের গুলি খেয়ে দুই বকের মৃত্যু। বলা বাহুল্য ওটা আসলে গুলি খেয়ে যুবকের মৃত্যু। আমার বক্তব্য ওটা নয়, রসিক বাঙালি এর সঙ্গে যোগ করল আরও একটি মাত্রা। পরের দিন সংশোধনীতে লেখা হল - ওটি ‘পাছার’ ভুল ছিল। ছাপার এমন বিপর্যয় বাঙালি ছাড়া আর কারও মস্তিষ্কের আমদানি হতে পারে। ছাপাখানার ভূত কত যে অদ্ভুত কাণ্ড ঘটিয়ে চলে সারা দুনিয়া জুড়ে তার নজির মেলা ভার। কখনও যতি চিহ্ন বসিয়ে দেয় ভুল জায়গায় আর তার ফলে অর্থ যায় উল্টে। একসময় এইরকম একটি চিঠির কথা খুব শোনা যেত - আমাদের মেনি বেড়ালটি বমি করেছে শ্বশুরমশাইয়ের মুখে, ঘা হয়েছে পেঁপে গাছের, মগডালে মধুর চাক হয়েছে, শাশুড়িমায়ের কোমরে, ব্যথাটা বেড়েছে খোকার, একটি খেলনা এনে দিও ভুলো কুকুরের জন্য, আর তো পারা যায় না তোমার জন্য, মন খারাপ করে না, চিন্তা কোর, না আমি পথ চেয়ে, আছি ভাল, থেকো চিঠি, ইতি মৃণালিনী।
স্কুল সার্ভিস কমিশন পূর্ববর্তী যুগে যখন এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ থেকে শিক্ষক পদপ্রার্থীদের নাম পাঠানো হত, আর হবু শিক্ষকদের ক্লাস নিতে হত, সেই আমলের কথা। পিছনে বসে আছেন তিন-চারজন হোমরা-চোমরা। প্রধান শিক্ষক, এক্সপার্ট হিসেবে বাইরে থেকে আগত কোনও অধ্যাপক, পঞ্চায়েৎ থেকে মনোনীত একজন, এইরকম মানুষেরা। হবু শিক্ষককে পড়াতে দেওয়া হয়েছে মেঘনাদ বধ কাব্যের অংশ বিশেষ। বেশ পড়াচ্ছিলেন, হঠাৎ একটি লাইন এল - ‘হুহুঙ্কারে বাহিরিল বারণ’। অকালপক্ক একটি ছাত্র উঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল -‘স্যর, বারণ মানে কি?’ হবু শিক্ষকের অবস্থা ঢিলে। বারণ মানে যে হাতি সেটি তাঁর জানা নেই, কিন্তু বাঙালি তো, জানি না বলতে শেখেননি। যথেষ্ট দায়িত্ব নিয়ে তিনি বলে দিলেন ‘ওটা ছাপার ভুল, বারণ নয়, ওটা হবে রাবণ, রামায়ণ থেকে লেখা হয়েছে সেটা জানো না?’
লিখন না হলেও কথন বিপর্যয় জাতীয় একটা মজার খেলা আছে। এক সময় খেলাটিতে দক্ষ হয়ে উঠেছিলাম। অনায়াসে ওলোট-পালট কথা বলে যেতাম। গানও গাইতে পারতাম, যেমন - ‘রাঁওন শাতে যদি, অরণে শাসে মোরে, ঝাহিরে বড় বহে, বয়নে নারি ঝরেৃ’। আমরা বেশ কয়েকজন এই ওলোট-পালট বাক্যে কথাও বলতাম। হয়তো রাস্তা দিয়ে হাঁটছি, অন্ধকার গ্রামের মেঠো পথ, সামনের বন্ধু হয়তো কাদায় পা দিয়েছেন, আমাকে সাবধান করে বলে উঠলেন-‘ধাবসান ধাবসান, কামনে সাদা’। আমরাই যে এমন মজাদার বাক্যক্রীড়ার আবিষ্কারক ছিলাম এমন দাবি করব না। আবহমান কাল থেকে বাঙালি এই চর্চা করে আসছে। মনে পড়ে ছেলেবেলায় মায়ের মুখে শুনতাম - লুলকো ফুচি, সিমকি নিঙারা আর এক চাপ কায়ের গল্প। অনেকে আবার সচেতন ভাবে নয়, স্বাভাবিক অভ্যাসেই কখন বিপর্যয়ের শিকার। নিচু ক্লাসের একটি ছাত্রকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘বয়ে আকার তয়ে আকার দন্ত্যসয়ে আকার, কি হয়?’ সে অম্লান বদলে বলল -বাসাতা। সে তো না হয় শিশু, আমরা বড়রাও কত অম্লান বদনে রিশকা অথবা ট্যাসকি চড়ে ঘুরে বেড়াই। খবরের কাগজে নৃশংসতার ঘটনা পড়ে বলে উঠি - ‘ওটা কি মানুষ? না পিচাশ?’
শুনেছিলাম চাটগাঁয়ের মানুষ নাকি ‘প’-কে ‘ফ’ বলেন। শোনা কথাটি ঠিক না ভুল তা পরীক্ষা করার জন্য একজন মাস্টার মশাইকে জিজ্ঞেস করেছিলাম - ‘স্যার, আপনারা নাকি ‘প’-কে ‘ফ’ বলেন?’ স্যার বলেছিলেন- ‘ধুর ফাগল, তাই কেউ বলে নাকি!’ আসলে যিনি বলেন তিনি তো জানেন না যে তিনি কি বলেন। এ বিষয়ে চূড়ান্ত একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। আমাদের পাড়ায় জগাপাগলাকে খ্যাপাতো স্কুলের বাচ্চারা। একদিন চার-পাঁচটা ছেলে একসঙ্গে বিরক্ত করছে জগাকে। তিতিবিরক্ত হয়ে জগা বলে উঠল - ‘কি মুসকিল, তোরা কি আমাকে পাগল করে দিবি।’


কবর থেকে চুরি হল হুমায়ূনের লাশ! | মোঃ রাশেদুল কবির আজাদ


রাতটি ছিল একমাসে দুটো পূর্ণিমার ঘটার রাত। হোসেন আলী রাতের খাবার খেয়ে বাইরে বের হয়েছে। চারদিক জোছনায় ভরে আছে। হোসেন আলী জানে এই বিরল ঘটনা আবার তিন বছর পর দেখা যাবে। তাই পারত পক্ষে আকাশের বুকে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা দেখতে সে ভুল করে না। পূর্ণিমা, ধূমকেতু, কিংবা আকাশের বুকে তারাগুলোকে সে প্রতিদিন দেখে নেয়। যুগের পরিবর্তন হয়েছে। সভ্যতার চাদর মানুষকে দিয়েছে ঘরবন্দী পৃথিবী। তরুণ প্রজন্ম কম্পিউটার নিয়ে সারারাত কাটিয়ে দেয়। ফেইজবুক, টুইটারসহ নানা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো নতুন প্রজন্মকে করছে গৃহপালিত। তাদের বাবা মা আশা নিরাশার মাঝে জীবন কাঁটায়। অনেকে অজ্ঞতার কারণে সন্তানের কাছে জানতেও চায় না সারা রাত সে কম্পিউটারে কী করে? কিন্তু স্কুল-কলেজের পরীক্ষার ফলাফল বের হলে অনেক বাবা-মার চোখের জলে দুঃখ ঝরে। কিন্তু এমনটি তো হওয়ার কথা ছিল না! মনের মাঝে অব্যক্ত কষ্ট নিয়ে প্রতিরাতেই হোসেন আলী প্রায় ঘন্টা খানেক খোলা আকাশের নিচে মেঠো পথ দিয়ে হাঁটতে থাকে। এই সময় সে কাউকে সঙ্গী করে না। তার স্ত্রী ঘুমানোর আগে হোসেন আলীর অভ্যাসের কথা ভেবে কাচের জগটি ভরে রাখে পানি দিয়ে। পাশে একটি গ্লাসও ঢেকে রাখে। তার স্ত্রী জানে, ঘরে ফিরেই সে হাত মুখ ধুয়ে প্রায় এক জগ পানি পান করবে। এই অভ্যাস হোসেন আলীর ছাত্র জীবন থেকে। তাই শরীরের প্রচুর ঘাম হয়। কিন্তু রোগ হয় কম। যখন হাঁটতে বের হয় রাতে, সে গ্রামের মানুষের খোঁজ খবরও নিতে যায়। বাঁশ বনের মাঝ দিয়ে দ্বিতীয় রাতের পূর্ণিমার চাঁদকে হোসেন আলী লক্ষ্য করে। সাদা মেঘগুলো কেমন জানি পাগলা ঘোড়ার মত চাঁদের পাশ দিয়ে ছুটে চলেছে। বাঁশ বনের ফাঁক গড়িয়ে নীলাভে চাঁদের কিরণ গ্রামের মেঠো পথে পড়ে সৃষ্টি হয়েছে এক অন্যরকম আলোকসজ্জ্বা। এমন আলোকসজ্জ্বায় ভুবণ রঙানো কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। হোসেন আলী এর বিস্তর বর্ণনা দিতে পারবে না তবে মনের মাঝে যে আনন্দ ও সুখের সৃষ্টি তা দেখে, তার পূর্ণতায় সে ভরপুর। বাঁশ বনের সামনেই নিশিপল্লীর গোরস্থান। কিছুদিন আগে এই গ্রামের নামকরা এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। তা মাস খানেক হবে। দেশের দূর দূরান্ত থেকে মানুষ প্রতিদিন আসে তার কবর দেখতে। শুধু মৃত ব্যক্তির ফুফু অসুস্থ থাকার কারণে তাকে দেখতে আসতে পারে নি। হোসেন আলী হাঁটতে হাঁটতে কাঠ বাদাম তলায় চলে আসে। সেখানে চারটি রিকসা কাপড় দিয়ে সামনে মোড়ানো। হোসেন আলী মনে কৌতুহল সৃষ্টি হয়। এত রাতে সবুর মিয়ার বাড়িতে কারা এলো? সে রিকসা চালকদের কাছে জানতে চায়। বৃদ্ধ বয়সি এক রিকসাচালক হোসেন আলীর সামনে এগিয়ে আসে। সে হোসেন আলীকে বলে, ‘আপনাদের গ্রামে সবুর মিয়ার যে আত্মীয় মাস খানেক আগে বজ্রপাতে মারা গেছেন এরা সেই বাড়ির মেহমান। রিকসার মধ্যে আলাপচারিতায় যা বুঝেছি তাতে মনে মৃত ব্যক্তির ফুফু এসেছেন’। হোসেন আলীর কাছে বিষয়টি পরিস্কার হয়ে যায়। হোসেন আলী একবার রাতের আকাশের দিকে তাঁকায় আবার ডানদিকে গোরস্থানের দিকে নজর দেয়। তাদের গ্রামটি অজো পাড়া গা হলেও বিদ্যুতের বাতি চারদিকে আনন্দে আত্মহারা। যদিও মাঝে মাঝে লোডশেডিং হয়। এখন আবার বিদ্যুৎ আসাতে রাতের আকাশটাকে কেমন যেন অন্ধকার লাগছে। তবুও নীলাভে চাঁদ তার জোছনার চাদর বিছিয়ে দিয়েছে নিশিপল্লীতে। হোসেন আলীর হঠাৎ করেই তার মেয়ে মিথিলার কথা মনে পড়ে। কেন মনে পড়ে তা সে জানে না। মেয়ের জন্য তার বুকের ভিতর সে অব্যক্ত বেদনা ছিল, সৃষ্টিকর্তা তা অনেকটাই লাগব করেছেন। তার বিশ্বাস, তার মিথিলা একদিন বাবার হাত ধরে রাতের আকাশ দেখার জন্য ঠিকই বের হবে। হাতের বাম পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালটিকে জোড়াতালি দিয়ে রেখেছে একটি সেতু। আজ থেকে বিশ বছর আগে সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছিল। রাত ন’টার পর কোথা থেকে এসে কিছু মোটর সাইকেল আরোহী এই সেতুর ওপর বসে আড্ডা দেয়। গত সাত দিন আগে তাদের আলাপচারিতা হোসেন আলী শুনে ফেলে। আলাপচারিতা শুনে হোসেন আলীর মনে ভয় ধরে যায়। সে কাউকে সে কথা বলে না। তবুও সে রাতে হাঁটা বন্ধ করে নি।
সেদিন সেতু ওপর বসে কয়েকজন লোক আলাপ করতে ছিল মৃত মানুষের শরীর নিয়ে। বজ্রপাতে যারা মারা যায় তাদের শরীরের নাকি অনেক দাম। বিশেষ করে মৃত ব্যক্তি মাথা। বজ্রপাতে মৃত ব্যক্তির মাথাটি নাকি ম্যাগনেটে পরিণত হয়। সেই মাথার মূল্য তারা যা বলছে তাতে হোসেন আলী বিস্মিত হয়। কী করে একটি মৃত মানুষের মাথা প্রায় কোটি টাকা মূল্য হতে পারে? যারা এ আলাপ করতে ছিল তারা অবশ্যই কোন সংঘবদ্ধ অপরাধ জগতের মানুষ। ইদানিং হোসেন আলী পত্র পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারে নিত্য নতুন চুরি ডাকাতির নানা কৌশল। মানুষের মধ্য থেকে মানবিকতা ওঠে যাচ্ছে। কিছুদিন আগে পাশের গ্রাম নগরকান্দা থেকে একরাতে সতেরটি লাশ চুরি গেছে।
অন্যদিকে শহরের অবস্থা আরো করুণ। ঢাকা শহরে ব্যস্ত কোন রাস্তার মোড়ে আপনি যদি ছোট্ট কোনো ছেলে মেয়ের হাতে কোনো ঠিকানা লেখা দেখতে পান এবং সেই মোতাবেক তাকে পৌছে দিতে যান, তাহলেই ধরা খেলেন। আপনাকে পণবন্দি হিসেবে তারা রেখে দিবে এবং আপনার পরিবারের কাছে কয়েক লক্ষ টাকা পণ দাবী করবে। না দিতে পারলে হয়ত আপনার প্রস্থান হবে পৃথিবী থেকে! হোসেন আলী ভাবে জীবন্ত মানুষকে নিয়ে না এমন করা গেল, কিন্তু মৃত মানুষের লাশ কারা কবর থেকে তুলে নিয়ে যায়? মৃত মানুষের হাড়, কঙ্কালও নাকি অনেক দামী। বিগত ছয় মাস ধরে হোসেন আলীদের গোরস্থান থেকে প্রায় দুএকটি করে কবর খোড়া পাওয়া যায়। সেই কবরে কোন লাশের চিহ্ন থাকে না। গ্রামের সহজ সরল মানুষ বিষয়টির প্রতি তেমন আমল দেয় না। তারা মনে করে, হয়ত শিয়ালে পঁচা লাশ খেয়ে ফেলেছে। কিন্তু হোসেন আলীর মনে অন্য সন্দেহ ঢুকে যায়। আজো লোকগুলো সেতুর ওপর বসা। হোসেন আলী সেতুর ওপর বসতে যাবে এমন সময় ওদের মধ্য থেকে একজন বলে ওঠলো, ‘কাকা আমরা একটা ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলাপ করছি, আপনি এখানে না বসলে খুঁশি হবো’। হোসেন আলী জোছনার আলোতে দেখতে পায় একটি ছেলে হাতে পিস্তল। ছেলেটি হোসেন আলীকে দেখানোর জন্যেই পিস্তলটি বের করেছে। এমন সময় হোসেন আলীর পাশে একটি রিকসা এসে থামে। গ্রামের রাস্তা হওয়াতে রাত এগারোটার পর এই রাস্তায় কোনো মানুষের চলাচল নেই। রিকসাওয়ালা সোজা সেতুর ওপর ওঠে। ওদের মাঝ থেকে একজন রিকসাওয়ালাকে বলে, ‘কোদালটা এনেছিস?’ রিকসাওয়াল হ্যাঁ সূচক উত্তর দেয়। আরেকজন জানতে চায়, বস এসেছে কি না? রিকসাওয়ালা জবাব দেয়, ‘তারা মাইক্রো নিয়ে দু’ঘন্টা আগেই বসে আছে পাঁকা রাস্তায়’। হোসেন আলী বিপদের আভাস পায়। সে আর দেরি করে না। দ্রুত বাড়ির দিকে রওয়ানা হয়। পিছন থেকে ওদের একজন একটি টর্চ লাইট জ্বেলে বলে, ‘কাকা আমরা লাইট ধরছি, আপনি বাড়ি যান’।
ঘরে ফিরে হোসেন আলী টেবিলের সামনে রাখা চেয়ারে বসে। তার স্ত্রী ও মেয়েটি নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। আজ রাতে হোসেন আলীর কিছুতেই ঘুম আসবে না। কেন আসবে না, তার কারণও কাউকে সে বলতে পারছে না। যদি তার স্ত্রী এই ঘটনা শুনে, তাহলে তাকে আর রাতে বের হতে দিবে না। হোসেন আলী আবারও ঘর থেকে বের হয়ে টিউবওয়েলে দিকে যেতে থাকে। পূর্ণিমার চাঁদটিকে ইতোমধ্যে কালো মেঘ প্রায় গ্রাস করতে যাচ্ছে। কেমন যেন অন্ধকার লাগছে চারদিক। চাঁদের দিকে তাকিয়ে হোসেন আলী বলতে থাকে, ‘তুইও কী ওদের দলে? তা’না হলে আলো নিভাচ্ছিস কেন?’ চাঁদ কোনো জবাব দেয় না। চিরকালের জন্য দেয়া ‘না দেখা কলঙ্ক’ মাথায় নিয়ে চাঁদের মত চাঁদ জোছনা ভাঁসায় আবার আঁধার নামায়। টিউবওয়েলের হাতলটা ধরে হোসেন আলী একটি চাপ দিয়ে সামনে তাঁকায়। তার মনে হয়, গোরস্থানের মধ্যে কারা যেন কাজ করছে। তাহলে আবার কোনো মানুষ মারা গেল নাকি যাকে দাফন করা হচ্ছে? নিশিপল্লীর এই গোরস্থানে শুধু নিশিপল্লীর মানুষরাই শুয়ে নেই, শুয়ে আছে বিশ পঁচিশটা গ্রামের মানুষ। ইদানিং নদীর ওপার থেকে মানুষ এনে এখানে দাফন করা হয়। নিশিপল্লীর মানুষ জানে না কাকে দাফন করা হল।
সবুর মিয়ার ছেলে হুমায়ূন। লেখাপড়া শেষ করে সাংবাদিকতায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সারা বাংলাদেশ তাঁকে চেনে স্পষ্টভাষী হিসেবে। ঢাকায় বাড়ি-গাড়ির মালিক যে সময়ে হওয়ার কথাছিল তার চেয়ে আরো দশ বছর পরে হুমায়ূনের গাড়ি বাড়ি হয়। কিন্তু পেশা জীবনে তার সৃষ্টি হয় অনেক শক্রু। কিছুদিন আগে হুমায়ূন বৌ-বাচ্চাসহ নিজের গাড়ি নিয়ে বাড়িতে বেড়াতে আসে। বাড়িতে আসলে এক মিনিটও হুমায়ূন স্থির থাকে না। সারাক্ষণ ছুটে বেড়ায় গ্রামের বন, বাদার, মাঠ, ঝিল, নদীনালা, খালবিলে। যারা বৃদ্ধ হয়ে গেছেন হুমায়ূন তাদের দেখতে যায়। কুশল বিনিময় করে। নিশিপল্লীর সেই গৌরব হুমায়ূন কিছুদিন আগে বিকালে বৃষ্টিতে গোসল করতে ছিল। হঠাৎ বজ্রপাতে সে কদম গাছে তলায় মরে দাড়িয়ে থাকে। বজ্রপাতে মৃত ব্যক্তিকে স্পর্শ না করা পর্যন্ত সে যে অবস্থায় ছিল ঐ অবস্থায় থাকে। চারদিকে চিৎকার চেঁচামেচিতে লোকে লোকারণ্য। বজ্রপাত যে নিশিপল্লীতেই হয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। মানুষ খুঁজে বেড়াচ্ছে কার বাড়িতে বজ্রপাতটি হলো? এক সময় হুমায়ূনের লাশ দেখে নিশিপল্লীর মানুষ হতবিহবল হয়ে যায়। তারা কিছুতেই বিশ্বাস করতে চায় না, হুমায়ূন মারা গেছে। তবুও সত্য চিরদিন সত্য। হুমায়ূন আর ফিরে আসবে না। তার মৃত্যুর সময় দেশের অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত থাকলেও তার একমাত্র ফুফু অসুস্থতার কারণে সেদিন হুমায়ূনের দাফন কাফনে শরিক হতে পারে নি। ৮৫ বছর বয়সি হুমায়ূনের ফুফুর শরীরটা মাস খানেক পরে একটু সুস্থ হলেই তিনি ছুটে আসেন সবুর মিয়ার বাড়িতে হুমায়ূনের কবর জিয়ারত করতে।
হোসেন আলী ভাবে হয়ত হুমায়ূনের ফুফুরা তার কবর জিয়ারত করছে। টিউবওয়েরের ঠান্ডা পানি চোখে মুখে দিয়ে হোসেন আলী আরো ভালো ভাবে লক্ষ্য করে গোরস্থানের দিকে। কিন্তু এখনও কিছু দেখা যাচ্ছে না। কার প্রয়োজনে কে এসেছিল গোরস্থানে এই ভেবে আর রাত জেগে লাভ নেই। যা হবার তাই হবে, আর যা করার তারা তাই করবে। এভাবেই তো চলছে দেশ। তাহলে আমার মত হোসেন আলীর এত মাথা ঘামিয়ে লাভ কী? মাথায় কয়েক ফোটা বৃষ্টির পানি পড়তেই হোসেন আলী দ্রুত নিজের ঘরের দিকে রওয়ানা হয়। টেবিলের সামনে এসে তাওয়ালটা নিয়ে মাথা মুছতে থাকে। জগে ভরা পানিটুকু জগ ধরে পান করতে থাকে। তার আজ অনেক পিপাসা পেয়েছে। কেন জানি বুকটা আর মুখটা বার বার শুখিয়ে যাচ্ছে। মেয়ে মিথিলার পাশে বালিশটা নিয়ে হোসেন আলী শুয়ে পড়ে। মেয়ে মাথায় একটি হাত বুলিয়ে দেয়। আয়তাল কুরছি পাঠ করে মেয়ের মাথায় ফু দেয়। এই কাজটা করতে সে কখনই ভুল করে না। বিছানায় গা এলাতেই রাজ্যের চিন্তা তার মাথায় ভর করে। আজকাল দেশের একি হল! মরা মানুষের লাশ নিয়ে যাচ্ছে কারা? তারা এই লাশ দিয়ে কী করে? সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা ইতোমধ্যে লাশ চোর কয়েকটি সংঘবদ্ধ দলকে ধরেছে। মিডিয়াতে অপরাধী চক্রের বিস্তার শুনে এবং লাশগুলো কী করা হয় তা শুনে হোসেন আলী চোখ কপালে ওঠে যায়। কী করে এক শ্রেণির ডাক্তার নামধারী পশু এই সব লাশ চুরির ঘটনায় জড়িত থাকে!
বাইরে কিছুটা ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। নানা চিন্তার জগতে হোসেন আলী সাঁতরাতে সাঁতরাতে এক সময় ক্লান্ত হয়ে যায়। কখন যে ঘুমের দেশের বাসিন্দা হয়ে ডুব দেয় মৃতপুরীর শান্ত ঘরে তা সে নিজেও জানে না।
সকালে মানুষের চিৎকার চেঁচামেচিতে তার ঘুম ভাঙে। হোসেন আলীদের বাড়িতে ত্রিশ চল্লিশজন মানুষ জড়ো হয়েছে। হোসেন আলীর পিতা গ্রামের মুরুব্বি। সকলেই এসেছে তাঁর কাছে। হোসেন আলী চেঁচামেচি শুনে দ্রুত বিছানা ছেড়ে ওঠে পড়ে। তখনও সূর্য ওঠে নি। বাইরে এসে দেখে পুরুষ মহিলা মিলে গোটা পঞ্চাশেক মানুষ জড়ো হয়েছে তাদের বাড়িতে। সবুর মিয়ার ভাই শহর মিয়া হোসেন আলীর বাবাকে বলতে থাকে, ‘কাকা হুমায়ূনের ফুফু অসুস্থ মানুষ। আধমরা অবস্থায় হুমায়ূনের কবর জিয়ারত করতে গত রাত এগারোটার সময় ভাইয়ের বাড়িতে এসেছে। রাতে বৃষ্টি হওয়ার কারণে আমরা তাকে নিয়ে আর গোরস্থানের দিকে যায় নি। ভাবলাম সকালে ফজর নামাজ শেষে তাঁকে নিয়ে কবর জিয়ারত করতে যাবো। সেই মোতাবেক সবাই সকালে নামাজ পড়ে গোরস্থানে এসে দেখি হুমায়ূনের কবরটা খুঁড়া। কবর থেকে কোন গন্ধ বের হচ্ছে না। ভাবলাম শিয়াল হয়ত কবরটা খুড়েছে। নতুন মাটি কবরে রদয়ার জন্য একটি কোদাল নিয়ে কবরের কাছে যাই। গিয়ে যা দেখলাম, বলেই শহর মিয়া কাঁদতে থাকে। হোসেন আলীর পিতা শহর মিয়াকে থামতে বলে। আগে ঘটনা বল। কাকা, গিয়ে দেখি আমাদের হুমায়ূনের লাশ কবরে নাই। কারা যেন তাঁর লাশ চুরি করে নিয়ে গেছে। হুমায়ূনের ফুফু নিজ চোখে কবরে লাশ দেখতে না পেয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তাঁকে ইতোমধ্যে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। কাকা, কারা আমাদের হুমায়ূনের লাশ চুরি করলো? হোসেন আলীর পিতা পুরোনো দিনের মানুষ। শহর মিয়ার কথা সে বিশ্বাস করতে পারে না। মানুষ কী এতটা পশু হয়ে গেছে? হোসেন আলীর পিতা বলতে থাকে, ‘ভেবেছিলাম মারা গেলে গোরস্থানের রাখার কথা বলে যাবো। এখন দেখছি সেটা আর সম্ভব হবে না। কারণ জ্যান্ত মানুষের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছি এ বদমান শুনেও শান্ত ছিলাম। কিন্তু মৃত মানুষের নিরাপত্তা যখন আমরা দিতে পারছি না তাহলে আমি মরার পর আমার বাড়ির সামনেই কবর দিস। তবুও শান্তি পাবো এই ভেবে যে, আমার লাশটা অন্তত চুরি হবে না। যুগ পরিবর্তন হয়েছে সেটা জানি, কিন্তু পরিবর্তনের মাত্রায় পশুকে হার মানিয়েছে তা জানতাম না। আজ থেকে অন্য গ্রামের কোন লাশকে নিশিপল্লীতে দাফন করতে দিবি না।’


প্রিন্সিপাল | মাখরাজ খান


কথাটা শুনেই জোনাব আলীর মুখ বিকৃত হয়ে গেলো- বলে কি? এত কাজ কি একদিনে করা সম্ভব? আতা, অফিস সহকারী আতাউর তার পাশের চেয়ারে বসা ছিলো-সে বললো সম্ভব না হলে যাও প্রিন্সিপালকে বলে এসো।
-হ্যাঁ তাই যাব। সারা বছরের কাজ কি একদিনে করা যায়?
প্রিন্সিপাল আজহারুল ইসলাম পাশের রুমেই ছিলেন-তিনি কলিং বেল বাজালেন। বকুলি গিয়ে হাজির হলো-প্রিন্সিপাল বললেন, -বুয়া। শান্তি কোথায়?
প্রিন্সিপাল-পিয়ন শান্তি রানী সাহা আর ঝাড়ুদার বকুলিকে বুয়া বলে ডাকেন।
-স্যার শান্তি তো-আসে নাই আসতে দেরী হবে।
-রোজই তার দেরি হয়, কোন সময়ই তাকে ডাকলে পাওয়া যায় না। আগামীকাল আউট, অফিসে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে শান্তির দেখা নাই। জোনাব আলীকে ডাক। জোনাব আলীকে ডাকার আগেই সে এসে হাজির হলো- এতক্ষণ দর্জার পাশে দাঁড়িয়ে সব শুনছিলো।
-স্যার।
-শুনছেন তো-কাল আউট হবে।
-জ্বি স্যার। কিন্তু...?
-কোনো কিন্তু নয়। আজ রাতের মধ্যে সব কাজ সারবেন। কলেজ এখনো এমপিওভুক্ত হয়নি। এখন অডিটে কোনো ঘাপলা হলে আর কোনোদিনই আমাদের একপিও'র মুখ দেখতে হবে না।
-এত কাজ স্যার-একা কিভাবে করবো?
-এতদিন তো একাই করেছেন-আতাউর-সাব তো বোর্ড অফিসে দৌড়াদৌড়ি' সভাপতির কাছে যাওয়া আসা আর ছাত্রদের বেতন তোলা নিয়ে ব্যস্ত।
-জানি স্যার।
-জানেন-তবে করছেন না কেন? কলেজ হয়েছে ষোল বছর, জানেন না বছর বছর অডিট হয়?
-জানি স্যার। এখানে যা পাই তাতে তো কিছুই হয় না। বাড়িতে দোকান করি টিউশনি করি। কোনো কোনো সময় নিজের জমিতেও কাজ করি।
-আপনারা সামান্য বেতন পান-আর আমি কি খুব বেশি পাই। কলেজের আয় কোথায়? ছাত্র-ছাত্রীরা তো বেতনই দিতে চায় না। টিএনও'র হাতে-পায়ে ধরে দু'টো পুকুর লিজ নিয়েছি, বছরে চার পাঁচ লাখ টাকা আসে-এর মধ্যে কতজনকে কতভাবে খুশি রাখতে হয়।
প্রিন্সিপাল আজহারুল ইসলাম বাউনবীর। খর্বাকৃতি, তিনি হাফশার্ট গায়ে, সাদা প্যান্ট পরে সাইকেল নিয়ে কলেজে আসেন। দড়িবহর থেকে বালিয়াটি আসতে তার দেড় দুই ঘণ্টা চলে যায়। এজন্য রোজ তার দর্শন মিলে না। দু'চারদিন পর পর কলেজে আসেন। ছাত্ররাও নিয়মিত আসে না- তবে শিক্ষকদের মধ্যে ইংরেজির এম কে রহমান খান, বাংলার রতন চন্দ্র বালু, কৃষির সিরাজুল ইসলাম আর সমাজ কল্যাণের মুন্নী রানী সরকার নিয়মিত আসেন।
-স্যার অডিট কয়দিন চলবে? জোনাব আলী জানতে চাইলো।
-হিসাব-কিতাব ঠিক থাকলে একদিনেই শেষ করতে পারবো।
-স্যার অডিট তো শুধু হিসাব-কিতাবের ব্যাপার নয়, ছাত্র হাজিরা, শিক্ষক হাজিরা আর-
-আর কি? খাতাপত্র ঠিকঠাক রাখুন।
জোনাব আলী আর কথা বাড়ালো না।
কথা বাড়িয়েও লাভ নেই, তিন মাসের বেতন বাকি বালু বাবু তো সেদিন বলেই গেছেন, এবার তিনি প্রিন্সিপালের সাথে ফাইনাল আলাপ করবেন। এভাবে কি কলেজ চলে?
ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল একদিন আসেন তো তিনদিন আসেন না। বেতনের বেলায় কথা নেই, শুধু কাজ কর। কাজ কি শুধু কেরানী আর একাউন্ট্যান্ট করবে! প্রিন্সিপালের কাজ নেই!
প্রিন্সিপাল বোধ হয়- জোনাব আলীর নীরবতা দেখে বিষয়টি অাঁচ করতে পারলেন-
-জোনাব আলী সাব, ধৈর্য ধরুন। এমপিওটা হয়ে গেলে সব কষ্ট দূর হয়ে যাবে।
-সেটা তো পরের কথা স্যার। এখন কি করবো-
-তিন মাসের বেতন বাকি।
-পুকুরের টাকা পেলেই দিয়ে দিব। এমন সময় প্রবেশ করলো রহমান।
-রহমান সাব।
-জ্বি!
অডিট এসে গেছে-টাকা পয়সা খরচ হবে, আপনাদের এ মাসেও বেতন দিতে পারবো না।
-রহমান চুপ করে রইলেন।
-চুপ করে আছেন কেন?
-কী বলবো? আমাদের মধ্যে সিনিয়র মোস্ট সিরাজ সাহেব-তাকে বলুন।
২.
জোনাব আলী আগেই বের হয়ে গিয়ে টিচার্স রুমে সিরাজ সাহেবকে ব্যাপারটা জানিয়েছিল সিরাজ সাহেব বললেন, আমি গিয়ে কি করবো, যেখানে আমার কথার কোন মূল্য নাই, সেখানে যেতে চাই না। বালু বাবু তার মেদবহুল দেহের ভুঁড়ি নাড়াতে নাড়াতে বললেন, কিছু বলা উচিত। উনি নিজের জন্য বেতন নিবেন, কনভেন্স নিবেন, মোবাইলের টাকা নিবেন আর আমরা খেটে মরবো।
সিরাজ সাহেব বললেন, বালু সাহেব, আমি সব জানি। এমপি'র কথা বলে এখানে আগে যেসব শিক্ষক ছিল সবার কাছ থেকেই টাকা নেয়া হয়েছে।
-তারা কিছু বলে না কেন?
-বলতে বলতে হয়রান হয়ে অন্য জায়গায় চাকরি নিয়েছে।
-এখনতো আমরা চারজন এই কলেজটা টিকিয়ে রেখেছি-সিরাজ সাহেব, রহমান সাহেব, রতন চন্দ্র বালু আর মুন্নী সরকার। এরা চারজনে মুখোমুখি বসে থাকে। ক্লাস অনিয়মিত। প্রিন্সিপাল এলে বালু বাবু সিরাজদ্দৌলাকে তাগিদ দেয়। সিরাজ সাহেব বলেন-
-কোনো লাভ হবে না। টাকা কুমীরের পেটে গেছে।
-কুমীর?
তারপর বালু বাবু কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে রহমান সাহেবের দিকে তাকান।
-দেখুন সিরাজ সাহেব-আমরা দুইজন বন্ধু টাকা টাকা বলে চিৎকার করি, রহমান সাহেব কিছুই বলেন না।
-রহমান নির্বিকার। মুন্নী সরকার বলেন-
-আমি আসি।
-আসি মানে-বালু বাবু যেন অবাক হয়ে গেছেন। আজ টাকা ছাড়া যাব না। তিনি প্রিন্সিপালের রুমে গিয়ে ঢুকলেন-
-টাকা দেন।
বালু বাবুর এ রকম কথা বলার ধরন। ভূমিকা নেই-সৌজন্য প্রকাশ নেই, সোজাসুজি টাকার কথা। সরকারি চাকরি থেকে রিটায়ারমেন্টের পর সব মানুষই এ রকম হয়ে যায়। বালু বাবু সাটুরিয়া উপজেলার এটিও ছিলেন-অবসর নিয়েছেন তিন বছর। বালিয়াটি কলেজে আছেন দু' বছর ধরে। বালু বাবুর কথায় প্রিন্সিপাল প্রথম প্রথম হতভম্ব হতেন-এদিক-ওদিক তাকাতেন, রহমান সাহেব ধারে-কাছে থাকলে তাকে বলতেন, রহমান সাব, আপনি বাবুর সাথে কথা বলুন।
রহমানকে জড়ানোর কারণ হলো-রহমানই বালু বাবুকে এ কলেজে এনেছেন। বাংলার টিচার নেই। বাংলা ভাইটাল সাবজেক্ট-এ কারণে একজন টিচার দরকার। বালু বাবু সাটুরিয়ায় তাকে, রহমানের সাথে তার খাতির-দুইজন মানিকজোড়, একসাথে চা খায়। ঘোরাঘুরি করে।
-বালিয়াটি কলেজের কথা বলতেই রাজি হয়ে গেলেন বালু বাবু, এমএ বিএড, এলএলবি, আদ্য, মধ্য, উপাধি।
প্রিন্সিপাল বললেন, দেখুন বালু বাবু, আপনি তো এখন রিটায়ার্ড, পেনশন পান। কলেজে আছেন এতে আপনার সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাচ্ছে-এত টাকা টাকা করেন কেন?
বালু বাবু এবার গ্যাস লাইটের মতো জ্বলে উঠলেন-কি বললেন, কলেজে আছি বলে আমার মর্যাদা বেড়ে যাচ্ছে, আমি শিক্ষা অফিসার, এডভোকেট আমার সামাজিক মর্যাদা কি কম? তারপর তিনি অন্যান্য শিক্ষকদের নাম ধরে বলতে লাগলেন, সিরাজ সাহেব টাকা চায় না, রহমান সাহেবও চুপচাপ আর মুন্নী তো এমপিও করানোর জন্য টাকা দিয়ে বসে আছে সব রতন চন্দ্র বালুকে করতে হবে সব। বালু বাবু বেরিয়ে গেলেন।
প্রিন্সিপাল এবার ডাকলেন বুয়া।
বকুলি এসে হাজির হলো-বকুলি মধ্যবয়সী মহিলা, এক ছেলে দুই মেয়ে, দু'মেয়েরই বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলেটি ভ্যানগাড়ি চালায়। স্বামী নেই বিধবা-শোনা যায় আবার নাকি বিয়ে করেছে কিন্তু কেউ জানতে চাইলে বলে, আর মাতা বেচুম না।
-বলেন স্যার।
-জোনাব আলীকে ডাকো।
-জোনাব স্যার তো চইল্যা গেছে। খাতাপত্র নিয়া, বাড়িতে হিসাব-কিতাব করবো।
-ঠিক আছে।
প্রিন্সিপাল তার দফতর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় সাইকেলটির সিট রুমাল দিয়ে ঝাড়লেন, তারপর ঠেলে নামালেন বারান্দা থেকে, না প্রিন্সিপালের সাইকেলে করে আসা শোভা পায় না। একটা হোন্ডা দরকার। সামনে গভর্নিং বডির মিটিংয়ে কথা তুলবেন, কলেজ থেকে যদি হোন্ডার জন্য হাজার পঞ্চাশেক টাকা লোন নেয়া যায়, তাহলে বাকি টাকা অন্যভাবে যোগাড় হয়ে যাবে।
এমপিও যে এবার হবে না, এটা তিনি বুঝে গেছেন-কিন্তু মুখ খুলতে পারছেন না। দেখা যাক-অডিটে কি হয়, কোন ভাউচারই তো ভাউচার নয়, নিজের খরচ। সব কিছু টাকা দিয়ে ঠিক করতে হবে আর এ কাজটা করতে হবে আজই। তিনি সাইকেলে চড়ে প্যাডেল ঘোরাতে লাগলেন।
সূত্র : দৈনিক সংগ্রাম


নিস্তারণ | শাহ নেওয়াজ চৌধুরী


রশীদ জমাদ্দারের নামের ‘জমাদ্দার’ বিশেষণটি তার অলৌকিক ক্ষমতাপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে রাতারাতি উঠে গেল। নামের ‘জমাদ্দার’ বিশেষণটির স্থলে ‘ফকির’ শব্দটি বসে তার নাম দাঁড়াল রশীদ ফকির।
একদিন শেষরাতের দিকে রশীদ জমাদ্দার ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। তার বউ রাহীর ঘুম বেশ পাতলা। কোলের বাচ্চাটা বেশ জ্বালায়। মায়ের স্তনের বোঁটা মুখে নিয়ে ঘুমানোর অভ্যেস ওর। বাচ্চাকে দুধ দিতে দিতে রাহী আলগোছে ঘুমিয়ে পড়ে। আর থেকে থেকে বাচ্চাটি বারবার কেঁদে উঠে মায়ের স্তন-বোঁটা চুষতে থাকে।
ঘুমাতে গিয়ে বাচ্চাটির মতো বাচ্চার বাবাও কি রাহীকে কম জ্বালায়? নানা কারণে রাহীর ঘুম গাঢ় হওয়ার উপায় নেই। তাই শেষ রাতের দিকে স্বামী যখন বিছানা ছেড়ে বাইরে বের হলো, রাহী তা টের পেল। তবে টের পাওয়াই সই, মুহূর্তে তন্দ্রা ভর করল রাহীর চোখে। কিন্তু বাচ্চাটি আবার যখন কেঁদে উঠল তন্দ্রা ভেঙে রাহী দেখল তার স্বামী তখনও বিছানায় ফেরেনি। রাত তখনও শেষ হয়নি—এই অনুমান রাহীর আছে। আরেক অনুমান, তার স্বামী হয়তো প্রস্রাব-পায়খানার উদ্দেশে ঘরের বাইরে নেমেছে! তাই সম্ভাব্য জায়গাগুলোতে খুঁজে না পেয়ে রাহীর কেমন ভয় ভয় লাগে! দ্রুত ঘরে ঢুকে শাশুড়ির ঘুম ভাঙায় সে। ছেলের টানে বৃদ্ধা মা তড়িঘড়ি বিছানা ছেড়ে একদম উঠোনে এসে দাঁড়ায়। আর ঘুম ঘুম চোখে ‘রইশ্যা’ ‘রইশ্যা’ বলে ডাকতে থাকে। আর রাহী শুক্কুরের বাপ বলে ডাকতে ডাকতে একশেষ।
বউ-শাশুড়ির ডাকাডাকিতে উঠোনঘেরা বাকি তিনটি ঘরের লোকের ঘুম ভাঙে। বিছানায় শুয়েই বয়স্করা গলা হাঁকে, ‘অইচে কী? রইশ্যা গ্যাছে কই?’
রশীদ জমাদ্দারের মা বলে, ‘রইশ্যারে দেহি না। ঘরে গোনে নাইম্যা কোমনে যে গ্যাছে!’
বাড়ির সবচেয়ে বয়স্ক লোক করিম জমাদ্দার বলল, কও কী মাতারি! এই শ্যাষ রাইতে জুয়ান ব্যাডাডা যাইবে কই?
আস্তে আস্তে বাড়ির সবার ঘুম ভাঙল। এমনকি রাহীর বাচ্চাটিরও। সবাই বাইরে নেমে এলো। পুরুষরা উঠোন পেরিয়ে রাস্তায় নামল। ততক্ষণে অন্ধকার একটু ফিকে হয়ে এসেছে।
কিন্তু রশীদ জমাদ্দারকে কোথায় খোঁজা যাবে?
আশপাশের আরও দু-চার বাড়ির নামাজি মানুষ ফজরের নামাজ পড়তে বেরিয়ে তারাও জানল এই ঘটনা। এক-দুই কান হতে হতে সবার দৃষ্টি যখন রশীদ জমাদ্দারকে খুঁজতে লাগল, তখন কোনো একজনের চোখে পড়ল, বাড়ির উত্তর দিকের জঙ্গলে একমনে হেঁটে বেড়াচ্ছে রশীদ জমাদ্দার। যেন নিগূঢ় চিন্তায় মগ্ন এবং প্রতিটি পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ—এমন ভঙ্গিতে পা ফেলছে আর এগাছ-ওগাছ খুঁটিয়ে দেখছে; লতাপাতা তুলে নিচ্ছে হাতে।
গুঞ্জন ছড়াতে সময় লাগে না, রশীদ জমাদ্দারের ওপর অলৌকিক ক্ষমতা ভর করেছে!
রশীদ জমাদ্দর অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে কি না কে জানে, কিন্তু তিন-চার দিনের মাথায় তাকে ঘিরে গুঞ্জন একটু বেশি মাত্রায় ছড়িয়ে পড়লে গ্রামের কুসংস্কারাচ্ছন্ন আনাড়ি লোকরা মগ-গ্লাস ভরে পানি নিয়ে এলো তাতে রশীদ জমাদ্দারের দম নেয়ার জন্য। কেউ বানিয়ার দোকান থেকে মাদুলি আনল, কেউ লতাপাতার রস সেবন করতে এলো। রশীদ জমাদ্দারকে সবাই ‘ফকির’ বলে সম্বোধন করতে শুরু করল।
রশীদ ফকির দেখল কেউ কেউ দু-চার-পাঁচ টাকা খুব ভক্তির সঙ্গে তার পায়ের কাছে রাখছে। এতে একটা আয়ের পথ তৈরি হয়েছে তার। দরিদ্র ঘর। এর-ওর ক্ষেতখামারে বদলা দিতে হয়। এমন একটা আয়ের পথ তৈরি হলে মন্দ কী? তাছাড়া গ্রামে একটা রব উঠেছে—শুধু গ্রামে কেন, রশীদ ফকিরের অলৌকিক ক্ষমতার খবর ছড়িয়েছে দূর-দূরান্তেও। তাই বাড়িতেও লোকজনের ভিড় লেগে থাকে। সে কারণে সকাল-বিকাল ফকিরকে ঘরেই কাটাতে হয়।
কিন্তু মাস ছয়েক পর ফকির যখন দেখল তার বাড়িতে লোকজনের ভিড় আগের চেয়ে কিছুটা কম, ফকির তখন নিজের কাছে প্রশ্ন রাখে—তার দাওয়াইতে কি কাজ হয়? নইলে হঠাত্ ওঠা দরটা হঠাত্ই পড়ে যেতে পারে—এ নিয়ে শঙ্কা ঢুকে গেল ফকিরের মনে। তেমন হলে তো আগের অবস্থানে ফিরে যেতে হবে। ভাতের জন্য কামলা খাটতে হবে। গেরস্থবাড়িতে ধান ভানতে যেতে হবে রাহীকে। শঙ্কিত মনেও রশীদ ফকিরের চৌত্রিশ বছর আগের কথা মনে পড়ে। গ্রামের লোকেরা তাকে নিয়ে আরেকবার মেতে উঠেছিল তখন। গ্রামে ফেরার পর প্রতিটি মানুষ কেমন অদ্ভুত চোখে দেখত তাকে! তার প্রতি লোকজনের কোমল দৃষ্টি যেন অন্য কিছু বলত! রশীদ জমাদ্দার এসব বেশ উপভোগ করত। তার উধাও হওয়া নিয়ে গ্রামের মানুষ কত না গল্প ফেঁদেছে!
গ্রামের হাটে উঠলে কত লোক জোর করে চা খাওয়াত! যুদ্ধের কথা জানতে চাইত। সেসব কথা বলতে বলতে অনেক সময় কেটে যেত। আর নদীর তীর ভাঙার মতো একে একে রশীদ জমাদ্দারের ভাবনা তীর ভাঙত তাকে নিয়ে গ্রামের মানুষের নানা ভাবনার কথা জেনে। রশীদ জমাদ্দারের মনে হতো, গ্রামে সে যেন একটুকরো রত্নে পরিণত হয়েছে। তাকে নিয়ে লোকজনের মাতামাতি কিছুদিন গরম জিলাপির মতো চলল। তারপর মিয়ানো মুড়ির মতো হয়ে উঠল তা। এমনটা স্বাভাবিক। কেননা এই গ্রামে মুক্তিযুদ্ধের তীব্রতার ছিটেফোঁটাও লাগেনি। মিলিটারিরা জেলা শহর পর্যন্ত এসে ঠাঁই গেড়েছিল। জেলা শহর থেকেই থানা, ইউনিয়ন, গ্রাম তদারকি করিয়েছে রাজাকার-আলবদরদের দিয়ে। ওই পর্যন্তই। শুধু গ্রামের সেকান্দার খাঁকে ঘিরে গ্রামবাসীর মনে একটু সন্দেহ দানা বেঁধেছিল প্রথম দিকে। পরে তা আরও গাঢ় হয়ে উঠেছিল। কেননা সেকান্দার খাঁ-ই খবর নিয়ে এসেছিল রশীদ জমাদ্দার যুদ্ধে গেছে।
রশীদ জমাদ্দার তখন মংলা বন্দরে কুলির কাজ করত। তিন মাস অন্তর একবার গ্রামে আসত। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর রশীদ জমাদ্দারের আর গ্রামে আসার নাম-গন্ধ নেই। স্বামীর খবরের জন্য রাহী শহর থেকে ফেরা মানুষের কাছে যেত—হোক তারা ঢাকা থেকে কিংবা অন্য কোথাও থেকে গ্রামে আসা লোকজন।
স্বামীর কোনোরকম খোঁজখবর না পাওয়ায় রাহী স্বামীর পথ চেয়ে যেখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে কাঁদত।
একবার খবর ছড়াল—পাকবাহিনী মংলা বন্দরে অনেক লোক মেরে ফেলেছে। তাদের মধ্যে রশীদ জমাদ্দারও আছে।
কিন্তু মিলিটারিরা জেলা শহরে আসার পর কীসব কমিটি-টমিটি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল সেকান্দার খাঁ। হঠাত্ তার মুখে রাজনীতির কথাটথা শোনা যেত। মুসলিম লীগের গুণকীর্তন করে বেড়াত সে। তার পেছনে পেছনে ঘুরে বেড়ানোর মতো কিছু সাঙ্গপাঙ্গ জুটে গিয়েছিল। আর এভাবেই সেকান্দার খাঁ নিজেকে গ্রামের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ভাবতে শুরু করেছিল। সে-ই খবর এনেছিল, রশিদ জমাদ্দার যুদ্ধে গেছে। এই খবরটা ছড়িয়ে সেকান্দার খাঁ তার অন্য এক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে চেয়েছিল। মূলত সে ভেবেছিল, মুসলিম লীগ প্রিয় গ্রামের মানুষের মানসিকতায় রশীদ জমাদ্দারের পাকিস্তানবিরোধিতা বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে। এই সুযোগে সে রশীদ জমাদ্দারের পরিবারটিকে নাজেহাল করবে। পরিবার বলতে সেকান্দার খাঁর দৃষ্টি রাহীর দিকে। সে অনেক আগে থেকেই। রশীদ জমাদ্দার রাহীকে বিয়ে করে আনার পর রাহীর শরীরটা তার চোখে ভেসে উঠলে সে এক অতুল যন্ত্রণায় ছটফট করে। সে যন্ত্রণা লাঘবের সুযোগ খুঁজছিল সেকান্দার খাঁ। রশীদ জমাদ্দারের যুদ্ধে যাওয়াটা তার জন্য সুযোগ এনে দিল—সেকান্দার খাঁ এমন করেই ভেবেছিল। আর পাকিস্তানি মিলিটারির কাছে রশীদ জমাদ্দারের মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার খবর পৌঁছলে কী ভয়াবহ হবে, সুযোগমত রাহীকে রাস্তায় একা পেয়ে সেকান্দার খাঁ সে কথা বোঝাতে চেষ্টা করেছিল। এ-ও বোঝাতে চেষ্টা করেছিল, সে-ই পারে মিলিটারির হাত থেকে ওদের বাঁচাতে; রাহীকে রক্ষা করতে।
রাহী এই মারপ্যাঁচের কলাকৌশল কতটা বুঝেছে, কে জানে! কিন্তু সেকান্দার খাঁকে তার সুবিধের মনে হয়নি। দেশ, যুদ্ধ, মানুষ হিসেবে টিকে থাকা—এসব বোঝার ক্ষমতা রাহীর না থাকলেও সে এটুকু বুঝেছিল, সেকান্দার খাঁ কোনো এক ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত; সে ভালো কিছু করছে না। আর সেকান্দার খাঁ বুঝেছিল, স্বামীর কথা ভেবে তার কাছে অবনত হবে রাহী। সুযোগ তখন হাতের নাগালে আসবে। মোহগ্রস্তের মতো রাতের আঁধারে রাহীর ঘরের মুলিবাঁশের বেড়ার ফাঁক দিয়ে স্বর নামিয়ে রাহীকে ডাকত সেকান্দার খাঁ। কিন্তু রাহী অনড়, অটুট।
সেকান্দার খাঁর সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে একে একে। তারপর রশীদ জমাদ্দার যুদ্ধ থেকে ফিরলে সেকান্দার খাঁর দিন একটু ভয়ে ভয়ে কেটেছে—‘রইশ্যা গোল পাকাইলে মান-সম্মানের প্রশ্ন দ্যাহা দিব।’
রশীদ জমাদ্দার গ্রামে ফিরে সবই জেনেছে। কিন্তু কী কারণে সে সেকান্দার খাঁকে কিছু বলেনি, সেটা সে-ই জানে। সেকান্দার খাঁ যেমন তাকে এড়িয়ে চলত, সেকান্দার খাঁকেও এড়িয়ে চলত রশীদ জমাদ্দার।
যে গ্রামে যুদ্ধের আঁচ লাগেনি, সে গ্রামের মানুষ যুদ্ধফেরত এই মানুষটির দেশপ্রেমকেও সরল গ্রাম্যতায় ঢেকে দেবে একসময়—দরিদ্র-অশিক্ষিত রশীদ জমাদ্দারের পক্ষে তা এতটা গভীরভাবে উপলব্ধি করার কথা নয়। তবে এই গ্রামে যেমন একজনই মুক্তিযোদ্ধা আছে, রাজাকারও তেমনি সেকান্দার খাঁ একাই—বিষয়টি ভেবে এখনও মজা পায় রশীদ জমাদ্দার। আর সেকান্দার খাঁর প্রতি তাই সব ঘৃণা রশীদ জমাদ্দারের বুকের গভীরে তলানির মতো জমেছিল—কখনও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেনি।
কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চল্লিশ বছর পরে এসে সেকান্দার খাঁকে একবার দেখে নিতে ইচ্ছে হলো রশীদ ফকিরের। দারিদ্রে আষ্টেপৃষ্ঠে থাকা মানুষটি অলৌকিক ক্ষমতার উছিলায় যখন কিছুটা আর্থিক সঙ্গতির মুখ দেখেছিল—হোক মিথ্যেয় জড়ানো উপার্জন—তাকে কিছুদিন আধপেটা অবস্থা থেকে মুক্তি দিয়েছিল। কিছুদিন তার বউকে অন্যের বাড়ির কাজ করতে যেতে হয়নি; তার ছোট ছোট ছেলেগুলোকে পেটের দায়ে অন্যের ফরমাস খাটতে হয়নি; অকথ্য গালাগাল শুনতে হয়নি; তখন সেকান্দার খাঁ-ই লোক ঠকিয়ে খাওয়ার জন্য তার বিচার বসাতে চেয়েছিল। তখন চল্লিশ বছর ধরে জিইয়ে রাখা হিসাবটা একবার শানিয়ে নেয়ার ইচ্ছে জেগেছিল রশীদ ফকিরের। কিন্তু এখন সেকান্দার খাঁর দল বেশ ভারি। সে এখন ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার। তার পেছনে গ্রামের দু-চারজন লোক সব সময় দেহরক্ষীর মতো লেগে থাকে। লেগে থাকে সেকান্দার খাঁর ক্ষমতার আঠায়।
শিকারির ফাঁদে পা দেয়ার মতো সেকান্দার খাঁ এবার রশীদ ফকিরের ঘরমুখো হলো। সেকান্দার খাঁ যে স্বেচ্ছায় এসেছে তা নয়; সে বাধ্য হয়েছে। রশীদ ফকিরও টের পেয়ে গিয়েছিল, সেকান্দার খাঁর মস্তক অবনত হয়ে আসছে। কিন্তু তার ভেতরে অবদমিত দ্রোহ ক্রমে বেড়ে উঠছে। আর সেকান্দার খাঁ স্বেচ্ছায় সে জ্বালামুখে এসে ধরা দিচ্ছে। কিন্তু শারীরিক অক্ষমতার কারণে সুযোগ এবার আপনিতে হাতছাড়া হয়ে যায় ফকিরের। ছ’মাস ধরে সে শয্যাগত। রোগের ভার তাকে বিছানায় আঁকড়ে রেখেছে। সে দেখল, জীবনে আরেকবার তার দর উঠল। সে কারণে শুধু সেকান্দার খাঁ কেন, এবার গ্রামের অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তির পা পড়ল তার বাড়িতে। ফকিরকে তাদের প্রয়োজন। না, ঝাড়-ফুঁকের জন্য নয়, যেমন করে হোক রশীদ ফকিরকে একবার মঞ্চে উঠে দাঁড়াতে হবে, মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে হবে। আসছে বিজয় দিবসে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে যেমন করে হোক একটা আয়োজন করার তাগিদ। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পর্যন্ত এ নিয়ে মহাব্যস্ত। আর গ্রামে তো এই একজনই মুক্তিযোদ্ধা—রশীদ জমাদ্দার কিংবা রশীদ ফকির।
ফকির জানতে পারল, বেশ বড় আয়োজন। ১৬ ডিসেম্বর হাইস্কুল মাঠে তাকে সংবর্ধনা দেয়া হবে। এ উপলক্ষে তাকে কিছু টাকা-পয়সাও দেয়া হতে পারে। আর অনুষ্ঠানে সেকান্দার খাঁ থাকবে প্রধান অতিথি।
এই প্রলোভন নিয়ে সেকান্দার খাঁ এলো রশীদ ফকিরের বাড়িতে। তাকে বোঝাতে চেষ্টা করল নানাভাবে—আরে মিয়া, শুধু কি একখান ক্রেস্ট, কিছু টাকাও পাবা। হেই টাকায় ডাক্তার দ্যাহাইতে পারবা।
রশীদ ফকির কারও সঙ্গেই হ্যাঁ-না করে না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে জ্বলতে থাকে। শারীরিক অক্ষমতাই কেবল দমিয়ে রাখে তাকে। একটি নয়, একাধিক রোগে আক্রান্ত সে। একবার কোনোমতে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল। ডাক্তার বলেছে, কিডনি রোগ, লিভারের রোগ, এমনকি শরীরে আরও অনেক রোগ বাসা বেঁধেছে। তবু রোগ তাকে দমিয়ে রাখতে পারত না, হাইস্কুল মাঠের অনুষ্ঠানে সে যেত। কিন্তু সেকান্দার খাঁ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বক্তৃতা দেবে। সে বক্তৃতার প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি অক্ষর কী তার কানে তীরের মতো বিঁধবে না! তাছাড়া দেশ স্বাধীন হওয়ার এত বছর পরে কেন এসবের প্রয়োজন হলো? এই লোকগুলো আরও আগেও তো এসব করতে পারত!
আয়োজন তবু থেমে থাকে না। আয়োজকদের বিশ্বাস, রশীদ ফকিরকে তারা রাজি করাবেই। এটা তাদের জন্য বেশ জরুরিও। কর্তৃপক্ষের কাছে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের ব্যাপার আছে।
অক্ষম রশীদ ফকির খোঁজে নিজের নিস্তারের পথ।
একে রোগাক্রান্তি, অপরদিকে মানসিক টানাপড়েনে রশীদ ফকিরের রোগযন্ত্রণা আরও প্রবল হয়ে ওঠে। তাই প্রবলভাবে মুক্তির পথ খোঁজে সে। 

সূত্র: আমার দেশ


আসলে কী ঘটেছিল | ইমদাদুল হক মিলন


এই বাড়ির কাজের লোকটির নাম বারেক।
তিরিশ একত্রিশ বছর বয়স। এখনও বিয়ে করেনি। রোগা পটকা কেংলা ধরনের। চেহারায় মিষ্টতা আছে, চোখ দুটো সুন্দর। এক বালতি পানি এনে দরজার বাইরে একপাশে রাখল সে। সন্ধ্যা প্রায় হয়ে আসছে। তবু বালতি ভরা টলটলে পরিষ্কার পানিটা দেখতে পেলাম। বারেককে জিজ্ঞেস করলাম, এখানে এভাবে বালতি ভরা পানি রাখলে কেন?
বারেক কী রকম একটু রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসল। গ্রামের লোক হলেও কথা সে মোটামুটি শুদ্ধভাষায় বলে। শুধু দুয়েকটা শব্দের গণ্ডগোল হয়। বিক্রমপুরের মানুষ বলে এলাকার দুয়েকটা শব্দ শুদ্ধভাষার মধ্যে ঢুকে যায়।

এখনও ঢুকল। ‘এমতেই রাখলাম।’
বুঝলাম, ‘এমতেই’ মানে এমনি। বললাম, এমনি এমনি এক বালতি পানি সারারাত এখানে থাকবে?

বারেক আবারও সেই হাসিটা হাসল। থাকলে অসুবিধা কী? পানি অনেক দরকারি জিনিস। কত সময় কত কাজে লাগতে পারে। এই ধরেন রাত্রে আপনার পাও ধোয়ার দরকার হইল, হাতমুখ ধোয়ার দরকার হইল, তখন কষ্ট কইরা চাপকলের ওইখানে না গিয়া এই বালতির পানি দিয়াই কাজটা আপনে সারলেন।

আমার ওসবের দরকার হবে না। আমার ঘুম খুব গভীর। শুয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে যাই। একঘুমে রাত শেষ করি। সকাল সাতটার আগে ঘুম ভাঙে না।

নতুন জাগায় একটু অসুবিধা হইতে পারে।

কিসের অসুবিধা?

ঘুমের। অনেক মানুষ আছে জায়গা বদল করলে, বিছানা বদল করলে সহজে ঘুমাইতে পারে না। আপনে অনেকদিন পর নানারবাড়িতে বেড়াইতে আসছেন। এখানে ঢাকা শহরের মতন ঘুম আপনের নাও হইতে পারে।

ঘরে ঢুকে পুরনো আমলের পালঙ্কে পা ঝুলিয়ে বসলাম।

আমার নানাবাড়ি গ্রাম এলাকার বিশাল বনেদী এক বাড়ি। বাইরের দিকে একতলা পুরনো একটা দালান। সেটাকে বলে কাছারি ঘর। লোকজন এলে ওই ঘরে বসে। তারপর ভেতরবাড়ি। ভেতরবাড়ির চারদিকে চারটা বড় বড় টিনের ঘর। মাঝখানে মাঠের মতন বিশাল উঠোন। পুনুখালা আর বাড়ির বহুকালের পুরনো ঝি রহিমা যে ঘরটায় থাকে তার পাশেই রান্নাঘর। নানা নানী মারা যাওয়ার আগেই বিধবা হয়েছেন পুনুখালা। তাঁর একটা মাত্র মেয়ে। সেই মেয়ে থাকে অস্ট্রেলিয়ায়। স্বামী স্ত্রী দুজনেই সিডনিতে ভাল চাকরি করে। আমার কোনও মামা নেই বলে মা আর পুনুখালা এখন এই বাড়ির মালিক। মা তো ঢাকাতেই থাকেন, পুনুখালা থাকেন এই বাড়িতে। দুচার বছরে এক আধবার মা হয়তো আসেন। মার সঙ্গে আমিও এসেছি কয়েকবার। একা কয়েকদিন পুনুখালার কাছে থাকার জন্য এই প্রথম এলাম। আমার এমবিএ শেষ হয়েছে কদিন আগে। এখন কিছুদিন অলস সময় কাটাবো। তারপর চাকরি বাকরিতে ঢুকবো। মা বললেন, যা তোর খালার কাছ থেকে বেড়িয়ে আয়। চলে এলাম।

এতবড় বাড়িটায় তিনজন মাত্র মানুষ। পুনুখালা রহিমা আর বারেক। আজ আমি এলাম বলে লোক হয়েছে চারজন। দুপুরবেলা এসে পৌঁছাবার পর দিনমজুর ধরনের কয়েকজন পুরুষ মহিলা দেখেছি। তারা কেউ গোলাঘরের কাজ করছিল, উঠোনের রোদে ধান শুকিয়ে বস্তায় ভরছিল। কেউ কেউ কাজ করছিল বাড়ির পেছন দিককার সবজি বাগানে। বড় পুকুরটার পারেও আরেকটা সবজি বাগান, সেখানেও কাজ করছিল কয়েকজন। সন্ধ্যার আগে আগেই যে যার কাজ শেষ করে চলে গেছে। এখন বাড়িটা একেবারেই নির্জন।

বিকেলবেলা বারেককে নিয়ে পুরো বাড়ি ঘুরে দেখতে দেখতে আমার মনে হয়েছে বাড়িটা আসলে একটা খামারবাড়ি। ফার্ম হাউজ। বনজ ফলজ আর ঔষধি গাছে ভর্তি। নানা প্রকারের সবজি ফলছে বাগানে। পুকুরগুলো ভরে আছে মাছে। শুধু একটা জিনিসই নেই, গরু। বাড়িতে গরু নেই। পুনুখালা গরু পছন্দ করেন না। গোবরের গন্ধে তাঁর বমি আসে।

আমি আবার গরু খুব ভালবাসি। বাবার বন্ধু আরেফিন আংকেলের একটা গরুর খামাড় আছে ময়মনসিংহের ফুলপুরে। একবার সেই খামার দেখতে গিয়েছিলাম। গরুগুলোকে যা ভাল লেগেছে! সবচে’ ভাল লেগেছে গরুদের পানি খাওয়া দেখতে। গামলায় মুখ দিয়ে অদ্ভুত এক শব্দে পানি খাচ্ছিল। সেই শব্দটা এখনও কানে লেগে আছে।

আহা এই বাড়িতে যদি দুয়েকটা গরু থাকতো তাহলে গরুদের পানি খাওয়াটা আবার দেখতে পেতাম। অদ্ভুত সেই শব্দটা শুনতে পেতাম।

এই বাড়িতে পল্লীবিদ্যুৎ আছে। কিন্তু রাত নটার পর থাকে না। এজন্য সাড়ে আটটা পৌনে নটার মধ্যে খাওয়া দাওয়া শেষ করে সবাই শুয়ে পরে।
আজও তাই হলো।

পুনুখালা বললেন, তুই দক্ষিণের ঘরে থাক বাবা। ওই ঘরের পালঙ্কটা সুন্দর। তোর নানা শুতেন। নানার খাটে নাতী শুলে ঘুম ভাল হবে। বারেকও থাকবে তোর সঙ্গে।

আমার একা ঘরে ঘুমানোর অভ্যাস। বারেক সঙ্গে থাকবে শুনে একটু গাঁইগুই করলাম। আমি একাই থাকতে পারবো খালা। বারেক অন্যঘরে ঘুমাক।

খালা বললেন, বারেক রোজ রাতেই ওই ঘরে ঘুমায়। ও ঘুমাবে মেঝেতে আর তুই পালঙ্কে। অসুবিধা কী? এত নির্জন বাড়ি, রাতে যদি ভয় পাস?

ভয় পাবে কেন?

ভূতের ভয় পেতে পারিস।

আমি ভূতে বিশ্বাস করি না। ভূতের ভয় আমার নেই। ঠিক আছে তুমি যখন বলছ বারেক থাক আমার সঙ্গে। অসুবিধা নেই।

পালঙ্কে উঠে বসেছি, বারেক মেঝেতে তার বিছানা মাত্র শেষ করেছে, পল্লীবিদ্যুৎ চলে গেল। ঘুটঘুটে অন্ধকারে ভরে গেল ঘর। বারেক বলল, দেখছেন অবস্থা? কী রকম অন্ধকার!

আমার ভালই লাগছে।

বলেন কী? এই রকম অন্ধকার আপনের ভাল লাগতেছে?

হ্যাঁ। কারণ আমি এখনই শুয়ে পড়ব, আর শোয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুম। ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঘুম খুব জমে।

তয় জমাইয়া ঘুম দেন। রাত্রে যদি ঘুম ভাঙ্গে, যদি কোনও দরকার হয়, ডাইকেন আমারে।

মনে হয় দরকার হবে না।

বারেক কথা বলল না। মৃদু শব্দে হাসল।
শুয়ে পড়তে পড়তে বললাম, হাসছ কেন?

এমতেই হাসছি।

ঠিক আছে। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম বারেক। গুড নাইট।

বারেকও এসব আধুনিক কায়দা জানে। সেও বলল, গুড নাইট।

রাত দুপুরে ঘুম ভেঙে গেল। ঘুমের ভেতর থেকেই কী রকম একটা শব্দ পাচ্ছিলাম, অচেনা একটা গন্ধ এসে লাগছিল নাকে। ঘুম ভাঙার পর টের পেলাম শব্দটা আসছে দরজার বাইরে থেকে। চব চব, চব চব এইরকম শব্দ। কোনও একটা জন্য যেন পানি খাচ্ছে।
milon_ki_ghoechilo_5 কয়েকটা মাত্র মুহূর্ত, শব্দটা চিনে ফেললাম। আরে, এ তো গরুর পানি খাওয়ার শব্দ! আরেফিন আংকেলের ফুলপুরের খামারে গরুদের পানি খাওয়ার শব্দ পরিষ্কার মনে আছে আমার। ঠিক এইরকম শব্দ। গন্ধটা চিনতেও দেরি হলো না। গরুর গায়ের গন্ধ। দরজার বাইরে বালতিতে যে পানি সন্ধ্যাবেলা রেখেছিল বারেক সেই পানি গরুতে খাচ্ছে। অনেকক্ষণ ধরে খাচ্ছে। খাওয়া যেন থামছেই না।

কিন্তু এই বাড়িতে তো গরু নেই। গরু নামের জন্যটা দুই চক্ষে দেখতে পারেন না পুনুখালা। গোবরের গন্ধে তাঁর বমি আসে। তাহলে এত রাতে কোত্থেকে এলো গরু? কাদের গরু এত রাতে এই বাড়িতে এসে বারেকের রাখা বালতিভরা পানি খাচ্ছে? তাছাড়া গরু খুবই দামি প্রাণী। গৃহস্থরা গরু খুবই যত্নে গোয়াল ঘরে বেঁধে রাখে রাত্রে। কেউ কেউ রাত জেগে পাহারা দেয়। গরু চোরের অভাব নেই দেশগ্রামে। শুনেছি চান্স পেলেই গৃহসে’র গোয়াল থেকে গরুচুরি করে গ্রামের হাট বাজারে বিক্রি করে দেয় গরুচোরগুলো। কসাইদের কাছে বিক্রি করে দেয়, যাতে মুহূর্তেই চামড়া বিক্রি হয়ে যায় ট্যানারিঅলাদের কাছে, কেজি দরে মাংস বিক্রি হয়ে যায় খদ্দেরদের কাছে। বিক্রমপুর এলাকায় গরুর নাড়িভূড়িকে বলে ‘আতড়ি উঝুড়ি’। সেই জিনিসও পরিষ্কার করে, তেল মশলা দিয়ে রান্না করে খায় অনেকে। খুবই নাকি টেস্টি জিনিস। গরুর হাড়মাথাও আজকাল ফেলনা জিনিস না। টোকাইরা কুড়িয়ে নিয়ে হাড্ডিঅলাদের কাছে বিক্রি করে দেয়। সেই জিনিস চালান হয়ে যায় বিদেশে। গরুর হাড্ডি শুকিয়ে পাউডার করে সেই পাউডার থেকে তৈরি হয় সিরামিকসের প্লেট পেয়ালা। আর দুধ এবং মাংসের জন্য গরু, হালচাষের জন্য গরু, সবমিলিয়ে গরু হচ্ছে অপরিসীম প্রয়োজনীয় এক প্রাণী।

এইরকম প্রয়োজনীয় দামি প্রাণী কোন বাড়ির গোয়াল থেকে ছুটে এসে রাত দুপুরে আমার নানাবাড়ির পানি খাচ্ছে?
গরুর পানি খাওয়ার শব্দটা তখনও সমানে চলছে। শব্দের সঙ্গে গায়ের গন্ধটাও ঘরে এসে ঢুকছে। একটু যেন গোবরের গন্ধও পাওয়া যাচ্ছে। তার মানে পানি খাওয়ার ফাঁকে ওই কাজটাও সেরে নিচ্ছে গরুটা।
ইস পুনুখালা নিশ্চয় সকালবেলা খুব বিরক্ত হবেন। গোবরের গন্ধে তার বমি হয়ে যেতে পারে।

আস্তে করে বারেককে ডাকলাম। বারেক।

বারেক সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল। জ্বি।

তার মানে গরুর পানি খাওয়ার শব্দে বারেকেরও ঘুম ভেঙে গেছে।

শুনতে পাচ্ছ?

জ্বি পাইতেছি।

এত রাত্রে গরু এলো কোত্থেকে? কাদের বাড়ির গরু এসে বালতির পানি খেয়ে যাচ্ছে। গোবরের গন্ধও পাচ্ছি। আমরা কি উঠবো? দুজনে মিলে গরুটা তাড়াবো?

বারেক ভয়র্ত গলায় বলল, আপনের কি মাথা খারাপ হইছে? চুপচাপ শুইয়া থাকেন। কথাও বইলেন না।

কেন?

সকালবেলা ঘটনা আপনেরে বলবো।

আমাদের কথাবার্তার শব্দেই কী না কে জানে, হঠাৎ পানি খাওয়ার শব্দটা বন্ধ হলো, আর পানির বালতিটা যেন উল্টে পড়ল। গরুটাও যেন দৌড়ে চলে গেল। তার ভারী শরীরের দৌড়ে মৃদু একটা কাঁপন লাগল মাটিতে, পালঙ্কে শুয়েও সেটা টের পেলাম আমি। বাড়ির পাশ দিয়ে ট্রেন কিংবা ভারী ট্রাক চলে গেলে মাটি যেমন কাঁপে ঠিক তেমন করে কাঁপলো পালঙ্ক।

সকালবেলা আমাকে ডেকে তুললো বারেক। ওঠেন ওঠেন, মজার একটা কারবার দেখাই আপনেরে।

উঠলাম। বারেকের সঙ্গে দরজা খুলে বেরুলাম।

বারেক বলল, দেখেন, বালতির দিকে চাইয়া দেখেন।

ঘুম ভাঙা চোখে বালতির দিকে তাকালাম। তাকিয়ে বড় রকমের একটা ধাক্কা খেলাম। চোখ কচলে আবার তাকালাম। না, দৃশ্য বদলায়নি! দৃশ্য একই। বালতিভরা পানি ঠিকই আছে। এক ফোটাও কমেনি। বারেক যেভাবে রেখেছিল ঠিক সেইভাবে আছে বালতি, সেইভাবেই আছে পানি। মাঝরাতে গরুতে তাহলে খেল কী? এতক্ষণ ধরে পানি খাওয়ার শব্দ পেলাম, ওই নিয়ে বারেকের সঙ্গে কথা বলল। আমাদের কথাবার্তার শব্দে বালতি উল্টে দিয়ে ছুটে গেল গরুটা সেই শব্দও পেলাম। আর এখন দেখছি সবই ঠিক আছে। বালতি আছে বালতির জায়গায়, পানি ভরা আছে আগের মতোই। ব্যাপার কী?

আমি তারপর গোবর খুঁজলাম। গোবরের গন্ধ যে পেয়েছিলাম সেই বস্তুটাই বা উধাও হয়ে গেল কোথায়? কোনও চিহ্নই তো নেই।

কাল সন্ধ্যার সেই রহস্যময় হাসিটা হাসল বারেক। বুঝলেন কিছু?

ফ্যাল ফ্যাল করে বারেকের দিকে তাকালাম। মাথা নাড়লাম। না, কিছুই বুঝলাম না। সবই দেখি ঠিক আছে। মাঝরাতে অতক্ষণ ধরে গরুটায় তাহলে খেল কী? শব্দ পেলাম, গরুর গায়ের গন্ধ, গোবরের গন্ধ সবই পেলাম। দৌড়ে চলে যাওয়ার শব্দও পেলাম। আর এখন দেখি বালতিভরা পানি যেমন ছিল তেমনই আছে। গোবরের চিহ্নও নেই।

কোথা থেকে থাকবে? গরু বলে কোনও জিনিস তো আসে নাই।

তাহলে কী এসেছিল? বারেক, তুমি আমার সঙ্গে ফাজলামো করো না। গরুর পানি খাওয়ার শব্দ আমার চেনা। গা এবং গোবর দুটোর গন্ধই চেনা। বালতি উল্টে দৌড়ে চলে যাওয়ার শব্দ আমি পেয়েছি। তুমিও পেয়েছ। এত কিছুর পর বলছ গরু বলে কোনও জিনিস আসেনি। তাহলে কী এসেছিল? আমার মনে হয় তুমি কিছু একটা চালাকি করেছ।

বারেক বিস্মিত চোখে তাকাল। আমি কী চালাকী করবো?

নিশ্চয় আমার ঘুম ভাঙার আগে উঠে চাপকল থেকে বালতি ভরে পানি এনে রেখেছ, গোবর পরিষ্কার করে রেখেছ।
সেইটা কইরা আমার লাভ কী? দরজা খুইলা ঘর থেকে বাহির হইলে সেই আওয়াজ আপনে পাইতেন। চাপকল থেকে ঘুটঘুটে অন্ধকারে কেন এত কষ্ট করে পানি আনতে যাবো আমি? অন্ধকারে গোবরই বা পরিষ্কার করবো কীভাবে? রাত্রে এই কাজগুলি সারবার কোনও দরকার নাই। দরকার থাকলে সকালবেলা সারবো। আমারে তো কেউ তাড়া দেয় নাই।

বারেকের কথায় যুক্তি আছে। ঠিকই তো। বারেক কেন অন্ধকার রাতে ঘর থেকে বেরিয়ে এসব কাজ সারতে যাবে? কাজটা তো এমন কিছু জরুরি না।

বললাম, তাহলে ব্যাপারটা কী?

বারেক গম্ভীর গলায় আবার সেই কথাটা বলল। গরু বলে কোনও জিনিস আসে নাই।

তাহল কী এসেছিল?

আপনে বোঝেন নাই?

না।

এত সহজ জিনিসটা বুঝতাছেন না?

এবার গা কাঁটা দিয়ে উঠল আমার। গলা কেমন শুকিয়ে এলো। ঢোক গিলে বারেকের দিকে তাকালাম।

বারেক বলল, যদি সত্য সত্যই গরু হইতো তাহলে আপনের কথায় আমি রাজি হইতাম। দুইজনে বাহির হইয়া গরুটা তখনই তাড়ায়া দিতাম। আমার হাতের কাছে ম্যাচ থাকে, হারিকেন থাকে। হারিকেন জ্বালাইয়া দুইজনে বাহির হইলে গরু তাড়ানো কঠিন কোনও কাজ ছিল না। আর একটা কথা হইল, এই বাড়িতে গরু নাই, গরু ঢুকবারও কোনও পথ নাই। বাড়ির চারদিকে কাঁটাতারের বেড়া। নানান পদের সবজির চাষ হয় বাড়িতে। গরু ছাগল ঢুকলে ক্ষেতের সবজি বিনাশ কইরা ফালাইবো। সামনের দিককার গেটটাও রাত্রে বন্ধ করি আমি নিজহাতে। তাহলে গরু আসবে কোথা থেকে?

শুকনো গলায় বললাম, তাহলে কী এসেছিল?

যে এসেছিল সে মাঝে মাঝেই আসে। কোনও রাতে আমি টের পাই, কোনও রাতে পাই না। তবে সে পানি খাইতে খুবই ভালবাসে। আর তিনাদের পানি খাওয়া আজব রকমের। পানি খাইবেন ঠিকই কিন্তু সেই পানি ফুরাইবো না। তিনার জন্য পানি আমি রোজ সন্ধ্যাবেলাই দরজার বাইরে রাইখা দেই। কোন রাত্রে তিনি আসবেন, কোন রাত্রে পানি খাবেন! যদি মুখের কাছে পানি না পান তাহলে আমার উপরে চেইতা যাইবেন। আমি একলা এইঘরে থাকি। যদি ঘরে ঢুইকা…। ঘরে ঢুকবার জন্য তিনাদের কোনও দরজা লাগে না। হাওয়ার সঙ্গে ঢুকবেন, হাওয়ার সঙ্গে বাহির হইবেন।

ভয়ার্ত গলায় বললাম, ঘটনাটা কি খালা জানেন? রহিমা বুয়া জানে?

না, কেউ জানে না। আমি কাউরে বলি না। বললে যদি আমার উপরে তিনি চেইতা যান? ভাইজান, আপনেও কেউরে বইলেন না।


কে আসে | ইমদাদুল হক মিলন


কে আপনি, কে? এই যে, এই যে আপনি, কালো আলখাল্লা পরে আমার বুক বরাবর এসে দাঁড়িয়েছেন। কে আপনি? আপনার মুখটা আমি দেখতে পাচ্ছি না। আগের দিনকার শাহজাদিদের মতো কালো নেকাবে মুখ ঢেকে রেখেছেন, কিন্তু আকৃতিতে আপনি বিশাল। কোনো মেয়ে এত দীর্ঘাঙ্গী হয় না। আপনি কে? কে আপনি? আরে, চট করে আবার কোথায় চলে গেলেন? এই যে, এই যে…
আমরা তিনটি ভাইবোন কেবিনের বাইরে বসে আছি। হাসপাতালটি চৌদ্দতলা। বাদল ছিল আইসিইউতে। আজ সতেরো দিন সে ডিপ কোমায়। তিন দিন আগে তাকে কেবিনে দেওয়া হয়েছে। অবস্থার একচুলও পরিবর্তন হয়নি। চোখ বন্ধ, লাশের মতো চিৎ হয়ে শুয়ে আছে ধবধবে সাদা বেডে। মুখে অক্সিজেন-মাস্ক লাগানো। আমাদের হামিদ মামা প্রায় চব্বিশ ঘণ্টাই আছেন বাদলের সঙ্গে। আমরা দশটি ভাইবোন। তিনজন আমেরিকায়। ঢাকায় যে সাতজন, তার মধ্যে বাদলের এই অবস্থা। অন্য ছয়জন যখন যে পারছে হাসপাতালে এসে প্রথমে বাদলের রুমে ঢুকছে, তাকে একপলক দেখে বাইরের বেঞ্চে এসে হতাশ মুখে বসে থাকছে। বাদলের কেবিন ছেড়ে হামিদ মামাও মাঝেমধ্যে এসে বসছেন আমাদের সঙ্গে। বাদলকে নিয়ে আমরা ফেলে আসা দিনের কথা বলি। টুকটাক স্মৃতিচারণা করি।
আজ কোনো কথা হচ্ছিল না। বেঞ্চে আমার দুপাশে বসে আছে দুবোন। একপাশে পলি আরেক পাশে ডলি। পলি আর বাদল যমজ। যমজদের পরস্পরের প্রতি টান থাকে অন্য রকম। সেই টানে আমরা কেউ আসি না-আসি, পলি প্রতিদিন আসে হাসপাতালে। ভাইয়ের মুখ একপলক দেখে বাইরে এসে আকাশের দিকে তাকিয়ে বসে থাকে। কখনো বিড়বিড় করে দোয়া-দরুদ পড়ে, কখনো নিঃশব্দে কাঁদে।
আজও কাঁদছিল সে।
এ সময় বাদলের কেবিন থেকে পাগলের মতো ছুটে এলেন হামিদ মামা। তোরা আয়। তাড়াতাড়ি আয়। বাদল হঠাৎ নড়েচড়ে উঠেছে। মুখ থেকে অক্সিজেন-মাস্ক খুলে ফেলেছে। আর পরিষ্কার ভাষায় কথা বলছে। তাড়াতাড়ি আয়।
সতেরো দিন এই প্রথম আমাদের মধ্যে আশার সঞ্চার হলো। ছুটে গিয়ে ঢুকলাম বাদলের রুমে। বাদলের মুখ দেখে তিন ভাইবোন হতভম্ব। যেন এইমাত্র গভীর ঘুম থেকে জেগে উঠেছে সে। মুখে বিশ-বাইশ দিনের না কামানো দাড়ি-গোঁফ। তার মুখটা বেশ ফ্রেশ লাগছে। কিন্তু চোখে অদ্ভুত এক চঞ্চল দৃষ্টি। যেন এদিক-ওদিক তাকিয়ে কাউকে খুঁজছে। শরীর নড়াতে পারছে না, মাথা ঘোরাতে পারছে না এদিক-ওদিক। শুধু চোখের মণি ঘুরিয়ে কাউকে খোঁজার চেষ্টা করছে। আর কথা বলছে পরিষ্কার গলায়। কোথায় গেল? সে কোথায় গেল?
আমি বাদলের মুখের কাছে ঝুঁকে গেলাম। কে কোথায় গেল? কাকে খুঁজছিস তুই? বাদল, কাকে খুঁজছিস?
চিনি না, আমি তাকে চিনি না। কালো আলখাল্লা পরা মুখে মেয়েদের মতো কালো নেকাব। শুধু চোখ দুটো দেখা যায়। বড় বড় চোখ। ধক ধক করছে। এই তো কিছুক্ষণ আগে আমার বুক বরাবর এসে দাঁড়িয়েছে।
হামিদ মামা ছুটে গিয়ে ডাক্তার ডেকে এনেছেন। অল্পবয়সী একজন ডাক্তার। সে অনেক দিন ধরেই বাদলকে দেখছে। বলল, কোনো কোনো রোগীর এ রকম হয়। আপনারা নার্ভাস হবেন না। এই অবস্থাটা চলতে থাকবে।
কিন্তু বাদলের কথাবার্তা একেবারেই স্বাভাবিক মনে হচ্ছে আমার। তার চোখ ও কণ্ঠে এক ধরনের ঘোর লেগে আছে। আমাদের প্রত্যেকের দিকেই তাকাচ্ছে সে, আবার কারও দিকেই যেন তাকাচ্ছে না। সবাইকে দেখছে, আবার কাউকেই যেন দেখছে না। আর কথা সে বলেই যাচ্ছে। কোনো এক কালো আলখাল্লা পরা, মুখ কালো নেকাবে ঢাকা মানুষের কথা বলে যাচ্ছে।
…আমি আগেও তাকে দেখেছি। ওই, ওই যে একবার আমার, খুব ছোটবেলায়, খুব ছোটবেলায় বিক্রমপুরে, মেদিনীমণ্ডল গ্রাম, নানির কাছে থাকি। শীতকালের রাত, গভীর রাত, আমার খুব কাশি হচ্ছিল, দম নিতে পারছিলাম না তখন, তখন হারিকেনের আলোয় আমি তাকে ছায়ার মতো একবার দেখেছিলাম। ঠিক এই রকমই। কালো আলখাল্লা পরা, নেকাবে ঢাকা মুখ। শুধু চোখ দুটো দেখা যায়। অন্ধকারে বাঘের চোখ যেমন জ্বলে, তেমন জ্বলছিল। সেই রাতে ছোট নানা আর মামারা গিয়ে জলধর ডাক্তারকে ডেকে আনল কাজির পাগলা থেকে। সকালবেলাই ভালো হয়ে গেলাম আমি…
বাদলের কথা শুনে আমরা তিনটি ভাইবোন মুখ চাওয়াচাওয়ি করছি। অন্য ভাইবোনদের ফোনে জানানো হয়েছে বাদলের অবস্থা। সে কথা বলছে শুনে যে যার মতো করে রওনা দিয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই অনেকে এসে পড়বে।
কিন্তু ডাক্তার বললেন, এ ধরনের রোগী এলোমেলো কথা বলে! কই, বাদল তো তা বলছে না। সে তো তার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথাই বলছে। এই ঘটনা তো আমরা সবাই জানি। একটুও তো এলোমেলো কথা না।
…আরেকবার, আরেকবার তাকে আমি দিনের আলোয় স্পষ্ট দেখতে পেলাম। ওই যে, ওই যে গাড়িটা যেবার আমাকে ধাক্কা দিল, আমাকে দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরল, আমি, আমি তখন একটা সময়ে দেখি গাড়িটা না, কালো আলখাল্লা পরা, নেকাবে মুখ ঢাকা, বিশালদেহী কে একজন আমাকে চেপে ধরেছে। দম বন্ধ হয়ে আমি যখন মরে যাচ্ছি, তখন, তখন হঠাৎ করে দেখি, আমি মাটিতে পড়ে আছি। কালো আলখাল্লা পরা মানুষটা কোথাও নেই। আমার চারপাশে অনেক লোক…
এবারও আমরা তিন ভাইবোন এ ওর দিকে তাকালাম। সত্যি তো বাদল একবার অ্যাকসিডেন্ট করেছিল। একজন আনাড়ি ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিয়েছে, বাদল হেঁটে যাচ্ছে পাশ দিয়ে, হঠাৎ করে গাড়িটা এসে দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরল বাদলকে। পা দুটো প্রায় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল ওর। চার-পাঁচ মাস লেগেছিল ভালো হতে।
…এবার আমি যে রাতে অসুস্থ হলাম, সেই রাতে তাকে দেখলাম আমার পায়ের দিকটায় এসে দাঁড়িয়েছে। যেন পা ধরে আমাকে কোথাও টেনে নিয়ে যাবে। তারপর দেখলাম আজ, এই তো কিছুক্ষণ আগে আমার বুক বরাবর এসে দাঁড়িয়েছিল। কে, ওটা কে? এখন আর দেখছি না কেন? চট করে কোথায় উধাও হয়ে গেল…
ততক্ষণে আমার বড় ভাই, ভাবি, অন্যান্য বোন, বোনজামাই, সবাই এসে পড়েছে। বাদলের কেবিনে বেশ বড় রকমের ভিড়। হামিদ মামা আমাকে ডেকে বাইরে নিয়ে এলেন। তাঁর মুখ বিবর্ণ, ফ্যাকাসে, চোখে ভয়, আতঙ্ক। বললেন, এই লক্ষণটা ভালো না। বাদল মনে হয়, বাদল মনে হয়…
কথা শেষ করতে পারলেন না হামিদ মামা। আমার হাত ধরে বাদলের কেবিনে ঢুকলেন। বাদলের চোখে সেই আগের দৃষ্টি। এখনো যেন কালো আলখাল্লা পরা, নেকাবে ঢাকা মুখ, সেই মানুষকে সে খুঁজছে। আমরা দুজন কেবিনে ঢোকার পরপরই যেন তাকে সে পেয়েও গেল। চোখ দুটো স্থির হলো বাদলের। এই প্রথম তাকে খুব ভয় পেতে দেখলাম। চোখে ভয়ার্ত দৃষ্টি, কণ্ঠে প্রচণ্ড ভয় পাওয়ার সুর। …আরে, আরে এই তো সে। এই তো! এই যে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমার ভয় করছে, আমার খুব ভয় করছে। এই, এই ওকে তোমরা সরে যেতে বলো, সরে যেতে বলো। আমার দিকে যেন এগিয়ে আসছে…
ওটাই ছিল বাদলের মৃত্যুমুহূর্ত।

সূত্রঃ প্রথম আলো


মানুষ কেমন করে বদলায় | ইমদাদুল হক মিলন


গল্পটা বলেছিল হাজামবাড়ির মজিদ।
গল্পকে সে বলত কিচ্ছা। আমার কিশোরবেলার কথা। গ্রামে নানির কাছে একা একা থাকি। সন্ধ্যাবেলা মজিদ মাঝে মাঝে আমাকে কিচ্ছা শোনাতে আসত। রাক্ষস খোক্ষস, জিন পরী, দেও দানব, ভুত পেতনি আর রাজরাজার কিচ্ছা।
এই কিচ্ছাটা ছিল ডাকাতের।
এক দুর্ধর্ষ ডাকাত রামদা হাতে বনোপথে দাঁড়িয়ে থাকে। সেই পথে টাকা-পয়সা সোনাদানা নিয়ে যে যায় রামদায়ের এক কোপে ধর থেকে তার মুন্ডুটা আলগা করে দেয় সে। তারপর তার টাকা-পয়সা সোনাদানা নিয়ে বাড়ি যায়। সংসারে বউ ছেলেমেয়ে আছে। তারা খুবই আরাম আয়েশে জীবন কাটায়।
একদিন সেই বনোপথ ধরে এক সাধু আসছিল। ডাকাত তার সামনে রামদা উঁচিয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধু বললেন, আমাকে তুমি খুন করতে চাও কেন?
তোমার কাছে যা আছে সেসব ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য।
সেটা তো তুমি আমাকে খুন না করেও নিতে পার?
তা পারি, কিন্তু মানুষ খুন করা আমার অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। এ পর্যন্ত ১০০টি খুন করেছি, তোমাকে খুন করলে খুনের সংখ্যা দাঁড়াবে ১০১।
আমি তোমাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি?
পারো।
ডাকাতির টাকা-পয়সা সোনাদানা দিয়ে তুমি কী করো?
কী আর করব। সংসার চালাই। বউ-ছেলেমেয়ের ভরণপোষণ করি।
কিন্তু ডাকাতি আর মানুষ খুন করে তুমি যে পাপ করছ এই পাপের দায়ভার কি তোমার স্ত্রী-ছেলেমেয়েরা নেবে?
ডাকাত একটু চিন্তিত হলো। তা তো জানি না।
কোনো দিন কি জানার চেষ্টা করেছ?
না।
এখন গিয়ে জেনে আসো।
আর তুমি?
আমি এখানে তোমার অপেক্ষায় বসে থাকব।
ডাকাত হাসল। তুমি কি আমাকে এতই বোকা মনে করো? আমি তোমাকে এখানে বসিয়ে রেখে ওসব কথা জানতে যাই আর সেই ফাঁকে তুমি পালাও। ওটি হবে না বাপধন।
তাহলে এক কাজ করো। আমাকে এই গাছের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখে যাও, যাতে আমি পালাতে না পারি।
হ্যাঁ, এটা হতে পারে।
তাহলে তা-ই করো।
সাধুকে একটি গাছের সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে বাড়ি গেল ডাকাত। গিয়ে স্ত্রীকে প্রথমে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, এই যে আমি ডাকাতি করে, মানুষ খুন করে টাকা-পয়সা রোজগার করে তোমার ভরণপোষণ করি, তাতে যে আমার পাপ হয়, এই পাপের অর্ধেক দায়ভার কি তুমি নেবে?
স্ত্রী অবাক। কেন তোমার পাপের দায়ভার আমি নেব?
যেহেতু তুমি আমার স্ত্রী। আমার অর্ধাঙ্গিনী।
স্ত্রী, অর্ধাঙ্গিনী যা-ই বলো আমার ভরণপোষণ এবং সংসার পরিচালনার দায় তোমার। তুমি কীভাবে কোন পদ্ধতিতে রোজগার করে সংসার চালাচ্ছ সেটা আমার দেখার ব্যাপার না। আমি শুধু দেখব তুমি আমাকে খাইয়ে-পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে পারছ কি না। অন্য কিছুই আমার দেখার ব্যাপার না। রোজগার করতে গিয়ে তোমার যদি কোনো পাপ হয় সেই পাপের দায়ভার তোমার। পৃথিবীতে কারও পাপের দায়ভার অন্য কেউ নিতে পারে না।
ডাকাত চিন্তিত হলো।
গেল ছেলের কাছে। ছেলেও একই কথা বলল। পিতা হিসেবে আমাকে খাইয়ে-পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব তোমার। সেই দায়িত্বের জন্য তুমি খুন করছ না ডাকাতি করছ তা আমি ভাবতে যাব কেন? তোমার পাপের ভার আমি নিতে যাব কেন? তোমার পাপ তোমার।
ডাকাত গেল মেয়ের কাছে। মেয়েরও একই কথা।
দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ডাকাত ফিরে এল বনে। এসে দেখে যে গাছের সঙ্গে সাধুকে বেঁধে রেখে গিয়েছিল সাধু সেই গাছের তলায়ই বসে আছেন কিন্তু তাঁর শরীরে কোনো বাঁধন নেই। মোটা মোটা দড়ি পড়ে আছে সাধুর পায়ের কাছে।
ডাকাত হতভম্ব। এ কী করে সম্ভব? এত শক্ত বাঁধন তুমি কী করে খুলেছ?
সাধু বললেন, আমি খুলিনি। আপনা আপনিই খুলে গেছে।
ডাকাত বুঝে গেল সাধু ঐশ্বরিক ক্ষমতার অধিকারী। কিছু একটা বলতে যাবে তার আগেই সাধু বললেন, এবার বলো যে কথা জানতে তুমি গিয়েছিলে সে কথা জেনেছ কি না?
ডাকাত মাথা নিচু করে বলল, জেনেছি।
তোমার স্ত্রী আর ছেলেমেয়ে কী বলল? তারা কি নেবে তোমার পাপের দায়ভার?
না কেউ নেবে না। তিনজনই পরিষ্ককার বলে দিয়েছে আমার পাপের যাবতীয় দায়ভার আমার। আমার পাপ অন্য কেউ ভাগ করে নেবে না।
তাহলে বোঝো। যাদের ভরণপোষণের জন্য ডাকাতি করছ তুমি, মানুষ খুন করার মতো ভয়াবহ পাপ করছ তারা কেউ তোমার পাপের দায়ভার নেবে না। তোমার পাপ শুধুই তোমার। তাহলে কি লাভ এই পাপ করে?
ডাকাত হাতের রামদা ছুড়ে ফেলে দিল। তাই তো। তারপর সাধুর পা জড়িয়ে ধরল। সাধুবাবা, আমি এখন কী করব? এই ১০০টি খুনের পাপ আমি কীভাবে মোচন করব? ডাকাতি করে যে পাপ করেছি সেই পাপ কী করে মোচন করব?
সাধু বললেন, ওই যে মরা গাছটা দেখছ, এক্ষুনি গিয়ে ওই গাছের তলায় বসো। বসে ভগবানকে ডাকতে থাকো। ভগবান, আমার পাপ মোচন করো। আমার পাপ মোচন করো। যেদিন দেখবে মরা গাছে সবুজ পাতা গজিয়েছে সেদিন বুঝবে ভগবান তোমার পাপ মোচন করেছেন। তোমার জন্য স্বর্গের দরজা খুলে যাবে।
সাধুর কথায় ওই মুহুর্তেই বদলে গেল ডাকাত। জগৎ সংসার ভুলে, স্ত্রী-সন্তান ভুলে মরা গাছের তলায় গিয়ে বসল। ভগবানকে ডাকতে শুরু করল।
দিন যায়, রাত যায়। ডাকাত শুধু ভগবানকেই ডাকে।
মাস যায়, বছর যায়। ডাকাত শুধু ভগবানকেই ডাকে।
কিন্তু তার পাপ মোচন হয় না। মরা গাছে গজায় না সবুজ পাতা।
একদিন ডাকাত দেখে বনের ধারে একজন কাউকে কবর দিয়ে যাচ্ছে কিছু লোক। সন্ধ্যার দিকে তারা কাজ সেরে চলে যাওয়ার পর বিশাল চাঁদ উঠল আকাশে। ফুটফুটে জ্যোৎস্মায় ভরে গেল চারদিক। ডাকাত উদাস চোখে জ্যোৎস্মা দেখছে আর মনে মনে ভগবানকে ডাকছে। এ সময় দেখা গেল একটি লোক কোদাল হাতে সেই কবরটার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। কোদাল চালিয়ে মাটি খুঁড়ল সে, লাশ তুলে আনল। লাশের শরীর থেকে কাফনের কাপড় সরানোর পর এতটা দুর থেকেও ডাকাত দেখতে পেল, লাশটি খুব সুন্দরী একটি মেয়ের। লোকটি তারপর সেই লাশের ওপর নিজের বদমতলব হাসিল করার প্রস্তুতি নিল। এই দেখে ভগবানকে ডাকতে ভুলে গেল ডাকাত। তক্ষুনি ছুটে গেল সেখানে। কোদালের কোপে হত্যা করল লোকটিকে। মেয়েটির লাশ সসম্মানে, সযত্নে কবরে শুইয়ে দিল। তারপর অনেকক্ষণ ধরে যতটা যত্ন সম্ভব ততটা যত্নে কবরের ওপর মাটিচাপা দিল। এসব কাজ শেষ করে সে যখন তার আগের জায়গায়, মরা গাছটির তলায় ফিরে এসেছে, এসে দ্যাখে চাঁদের আলোয় চকচক করছে মরা গাছের ডালপালা। সবুজ পাতায় ভরে গেছে মরাগাছ। অর্থাৎ ডাকাতের পাপ মোচন হয়েছে। ঈশ্বর তার পাপ ক্ষমা করেছেন।
মানুষ আসলে এভাবে বদলায়। বদলের মন্ত্রটা তাকে দিয়ে দিতে হয়। তার প্রাণে গেঁথে দিতে হয়, তুমি এইভাবে বদলাও। আমাদের মায়েরা, স্ত্রী কিংবা প্রেমিকা, সন্তানেরা চিরকাল খারাপ পথ থেকে প্রিয় মানুষটিকে ফেরানোর মন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে খুবই সহজ একটা অস্ত্র। ছেলে খারাপ কাজ করছে, খারাপ পথে চলছে, মা ছেলেকে শপথ করিয়েছেন, আমার মাথায় হাত দিয়ে বল, খারাপ কাজ তুই আর করবি না। খারাপ পথে তুই আর চলবি না।
মায়ের মাথায় হাত দিয়ে শপথ করা ছেলে খারাপ কাজটি আর করতে পারেনি। খারাপ পথে আর চলতে পারেনি। মায়ের সঙ্গে করা প্রতিজ্ঞা সে ভাঙবে না। ভাঙলে যদি মায়ের কোনো অনিষ্ট হয়? মায়ের মরা মুখ যদি দেখতে হয়?
প্রিয়তমা স্ত্রী কিংবা প্রেমিকা নেশাভাঙ করা প্রিয় মানুষটিকেও ওই একই কায়দায় ফিরিয়েছে। প্রতিজ্ঞা করো আর নেশা করবে না। করলে আমার মরা মুখ দেখবে।
নেশার সোনালি জগৎ থেকে ফিরে এসেছে মানুষটি।
কিছুতেই সিগারেট ছাড়তে পারছে না সংসারের কর্তা। তার আদরের সন্তানটি বলল, তুমি সিগারেট না ছাড়লে আমি তোমার সামনে যাব না, তোমার সঙ্গে কথা বলব না। যদি আমার চেয়ে সিগারেট তোমার বেশি প্রিয় হয় তাহলে তুমি সিগারেট নিয়েই থাক।
ভদ্রলোক সিগারেট ছেড়ে দিলেন।
আমি এক ভদ্রলোককে চিনি। এমন একটা জায়গায় চাকরি করেন, প্রতিদিন ১০-২০ হাজার টাকা ঘুষ খাওয়া তাঁর জন্য কোনো ব্যাপারই না। ভদ্রলোক একটি পয়সাও ছুঁয়ে দেখেন না। বেতনের টাকায় অতিকষ্টে ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসার চালান। তাঁর সহকর্মীরা সবাই বাড়িগাড়ি করে ফেলেছে।
ভদ্রলোক কেন ঘুষ খান না?
চাকরিতে ঢোকার আগে বাবা তাঁকে শপথ করিয়েছিলেন, কোনো দিন একটি পয়সাও ঘুষ খাবে না। সেই শপথ মেনে চলছেন তিনি। সত্যিকার শপথের এমন এক শক্তি থাকে, পৃথিবীর কোনো প্রলোভনই সেই শক্তির সঙ্গে পেরে ওঠে না।
মানুষ বদলায় নিজের শপথে। অন্যকে বদলে দেয় তার ভেতরে শপথের শক্তি তৈরি করে। বিবেককে জাগ্রত করিয়ে।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মিষ্টি পছন্দ করতেন। মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাস ছিল তাঁর। একদিন এক সাহাবি আসছেন তাঁর কাছে। হুজুর, আমার খুবই মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাস। আমি মিষ্টি খাওয়া ছাড়তে চাই। আপনি আমাকে পথ দেখান।
মহানবী (সা.) বললেন, আপনি সাত দিন পর আসবেন। তখন আমি আপনাকে বলব কীভাবে মিষ্টি ছাড়বেন।
সাহাবি সাত দিন পর এলেন। মহানবী (সা.) তাঁকে পথ দেখালেন। আপনি যদি প্রতিদিন চারটি মিষ্টি খান, তাহলে আজ খাবেন তিনটি। কাল খাবেন দুটো। তারপর দিন একটি। এভাবে চেষ্টা করলে অল্প দিনের মধ্যেই আপনি মিষ্টি ছাড়তে পারবেন।
সাহাবি খুব খুশি। জি হুজুর। আমি এভাবেই চেষ্টা করব। কিন্তু হুজুর, এই পরামর্শ দেওয়ার জন্য আপনি সাত দিন সময় নিলেন কেন? কারণটা জানার খুব কৌতুহল হচ্ছে।
মহানবী (সা.) বললেন, আমার নিজেরও মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাস ছিল। এই সাত দিনে সেই অভ্যাস আমি পরিত্যাগ করতে পেরেছি। নিজের অভ্যাস না বদলে সেই বিষয়ে আপনাকে আমি কী করে পরামর্শ দেব?
এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর কিছু হতে পারে না। এই ঘটনার অর্থই হচ্ছে, বদলে যাও বদলে দাও। আগে নিজে বদলাও, তারপর অন্যকে বদলে দাও।


ছেলেধরা | শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যয়


সেবার দেশময় রটে গেল যে, তিনটি শিশু বলি না দিলে রূপনারায়ণের উপর রেলের পুল কিছুতেই বাঁধা যাচ্ছে না। দু’টি ছেলেকে জ্যান্ত থামের নীচে পোঁতা হয়ে গেছে, বাকী শুধু একটি। একটি সংগ্রহ হলেই পুল তৈরী হয়ে যায়। শোনা গেল, রেল-কোম্পানির নিযুক্ত ছেলেধরারা শহরে ও গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্চে। তারা কখন এবং কোথায় এসে হাজির হবে, কেউ বলতে পারে না। তাদের কারও পোশাক ভিখিরীর, কারও বা সাধু-সন্ন্যাসীর, কেউ বা বেড়ায় লাঠিহাতে ডাকাতের মত—এ জনশ্রুতি পুরানো, সুতরাং কাছাকাছি পল্লীবাসীর ভয়ের ও সন্দেহের সীমা রহিল না যে এবার হয়ত তাদের পালা, তাদের ছেলেপুলেই হয়ত পুলের তলায় পোঁতা যাবে।

কারও মনে শান্তি নেই, সব বাড়িতেই কেমন একটা ছমছম ভাব। আবার তার উপরে আছে খবরের কাগজের খবর। কলকাতায় যারা চাকরি করে তারা এসে জানায়, সেদিন বউবাজারে একটা ছেলেধরা ধরা পড়েচে, কাল কড়েয়ায় আর একটা লোককে হাতে-নাতে ধরা গেছে, সে ছেলে ধরে ঝুলিতে পুরছিল। এমনি কত খবর! কলকাতার অলিতে গলিতে সন্দেহক্রমে কত নিরীহের প্রতি কত অত্যাচারের খবর লোকের মুখে মুখে আমাদের দেশে এসে পৌঁছুল। এমনি যখন অবস্থা তখন আমাদের দেশেও হঠাৎ একটা ঘটনা ঘটে গেল। সেইটে বলি।

পথের অদূরে একটা বাগানের মধ্যে বাস করেন বৃদ্ধ মুখুজ্যে-দম্পতি। ছেলেপুলে নেই, কিন্তু সংসারে ও সাংসারিক সকল ব্যাপারে আসক্তি আঠারো আনা। ভাইপোকে আলাদা করে দিয়েছেন, কিন্তু আর কিছুই দেননি। দেবেন এ-কল্পনাও তাঁদের নেই। সে এসে মাঝে মাঝে দাবী করে ঘটি-বাটি-তৈজসপত্র; খুড়ী চেঁচিয়ে হাট বাঁধিয়ে দিয়ে লোকজন জড়ো করেন, বলেন হীরু আমাদের মারতে এসেছিল। হীরু বলে, সেই ভাল—মেরেই একদিন সমস্ত আদায় করবো।
এমনি করে দিন যায়।
সেদিন সকালে ঝগড়ার চূড়ান্ত হয়ে গেল। হীরু উঠানে দাঁড়িয়ে বললে, শেষ বেলা বলচি খুড়ো, আমার ন্যায্য পাওনা দেবে কিনা বল?
খুড়ো বললেন, তোর কিছুই নেই।
নেই?
না।
আদায় করে আমি ছাড়ব।
খুড়ী রান্নাঘরে কাজে ছিলেন, বেরিয়ে এসে বললেন, তা হলে যা তোর বাবাকে ডেকে আন্‌ গে।
হীরু বললে, আমার বাবা স্বর্গে গেছেন, তিনি আসতে পারবেন না,—আমি গিয়ে তোমাদের বাবাদের ডেকে আনব। তাদের কেউ হয়তো বেঁচে আছে—তারা এসে চুলচিরে আমার বখ্‌রা ভাগ করে দেবে।
তারপর মিনিট-দুয়েক ধরে উভয়ে পক্ষে যে-ভাষা চলল তা লেখা চলে না।
যাবার আগে হীরু বলে গেল, আজই এর একটা হেস্তনেস্ত করে তবে ছাড়ব। এই তোমাদের বলে গেলুম। সাবধান!
রান্নাঘর থেকে খুড়ী বললেন, তোর ভারী ক্ষমতা! যা পারিস কর গে।
হীরু এসে হাজির হলো রাইপুরে। ঘর-কয়েক গরীব মুসলমানদের পল্লী। মহরমের দিনে বড় বড় লাঠি ঘুরিয়া তারা তাজিয়া বার করে। লাঠি তেলে পাকানো, গাঁটে গাঁটে পেতল বাঁধানো। এই থেকে অনেকের ধারণা তাদের মত লাঠি-খেলোয়াড় এ অঞ্চলে মেলে না। তারা পারে না এমন কাজ নেই। শুধু পুলিশের ভয়ে শান্ত হয়ে থাকে।
হীরু বললে, বড় মিঞা, এই নাও দুটি টাকা আগাম। তোমার আর তোমার ভায়ের। কাজ উদ্ধার করে দাও আরো বক্‌শিশ পাবে।
টাকা দুটি হাতে নিয়ে লতিফ মিঞা হেসে বললে, কি কাজ বাবু?
হীরু বললে, এদেশে কে না জানে তোমাদের দু-ভায়ের কথা! লাঠির জোরে বিশ্বাসদের কত জমিদারি হাসিল করে দিয়েছ—তোমরা মনে করলে পার না কি!
বড় মিঞা চোখ টিপে বললে, চুপ্‌ চুপ্‌ বাবু, থানার দারোগা শুনতে পেলে আর রক্ষে থাকবে না। বীরনগর গ্রামখানাই যে দু-ভায়ে দখল করে দিয়েছি, এ যে তারা জানে। কেউ চিনতে পারেনি বলেই ত সে-যাত্রা বেঁচে গেছি।
হীরু আশ্চর্য হয়ে বললে, কেউ চিনতে পারেনি?
লতিফ বললে, পারবে কি করে! মাথায় ইয়া পাগ্‌ বাঁধা, গালে গাল-পাট্টা, কপালে কপাল-জোড়া সিঁদুরের ফোঁটা, হাতে ছ-হাতি লাঠি,—লোকে ভাবলে হিঁদুর যমপুরী থেকে যমদূত এসে হাজির হলো। চিনবে কি—কোথায় পালাল তার ঠিকানা রইল না।
হীরু তার হাতখানা ধরে ফেলে বললে, বড় মিঞা, এই কাজটি আর একবার তোমাকে করতে হবে, দাদা। আমার খুড়ো তবু যা হোক দুটো ভাগের ভাগ দিতে চায়, কিন্তু খুড়ীবেটী এমনি শয়তান যে একটা চুমকি ঘটিতে পর্যন্ত হাত দিতে দেয় না। ওই পাগড়ি গালপাট্টা, আর সিঁদুর মেখে লাঠি হাতে একবার গিয়ে উঠানে দাঁড়াবে, তোমাদের ডাকাতে-হুমকি একবার ঝাড়বে, তার পর দেখে নেবো কিসে কি হয়। আমার যা-কিছু পাওনা ফেঁড়ে বার করে আনব। ঠিক সন্ধ্যার আগে—ব্যাস্‌।
লতিফ মিঞা রাজী হলো। লতিফ মামুদ দু-ভাই সাজ-পোশাক পরে আজই গিয়ে খুড়োর বাড়িতে হানা দেবে ঠিক হয়ে গেল। পিছনে থাকবে হীরু।
একাদশী। সারা দিনের পর দাওয়ায় ঠাঁই করে দিয়েচেন জগদম্বা। মুখুজ্যেমশাই বসেছেন জলযোগে। সামান্য ফলমূল ও দুধ। বেতো ধাত—একাদশীতে অন্নাহার সহ্য হয় না। পাথরের বাটিতে ডাবের জলটুকু মুখে তুলেছেন, এমন সময় দরজা ঠেলে ঢুকল দু-ভাই লতিফ আর মামুদ। ইয়া পাগড়ি, ইয়া গাল-পাট্টা, হাতে ছ-হাতি লাঠি, কপাল-জোড়া সিঁদুর-মাখানো। মুখুজ্যের হাত থেকে পাথরের বাটি দুম করে পড়ে গেল,—জগদম্বা চিৎকার করে উঠলেন—ওগো পাড়ার লোক, কে কোথায় আছো, এসো গো, ছেলেধরা ঢুকেছে।
সুমুখের ছোট মাঠটায় ঘর কেটে ছোট ছোট ছেলের দল রোজ ফিঞে খেলে, আজও খেলছিল,—তারাও চেঁচাতে চেঁচাতে যে যেখানে পারলে, ছুট দিলে—ওগো ছেলেধরা এসেচে, অনেক ছেলে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।
হীরু সঙ্গে এসেছিল বাড়ি চিনিয়ে দিতে। দোরের আড়ালে লুকিয়েছিল—সে চাপা গলায় বললে,—আর দেখ কি মিঞা, পালাও। পাড়ার লোকে ধরে ফেললে আর রক্ষে নেই। বলেই নিজে মারলে ছুট।
লতিফ মিঞা শহরের আর কিছু না শুনে থাক, ছেলেধরার জনশ্রুতি তাদের কানে এসেও পৌঁছেছে। চক্ষের পলকে বুঝলে এ অজানা জায়গায় এরূপ বেশে এই সিঁদুর মাখা মুখে ধরা পড়ে গেলে দেহের একখানা হাড়ও আস্ত থাকবে না। সুতরাং তারাও মারল ছুট।
কিন্তু ছুটলে হবে কি? পথ অচেনা, আলো এসেছে কমে—চতুর্দিক থেকে কেবল বহুকণ্ঠের সমবেত চিৎকার—ধরে ফ্যাল্‌, ধরে ফ্যাল্‌! মেরে ফ্যাল্‌ ব্যাটাদের! ছোট ভাই মামুদ কোথায় পালাল ঠিকানা নেই, কিন্তু বড় ভাই লতিফকে সবাই ঘিরে ফেললে—সে প্রাণের দায়ে কাঁটা বন ভেঙ্গে লাফিয়ে পড়ল একটা ডোবায়। তার পর সবাই পাড়ে দাঁড়িয়ে ছুঁড়তে লাগল ঢিল। যেই মাথা তোলে অমনি মাথায় পড়ে ঢিল। আবার সে মারে ডুব। আবার উঠে, আবার মাথায় পড়ে ঢিল।
লতিফ মিঞা জল খেয়ে আর ইঁট খেয়ে আধমরা হয়ে পড়ল। সে যতই হাতজোড় করে বলতে চায় সে ছেলেধরা নয়, ছেলে ধরতে আসেনি,—ততই লোকের রাগ আর সন্দেহ বেড়ে যায়। তারা বলে নইলে ওর গাল-পাট্টা কেন? ওর পাগড়ি কিসের জন্য? ওর মুখময় এত সিঁদুর এলো কোথা থেকে? পাগড়ি তার খুলে গেছে, গাল-পাট্টা একধারে ঝুলচে—কপালের সিঁদুর জলে ধুয়ে মুখময় লেগেচে। এ-সব কথা সে পাড়ের লোকদের বলেই বা কখন, শোনেই বা কে!
ততক্ষণে কতকগুলি উৎসাহী লোক জলে নেমে লতিফকে হিঁচড়ে টেনে তুলেছে—সে কাঁদতে কাঁদতে কেবলই জানাচ্চে, সে লতিফ মিঞা, তার ভাই মামুদ মিঞা—তারা ছেলেধরা নয়।
এমন সময় আমি যাচ্ছিলুম সেই পথে—হাঙ্গামা শুনে নেমে এলুম পুকুর-ধারে। আমাকে দেখে উত্তেজিত জনতা আর একবার উত্তেজিত হয়ে উঠল। সবাই সমস্বরে বলতে লাগল, তারা একটা ছেলেধরা ধরেছে। লোকটার অবস্থা দেখে চোখে জল এলো, তার মুখ দিয়ে কথা বেরোবার শক্তি নেই—গাল-পাট্টায়, পাগড়িতে সিঁদুরে-রক্তে মাখামাখি—শুধু হাতজোড় করছে আর কাঁদচে।
জিজ্ঞেসা করলুম, ও কার ছেলে চুরি করেছে? কে নালিশ করচে? তারা বললে, তা কে জানে?
ছেলে কৈ?
তাই বা কে জানে?
তবে এমন করে মারচো কেন?
কে একজন বুদ্ধিমান বললে, ছেলে বোধ হয় ও পাঁকে পুঁতে রেখেচে। রাত্তিরে তুলে নিয়ে যাবে। বলি দিয়ে পুলের তলায় পুঁতবে।
বললুম, মরা ছেলে কখনো বলি দেওয়া যায়?
তারা বলল, মরা হবে কেন, জ্যান্ত ছেলে।
পাঁকে পুঁতে রাখলে ছেলে জ্যান্ত থাকে কখনো?
যুক্তিটা তখন অনেকের কাছেই সমাচীন বোধ হলো। এতক্ষণ উত্তেজনার মুখে সে কথা কেউ ভাববারই সময় পায়নি।
বললুম, ছাড় ওকে। লোকটাকে জিজ্ঞেসা করলুম—মিঞা, ব্যাপারটা সত্যি কি বল ত?
এখন অভয় পেয়ে লোকটা কাঁদতে কাঁদতে সমস্ত ঘটনা বিবৃত করলে, মুখুজ্যে দম্পতির উপর কারও সহানুভূতি ছিল না, শুনে অনেকের করুণাও হলো।
বললুম, লতিফ বাড়ি যাও, আর কখনও এ-সব কাজে এসো না।
সে নাক মললে, কান মললে—খোদার কিরে নিয়ে বললে, বাবুমশায়, আর এ-সব কাজে কখনো না। কিন্তু আমার ভাই গেল কোথায়?
বললুম, ভায়ের ভাবনা বাড়ি গিয়ে ভেবো লতিফ, এখন নিজের প্রাণটা যে বাঁচল এই ঢের।
লতিফ খোঁড়াতে খোঁড়াতে কোনমতে বাড়ি চলে গেল।
অনেক রাত্রে আর একটা প্রচণ্ড কোলাহল উঠল ঘোষালদের পাড়ায়। তাদের ঝি গোয়ালে ঢুকেছিল গরুকে জাব দিতে। খড়ের ঝুড়ি টানতে গিয়ে দেখে টানা যায় না—হঠাৎ তার মধ্যে থেকে একটা ভীষণ মূর্তি লোক বেরিয়ে ঝির পা-দুটো জড়িয়ে ধরলে।
ঝি যতই চেঁচায়, বেরোও গো, কে কোথা আছ,—ভূত আমাকে খেয়ে ফেললে। ভূত ততই তার মুখ চেপে ধরে বলে, মা গো আমাকে বাঁচাও—আমি ভূত-পেরেত নই, আমি মানুষ।
চিৎকারে বাড়ির কর্তা আলো নিয়ে লোকজন নিয়ে এসে উপস্থিত—আগের ঘটনা গাঁয়ের সবাই শুনেছে। সুতরাং ছোট ভায়ের ভাগ্যে বড় ভাইয়ের দুর্গতি আর ঘটল না, সবাই সহজে বিশ্বাস করলে এই সেই মামুদ মিঞা। ভূত নয়।
ঘোষাল তাকে ছেড়ে দিলে—শুধু তার সেই পাকা লাঠিটি কেড়ে নিয়ে বললে, ছোট মিঞা, সমস্ত জীবন মনে থাকবে বলে এটা রেখে দিলুম। মুখের ঐ সব রং-টং ধুয়ে ফেলে এখন আস্তে আস্তে ঘরে যাও।
কৃতজ্ঞ মামুদ এক শ’ সেলাম জানিয়ে ধীরে ধীরে সরে পড়ল। ঘটনাটি ছেলেভুলানো গল্প নয়, সত্যই আমাদের ওখানে ঘটেছিল।


রহস্য | হুমায়ুন আহমেদ


রহস্য জাতীয় ব্যাপারগুলিতে আমার তেমন বিশ্বাস নেই। তবু প্রায়ই এ রকম কিছু গল্প-টল্প শুনতে হয়। গত মাসে ঝিকাতলার এক ভদ্রলোক আমাকে এসে বললেন, তার ঘরে একটি তক্ষক আছে – সেটি রোজ রাত ১টা ২৫ মিনিটে তিনবার ডাকে। আমি বহু কষ্টে হাসি থামালাম। এ রকম সময়নিষ্ঠ তক্ষক আছে নাকি এ যুগে? ভদ্রলোক আমার নির্বিকার ভঙ্গি দেখে বললেন, কি ভাই বিশ্বাস করলেন না?
জ্বি না।
এক রাত থাকেন আমার বাসায়। নিজের চোখে দেখেন তক্ষকটা। ঘড়ি ধরে বসে থাকবেন। দেখবেন ঠিক ১টা ২৫ মিনিটে তিনবার ডাকবে।
আরে দুর! কি যে বলেন?

ভদ্রলোক মুখ কালো করে উঠে গেলেন। চারদিন পর তার সঙ্গে আবার দেখা। পৃথিবীটা এরকম, যার সঙ্গে দেখা হবার তার সঙ্গে দেখা হয় না। ভুল মানুষের সঙ্গে দেখা হয়। আমাকে দেখেই ভদ্রলোক গম্ভীর মুখে বললেন, আপনি কি দৈনিক বাংলার সালেহ সাহেবকে চেনেন?
হ্যাঁ চিনি।
তাকে বাসায় নিয়ে গিয়েছিলাম। তিনি নিজের কানে শুনেছেন। বলেছেন একটা নিউজ করবেন।
ভালই তো। নিউজ হবার মতই খবর।
আপনি আসেন না ভাই, থাকেন এক রাত।
আমাকে শোনালে কি হবে?
আরে ভাই আপনারা ইউনিভার্সিটির টিচার। আপনাদের কথার একটা আলাদা দাম।
তাই নাকি?
আপনারা একটা কথা বললে কেউ ফেলবে না।
এই জিনিসটা নিয়ে খুব হৈ-চৈ করছেন মনে হচ্ছে?
না, হৈ-চৈ কোথায়? অনেকেই অবশ্যি শুনে গেছেন। বাংলাদেশ টিভির ক্যামেরাম্যান নাজমুল হুদাকে চেনেন?
জ্বি না।
উনিও এসেছিলেন। খুব মাইডিয়ার লোক। আপনি আসুন না।
আচ্ছা ঠিক আছে, একদিন যাওয়া যাবে।

ভদ্রলোকের চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি মুখভর্তি করে হাসলেন। টেনে-টেনে বললেন, চলেন চা খাই।
না, চা খাব না।
আরে ভাই আসেন না। প্রফেসর মানুষ, আপনাদের সঙ্গে থাকাটা ভাগ্যের ব্যাপার।
ভদ্রলোক হা হা করে হাসতে লাগলেন। যেতে হল চায়ের দোকানে।
চায়ের সঙ্গে আর কিছু খাবেন? চপ?
না।
আরে ভাই খান না। এই এদিকে দু’টো চা দে তো। এখন ভাই বলেন, কবে যাবেন?
আপনার সঙ্গে তো প্রায়ই দেখা হয়, বলে দেব একদিন।

চা খেতে খেতে ভদ্রলোক দ্বিতীয় একটা রহস্যের কথা শুরু করলেন। নাইনটিন সিক্সটিতে তিনি বরিশালের পিরোজপুরে থাকতেন। তার বাসার কাছে বড় একটা কাঁঠাল গাছ ছিল। অমাবস্যার রাতে নাকি সেই কাঁঠাল গাছ থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসত। আমি গম্ভীর হয়ে বললাম, সেই কান্নারও কি কোন টাইম ছিল? নির্দিষ্ট সময়ে কাঁদত? আপনার তক্ষকের মত?
ভদ্রলোক আহত স্বরে বললেন, আমার কথা বিশ্বাস করলেন না?
বিশ্বাস করব না কেন?
আমি কান্নার শব্দ গোটাটা টেপ করে রেখেছি। একদিন শোনাব আপনাকে।
ঠিক আছে।

বরিশালের ডিসি সাহেবও শুনেছেন। চেনেন উনাকে? আসগর সাহেব। সি এস পি। খুব খান্দানী ফ্যামিলি।
না, চিনি না।
ডিসি সাহেবের এক ভাই আছেন বাংলাদেশ ব্যাংকে। বিরাট অফিসার।
তাই বুঝি?
জ্বি। উনার বাসায় একদিন গিয়েছিলাম। খুব খাতির-যত্ন করলেন। গুলশানের বাসা। তিন তলা। উনি থাকেন এক তলায়। ওপরের দুটো তলা ভাড়া দিয়েছেন।
ভদ্রলোক আমার প্রায় এক ঘন্টা সময় নষ্ট করে বিদায় হলেন। আমার মায়াই লাগলো। ইন্ডেন্টিং ফার্মে সামান্য একটা চাকরি করেন। দেখেই বুঝা যায় অভাবে পর্যুদস্ত। চোখের দুষ্টি ভরসাহারা। বয়স এখনো হয়তো ত্রিশ হয়নি কিন্তু বুড়োটে দেখায়। বিচিত্র চরিত্র।

মাস খানেক তার সঙ্গে আমার দেখা হল না। তার প্রধান কারণ, যে সব জায়গায় তার সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার সম্ভাবনা সে সব জায়গা আমি এড়িয়ে চলতে শুরু করেছি। নিউমার্কেটে আড্ডার জায়গাটিতে যাই না। কি দরকার ঝামেলা বাড়িয়ে? এই লোকটি পিচ্ছিল পদার্থ, সে গায়ের সঙ্গে সেঁটে যাবে। আর ছাড়ানো যাবে না। কিন্তু তবু দেখা হল। একদিন শুনলাম সে ইউনিভার্সিটি ক্লাবে এসে খোঁজ নিচ্ছে। ক্লাবের বেয়ারা বলল, গত কিছুদিন ধরে নাকি সে নিয়মিতই আসছে। কি মুসিবত।

একদিন আর এড়ানো গেল না। ভদ্রলোক বাসায় এসে হাজির।
কি ভাই আপনি তো আর এলেন না?
কাজের ব্যস্ততা …
আজকে আপনাকে নিতে এসেছি।
সে কি?
কবি শামসুল আলম সাহেবও আসবেন।
তাই বুঝি?
জ্বি। চিনেত তো শামসুল আলম সাহেব কে? দু’টো কবিতার বই বেরিয়েছে। পাখির পালক আর অন্ধকার জ্যোত্স্না।
তাই বুঝি?
জ্বি। আমাকে দু’টো বই-ই দিয়েছেন। খুবই বন্ধু মানুষ। বাড়ি হচ্ছে আপনার ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা।
ও।
উনার ছোট ভাইও গল্প টল্প লেখেন। আরিফুল আলম।

গেলাম তার বাসায়। ঝিকাতলার এক গলিতে ঘুপসি মত দু’কামরার বাড়ি। মেজাজ খুবই খারাপ। রাত দেড়টা পর্যন্ত বসে থাকতে হবে সময়নিষ্ঠ তক্ষকের ডাক শোনার জন্য। কত রকম যন্ত্রণা যে আছে পৃথিবীতে!

ভদ্রলোক আমাকে বসার ঘরে বসিয়ে অতি ব্যস্ততার সঙ্গে ভেতরে চলে গেলেন। বসার ঘরটি সুন্দর করে সাজানো। মহিলার হাতের সযত্ন স্পর্শ আছে। ভদ্রলোক বিবাহিত জানতাম না। এ নিয়ে তার সঙ্গে কখনো কথা হয়নি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার স্ত্রী ঘরে এসে ঢুকলেন। খুবই অল্প বয়েসী তরুণী এবং অসম্ভব রূপসী। আমি প্রায় হকচকিয়ে গেলাম।

আমার স্ত্রী লীনা। আর লীনা, উনি হুমায়ূন আহমেদ। এর কথা তো তোমাকে বলেছি।
লীনা হাসি মুখে বললো, জ্বি আপনার কথা প্রায়ই বলে।
লীনা একটু চায়ের ব্যবস্থা কর।

লীনা চলে গেল ভেতরে। ভদ্রলোক নিচু গলায় বললেন, লীনার গল্প-উপন্যাস লেখার শখ আছে। কয়েক দিন আগে সাপ নিয়ে একটা গল্প লিখেছে। মারাত্মক গল্প ভাই। আপনাকে পড়ে শোনাতে বলবো। আমি বললে পড়বে না। আপনিও কাইন্ডলি একটু বলবেন।
আমি বললাম, গুণী মহিলাতো!
ভদ্রলোকের চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।
তা ভাই, কথাটা অস্বীকার করব না। গানও জানে। নজরুল গীতি। ভালো গায়। বাড়িতে টিচার রেখে শিখেছে।
তাই নাকি?
জ্বি, শোনাবে আপনাকে। একটু প্রেসার দিতে হবে আর কি। আপনি একটু রিকোয়েস্ট করলেই শোনাবে। কাইন্ডলি একটু রিকোয়েস্ট করবেন।
ঠিক আছে, করব।

চা এসে পড়ল। চায়ের সঙ্গে বড়া জাতীয় জিনিস। বেশ খেতে। আমি বললাম, কিসের বড়া এগুলি? ডালের নাকি?
ভদ্রলোক উচ্চস্বরে হাসলেন, নারে ভাই, কুলের বড়া। হা-হা-হা। কত রকম অদ্ভুত রান্না যে জানে! মাঝে মাঝে এত সারপ্রাইজ হই। খেতে কেমন হয়েছে বলেন? চমত্কার না?
ভাল, বেশ ভাল।
আরেক দিন আসবেন, চাইনীজ সুপ খাওয়াবো। চিকেন কর্ন সুপ। চাইনীজ রেস্তোরাঁর চেয়ে যদি ভালো না হয় তাহলে কান কেটে ফেলবেন। হা-হা-হা।

আমি মেয়েটার লেখা একটা ছোট গল্প শুনলাম, দু’টি কবিতা শুনলাম। ভদ্রলোক মুগ্ধ ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলেন। বার বার বললেন, ইস শামসুল আলম সাহেব আসলেন না। দারুণ মিস্ করলেন, কি বলেন ভাই?
রাত এগারোটার দিকে বললাম, তা হলে আজ উঠি?
তক্ষকের ডাক শুনবেন না?
আরেক দিন শুনব।
আচ্ছা, ঠিক আছে। ভুলবেন না যেন ভাই। আসতেই হবে।

ভদ্রলোক আমাকে এগিয়ে দিতে এলেন। রাস্তায় নেমেই বললেন, আমার স্ত্রীকে কেমন দেখলেন ভাই?
ভাল, গুণী মহিলা।
ভদ্রলোকের চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ধরা গলায় বললেন, বাঁদরের গলায় মুক্তার মালা। ঠিক না ভাই?
আমি কিছু বললাম না। ভদ্রলোক কাঁপা গলায় বললেন, গরীব মানুষ, স্ত্রীর জন্যে কিছুই করতে পারি না। কিন্তু এই সব নিয়ে লীনা মোটেই মাথা ঘামায় না। বড় ফ্যামিলির মেয়ে তো। ওদের চাল চলনই অন্য রকম।

আমি রিকশায় উঠতে উঠতে বললাম, খুব ভাগ্যবান আপনি।
ভদ্রলোক আমার হাত চেপে ধরলেন। যেন আবেগে কেঁদে ফেলবেন।
ভাই, আরেকদিন কিন্তু আসতে হবে। তক্ষকের ডাক শুনতে হবে। আসবেন তো? প্লীজ।

তক্ষকের ডাকের মত কত রহস্যময় ব্যাপারই না আছে পৃথিবীতে!


কবি সুফিয়া কামাল-এর জীবনাবলম্বনে গল্পঃ কাব্যকন্যার রঙিন দিন | মোমিন মেহেদী


অবিবাহিত  মেয়েদের দিয়ে সেকালে অনেক পুণ্য কর্ম করানো হতো, যেমন কোনো কিছুর চুরি হলে বা হারিয়ে গেলে কাঁঠাল বা কলাপাতায় বাড়ির বা সন্দেহজনক লোকদের নাম লিখে নিয়ে লোটা ভরে পানি নিয়ে দুটি কুমারী মেয়েকে ধরতে দিয়ে বসানো হতো। কোরআন শরীফ থেকে সুরা ইয়াসিন বা সুরা রহমান কিংবা আয়তাল কুরশী পড়া হতো। সঙ্গে সঙ্গে নাম লেখা পাতা একটি করে সেই লোটার মধ্যে ফেলা হতো। যে নামের পাতাটি লোটায় পড়লে লোটাটি ঘুরে উঠত, তাকেই ধরা হতো। আর এটি সত্যিই আশ্চর্যজনক রূপে চোর ধরিয়ে দিত। এখন কি আর সে প্রথা কেউ মানবে, না সে প্রথা কেউ অবলম্বন করবে? কেউ পালিয়ে গেলে বা হারিয়ে গেলে  জমিদার বাড়ির বড় হাফিজ সাহেব কলা পাতায় একটি দোওয়া লিখে দিতেন। তিনদিনের মধ্যে সে নিজেই ফিরে আসত কিংবা দূরে চলে গেলে চিঠি দিয়ে বা লোকমুখে সে নিজেই খবর দিত, কোথায় আছে এবং কেন চলে গিয়েছে। এসব অলৌকিক কাহিনী আজ আর কেউ বিশ্বাস করবে কি? বৃষ্টি না হলে সবাই খালি মাথায় খালি পায়ে খোলা মাঠে নামাজ পড়তেন। মেয়েরা ভিজা কাপড়ে ভিজাচুলে দোওয়া-দরুদ পড়তেন। বৃষ্টি সত্যিই হতো। আর খুব বেশি বৃষ্টি হলে ছোট ছেলেমেয়েরা সবাই মিলে একটা বড় মজার খেলা করতো। রাতে মেঘের ফাঁকে ২/১টি তারা দেখা গেলে সুর করে তারা বাঁধতো দল, কাটতো ছড়া।  সে ছড়াটি হলো- একতারা, দুইতারা, তারারা কয় ভাই?/ তারারা সাত ভাই/  বেঁধে  ফেল্লাম বড় ভাই/ চন্দ্র গেলে সূর্যের বাড়ি বসতে দিল চৌকি সিঁড়ি
বসবেনা আর পিঁড়িতে/ মানুষ মরে ভাতে, গরু মরে ঘাসে/ কালেকের রৌদ্রে যেন বসুমতী ফাটে।/
শৈশবের দিনগুলো ছিলো স্বপ্নঘেরা রঙিন । একালের মতো কচি বয়স হতেই স্কুল পড়া আর সময় মেনে চলার দিন ছিল না বলে শিশুমনের কল্পনার বিকাশ হতো নানা দিক দিয়ে। জীবন ছিল জীবন্ত, আনন্দও যেন অফুরন্ত ছিল, খেলাধুলা,খাওয়া, পরা, গ্রাম্য পরিবেশ, ফুলঝরা, পাখিডাকা, ভোরে ফুলের গন্ধে, পাখির গানে, রোদে বৃষ্টিতে ফুল ফল কুড়ানো, নদী-পুকুরে সাঁতার কাটা। শরীর স্বাস্থ্য মন অন্তর যেন পরিপূর্ণতা লাভ করত। আকাশ মাটির সাথে মিতালি হতো। পৃথিবীর এক আশ্চর্যময় রূপায়ণের কোলে চলছিল আদরের ফুলফোটা। প্রথম মহাযুদ্ধ, স্বাধীনতা আন্দোলন, মুসলিম রেনেসাঁর পুনরুত্থান, রাশিয়ান বিপ্লব, বিজ্ঞান জগতের নতুন নতুন আবিষ্কার, সাহিত্য ও সংস্কৃতির নবরূপ সূচনা, এসবের শুরু  থেকে যে অভাবের মধ্যে শৈশব কেটেছে তারই আদর্শ  সেই সময়ের সবার মনের ছাপ রেখেছে সুগভীর করে। স্বাধীনতা চাই, শান্তি চাই, সাম্য চাই, এই বাণী তখনকার আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হতো। প্রতিনিয়ত মানুষ সেই সংগ্রাম করে চলছে, একতাবদ্ধ গণজাগরণ চিরকাল জয়ে পতাকা উড্ডীন করেছে।
এমন একটা সময়ের গল্প। গল্পের প্রথম পর্বে দেখা যায়, বিশাল প্রাচীরের ভেতর বিশাল প্রাসাদ। ফুল-ফল আর নানারকম গাছগাছিলেতে শোভান্বিত শ্যামল ভেতর বাড়িতে দুই পুকুর একটি গোসলের, অন্যটি রান্না করা, কাপড় ধোয়ার কাজের। অন্দরের পুকুরের সঙ্গে প্রাচীরের তলা দিয়ে গেট করা, খাল থেকে নদীতে যাওয়ার পথ। জোয়ারের পানি নববর্ষায় উচ্ছ্বসিত হয়ে গেটের তলা দিয়ে পুকুরে আসত আর আসত অসংখ্য মাছ। বেগম-বিবিরা সেই মাছ ধরতেন অবসরের আনন্দে। অন্দর বাড়িতে পুরুষের প্রবেশ ছিল না, তাই বিবিরা সবাই সাঁতার কেটে, নৌকা বেয়ে আনন্দ-উৎসব করার সুযোগ পেতেন। গরমের দিনে দুপুরে থাকার জন্য ঠান্ডা আটচালা বাংলোর সিঁড়ি ধাপে ধাপে নেমে গেছে বৃহৎ পুকুরের মধ্যে। দুই ধারে মেহেদি গাছের বেড়ার মধ্যে অজস্র ফুলের গাছ। রঙ্গন গাছের কুঞ্জ বেয়ে লতিয়ে উঠেছে লতা-বেলি, জুঁইয়ের ঝাড়, কামিনী, শেফালি, জবা, সূর্যমুখী। শিউলি বোঁটার রঙে কাপড় রাঙ্গিয়ে পরার জন্য প্রচুর ফুল সংগ্রহ করে বোঁটা শুকিয়ে রাখা হতো। এসব কাজে ছেলেমেয়ে, বউ-ঝিদের উৎসাহ ছিল প্রচুর। ভোর-সকালে ফুল কুড়ানোর পাল্লা দেওয়া হতো, কে কত ফুল কুড়াতে পারে। বাইরে থেকে মালিরাও ফুল পাঠাত অন্দরমহলে। ফুল বাছানিয়ারা তা থেকেও বোঁটা সংগ্রহ করত। আম, জাম, লিচু, আতা, বাতাবি, সফেদা, লেবু, তুঁত, পেয়ারা, তাল, খেজুর, কলা, কামরাঙ্গা, করমচা, চালতা, আমরুল, আঁশফল, সুপারি গাছ প্রাচীরের পাশে বহু বিস্তৃত সীমানার মধ্যে থাকায় তাজা-টাটকা ফল পেতে পরিবারের অভাব হতো না। বাড়িতে অন্দরমহলে বিস্কুট, রুটি, কেকও তৈরি হতো। কিন্তু আমার বড় মামার বিস্কুট, রুটি, কেক, চিনি, নুন, চা, গোলমরিচ গুঁড়া আসত কলকাতার আর্মি নেভি স্টোরস থেকে। এই যে বিশাল প্রাসাদের কথা বলছি, এই প্রাসাদের চারপাশে দারওয়ানরা বাড়ি পাহারা দিত।  বাচ্চারাও সেকালে মসজিদে যেতাম আর মসজিদের জায়নামাজেই ঘুমিয়ে পড়তো। সকালে দেখা  যেত  ঠিক বিছানায়ই শুয়ে আছে। আর এই ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে বলা হতো- ফেরেশ্তারা বাচ্চাদের সবাইকে ঘরে এনে শুইয়ে দিয়ে গেছেন।
তখন মসজিদে গিয়ে সুর মিলিয়ে জোরে 'কায়েদা বোগ্দাদি' পড়তে হতো। তিন-চারজন মেয়েও যেতো এই কায়দা বোগদাদি পড়ার জন্য।  প্রাসাদের মালিকের আদরের বড় নাতি যখন আরবি-ফারসি পড়তে শিখলেন, তখন  ছোটরা জের-জবর- পেশ-তশ্দিদ শিখছে। তারা সুর করে পড়তেন- করিমা বেবখ্শা য়ে বর হালেমা/  কে হাস্তম আলীরে কমন্দে হাওয়া/  নেগাহ্দার মারা-জারায়ে খাতা/ খাতা দর্ গোজারো সওয়াবেন্নামা...
গল্পের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়েছে ছন্দিত আনন্দিত কল্লোলে। আর এভাবেই শুভদিনটি চলে আসে। বাংলা আষাঢ় মাসের কোন একটি দিন, ইংরেজি সাল গণণায় দেখা যায়- ১৯৯১ সালের ২০ জুন। এই দিনটিতেই একটি শিশুর জন্ম হয়। আনন্দ-কলরবে শিশুটির জন্মণ উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল।  যেই প্রাসাদের কথা শুরুতেই বলেছি, সেই প্রাসাদটি সারাদেশে পরিচিত। বরিশাল জেলার শায়েস্তাবাদ নওয়াব পরিবারের অনেক খ্যাতি তখন। শিশুটির মাতামহ সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেনের কনিষ্ঠ কন্যা সৈয়দা সাবেরা খাতুন ছিলেন শিশুটির মা। ত্রিপুরা জেলার শিলাউড় গ্রামের সৈয়দ আবদুল বারী বিএল ছিলেন তাঁর বাবা। তারা এক ভাই এক বোন। মাটিকে বাদ দিয়ে ফুলগাছের যেমন কোনো অস্তিত্ব নেই আমার মাকে বাদ দিয়ে তারও তেমন কোনো কথা নেই। শিশুটি জন্ম নেওয়ার আগেই মায়ের মুখে 'হাতেম তাইয়ের কেচ্ছা' শুনে শিশুটির নানি আম্মা তাঁর নাম রেখেছিলেন হাসনা বানু। শিশুটির নানা প্রথম বয়সে সদর আলা থেকে জজগিরি পর্যন্ত সারা করে শেষ বয়সে সাধক-'দরবেশ' নাম অর্জন করেছিলে। আলোকিত আগামী গড়ার অনন্য মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠার রঙিন ভূবন নিয়ে যখন তিনি জন্ম নিলেন, নিজের হাতে সেই শিশুটির  মুখে মধু দিয়ে তিনি নবাগত শিশুর নাম রেখেছিলেন সুফিয়া খাতুন। কিন্তু তাঁর ডাক নাম হাসনা বানুটাই আমাদের পরিবারে প্রচলিত।  সেই শিশু হাসনা বানু ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখেন; সুখ স্বপ্ন, দুঃস্বপ্ন। দুঃস্বপ্নে আসে একটা আতঙ্কিত ভাব; সুখ স্বপ্নের মধুর আবেশে মন ভরে থাকে। তারও শৈশবের সুখ স্বপ্ন মধুময়। অফুরন্ত ঐশ্বর্যের মধ্যে, শিতি পরিবারের আওতায়, ধর্মীয় পরিবেশের মধ্যে বেড়ে উঠেছে । তাদের পরিবারটি ছিল সুবৃহৎ। মা, মামা-খালা আম্মারা মিলে ছয় ভাই, ছয় বোন। শিশুটির আম্মা বোনদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। শিশুটির শৈশব-কৈশোর ছিল পরিবারের গন্ডিতেই সীমাবদ্ধ।
গল্পের তৃতীয় পর্বের রঙধনু দূর করেছে কষ্টের কালোমেঘ। আর ঠিক তখন কিছুই বোঝবার মতো বিদ্যাবুদ্ধি হয়নি শিশুটির। কিন্তু কি জানি কেন তার ভীষণ কান্না পেত। আর তার চেয়ে বয়সে কিছু বড় এক বোনঝি  চোখ মুছিয়ে বলতেন, শুধু শুধু কাঁদতে নেই। সিপারের আমপারা পর্যন্ত মসজিদে তাদের পড়া; তারপর কোরআনের সবক আম্মার কাছ থেকেই নিতে হয়েছে, কেননা তখন তারা বড় হয়ে গিয়েছিলেন। তবে জুবিলি স্কুলে প্যারীলাল মাস্টার মশায়ের কাছে তিনিও দু-এক সবক পড়েছেন। তবে তা পুরুষের পোষাকের মাধ্যমে অর্থাৎ পায়জামা-কুর্তা আবার আচকান-পায়জামা পরে গিয়ে । বাল্য-শিা পর্যন্ত তার বিদ্যা হওয়ার পর ভাইয়ারা সব চলে গেলেন  কেউ বরিশাল, কেউ ঢাকা আর আমার ভাইয়া গেলেন কলকাতায়। খালা-আম্মা তাকে নিয়ে কলকাতার স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। মামাত বোনেরা তাদের ছেলেমেয়ে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি চলে গেলেন। শূন্য বিরাট ভবনে পীমাতার পতলে রইলেন শুধু হাসনা বানু একা। আর রইল দাই-খেলাই বাঁদী খানসামা-পেয়াদাদের দল। তখন তার বয়স সাত বছর। আর এই বয়সে নিরালা নিঝুমপুরীতে পাহারা দেওয়ার পেয়াদাদের বেহালার মূর্ছনা অনেক রাত পর্যন্ত  তার কানে বাজত। শিশুজীবনের সবচেয়ে প্রকৃত শিক-সাথী ছিলেন তার 'জামাই', অর্থাৎ পুতুল মেয়ে তার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে আমি 'শাশুড়ি' হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন হাসনা বানুর আম্মার দুধভাই, ভাইয়ারা সবাই তাকে ডাকত মামা। হাসনা ডাকতেন জামাই। সেই জামাইয়ের কোলে বসে বসে শুনতেন পুঁথি পড়া। শুনতেন গান। দেখতেন বেহালার তানে তানে ওস্তাদ বেহালাদারের ভাবোদ্বেল মুখ, কখনও হোসেনের বীরত্বে উচ্ছ্বসিত, কখনও সখিনার ব্যথায় ব্যথিত। আবার পালাগানও হতো। ভালো ভালো পালা সোনাভানের পালা ইত্যাদিথ বানিয়ে ওরা অভিনয় করত। তখন তো আর অভিনয় কী তিনি জানতেন না। তবে তার কাছে মনে হয়েছে শিল্প-সাহিত্য মানুষের অন্তরের সম্পদ। আল্লাহ্ তা সবাইকে দান করেছেন। সবার অন্তরে এ স্বতঃস্ফূর্ত। কেউ এ নিয়ে বিশ্বজোড়া নাম করে, কেউ বা কোথায় ঢেউয়ে ভেসে তলিয়ে যায় সাধনা-সুযোগ-সুবিধা ও শিার অভাবে তার আর পাত্তা থাকে না। শীতের দিনে খেজুর গাছের রস নামিয়ে নারিকেল, চাউল দিয়ে পেয়াদারা যে শিরনি রাঁধত, হাসনাও জামাইয়ের কোলে বসে তা খেতেন। অনেক রাতে জামাইয়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়লে তাকে নিয়ে গিয়ে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিতেন।  সেইত জীবন-সেই স্বপ্ন সুর ব্যথা, আর তার সঙ্গে শুরু দুঃখ-অভাব-অনটনের। ব্যথার যে কত রূপ তা কি এখনও জানার সূত্র তৈরী হচ্ছে। হারিয়ে পাওয়া-পেয়ে হারানো। চাওয়া-পাওয়া-দেওয়া এ সবই তো ব্যথা-বিজড়িত সুখ-দুঃখ অশ্রুজল সিক্ত, স্মৃতির সুরভিতে সুরভিত। কখনও কোনো দূরান্ত থেকেও এরা ভেসে এসেছে।
 গল্পের চতুর্থ পর্ব বয়ে চলেছে কবিতার রাস্তা ধরে- সুফিয়া কামালের কবিতা। আমরা যেই শিশুটির কথা, যেই হাসনা বানুর কথা এতক্ষণ পর্যন্ত বলছি, শুনছি। সেই হাসনা বানু বাংলাদেশের শিশু-কিশোর নারীদের অতি পরিচিত মানুষ। অতি পরিচিত কবি। অনন্য নারী মহিয়ষী। তিনি তার চেতনায় আদর্শে রেখেছিলেন স্বাধীনতা আর স্বাধীকারের স্বাদ। আর তাই শৈশবে বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরও পিছপা হননি। বরং সেই স্বামীর হাত ধরেই নিয়েছে কবিতার নতুন সোপান। আর এভাবেই তিনি একসময় লিখেছেন, সাঁঝের মায়া। যেখানে জীবনের কথা, দেশের কথা, মানুষের কথা তিনি তুলে ধরেছেন পরম মমতায়- অনন্ত সূর্যাস্ত-অন্তে আজিকার সূর্যাস্তের কালে
সুন্দর দণি হস্তে পশ্চিমের দিকপ্রান্ত-ভালে/ দণিা দানিয়া গেল, বিচিত্র রঙের তুলি তার/ বুঝি আজি দিনশেষে নিঃশেষে সে করিয়া উজাড়/ দানের আনন্দ গেল শেষ করি মহাসমারোহে।/ সুমধুর মোহে ধীরে ধীরে ধীরে/ প্রদীপ্ত ভাস্কর এসে বেলাশেষে দিবসের তীরে/
ডুবিল যে শান্ত মহিমায়,/ তাহারি সে অস্তরাগে বসন্তের সন্ধ্যাকাশ ছায়।/ ওগো কান্ত দিবাকর! তব অস্ত-উৎসবের রাগে/ হেথা মর্তে বনানীর পল্লবে পল্লবে দোলা লাগে...
পঞ্চম পর্বে এসে স্বপ্নজ জীবনের ডানা মেলে বলা যায়, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা 'হেনা' সুফিয়া কামাল-এর মনে এক নতুন ভাবের উদ্রেক করে। গদ্য লেখার নেশা পেয়ে বসে তাঁকে। আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা পড়ে  কবিতার প্রতি মোহগ্রস্থ হন জমিদার বাড়ির নাতনি হাসনা বানু আমাদের আলোকিত সময়ের সাহসমানুষ সুফিয়া কামাল। বেগম রোকেয়া, বেগম সারা তাইফুর ও বেগম মোতাহেরা বানু প্রমুখের লেখাও তাঁকে উৎসাহিত করে। আর তাই এগিয়ে যান জীবনের একটাই লক্ষ্য নিয়ে আর তা হলো মানুষের মঙ্গল। এরপর যখন তার বিয়ে হয় তখন,  সৈয়দ নেহাল হোসেন ছিলেন স্কুলের ছাত্র। বিয়ের পর বরিশাল বি.এম.কলেজ থেকে এন্ট্রাস ও এফ.এ. পাশ করে কলকাতায়  সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি হন।  সেন্ট জেভিয়ার্স এ পড়ার সময় সৈয়দ নেহাল হোসেন সস্ত্রীক কলকাতার তালতলায় এক বাসায় থাকতেন। কলকাতায় অবস্থান করার সুযোগে কাজী নজরুল ইসলাম, সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, লীলা রায়, শামসুন নাহার মাহমুদ প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের সাাৎ লাভের অভূতপূর্ব সুযোগ তিনি লাভ করেন আমাদের সুফিয়া কামাল। যা তাঁকে সাহিত্য চর্চায় আরো অনুপ্রাণিত করে। শুধু তাই নয়, স্বামীর উত্সাহ উদ্দীপনা ও সর্বাত্মক সহযোগিতায় সুফিয়া বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগদান করতে লাগলেন; এমনকি কংগ্রেস সম্মেলনেও যোগ দিয়েছিলেন। মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্তের ভ্রাতুষ্পুত্র সরল কুমার দত্ত সম্পাদিত 'তরুণ' পত্রিকার সাথে জড়িত ছিলেন সে সময়ের তরুণ মেধাবী ছাত্র সৈয়দ নেহাল হোসেন। 'তরুণ' পত্রিকার জন্যে লেখা চাই। নেহাল হোসেনের মনে হলো তার নববধু সুফিয়ার কাঁচা হাতের কিছু লেখা আছে। তিনি সুফিয়ার ২/৩ টি লেখা সম্পাদকের কাছে নিয়ে গেলেন। সম্পাদক একটি গল্প ও একটি কবিতা মনোনীত করে প্রথমে গল্পটি ছাপার ব্যবস্থা করলেন। 'তরুণ' পত্রিকার প্রথম বর্ষ ৩য় সংখ্যায় মিসেস এস.এন. হোসেন নামে সুফিয়া কামাল-এর প্রথম লেখা 'সৈনিক বধূ' প্রকাশিত হয়। আশ্চর্য ব্যাপার প্রথম লেখা প্রকাশের সাথে সাথে হিন্দু মুসলমান সকলে অত্যন্ত  প্রশংসা করে আরও লেখার জন্য তাঁকে উত্সাহিত করেন। এ সময় বাংলার শ্রেষ্ঠ মহিলা গীতিকবি কামিনী রায় আসেন বরিশালে। একজন মুসলমান মেয়ে গল্প ও কবিতা লিখছেন এ কথা শুনে তিনি নিজে সুফিয়ার বাসায় গিয়ে তাঁকে উত্সাহিত করেন। অতঃপর আমরা পেলাম প্রত্যয়ী একজন মানুষকে। যিনি জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবেসেছেন দেশ, মাটি, মানুষ আর শিশু-কিশোর-নারীদেরকে। তার ভালোবাসার বহমান ¯্রােতেই আমরা পেয়েছি সাহসআলো, সাহসকাব্য আর চেতনায় স্বাধীনতা...


বাঘের পালকি চড়া | উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী



বাঘ কিনা মামা আর শিয়াল কিনা ভাগ্নে, তাই দুজনের মধ্যে বড্ড ভাব।
শিয়াল একদিন বাঘকে নিমন্ত্রণ করল, কিন্ত তার জন্যে খাবার কিছু তয়ের করল না! বাঘ যখন খেতে এল, তখন তাকে বললে, ‘মামা, একটু বস। আর দু-চারজনকে নিমন্ত্রণ করেছি, তাদের ডেকে নিয়ে আসি।’
এই বলে শিয়াল চলে গেল, আর সে রাত্রে ফিরল না। বাঘ সারারাত বসে থেকে, সকালবেলা শিয়ালকে বকতে-বকতে বাড়ি চলে গেল।
তারপর একদিন বাঘ শিয়ালকে নিমন্ত্রণ করল। শিয়াল এলে তাকে খেতে দিল মস্ত-মস্ত মোটা-মোটা হাড়। তার এক-একটা লোহার মত শক্ত। শিয়াল বেচারার চারটে দাঁত ভেঙ্গে গেল, তবু সেই হাড়ের একটুও সে চিবিয়ে ভাঙ্গতে পারল না। বাঘ ঐরকম হাড় খেতেই খুব ভালবাসে। সে মনের সুখে পেট ভরে হাড় চিবিয়ে খেলে, আর বললে, ‘কি ভাগ্নে, পেট ভরল তো?’
শিয়াল হাসতে হাসতে বললে, ‘হ্যাঁ মামা, আমার বাড়িতে তোমার যেমন পেট ভরেছিল, তোমার বাড়িতেও আমার তেমনি পেট ভরেছে।’ মনে-মনে কিন্ত তার ভয়ানক রাগ হল, আর সে বললে, ‘যদি বাঘমামাকে জব্দ করতে পারি, তবে দেশে ফিরব, নইলে আর দেশে ফিরব না।’
এই মনে করে শিয়াল সে-দেশ ছেড়ে আর এক দেশে চলে গেল। সে নতুন দেশে অনেক আখের তে ছিল। শিয়াল সেই আখের ক্ষেতে থাকত আর খুব করে আখ খেত। যা খেতে পারত না, ভেঙ্গে রেখে দিত।
চাষীরা বললে, ‘ভালো রে ভালো, এমন করে আমাদের আখ কোন দুষ্টু শিয়াল ভেঙ্গে রেখে দেয়? বেটাকে এর সাজা দিতে হবে।’
বলে তারা ক্ষেতের পাশে এক খোঁয়ার তয়ের করল।
কাঠ দিয়ে ছোট্ট ঘরের মতন খোঁয়ার তয়ের করতে হয়। তার ভিতরে কোন জন্ত ঢুকলে তার দরজা আপনি বন্ধ হয়ে যায়। তাতেই সে জন্ত খোঁয়াড়ের ভিতর আটকা পড়ে।
চাষীরা যখন খোঁয়াড় তয়ের করছে, শিয়াল তখন হাসছে আর বলছে ‘আমার জন্যে, না মামার জন্যে? এমন সুন্দর ঘরে মামা থাকলেই ভালো হয়।’
তার পরদিনই সে বাঘকে গিয়ে বললে, ‘মামা, একটি বড় নিমন্ত্রণ তো এসেছে। রাজার ছেলের বিয়ে, সেখানে আমি গান গাইব, আর তুমি বাজাবে। আর খাব যা, তার তো কথাই নেই! তারা পালকি পাঠিয়েছে, যাবে মামা?’
বাঘ বললে, ‘তা আর যাব না! এমন নিমন্ত্রণটা কি ছাড়তে আছে! আবার তারা পালকিও পাঠিয়েছে!’
শিয়াল বললে, ‘সে কি যে-সে পালকি? এমন পালকিতে আর চড়নি মামা।’ এমনি কথাবার্তা বলে দুজনে সেই আখের ক্ষেতের ধারে এল, যেখানে সেই খোঁয়াড় রয়েছে। খোঁয়াড় দেখে বাঘ বললে, ‘খালি পালকি পাঠিয়েছে, বেয়ারা পাঠায়নি যে?’
শিয়াল বললে, ‘আমরা উঠে বসলেই বেয়ারা আসবে এখন।’
বাঘ বললে, ‘পালকির যে ডাণ্ডা নেই, বেয়ারারা কি করে বইবে?’
শিয়াল বললে, ‘ডাণ্ডা তারা সঙ্গে আনবে।’
একথা শুনে বাঘ যেই খোঁয়াড়ের ভিতর ঢুকেছে, অমনি ধরাস করে তার দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তখন শিয়াল বললে, ‘মামা, দরজাটা বন্ধ করে দিলে আমি ঢুকব কি করে?’
বাঘ বললে, ‘তোমার ঢুকে কাজ নেই এবারের নিমন্ত্রণটা আমিই খাইগে।’
শিয়াল বললে, ‘বেশ কথা মামা! খুব ভালো করে পেট ভরে নিমন্ত্রণ খেও। কম খেও না যেন!’ এই বলে শিয়াল হাসতে-হাসতে তার দেশে চলে গেল।
তারপর চাষীরা এসে দেখল যে বাঘমশাই খোঁয়াড়ের ভিতর বসে আছেন। তখন তারা কি খুশি যে হল, কি বলব!
তারা সকলকে ডেকে বললে, ‘আন খন্তা, আন বল্লম,আন যে যা পারিস! খোঁয়াড়ে বাঘ পড়েছে। আয় তোরা কে কোথায় আছিস।’
অমনি সকলে ছুটে এসে বাঘকে মেরে শেষ করল।


দহন | জাকিয়া সুলতানা


চৌধুরী মিনহা প্রতিদিন ভোর পাঁচটায় উঠে ফজরের নামাজ পড়ে হালকা কিছু খেয়ে বিছানায় যান, আর ওঠেন আটটার দিকে। কিন্তু আজ তার কি যে হলো, বিছানায়ও যেতে ইচ্ছে করছে না। কিছুক্ষণ গড়াগড়ি করে বারান্দায় বসে আছেন। কাজের মেয়েটা সাধারণত সাতটায় উঠে নাশতা তৈরি করে তাকে জাগায়, কিন্তু আজ কাজের মেয়েটি উঠেই দেখে ম্যাডাম বারান্দায় বসা। ওতো এক রকম দৌড়ে গিয়েই—খালাম্মা আপনি আজ এত তাড়াতাড়ি উঠেছেন, আমি তো নাশতা তৈরি করতে পারিনি।
অসুবিধে নেই, মর্জিনা তুমি তোমার কাজ সেরে আমাকে একই টাইমে নাশতা দেবে। আমার শরীরটা তেমন ভালো নেই। তাই এখানে বসে আছি। তুমি আমাকে পত্রিকাটা এনে দাও।
সকাল থেকেই চৌধুরী মিনহার মনটা ভালো নেই। নিজের জীবনের অনেক কিছুরই না পাওয়ার বেদনা তাকে কুরে কুরে খেয়েছে সারাটি জীবন। এখন মধ্যবয়সে এসে মনে হচ্ছে জীবনে অনেক ভুলই করেছি, কিন্তু শোধরাবার সময় যে আর নেই। কিন্তু না পাওয়ার বেদনা যে কতটা প্রখর, তা আজ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেন তিনি। কিন্তু সময় হারিয়ে সে উপলব্ধির তো কোনো অর্থই নেই। কিন্তু মেয়েটা? মেয়েটাও কী আমার মতোই সেই একই পথে হাঁটছে? কীভাবে বোঝাই ওকে? ও ছাড়া যে আমার জীবনে আর কিছুই নেই অবশিষ্ট।
আশির দশকে চৌধুরী মিনহার বিয়ে হয়েছিল ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সালেহ আহমেদের সঙ্গে। উচ্চ বংশের ছেলে সালেহ আহমেদ। বাবার অগাধ সম্পদ না থাকলেও একজন ভালো মানুষ হিসেবে সমাজে সর্বজনপ্রিয়। কিন্তু এ বিয়েতে মত ছিল না তার। কারণ কলেজ জীবনে ভালোবেসেছিলেন রেদোয়ান নামের এক যুবককে। রেদোয়ান ছিলেন এক পুলিশ অফিসারের ছেলে, আর সেখানেই আপত্তি ছিল মিনহার রক্ষণশীল বাবার। কোনোভাবেই বুঝতে চাননি মেয়েকে। তার একই কথা, ঘুষখোরের ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে নয়! যে বাবাকে দেশের সবাই এক নামে চেনে, যিনি জ্ঞানের ভাণ্ডার বলে পরিচিত; সেই বাবাকে বোঝানোর সাধ্যি কার? আর তার মেয়ে হয়ে যে একজনকে পছন্দ করেছে, সেটাই অনেক আশ্চর্যের ব্যাপার! শিক্ষানুরাগী হাতেম আলী, যিনি জীবনে শুধু মানুষকে দিয়েই গেছেন। কিন্তু নিজের মেয়ের জন্য কিছুই করতে পারলেন না। একটি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপ্যাল ছিলেন। গরিবদের জন্য বিনা বেতনে পড়ানো থেকে শুরু করে কার পাশে তিনি ছিলেন না? ছিল তার নিজের হাতে গড়া ফ্রি প্রাইমারি স্কুল, হাইস্কুল, এতিমখানা। যার দান-অনুদানের খবর মানুষের মুখে মুখে। বিদ্বান এই মানুষটির জীবনে এতটা কষ্ট আসবে, তা কেউ কল্পনাও করেনি কখনো। এতটাই আবেগি আর মুডি তার কন্যাটি যে... যখন শুনলেন তার বাবা এ বিয়েতে কিছুতেই মত দেবেন না, তখন সবকিছু শুধু মুখ বুজেই সহ্য করে গেছেন। বাবার সামাজিক অবস্থান আর মানসম্মানের দিকে তাকিয়ে বাবার মতের বিরোধিতা করেননি, দু’পায়ে দলেছেন নিজের ভালোবাসাকে।
বাবা যেখানে পাত্র পছন্দ করেছেন সেখানেই বিয়েতে মত দিয়েছেন। কিন্তু প্রতিশোধ নিয়েছেন নিজের উপর। আর সেই প্রতিশোধের আগুনে জ্বলেছেন একজন নিষ্পাপ আবু সালেহ উদ্দীন। শুধু জ্বলাই নয়, তিনি ছারখার হয়েছেন জীবনে। কিন্তু মিনহার প্রতিশোধের আগুনে তিনি কেন জ্বলবেন? এমন কথাটাও বলার মতো ইচ্ছে তার জাগেনি কখনও। ভাগ্যকেই বরণ করে কাটিয়ে দিয়েছেন একটি জীবন। মুখ বুজে মিনহার সব ধরনের অত্যাচার তিনি সহ্য করেছেন। এমন একজন ব্যক্তিত্বের মেয়ের পাণি তিনি গ্রহণ করেছেন যে, ঘরের বাইরে এ নিয়ে বলার মতো মানসিকতাও তার কাজ করেনি কখনও। এক সময়ের উচ্ছল বন্ধুবত্সল আবু সালেহ বিয়ের পর কেমন যেন একা একা থাকতে ভালোবাসতেন। অফিসে দু’একজন কলিগ এ নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা অনেকদিন করেছেন। কিন্তু কারও সঙ্গে শেয়ার তিনি করেননি, শুধু একবুক জ্বালা নীরবে সয়েছেন। যখন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে, তখন একদিন অপ্রাপ্ত বয়সে হার্ট অ্যাটাকে দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করলেন। মিনহার সঙ্গে স্মৃতি বলতে রেখে গেছেন মেয়ে বকুলকে। মরার সময় শুধু বলে গেছেন, আমার মেয়েটাকে তুমি কষ্ট দিও না।
কিন্তু সে কথা রাখতে পারলেন না মিনহা। যখন জানলেন তার মেয়েটিও একজনকে পছন্দ করে, তখন যেন আকাশ ভেঙে তার মাথায় পড়ল। কারণ, প্রেম-ভালোবাসা তো তার অভিধানে নেই। ওখানে জীবনে কোনো কম্প্রোমাইজ তিনি করতে পারবেন না। ও জিনিসটি যে তার জীবন থেকে মরে গেছে অনেক আগেই। তাই বলে কী তার একমাত্র আদরের সন্তানটিকে নিজের মতো করেই কষ্ট দেবেন? নাকি মেয়ের পছন্দকেই প্রাধান্য দেবেন, তাই নিয়ে ভেতরে ভেতরে তোলপাড় চলছে মিনহা চৌধুরীর।
সালেহ সাহেব মারা যাওয়ার পর কলেজ শিক্ষক মা আর বুয়েট পড়ুয়া একমাত্র মেয়ের জীবন মোটামুটি ভালোই চলছিল। কিন্তু বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো অবস্থা হলো, যখন তিনি জানলেন তার মেয়েটি তারই মতো একই ভুল করতে যাচ্ছে। মেনে নিতে পারলেন না তিনি কিছুতেই। তাই প্রথমে মেয়েকে শোধরাবার চেষ্টা করলেন। একদম মায়ের কাজটিই বকুল করল। শুধু বলল, মা তুমি নিশ্চিত থাক, আমি তোমার অবাধ্য হয়ে কিছু করব না। তুমি যা চাও তাই হবে। তুমি আমাকে নিয়ে একদম ভেবো না। কিন্তু বকুল যে ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যাচ্ছে, তা তার রাশভারি মা কী করে বুঝবে? কারণ বকুল আর তার মায়ের সম্পর্কটা ছিল এক রকম দূরত্বেরই। জীবনে মেয়ের সঙ্গে কখনও প্রয়োজনের বাইরে কথা বলতেন না তিনি। সব সময় একটা মাস্টার মাস্টার ভাব। কিন্তু সবকিছু জানার পরেও মিনহা চৌধুরী বোঝার চেষ্টা করেননি কখনও বকুলের হৃদয়ে কতটা রক্তক্ষরণ হচ্ছে। যে ভালোবাসার জন্য তার জীবনটা এভাবে ছারখার হয়ে গেল, সেখানে বকুলের ভালোবাসাকে প্রাধান্য দেয়াটা ছিল তার অতি প্রয়োজন। কিন্তু তিনি করলেন তার উল্টোটি। বকুল ভালো করেই জানে, ওর একরোখা ধরনের মায়ের অনুমতি পাওয়া হয়তো কখনোই সম্ভব না। যে এক কথা দু’বার বলে না, তার কাছে তো কোনো কিছু ভিক্ষা চেয়েও লাভ নেই। তাই বলে তো আর জীবন থেমে থাকবে না। হয়তো এখন হাঁটতে হবে উল্টোপথে। তাই বকুল পাথরে বুক বেঁধে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। অন্তত পড়াশোনাটা তো ঠিকমত করতে হবে।
বকুল কীভাবে সাকিবকে বোঝাবে যে ওর মাকে দ্বিতীয়বার কষ্ট দেয়া ওর পক্ষে সম্ভব না। তাই যেভাবেই হোক সাকিবকে ভুলতে হবে। আস্তে আস্তে দূরত্ব সৃষ্টি করতে লাগল বকুল। যেখানে ঘুমকাতুরে সাকিবের ঘুম ভাঙত বকুলের ফোনে, সেখানে আজ দু’দিন গত হতে চলল বকুল ফোন করছে না। বড্ড চিন্তায় পড়ে গেল সাকিব। কী হয়েছে ওর, ফোন করছে না কেন? কোনো রকম অসুখ করল না তো? সাকিব ফোন করে, বকুল ধরে না; আবার ফোন করে সে। না, সে ধরে না। তৃতীয়বার বলে, সাকিব আমার শীররটা তেমন ভালো নেই, কালকে তোমার সঙ্গে ক্যাম্পাসে দেখা হবে। সাকিব চিন্তায় পড়ে যায়, কী এমন অপরাধ করলাম আমি। আমার জানা মতে আমি তো কোনো অপরাধ করিনি। তাহলে কেন ও এমন করছে। সারাটি দিন-রাত খুব কষ্টে যায় সাকিবের। কিন্তু কোনো সমাধান খুঁজে পায় না সে। সামনে পরীক্ষা, এক মুহূর্তও সময় অপচয় করা চলবে না। তাই আবার মনোযোগী হয় পড়াশোনায়। পরের দিন ক্যাম্পাসে দেখা বকুলের সঙ্গে। কিন্তু কী বলবে ও? হয়তো পরীক্ষার জন্যই ও এমনটি করছে।
—কী হয়েছে বকুল? কোনো সমস্যা?
—না, তেমন কিছু নয়।
—তবে?
আসলে আমার শরীরটা তেমন ভালো নেই, আর সামনে তো পরীক্ষা। আমি ভাবছি আমরা কিছুদিন দেখা-সাক্ষাত্ বা কোনো রকম ফোন করব না।
সাকিব শুধু হুম বলে ক্লাসের দিকে পা বাড়ায়।
আড়ালে মুখ বুজে কিছুক্ষণ কেঁদে নেয় বকুল। হয়তো আর কোনোদিনই একপথে আর সাকিবের সঙ্গে হাঁটা হবে না। হয়তো কোনো ফুচকার দোকানে একই প্লেটে আর ফুচকা খাওয়া হবে না, বা লাইব্রেরিতে একসঙ্গে বসে আর কোনোদিন ক্লাসওয়ার্ক করা হবে না। হয়তো একটি রিকশায় হুড খোলা রেখে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে আর ভেজা হবে না। এ আমি কী করলাম! সাকিব আমাকে কতটা ভালোবাসে তাতো আমি জানি, আমাকে না পেলে ওর হয়তো বড় ধরনের অ্যাক্সিডেন্ট হবে। কিন্তু মা? আমি কাকে বেছে নেব? সামনে আমার দুটি পথ খোলা—এক সাকিবকে গ্রহণ করা, না হয় মায়ের কথা মেনে নেয়া। না, মাকে আমি কষ্ট দিতে পারব না। এগুলো ভাবলে আমি দুর্বল হয়ে পড়ব সাকিবের প্রতি। আমাকে এগুলো আর ভাবা চলবে না। আমার পথ এখন সাকিবের উল্টোদিকে। বিদায় সাকিব! বিদায়! ভালো থেকো।
বকুলের মায়ের জীবনের সবকিছুই একদিন বকুল তার ডায়রি পড়ে জেনে নেয়। কিন্তু মায়ের এমন কষ্টের জীবনে বকুল আর কষ্ট দিতে চায়নি বলেই ভুলতে চাচ্ছে সাকিবকে। কিন্তু তা কেমন করে সম্ভব? যাকে তার মনপ্রাণ সব দিয়ে বসেছে, তাকে বাকি জীবনে ভুলে থাকা কীভাবে সম্ভব? আর মাকেই বা কীভাবে কষ্ট দেবে বুঝতে পারে না বকুল। তাই ভাবতে থাকে আমাকে এমন আবেগি হলে চলবে না। যেভাবেই হোক আমাকে শক্ত হতেই হবে।
একদিন ইন্টারনেট ঘাঁটতে গিয়ে বকুল দেখতে পেল লন্ডনের একটি স্থাপত্য সংস্থা কিছু লোক নিয়োগ দেবে। এমন সুযোগ আর হাতছাড়া করা যাবে না। তাই দ্রুত আবেদন করতে হবে।
যেমন ভাবা তেমন কাজ। এত দ্রুত যে সবকিছু হয়ে যাবে, বকুল ভাবতেও পারেনি। তাই তো পরীক্ষার রেজাল্ট হতে না হতেই হাতের নাগালেই চাকরি। বকুল গোপনে তার পাসপোর্ট, যাবতীয় কাগজপত্র রেডি করে ফেলল। এক মাসের মধ্যেই সবকিছু হয়ে গেল। দু’দিন বাদেই বকুলের ফ্লাইট। তাই এখন শুধু বিদায় জানানোর পালা। মাকে তাই লেখা তার চিঠি—

মামণি,
আমি চলে যাচ্ছি; না সাকিবের সঙ্গে নয়, আমার কর্মস্থলে। কী তুমি অবাক হচ্ছো যে তোমার ভীতু মেয়েটা এতকিছু কীভাবে পারল? হ্যাঁ মা আমাকে পারতে হয়েছে। তুমি চেয়েছিলে আমি জীবনে একজন প্রতিষ্ঠিত ইঞ্জিনিয়ার হই। আর বাবা চেয়েছিলেন আমি ডাক্তার হই, কিন্তু এখানেও তুমি বাবার চাওয়াকে কোনো পাত্তা দাওনি। তুমি যা চেয়েছ, তাই হয়েছে। তুমি আমাকে বুয়েটে ভর্তি করানোর জন্য কী না করেছ। কিন্তু দেখ মা তোমার ইচ্ছেটাকে সৃষ্টিকর্তা কতটা তাড়াতাড়িই না গ্রহণ করেছে? পাস করতে না করতেই আমার চাকরিটা হয়ে গেল। হয়তো বিদেশে তুমি যেতে দিতে চাইতে না, তাই তোমাকে কিছু না জানিয়েই সবকিছু করতে হয়েছে আমাকে। সরি মা, এছাড়া যে আমার কোনো উপায় ছিল না। একমাত্র বিদেশই পারে তোমার-আমার ভাঙন থেকে দূরে রাখতে। কারণ একই ছাদের নিচে থেকে হয়তো তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা অটুট রাখা সম্ভব হতো না। যেমনটা হয়েছিলে তোমার সঙ্গে নানা ভাইয়ের। তাই চলে গেলাম দূরে, বহুদূরে। তোমার-আমার সম্পর্কটা এখন আরও বেশি গভীর হবে, তুমি দেখো মা, সকাল-দুপুর-সন্ধ্যে তোমার খবর আমি নেব। যেটা তোমার কাছাকাছি থেকেও হয়তো সম্ভব হতো না। কারণ আমি ছাড়া যে এ দুনিয়ায় তোমার আর কিছু নেই।
মা, সারাটি জীবন তুমি ঝরেপড়া বকুল কুড়িয়ে তোমার মনের মানুষটির জন্য মালা গেঁথেছিলে। আর তাকে না পেয়ে আমার নিষ্পাপ বাবার জীবনটা তুমি নষ্ট করে দিয়েছ। কী দোষ ছিল আমার বাবার, বলতে পার? তাকে তুমি কোনোদিন স্বামীর মর্যাদা দাওনি। একই ছাদের নিচে বাস করে স্বামী-স্ত্রীর যে কী সম্পর্ক, তা তোমরা অনুভব করনি কখনও। মাঝখানে অকালে আমাকে হতে হয়েছে এতিম। কেন তোমার না পাওয়া ভালোবাসার বলি আমাদের বাবা-মেয়েকে হতে হয়েছে, বলতে পার কি? মা, সাকিব আমার জীবনসঙ্গী হিসেবে অযোগ্য ছিল না। কিন্তু তোমার ওই যে ভালোবাসাকে ঘৃণা করা, যেটাকে তুমি মনে কর অর্থহীন, তোমার কাছে সেই অর্থহীন ভালোবাসাটাই আজ আমাকে এত দূরে ঠেলে দিয়েছে, কিন্তু একটি বারও তুমি এর বিপরীত দিকটা ভেবে দেখলে না মা। ভুল যদি কেউ করে থাকে করেছে তোমার বাবা, আর তার মাসুল কেন আমার বাবা বা আমি দিলাম? জানি তুমি আজ আমার কোনো প্রশ্নেরই জবাব দিতে পারবে না। আর তাই আমি আমার জীবনে আমার বাবার মতো কোনো নিষ্পাপ লোককে ঠকাতে চাই না বলেই আমার এ সিদ্ধান্ত। মা, তুমি তোমার জীবনের সব আবেগ দিয়ে আমার নাম রেখেছ বকুল। আর এ নামটিই হয়তো তোমাকে আমার খুব কাছে রাখবে মা, তুমি ভালো থেকো। দোয়া যদি নাও কর, অন্তত বদ-দোয়া কর না। মা, এছাড়া যে আমার আর কোনো উপায় ছিল না। হ
ইতি তোমার
ঝরাবকুল
 
সূত্র : আমার দেশ


নির্বাচিত বিষয়গুলো দেখুন

কবিতা ছোটগল্প গল্প নিবন্ধ ছড়া টিপস রম্য গল্প প্রেমের কবিতা ইসলামী সাহিত্য স্বাস্থ্য কথা কৌতুক কম্পিউটার টিপস জানা অজানা লাইফ স্ট্যাইল স্বাধীনতা স্থির চিত্র ইসলাম ফিচার শিশুতোষ গল্প কবি পরিচিতি প্রবন্ধ ইতিহাস চিত্র বিচিত্র প্রকৃতি বিজ্ঞান রম্য রচনা লিরিক ঐতিহ্য পাখি মুক্তিযুদ্ধ শরৎ শিশু সাহিত্য বর্ষা আলোচনা বিজ্ঞান ও কম্পিউটার বীরশ্রেষ্ঠ লেখক পরিচিতি স্বাস্থ টিপস উপন্যাস গাছপালা জীবনী ভিন্ন খবর হারানো ঐতিহ্য হাসতে নাকি জানেনা কেহ ছেলেবেলা ফল ফুল বিরহের কবিতা অনু গল্প প্রযুক্তি বিউটি টিপস ভ্রমণ মজার গণিত সংস্কৃতি সাক্ষাৎকার ঔষধ গবেষণা ডাউনলোড প্যারডী ফেসবুক মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য রম্য কবিতা সাধারণ জ্ঞান সাহিত্যিক পরিচিতি সায়েন্স ফিকশান স্বাধীনতার কবিতা স্বাধীনতার গল্প কৃষি তথ্য চতুর্দশপদী প্রেমের গল্প মোবাইল ফোন রুপকথার গল্প কাব্য ক্যারিয়ার গৌরব জীবনের গল্প ফটোসপ সবুজ সভ্যতা
অতনু বর্মণ অদ্বৈত মারুত অধ্যাপক গোলাম আযম অনন্ত জামান অনিন্দ্য বড়ুয়া অনুপ সাহা অনুপম দেব কানুনজ্ঞ অমিয় চক্রবর্তী অরুদ্ধ সকাল অর্ক অয়ন খান আ.শ.ম. বাবর আলী আইউব সৈয়দ আচার্য্য জগদীশচন্দ্র বসু আজমান আন্দালিব আতাউর রহমান কাবুল আতাউস সামাদ আতোয়ার রহমান আত্মভোলা (ছন্দ্রনাম) আদনান মুকিত আনিসা ফজলে লিসি আনিসুর রহমান আনিসুল হক আনোয়ারুল হক আন্জুমান আরা রিমা আবদুল ওহাব আজাদ আবদুল কুদ্দুস রানা আবদুল গাফফার চৌধুরী আবদুল মান্নান সৈয়দ আবদুল মাবুদ চৌধুরী আবদুল হাই শিকদার আবদুল হামিদ আবদুস শহীদ নাসিম আবিদ আনোয়ার আবু মকসুদ আবু সাইদ কামাল আবু সাঈদ জুবেরী আবু সালেহ আবুল কাইয়ুম আহম্মেদ আবুল মোমেন আবুল হাসান আবুল হায়াত আবুল হোসেন আবুল হোসেন খান আবেদীন জনী আব্দুল কাইয়ুম আব্দুল মান্নান সৈয়দ আব্দুল হালিম মিয়া আমানত উল্লাহ সোহান আমিনুল ইসলাম চৌধুরী আমিনুল ইসলাম মামুন আরিফুন নেছা সুখী আরিফুর রহমান খাদেম আল মাহমুদ আলম তালুকদার আশীফ এন্তাজ রবি আসমা আব্বাসী আসাদ চৌধুরী আসাদ সায়েম আসিফ মহিউদ্দীন আসিফুল হুদা আহমদ - উজ - জামান আহমদ বাসির আহমেদ আরিফ আহমেদ খালিদ আহমেদ রাজু আহমেদ রিয়াজ আহসান হাবিব আহসান হাবীব আহাম্মেদ খালিদ ইকবাল আজিজ ইকবাল খন্দকার ইব্রাহিম নোমান ইব্রাহীম মণ্ডল ইমদাদুল হক মিলন ইলিয়াস হোসেন ইশতিয়াক ইয়াসির মারুফ উত্তম মিত্র উত্তম সেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এ কে আজাদ এ টি এম শামসুজ্জামান এ.বি.এম. ইয়াকুব আলী সিদ্দিকী একরামুল হক শামীম একে আজাদ এনামুল হায়াত এনায়েত রসুল এম আহসাবন এম. মুহাম্মদ আব্দুল গাফফার এম. হারুন অর রশিদ এরশাদ মজুদার এরশাদ মজুমদার এস এম নাজমুল হক ইমন এস এম শহীদুল আলম এস. এম. মতিউল হাসান এসএম মেহেদী আকরাম ওমর আলী ওয়াসিফ -এ-খোদা ওয়াহিদ সুজন কবি গোলাম মোহাম্মদ কমিনী রায় কাজী আনিসুল হক কাজী আবুল কালাম সিদ্দীক কাজী নজরুল ইসলাম কাজী মোস্তাক গাউসুল হক শরীফ কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম কাপালিক কামরুল আলম সিদ্দিকী কামাল উদ্দিন রায়হান কার্তিক ঘোষ কায়কোবাদ (কাজেম আলী কোরেশী) কৃষ্ণকলি ইসলাম কে এম নাহিদ শাহরিয়ার কেজি মোস্তফা খন্দকার আলমগীর হোসেন খন্দকার মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ্ খান মুহাম্মদ মইনুদ্দীন খালেদ রাহী গাজী গিয়াস উদ্দিন গিরিশচন্দ সেন গিয়াস উদ্দিন রূপম গোলাম কিবরিয়া পিনু গোলাম নবী পান্না গোলাম মোস্তফা গোলাম মোহাম্মদ গোলাম সরোয়ার চন্দন চৌধুরী চৌধুরী ফেরদৌস ছালেহা খানম জুবিলী জ. রহমান জসিম মল্লিক জসীম উদ্দিন জহির উদ্দিন বাবর জহির রহমান জহির রায়হান জাওয়াদ তাজুয়ার মাহবুব জাকির আবু জাফর জাকির আহমেদ খান জাকিয়া সুলতানা জান্নাতুল করিম চৌধুরী জান্নাতুল ফেরদাউস সীমা জাফর আহমদ জাফর তালুকদার জাহাঙ্গীর আলম জাহান জাহাঙ্গীর ফিরোজ জাহিদ হোসাইন জাহিদুল গণি চৌধুরী জায়ান্ট কজওয়ে জিয়া রহমান জিল্লুর রহমান জীবনানন্দ দাশ জুবাইদা গুলশান আরা জুবায়ের হুসাইন জুলফিকার শাহাদাৎ জেড জাওহার জয়নাল আবেদীন বিল্লাল ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া ড. কাজী দীন মুহম্মদ ড. ফজলুল হক তুহিন ড. ফজলুল হক সৈকত ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ ড. মুহা. বিলাল হুসাইন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ড. রহমান হাবিব ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ডক্টর সন্দীপক মল্লিক ডা. দিদারুল আহসান ডা: সালাহ্উদ্দিন শরীফ তমিজ উদদীন লোদী তাজনীন মুন তানজিল রিমন তাপস রায় তামান্না শারমিন তারক চন্দ্র দাস তারাবাঈ তারেক রহমান তারেক হাসান তাসনুবা নূসরাত ন্যান্সী তাসলিমা আলম জেনী তাহমিনা মিলি তুষার কবির তৈমুর রেজা তৈয়ব খান তৌহিদুর রহমান দর্পণ কবীর দিলওয়ার হাসান দেলোয়ার হোসেন ধ্রুব এষ ধ্রুব নীল নঈম মাহমুদ নবাব আমিন নাইমুর রশিদ লিখন নাইয়াদ নাজমুন নাহার নাজমুল ইমন নাফিস ইফতেখার নাবিল নাসির আহমেদ নাসির উদ্দিন খান নাহার মনিকা নাহিদা ইয়াসমিন নুসরাত নিজাম কুতুবী নির্জন আহমেদ অরণ্য নির্মলেন্দু গুণ নিসরাত আক্তার সালমা নীল কাব্য নীলয় পাল নুরে জান্নাত নূর মোহাম্মদ শেখ নূর হোসনা নাইস নৌশিয়া নাজনীন পীরজাদা সৈয়দ শামীম শিরাজী পুলক হাসান পুষ্পকলি প্রাঞ্জল সেলিম প্রীতম সাহা সুদীপ ফকির আবদুল মালেক ফজল শাহাবুদ্দীন ফররুখ আহমদ ফাতিহা জামান অদ্রিকা ফারুক আহমেদ ফারুক নওয়াজ ফারুক হাসান ফাহিম আহমদ ফাহিম ইবনে সারওয়ার ফেরদৌসী মাহমুদ ফয়সাল বিন হাফিজ বাদশা মিন্টু বাবুল হোসেইন বিকাশ রায় বিন্দু এনায়েত বিপ্রদাশ বড়ুয়া বেগম মমতাজ জসীম উদ্দীন বেগম রোকেয়া বেলাল হোসাইন বোরহান উদ্দিন আহমদ ম. লিপ্স্কেরভ মঈনুল হোসেন মজিবুর রহমান মন্জু মতিউর রহমান মল্লিক মতিন বৈরাগী মধু মনসুর হেলাল মনিরা চৌধুরী মনিরুল হক ফিরোজ মরুভূমির জলদস্যু মর্জিনা আফসার রোজী মশিউর রহমান মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর মা আমার ভালোবাসা মাইকেল মধুসূদন দত্ত মাওলানা মুহাম্মাদ মাকসুদা আমীন মুনিয়া মাখরাজ খান মাগরিব বিন মোস্তফা মাজেদ মানসুর মুজাম্মিল মানিক দেবনাথ মামুন হোসাইন মারজান শাওয়াল রিজওয়ান মারুফ রায়হান মালিহা মালেক মাহমুদ মাসুদ আনোয়ার মাসুদ মাহমুদ মাসুদা সুলতানা রুমী মাসুম বিল্লাহ মাহফুজ উল্লাহ মাহফুজ খান মাহফুজুর রহমান আখন্দ মাহবুব আলম মাহবুব হাসান মাহবুব হাসানাত মাহবুবা চৌধুরী মাহবুবুল আলম কবীর মাহমুদা ডলি মাহমুদুল বাসার মাহমুদুল হাসান নিজামী মাহ্‌মুদুল হক ফয়েজ মায়ফুল জাহিন মিতা জাহান মু. নুরুল হাসান মুজিবুল হক কবীর মুন্সি আব্দুর রউফ মুফতি আবদুর রহমান মুরাদুল ইসলাম মুস্তাফিজ মামুন মুহম্মদ নূরুল হুদা মুহম্মদ শাহাদাত হোসেন মুহাম্মদ আনছারুল্লাহ হাসান মুহাম্মদ আবু নাসের মুহাম্মদ আমিনুল হক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল মুহাম্মদ মহিউদ্দিন মুহাম্মাদ হাবীবুল্লাহ মুহিউদ্দীন খান মেজবাহ উদ্দিন মেহনাজ বিনতে সিরাজ মেহেদি হাসান শিশির মো. আরিফুজ্জামান আরিফ মো: জামাল উদ্দিন মোঃ আহসান হাবিব মোঃ তাজুল ইসলাম সরকার মোঃ রাকিব হাসান মোঃ রাশেদুল কবির আজাদ মোঃ সাইফুদ্দিন মোমিন মেহেদী মোর্শেদা আক্তার মনি মোশাররফ মোশাররফ হোসেন খান মোশারেফ হোসেন পাটওয়ারী মোহসেনা জয়া মোহাম্মদ আল মাহী মোহাম্মদ জামাল উদ্দীন মোহাম্মদ নূরুল হক মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ্ মোহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ মোহাম্মদ সা'দাত আলী মোহাম্মদ সাদিক মোহাম্মদ হোসাইন মৌরী তানিয় যতীন্দ্র মোহন বাগচী রজনীকান্ত সেন রণক ইকরাম রফিক আজাদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রহমান মাসুদ রহিম রায়হান রহিমা আখতার কল্পনা রাখাল রাজিব রাজিবুল আলম রাজীব রাজু আলীম রাজু ইসলাম রানা হোসেন রিয়াজ চৌধুরী রিয়াদ রুমা মরিয়ম রেজা উদ্দিন স্টালিন রেজা পারভেজ রেজাউল হাসু রেহমান সিদ্দিক রোকনুজ্জামান খান রোকেয়া খাতুন রুবী শওকত হোসেন শওকত হোসেন লিটু শওগাত আলী সাগর শফিক আলম মেহেদী শরীফ আতিক-উজ-জামান শরীফ আবদুল গোফরান শরীফ নাজমুল শাইখুল হাদিস আল্লামা আজীজুল হক শামছুল হক রাসেল শামসুজ্জামান খান শামসুর রহমান শামস্ শামীম হাসনাইন শারমিন পড়শি শাহ আব্দুল হান্নান শাহ আলম শাহ আলম বাদশা শাহ আহমদ রেজা শাহ নেওয়াজ চৌধুরী শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ শাহজাহান কিবরিয়া শাহজাহান মোহাম্মদ শাহনাজ পারভীন শাহাদাত হোসাইন সাদিক শাহাবুদ্দীন আহমদ শাহাবুদ্দীন নাগরী শাহিন শাহিন রিজভি শিউল মনজুর শিরিন সুলতানা শিশিরার্দ্র মামুন শুভ অংকুর শেখ হাবিবুর রহমান সজীব সজীব আহমেদ সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত সাইদা সারমিন রুমা সাইফ আলি সাইফ চৌধুরী সাইফ মাহাদী সাইফুল করীম সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদূদী সাকিব হাসান সাজ্জাদুর রহমান সাজ্জাদ সানজানা রহমান সাবরিনা সিরাজী তিতির সামছুদ্দিন জেহাদ সামিয়া পপি সাযযাদ কাদির সারোয়ার সোহেন সালমা আক্তার চৌধুরী সালমা রহমান সালেহ আকরাম সালেহ আহমদ সালেহা সুলতানা সিকদার মনজিলুর রহমান সিমু নাসের সিরহানা হক সিরাজুল ইসলাম সিরাজুল ফরিদ সুকান্ত ভট্টাচার্য সুকুমার বড়ুয়া সুকুমার রায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সুফিয়া কামাল সুভাষ মুখোপাধ্যায় সুমন সোহরাব সুমনা হক সুমন্ত আসলাম সুমাইয়া সুহৃদ সরকার সৈয়দ আরিফুল ইসলাম সৈয়দ আলমগীর সৈয়দ আলী আহসান সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন সিরাজী সৈয়দ তানভীর আজম সৈয়দ মুজতবা আলী সৈয়দ সোহরাব হানিফ মাহমুদ হামিদুর রহমান হাসান আলীম হাসান ভূইয়া হাসান মাহবুব হাসান শরীফ হাসান শান্তনু হাসান হাফিজ হাসিনা মমতাজ হুমায়ূন আহমেদ হুমায়ূন কবীর ঢালী হেলাল মুহম্মদ আবু তাহের হেলাল হাফিজ হোসেন মাহমুদ হোসেন শওকত হ্নীলার বাঁধন

মাসের শীর্ষ পঠিত

 
রায়পুর তরুণ ও যুব ফোরাম

জোনাকী অনলাইন লাইব্রেরী - Jonaaki Online Library © ২০১১ || টেমপ্লেট তৈরি করেছেন জোনাকী টিম || ডিজাইন ও অনলাইন সম্পাদক জহির রহমান || জোনাকী সম্পর্কে পড়ুন || জোনাকীতে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ